নেপথ্য নায়ক

মাধ্যমিকের শেষ ধাপে এসে বাস্তবতার কষাঘাতে শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটতে যাচ্ছিল। ভবিষ্যতের একটা ঝাপসা ছক আঁকছিলেন মা। সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা ততদিনে শয্যাশায়ী হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রস্তুতি না নিলেও তাঁকে যে কোনো সময়ই সাংসারিক দায়িত্বের অবসান ঘটিয়ে শয্যা গ্রহণ করতে হতো। বিয়ের উপযুক্ত একটা ছেলে, বিয়ের পর একটা মেয়ে আর প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়ুয়া দুই মেয়ের মৃত্যু স্বচক্ষে দেখেছেন-বয়স তো কম হয়নি।
মাধ্যমিক পরীক্ষা হাতের নাগালে। এদিকে বাবা বৃদ্ধ আর একমাত্র উপার্জনক্ষম অথচ কাঁধে পাঁচ সদস্যের সংসার। তাই পরিকল্পনা কিংবা নিয়তি একটাই হওয়া উচিত- শহরমুখী হও আর ছোটোখাটো কোনো কাজ খুঁজে নাও।
নিজের নমনীয় স্বভাব, ছটপটে না হওয়া, ভবিষ্যতে এই ঝুলে থাকা সংসারটার দায়িত্ব নিতে পারব কিনা ইত্যাদি চিন্তা মাথায় পুরো দস্তুর চেপে বসল। মন খারাপকে টেক্কা দিতে ঝুঁকে পড়লাম ভার্চুয়াল জগতে। বিষণ্ণ সময়গুলোতে একমাত্র অবলম্বন যেন সেটিই হয়ে উঠল।
একদিন আচমকা একজন বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো- আমার থেকে চারগুণ বয়সী। সহজাত প্রবৃত্তি অনুসারে কৌতুহল ভর করল, গ্রহণ করলাম। আলাপচারিতায় জানলাম একে, অপরকে, মাঝে বিস্তর দূরত্ব। ইউকেতে থাকেন। দেখতে দেখতে পরীক্ষা চলে এলো, ফের রাজ্যের দুশ্চিন্তা মাথা যেন ছিঁড়ে খাচ্ছিল। অমনোযোগী হয়ে উঠলাম সবকিছুতে। তখনই তিনি উৎসাহ দিলেন। জানতে চাইলেন দুশ্চিন্তার কারণ। একটু অবলম্বন ধরে ভেঙে পড়া গাছটার মতো উঠে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টায় খুলে বললাম সব। অনুপ্রেরণা পেলে জেগে ওঠে, আমি সেখানে নেতিয়ে পড়ি। সবসময়ই ভয়ে থাকি- আমাকে দিয়ে হবে তো?

একদিন নিজেই বললেন আমার পড়াশুনার দায়িত্ব নেবেন। স্বর্গীয় দূত মনে হলেও ভয়ে কাউকে বলিনি। একটা অচেনা লোক, কেন করবে এসব?
অনটনের কষাঘাতে মানবিক মূল্যবোধে চিঁড় ধরে শুনেছি-তখন উপলব্ধি করলাম। নিজেকে আরেকটু উপরে তুলতে এটা আমাকে করতেই হবে সন্দ্রিচিত্তে মেনে নিলাম। শুরু হলো অন্যের হাত ধরে স্বপ্নযাত্রা। আমার চোখে ভর করে বাবার। অবলম্বন সেই মানুষটি।
ফর্ম ফিল আপের টাকা না পেলে পরীক্ষা থমকে যাবে। বাধ্য হয়েই তাকে বললাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে টাকা পাঠিয়ে দিলেন। শুধু শর্ত দিয়েছেন সবার থেকে ভালো করতে হবে।
পরীক্ষা দিলাম। গোল্ডেন এ প্লাসও পেলাম। আর কয়েকদিন পরেই বুঝলাম আমাকে নিয়ে ঐ মানুষটিও স্বপ্ন দেখেন। আরো বেশি পাশে থাকারও কথা দিলেন।
এদিকে প্রতিনিয়ত মায়ের শুকনো মুখে অকথ্য ভাষায় বকা, অন্যের সাহায্যে চলার কারণে বাবার অসন্তুষ্টি- বাবা কখনো অন্যের সাহায্য নিয়ে চলেননি। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করল এটা করতে।

দেখতে দেখতে উচ্চ মাধ্যমিকে পা বাড়ালাম। সেই মানুষটি টাকা দিলেন। আবারও মানসিক বিপর্যস্ততা, ভয়, ঋণের বোঝা, স্বপ্ন পূরণ করতে না পারার আশঙ্কাকে সঙ্গী করে পথচলা শুরু। মাধ্যমিকে থমকে যাওয়ার কথা থাকলেও উচ্চ মাধ্যমিকে অনুপ্রবেশ-ততদিনে অনেকেরই হিংসাতুর চোখের কবলে পড়েছি। সবার মনেই উদিত হচ্ছিল একটাই প্রশ্ন- কীভাবে?
একের পর এক সফলতার মুখদর্শন হলো। সারাক্ষণ মনে হতো মানুষটা আমাকে দেখছে। পাঠ্যবই থেকে শুরু করে ডায়েরি, খাওয়াদাওয়া, ঘুম এমনকি হাঁটতে হাঁটতেও ভাবতাম তাকে। কেন এরকম আকস্মিকভাবে পাশে দাঁড়ালেন। এত দূরত্বে থেকেও কখনো প্রশ্ন করেননি আর আমার প্রতি বিশ্বাস হারাননি। আমিও তার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে পড়লাম। তার জন্য খুব বেশীদিন অপেক্ষা করতে হলো না আমার।
উচ্চমাধ্যমিকে গণ্ডি পেরুতেই আবার বুকে আগলে ব্যবস্থা করলেন ইউকেতে যাবার। আমার কাছে সবকিছু স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছিল। যেখানে আমার কোনো গ্যারেজে থাকার কথা, সেই আমি ইউকেতে যাচ্ছি।
বাবা ততদিনে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন। ইউকেতে গিয়ে আমার পড়ায় মন টিকছিল না, একটা মানুষকে আর কত চাপ দেবো? তাই দেড়মাসের মাথায় একটা কাজ জুটিয়ে নিলাম।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল, সে রাতের আগ পর্যন্ত।
দেশে টাকা পাঠিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম একরাশ ক্লান্তি নিয়ে। গভীর রাতে নিজের উপর বেশ চাপ অনুভব করে চোখ খুললাম- আমার উপর অন্যরকম সেই মানুষটি। প্রচণ্ড ঘৃণায় গা গলিয়ে উঠল আমার।
‘ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। মা সবসময় বকতেন। বলতেন তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। চেষ্টাও করিনি। একটা রুটির দোকানে কাজ নিলাম, সপ্তাহে বিশ পাউন্ড পেতাম। এতেই সামলে নিয়েছি চারজনের সংসার। রুটির দোকান থেকে একটা গাড়ী ঠিক করার গ্যারেজে যাই, সেখানে বাইশ পাউন্ড দিত। একটা খামারে কাজ করতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায় মা, তারপর তিনিও মারা যায়। ছোট দুইটা ভাইকে নিয়ে শুরু হয় কঠিন জীবনযাত্রা। ‘চাইল্ড এবিউজ’ এর শিকার হয়েছি কয়েকবার। কিন্তু কাজ ছেড়ে এসেও ছোট ভাই দুইটা নিয়ে কী খাবো ভেবে কাজ ছাড়তে পারিনি। একসময় অনুভব করলাম আমি সমকামী হয়ে উঠছি।

বন্ধুররা আমাকে ছেড়ে চলে যেতে লাগল। ভাই দুইটা ঘৃণা করতে লাগল কিন্তু আমার টাকার যাচ্ছেতাই খরচ করতো। তিলতিল করে গড়ে তোলা আমার কষ্টের সম্পদ, বাড়ি, এদের হাতে দেবো না।
আজ পেয়েছি একজনকে, আমার মতো ভাগ্য নিয়ে জন্মানো। তার দায়িত্ব নিলাম, সবটা তার হাতেই তুলে দেবো।’
সেই মানুষটার ডায়েরিটা পড়েছি দুদিন আগে। ভেবেছিলাম তার সমকামী চরিত্রের মুখোমুখি কখনোই হতে হবে না। কিন্তু সেই রাতের পর ইচ্ছে করছিল মাটির নিচে ডুকে যাই। এই লোকটার হাত ধরে এতদূর এগিয়েছি,ছিঃ!
ধড়পড় করে উঠে বসলাম। চোখে তখনো রাজ্যের বিস্ময়। তিনি আমার দিকে তাকানোর সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমার নামে সবকিছু দিয়ে দিয়েছেন। সাথে একটা ছোট্ট চিরকুট, ‘সেভ মাই এভরিথিং এন্ড মাই লাভ। লাভড ইউ, ফরগিভ মি ইফ ইউ ক্যান।’
পরদিন সকাল থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
.
এই মুহূর্তে আমি নিজের ডায়েরি থেকে চিরকুটটা হাতে নিয়ে বসে আছি। আমার স্ত্রী রান্নাঘরে রাতের খাবার তৈরি করছে। সেদিনের এক সপ্তাহ পর ইউকে ছেড়ে চলে আসি। সবকিছু সেই মানুষটির দুই ভাইকে বুঝিয়ে দিয়েছি। মানে হয় না একটা অপ্রকৃতিস্থ লোকের কথা মতো পড়ে থাকার। জানি না, হয়তো বিশ্বাসঘাতক ভাবতে পারে আমাকে। এই চিরকুটটার দিকে তাকিয়ে আশীর্বাদের মোড়কে আবৃত অনিয়ন্ত্রিত অতীতের স্মৃতিরোমন্থন করি। আমার স্ত্রীকেও কখনো বলিনি কিছু। মাঝেমাঝে প্রশ্নের সম্মুখীন হই। ‘বোকার মতো কেন ইউকে ছাড়লে?’
.
আজ ৪ ফেব্রুয়ারি, ঐ মানুষটার জন্মদিন। যতোই হোক, আমার একাংশ জুড়ে আছে তার অস্তিত্ব। প্রকৃতি তাঁকে আলাদা করে দিয়েছে। দোষটা কাকে দিব? একটু সহানুভূতি, ভালোবাসায় তিনি তো ফিরে আসতে পারতেন আমাদের কাতারে। তা নাহলে আজ এত কৃতজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তাকে নেপথ্যের মানুষ বলে ডাকতে হবে? ভুলতে চাই না তাকে। থাকুক না আরো মৃত্যু অবধি। কত কিছুই জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। তবুও তার জন্য কেন এই মিছে মায়া? আমি তো কাঁদছি না, তবুও গালটা ভেজা মনে হচ্ছে কেন?

লেখকঃআগন্তুক কালপুরুষ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.