ওগো দুঃখ জাগানিয়া

সেদিন বৃষ্টি ছিলো। রিমঝিম বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দেই আমার ঘুম ভেঙেছিলো। বৃষ্টি হচ্ছে বুঝতে পেরে দক্ষিণা জানালা খুলে পর্দাটা সরাতেই একপশলা বৃষ্টিধোঁয়া বাতাস আমার গায় আছড়ে পড়লো। আমি পরম সুখে তা উপভোগ করলাম দুচোখ বন্ধ করে। বহুদিন পেরিয়ে গেছে এমন সুখের পরশ পাইনি প্রকৃতিতে। বৃষ্টি যখন দক্ষিণা বাতাসকে সঙ্গে নিয়ে প্রকৃতি প্রেমীদের দুয়ারে এসে দাঁড়ায়, তখন হয়তো এমনি পরশ দেবে বলে তারা আসে। তবে এ পরশ আমায় যতোটা খুশি করে, বেদনার সুর বেহালায় যেন ততটাই গভীরভাবে বেজে উঠে। পাশে তাকিয়ে যখন দেখি তুমি নেই, জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা হাতের উপর যখন তোমার হাত এসে পড়ে না, যখন তোমার অন্য হাতটি পেছন থেকে এসে কোমড়ে জড়ায় না, তখনই বেহালা আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমি একা। তবে আমি একা ছিলাম না। প্রকৃতি আমাকে একাকীত্বের জোয়ারে ভাসিয়েছে। তবু আমি সুখী, তোমার দুঃখজরা স্মৃতি আগলে। মনেপ্রাণে অনুভব করি সেই মধুর দিনগুলো, যা আজও আমার স্মৃতির পাতায় অমলিন।
.
আমি হিমু, বিলিন হয়ে গিয়েছিলাম তুমি আরিয়ানের মাঝে। ২৪ জানুয়ারী প্রথম ক্যাম্পাসে আসি আমি ছাত্র হিসেবে। আহলাদে আটখানায় পূর্ণ ছিলাম আমার অনেক পরিশ্রমে স্বপ্নপূরণ হয়েছে ভেবে। তখন ক্যাম্পাসে কিছুই তেমন চিনি না। ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছি রীতিমত। একরকম সব কিছু দেখে নেয়ার মতো। হঠাৎ তোমাকে সিনিয়র ভেবে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম লাইব্রেরীর কথা। মুচকি হেসে উত্তর করেছিলে তুমিও নতুন। সেই থেকে পরিচয়। কতটা পথ যে একসঙ্গে পেরিয়ে এসে আজ আমি একা হয়েছি। তা বলতে কেমন আটকে যাচ্ছে আমার গলা।
.
প্রথম বর্ষের শুরুর দিকে আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম বইমেলা। কোনো প্রকার সূত্র ছাড়াই পরম বন্ধুর মতো আমরা মিশেছি।
ধীরে ধীরেই আমাদের প্রেম গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। বন্ধুত্বের প্রেম ক্রমেই রুপ নেয় ভালোবাসার সাগরে। সে সাগরে ভেসেছি আমরা সকল ঢেউকে অতিক্রম করে। দীর্ঘ ৬ বছর আমাদের সময় কেটেছে ভালবাসার সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে। কোনো বাঁধার প্রাচীরই যেন তখন আমাদের থামাতে পারেনি। একটা সময় শুরু হলো আমাদের কর্মজীবন। দুজনই ঢাকাতে এসে একসঙ্গে থাকতে শুরু করলাম। তবে এবার ভালোবাসার সাগরে উত্তাল ঢেউ উঠতে শুরু করলো। ছোট্ট একটা সংসার, দুটি মানুষের ছোট্ট কিছু স্বপ্ন। খুব ভালোভাবে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো।
.
একসময় আরিয়ানের বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ আসতে শুরু করলো। আরিয়ান বিভিন্ন বাহানায় তা এড়িয়ে যেতে শুরু করলো। কিন্তু এভাবে আর কতদিন! আরিয়ান তার পরিবারকে জানালো সে বিয়ে করতে রাজি নয়। সে হিমুর সঙ্গে থাকতে চায়।
রক্ষনশীল সমাজব্যবস্থা পূর্ণ দেশে আরিয়ানের পরিবার সাভাবিক কারনেই তা মেনে নেয়নি। মেনে না নেয়ার একপর্যায়ে আরিয়ান বাড়ির সঙ্গে সকল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এরই ফলশ্রুতিতে আরিয়ানের বাবা আমার নামে কিডনাপিং মামলা করলে একদিন রাতে হঠাৎ আমাদের বাসায় RAB উপস্থিত হয়। দরজা খুলতেই তারা আমার দিকে ক্রিমিনালের দৃষ্টিতে তাকায়। অনেক তর্ক বিতর্কের পর আমাদের দুজনেরই জায়গা হয় RAB অফিসে।
.
আরিয়ানের বাবা পরদিন সকালে আরিয়ানকে নিয়ে গেলেও আমি রয়ে গেলাম RAB অফিসেই। কিছুক্ষণ পর আমাকেও নিতে এলো। তবে আমার বাড়ির কেউ নয়, এসেছে পুলিশ। আরিয়ান বারবার বলছিল আমি নির্দোষ। কিন্তু সে কথা কেউ শুনেনি। কালো কাপড়ে আইনের চোখই শুধু বাধা নয়, একই কাপড়ে কানও বেধে দেয়া হয়েছে।
.
পুলিশ আমাকে আদালতে হাজির করলো। আদালত আমাকে উকিল নিযুক্তের পরামর্শ দিলে আমি তা অস্বীকার করেছিলাম। আদালতকে জানিয়েছিলাম আমিই আমার আত্মপক্ষ সমর্থন করতে চাই। আদালত আমাকে অনুমতি দিলো। আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো জেলে। তদন্তের নির্দেশ দেয়া হলো। মাস দুয়েক পর মামলার তদন্ত রিপোর্ট আদালতে হাজির করা হলো। তদন্তে আমাকে আসামি করা হয়েছে। আমি আরিয়ানকে কিডনাপ করেছিলাম। এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে উদ্ধার করেছে। উদ্ধারের সময় আমাকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে।
.
আদালতে শুরু হলো যুক্তি তর্ক। কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে আমাকে সত্য বলার শপথ পড়িয়ে শুরু হলো মূল পূর্ব।
উকিল: মহামান্য আদালত, আমি বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে আসামীকে প্রশ্ন করতে চাই। আপনার অনুমতি প্রার্থী।
আদালত: অনুমতি দেয়া হলো।
উকিল: হিমু, আপনি কেন আরিয়ান কে অপহরণ করেছিলেন?
হিমু: আরিয়ান যে কারনে আমাকে অপহরণ করেছিলেন, সেই একই কারণে।
উকিল: আরিয়ান কি আপনাকে অপহরণ করেছিল?
হিমু: এ প্রশ্ন আরিয়ানকে জিজ্ঞেস করুণ।
উকিল : আপনি আদালতকে বিভ্রান্ত করবার চেষ্টা করছেন!
আদালত: আদালত আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছে, সঠিক তথ্য দিয়ে আদালতকে সহযোগিতা করতে।
উকিল: আপনার বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ আনা হয়েছে যে, আপনি সমকামী। যা বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী দন্ডনীয় অপরাধ।
এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
হিমু: সংবিধান যেমন আপনার, তেমনি আমার সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও স্বাধীনতা ভোগ করবার সুযোগ দিবেন। সেখানে জন্মগত যৌনতার জন্য আপনি ভালোবাসার অধিকার পাবেন, আর আমাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে। এটা কি আমার প্রতি অবিচার নয়? যেখানে সংবিধানে সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
উকিল: আপনি কি সংবিধানকে অস্বীকার করছেন?
হিমু: আমি সংবিধানের প্রতি সম্মান রেখেই অসঙ্গতি গুলো বলার চেষ্টা করছি।
উকিল: আপনি কী মুসলিম?
হিমু: হ্যাঁ।
উকিল: আপনি কি লুত নবীর সম্প্রদায়ের কথা জানেন, যাদের সমকামীতার জন্য ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল?
হিমু: আপনি কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছে যে, লুত নবীর সম্প্রদায়ের একমাত্র অপরাধ ছিলো সমকামীতা? তারা এমন কোন অপকর্ম নেই যা করতো না। এবং সে সময় প্রভাবশালী নারীরা ক্রমাগত স্বামী থাকা সত্ত্বেও পর পুরুষকে ধর্ষণ করতো। যা ছিলো ব্যাভিচার। এবং এই ব্যাভিচারকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে যে, যা পূর্বে কোনো সম্প্রদায় করেনি।
উকিল : আপনি তো বিশ্বাস করেন যে, ইসলামে সমকামীতা নিষিদ্ধ?
হিমু : ইসলামে শুধুমাত্র সমকামী নিষিদ্ধ নয়। বর্তমান সমাজে প্রচলিত অনেক কাজ আছে যা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছেন। হস্তমৈথুন ইসলামে নিষিদ্ধ। একজন ব্যাক্তি খুঁজুন যিনি এই কর্মটি করেনি। বিবাহ বহির্ভূত যৌনতা ইসলামে নিষিদ্ধ। কিন্তু তা কি ইসলামের দোহাই দিয়ে থেমে আছে? রাষ্ট্রের ব্যাংক রাষ্ট্রের জনগনকে ব্যাংকিং সুবিধায় সুদ দিচ্ছে। তবে কি ইসলামে নিষিদ্ধ এই কাজটি করে রাষ্ট্র ইসলাম দ্রোহী হয়েছে? তবে সেখানে আপনাদের কোনো কথা নেই কেন? নাকি আপনাদের মাপকাঠি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে হয়?
নাকি সংখ্যায় বেশি হলে কোন পাপ নেই, কম হলেই যতো নিপীড়ন?
উকিল: আপনি কি জানেন সমকামীতাকে দিলে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটবে। ভেঙে পরবে সামাজিক শৃঙ্খলা?
হিমু: প্রতিদিন পত্রিকা খুলে ৬ মাসের শিশু থেকে শুরু করে ৭২ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণ করার খবর পড়েন। সমকামীতাকে নিষিদ্ধ রেখে আপনি সেই শৃঙ্খল রক্ষা করতে চাচ্ছেন, প্রতিদিন হত্যা গুম খুনের মূল্যবোধের কথা বলছেন? একবার ভেবে দেখুন, সমকামীতা নিষিদ্ধ ধোঁয়া তুলে একটি মেয়েকে আপনি আমার সঙ্গে বিয়ে দিলেন। আমি মোটেও তার প্রতি আসক্ত নই। আপনাদের সামাজিকতা রক্ষার যাঁতাকলে পড়ে কি আমাদের দুটি জীবনই ধ্বংসের দিকে আপনারা ঠেলে দিলেন না?
আদালত: আদালতের সময় শেষ হওয়ায় আজকের মতো আদালত মুলতবি ঘোষণা করা হচ্ছে পরবর্তী তারিখ না দেয়া পর্যন্ত।
.
এভাবেই চলতে থাকে আমার বিচার কার্য। দিন যায় মাস যায় করে দীর্ঘ সময় নিয়ে বিচার শেষ হয়। আমাদের অন্ধ বিচার কার্য ন্যায় দেখেনি। শুনেনি আমার কোনো যুক্তি তর্ক। আমাকে সাজা দেয়া হয়। আমি সাজা গ্রহণ করেছি। এই ভেবে যে স্বাধীনতা আজও বহু দূর।
কারাগারে বহুবার আমার পরিবার এসেছে আমাকে দেখতে। তবে কখনোই আসেনি আরিয়ান। হয়তো আসতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি। আদালতেই আরিয়ানকে কোনো কথা বলতে শুনিনি। আমিও কোনো প্রশ্ন করিনি আরিয়ানকে। আমি চাইনি আরিয়ান বিব্রত হোক। যেখানে সংবিধান আমাকে বুঝেনি, সমাজ আমাকে মানেনি সেখানে আরিয়ানকে আমি কী প্রশ্ন করতে পারতাম?
আরিয়ান তো চেয়েছিল আমাকে ভালোবাসতে, সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্মের ধোঁয়া তুলেছিল স্বার্থবাদী সংখ্যাগুরুরা।
.
আজও আমি আরিয়ানের স্পর্শ পাই। আজও আমি অপলক দৃষ্টিতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে। হয়তো আরিয়ান আসবে। একগুচ্ছ গোলাপ হাতে আরিয়ান আমাকে চিৎকার করে ডাকবে, হি…মু…আমি এসেছি।
আমি চিৎকার করে বলব, আরি…য়ান … তুমি দাঁড়াও আমি আসছি।
.
আরিয়ান হয়তো আসবে, হয়তো আসবেনা।
কিসের আশায় দুঃখ জাগানিয়া স্মৃতিগুলো আজও আমাকে আশা দেখায়, আশা দেখায়, আমাকে দিনের পর দিন বাঁচিয়ে রাখে।

লেখকঃসামীউল

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.