The prisoner of Zenda

১.বনি ক্যাম্পাসের ভিতরে একটি টংয়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলো । এমন সময় সে দূর থেকে ছেলেটাকে দেখতে পেল। ছেলেটা তার দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
– আচ্ছা, ভাইয়া ড্রামা ক্লাবটা কোনদিকে ?
– ঐ হলুদ বিল্ডিং এর দুই তলায় ২১৭ নম্বর রুমে। কি কাজ ঐখানে ?
– আমি নতুন মেম্বার হবো ।
– আমার সাথে চলো। চিনিয়ে দেই।
– না, ভাইয়া। ভার্সিটিতে যেহেতু চিনে আসতে পেরেছি, আশা করি ঐ রুমটাও চিনতে পারবো। এত অযাচিত সাহায্যের দরকার নেই আমার !

অদিত বিরক্ত হয়ে ঐ বিল্ডিং এ ঢুকে গেল। কলেজ লাইফ থেকেই সে এ ধরণের ব্যাপার দেখছে। যে কোন সংগঠনের সাথে জড়িত হবার পরপরই সেখানকার ছেলেরা সবসময় তাকে বাড়তি সাহায্য করতে চেয়েছে।

২.অদিত চলে যাবার পর কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে পরে হেসে দিলো বনি।ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়াররা সবসময় এরকম একটা ফ্যান্টাসিতে ভুগে যে- সব সিনিয়র তাকে কোন উদ্দেশ্য নিয়েই সাহায্য করতে চায়। তাই বাড়তি সাহায্য করতে চাইলেই এরকম বিব্রতকর কথা শুনতে হয়।

-“এক্সকিউজ মি ব্রো! প্লিজ গিভ মি টেন টাকা!”
সাদ্দামের কথায় চমক ভাঙে বনির। সাদ্দাম এই ক্যাম্পাসের পরিচিত পথশিশুদের একজন।বনি ওকে মাঝে মাঝে ইংরেজি কিছু কথা শিখিয়ে দেয়, আর সেগুলো বলে সে অন্যদের চমকে দেয়!

– এই ব্যাটা , পরশুদিন না তোকে ১০ টাকা দিলাম?
– ভাইয়া দেন না, সিঙ্গারা কিনমু !
– দুপুরে ভাত না খেয়ে সিঙ্গারা খাবি?
– না, ভাইয়া। আম্মা আজকে ভাত রান্না করছে , কোন তরকারি নাই, খালি কাঁচামরিচ দিয়া খাইতে হইবো। সিঙ্গারা কিনলে ঐডা থেকে আলুডা বাইর কইরা ভাতের লগে খামু !
– ঐ তরকারির ভ্যানটাকে ডাক দে!
ভ্যানটা কাছে আসা পর বনি জিজ্ঞেস করলো-“মামা, আলু কত করে কেজি?”
– ২০ টাকা ,মামা
– আধা কেজি দেন
আলু কিনে সাদ্দামের কাছে দিয়ে দিলো বনি- “ যা, এইবার ভাতের সাথে যেমনে পারিস খা !

৩.পরের দিন বনিকে ড্রামা ক্লাবে দেখতে পেয়ে অদিত কিছুটা অবাক হলো , কিন্তু এরপর সে ভাষা হারিয়ে ফেললো যখন সে জানতে পারলো- বনি এই ক্লাবের ভাইস-প্রেসিডেন্ট !
দুইদিন পরে সাহস করে বনির সাথে কথা বলতে পারলো অদিত,” আসলে ভাইয়া , আমি বুঝতে পারি নি !”
– কবিতা আবৃত্তি করতে পারো?
– (চমকে গিয়ে) কি?
– আমাদের পরের নাটকটাতে ব্যাকগ্রাউন্ডে কবিতা আবৃত্তি হবে । তুমি আবৃত্তি পারলে তোমাকে দিয়ে ঐটা করাবো ভাবছি।
– হ্যাঁ, পারি।
– তাহলে শোনাও
অদিত আবৃত্তি শুরু করলো,
“কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
তারি রথ নিত্যই উধাও
…………………………
……………………”
– শেষের কবিতা কি তোমার খুব প্রিয় নাকি?
– উপন্যাসটা কয়েকবার পড়েছি, তাই এই কবিতাটা মুখস্থ হয়ে গিয়েছে
– ভালো, রবীন্দ্রনাথ তাহলে এখনও এই প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক।

৪.Tinder এ swipe করতে করতে একদিন বনির ছবি দেখলো অদিত,বনির কথা-বার্তায় কিছুটা আঁচ করতে পারলেও চুপ ছিল অদিত।Tinder এ ম্যাচের পর থেকে প্রায়ই কথা হতো দুজনের । ক্যাম্পাসের যেকোন ব্যাপারে সাহায্য লাগলে বনির পরামর্শ নিত অদিত। বনির দেখাদেখি সাদ্দামের সাথে অদিতেরও ভাল সম্পর্ক হয়ে গেল। ঈদের সময় সাদ্দামকে জামা কিনে দিলো সে।
বেশ কিছুদিন পরে অদিত ফোন দিয়ে বনিকে বললো, “আগামী রবিবার আমার জন্মদিন। আশা করি আসবেন””
– আচ্ছা, দেখি !
কিন্তু ঐদিন বনি আসলো না, অদিত ফোন দেবার পরও ফোন ধরলো না।
পরের পুরো সপ্তাহটা ড্রামা ক্লাবে অদিত বনিকে এড়িয়ে চললো। তারপর একদিন থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো, “জানি, কোন লাভ নেই, তারপরও বলুন তো আমার জন্মদিনে কেন আসেন নি ?”
– ঐদিন সাদ্দামেরও জন্মদিন ছিলো। আমি ভাবলাম- তোমার জন্মদিন তো সবাই পালন করবে, সাদ্দামেরটা কেউ করবে না, তাই আমি থাকি ওর সাথে…
– সাদ্দামের জন্মদিন ও নিজেও জানে না ।
– ওহ, আচ্ছা ! মনে পড়েছে! ঐদিন আমার টিউশনি ছিলো!
– রবিবারে আপনার টিউশনি থাকে না। আপনি কেন মিথ্যা বলছেন?
বনি চুপ করে রইলো।অদিত বলতে থাকলো , “সিনিয়রদের মধ্যে আমি শুধু আপনাকে আমার জন্মদিনে ডেকেছিলাম, আপনি কি বোঝেন না কেন আমি এটা করেছিলাম?”
– তুমি ভার্সিটিতে মাত্র এসেছো, জীবনের অনেক কিছুই চেনা তোমার বাকি । এখনই কোন বাউন্ডুলের সাথে জড়িয়ে যেও না, আরো ভাল কিছু তোমার জন্য অপেক্ষা করছে
– আমি অনেক জেনেবুঝেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
– পরে এই সিদ্ধান্তের জন্য আফসোস করবে।
– যদি বলি এই বাউন্ডুলে ভাবটাই আমার ভাল লাগে? সাদ্দামের সাথে আপনার খুনসুটি আমার পছন্দ?আপনার সাংস্কৃতিক মনোভাব আমাকে মুগ্ধ করেছে ?
– এটা নতুন কিছু নয়। তুমি গৎবাধা একটা জীবনে বড় হয়েছো। বাউন্ডুলে,চালচুলোহীন, কিছুটা বিদ্রোহী,সংস্কৃতিমনা একটা ছেলে তোমার গৎবাধা জীবনের চেয়ে ব্যতিক্রম। কিন্তু যখন সম্পর্কটাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দরকার হবে, তখন তোমার মনে হবে জীবনসঙ্গী হিসেবে এধরণের ছেলেরা যোগ্য নয়। তখন একটা আর্থিক নির্ভরতা দরকার হয়। অনিশ্চিত জীবনের রোমাঞ্চটা তখন আর ভাল লাগে না।আর এই জীবনে নিশ্চয়তা নেই,জানোই তো!
– সবাইকে একপাল্লায় মাপছেন, আপনার সাথে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।
অদিত চলে গেল।

৫.এভাবে ৩ বছর কেটে গেল। বনির মাস্টার্স শেষ হয়ে গেল। তাকে ড্রামা ক্লাব থেকে ফেয়ারওয়েল দেওয়া হলো। সেদিন অদিত তার দিকে এগিয়ে গেল, “ ৩ বছর আগে আপনি কি বলেছিলেন মনে আছে? আমি ভার্সিটিতে মাত্র এসেছি, জীবনের অনেক কিছুই চেনা বাকি! এই ৩ বছরে আমি অনেক কিছুই চিনেছি, কিন্তু আমার সেই আগের অনুভূতির কোন পরিবর্তন হয় নি !এটাকে আপনি কী বলবেন?”
– তুমি The Prisoner of Zenda উপন্যাসটা পড়েছো?
– না
– এই উপন্যাসটা নিয়ে অনেক সিনেমা হয়েছে, এমনকি বাংলা সিনেমাওও হয়েছে ঝিন্দের বন্দী নামে। একজন সাধারণ মানুষের সাথে একজন রাজার চেহারা মিলে যায়। রাজা বিপদে পড়ে যাওয়ায় সেই রাজাকে বাঁচানোর জন্য সেই সাধারণ মানুষ রাজার অভিনয় করে। রাজার সাথে পাশের রাজ্যের রাজকন্যার বিয়ে হবার কথা , সেই রাজকন্যাও সেই সাধারণ মানুষের প্রেমে পড়ে যায়। এরপর সব বিপদ শেষ হবার পর যখন সে রাজাকে তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়, রাজকন্যার সাথে তার কিন্তু মিল হয় না। কারণ রাজকন্যাদের বিয়ে হয় রাজা বা রাজপুত্রদের সাথেই, সাধারণ মানুষের সাথে নয়। আমি কোন রাজপুত্র নই, আমি সাধারণ মানুষ। আমার জীবনে কোন রুপকথা নেই !
– শুনলাম, আপনি কুষ্টিয়ায় চলে যাচ্ছেন ?
– হ্যাঁ, ঐখানে একটা কলেজে চাকরি নিয়েছি। বেতন খুব বেশি না, তবে ঐখানে এই বেতনে চলা যাবে।
– আপনি কি ঢাকাতে এরকম চাকরি নিতে পারতেন না?
– পারতাম । কিন্তু জানোই তো- আমি একটু বাউন্ডুলে স্বভাবের!রবীন্দ্রনাথ, মীর মশাররফ হোসেন,লালন শাহের স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় থাকার সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করি নি।
– ভাল থাকবেন!
– তুমিও ভাল থেকো।

৬.বছর দেড়েক পরের কথা। লালনের আখড়া থেকে ফিরছিলো অভীক। আখড়ার একটি গান তার মাথায় বাজছিলো :
“ বাড়ির কাছে আরশী নগর
(একঘর) সেথা পড়শী বসত করে-
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে। ”

গুনগুন করতে করতে নিজের বাসার কাছে আসলো বনি। হঠাৎ পরিচিত একটা গলা শুনতে পেয়ে থেমে গেল সে,

“কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল–
তুলে নিল দ্রুতরথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহুদূরে। ”

পরিচিত সেই মুখটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সে। ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,
“আমি The Prisoner of Zenda উপন্যাসটা পড়েছি। এটা থেকে হলিউডে অনেকগুলা সিনেমা হয়েছে। বাংলায় ঝিন্দের বন্দী হয়েছে। কিন্তু আপনি কি জানেন -এটা নিয়ে বলিউডে একটা কমার্শিয়াল সিনেমাও হয়েছে “Prem Ratan Dhan Payo” নামে? সেই সিনেমায় কিন্তু রাজকন্যার সাথে সেই সাধারণ মানুষের বিয়ে হয়! জীবনটাকে সবসময় কালজয়ী উপন্যাস না ভেবে মাঝে মাঝে এরকম কমার্শিয়াল সিনেমাও ভাবা যায়! তাহলে কিন্তু জীবনটা অনেক সহজ হয়ে যায় ।”
বনি জিজ্ঞাসা করলো , “যে ছেলেটা ড্রামা ক্লাব চিনতো না, সে এতদূর এসে পড়লো!”

“ অনেক কষ্টে খুঁজে পেয়েছি, এবার আর হারাতে দেবো না ! জীবন তো একটাই, সেটা গৎবাধা না হয়ে একটু বাউন্ডুলে হলে ক্ষতি কী!”

-তবে তাই হোক ! বললো বনি।

আখড়া থেকে ভেসে আসছে “মিলন হবে কতদিনে, ও মিলন হবে কতদিনে!
আমার মনের মানুষেরও সনে”

লেখকঃ Todd Chavezzz

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.