লগ্নভ্রষ্টা

ওকে প্রথম দেখেছিলাম কলেজে।তখন সে ইন্টার প্রথম বছর।আর আমি দ্বিতীয়।কলেজে বেশ নাম ডাক ছিল আমার।দেখতে তেমন খারাপ ছিলাম না।বলতে গেলে অনেকটা সুন্দর ছিলাম।তাই মেয়েরা ঘুরঘুর করত স্বাভাবিক ভাবেই।তখন আমার অহংকারে মাটিতে পা না পড়ার মত ভাব নিয়ে ঘুরতাম আমি।কিন্তু ভেতরে আমি কেমন তা শুধু আমিই জানতাম।নিজের স্বত্বার সত্যতা চেপে রাখার মত যন্ত্রণা এই দুনিয়াই আর দ্বিতীয়টি নেই।নিজের স্বত্বার একাকিত্ব ভোগে আমি যখন ক্লান্ত তখন তার সাথে পরিচয়।সে এসছিল দেবদূত হয়ে।আমার জীবনের ভরসা হয়ে।আমার স্বত্বার সাতরং হয়ে।
আমি সমকামি তা জেনেছিলাম দশমে।বড় একা লাগত।কিন্তু ওকে দেখার পর আমি স্বপ্ন বুনতে শুরু করি।সাতরঙা স্বপ্ন।এ বয়সে স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক।কিন্তু সেই স্বপ্ন পুরণ করা বড় কঠিন।কিন্তু একদিন সাহস করে তাকে নিয়ে গেলাম বড় মাঠের ওপাড়ে।বটের কাছে।কোনো আড়ম্বর ছিল না।শুন্য হাতে শুন্য আশায় তাকে সেখানে নিয়ে গেলাম।অত কিছু ভাবার সময়ই ছিল না।শুধু বটের মোটা শিকড়ে বসে থাকা তার গালে হঠাৎ চুমু খেয়ে বললাম,”ভালবাসি।”
সে কথাটার জন্য হয়ত প্রস্তুত ছিল।তবে চুমুর জন্য কখনই নয়।অবাক হয়ে কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরল।সেই আবদ্ধ দুটো হাত আমি আজও সেভাবেই থাকতে দিয়েছি।তার সাথে কাটানো প্রতি মিনিট আমার জন্য স্বর্গীয়।তাকে বুকে ধরে বসে থাকতে ভাল লাগে আমার।সেই হাসি বার বার দেখতে ভাল লাগে আমার।হ্যাঁ,আমি সমকামি।কিন্তু আমারও তো ভালবাসার অধিকার আছে।

সবটা শুনে হতবাক হয়ে গেলো লীলা।সামনে থেকে সবকিছু একবার যেন নড়ে উঠল।সে বিশ্বাস করতেই পারছে না সব্য এই কথাগুলো বলছে।যে তার বাগদত্ত।কাল তাদের বিয়ে।লীলা আর সব্যসাচী আগে থেকে পরিচিত ছিল না।পারিবারিক ভাবে আয়োজক বিয়ে।একেবারে অভিজাত হিন্দু পরিবার বলে কথা।তার উপর একটা মাত্র ছেলে সব্য।তাই বেশ ধুমধাম করে বিয়ে হচ্ছে।লীলা মায়ের ছোট মেয়ে।এই শেষ বিয়ে।তাই বিরাট আয়োজন।একটা কথায় সব মিথ্যা হয়ে গেল।সব কিছু যেন ধীরে ধীরে দুরে সরে যেতে লাগল লীলার কাছে থেকে।সে মুখ তুলে তাকাল সব্যর দিকে।
-ওর নাম কি?
-ওম।
-কোন ওম?
-তোমার ভাই।
আরেক দফা কম্পন হয়ে গেল লীলার শরীরে।ওম!!
তার ভাই ওম?তার ভাই সমকামি?তাই কি ওম এই সম্বন্ধ হওয়ার পর থেকে এমন চুপ হয়ে গেছে?
লীলার বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রী নিঃসন্তান ছিলেন অনেকদিন।তারই সুবাদে লীলার মা তার দ্বিতীয় পক্ষ হয়ে আসেন।কিন্তু ভাগ্যের এমন পরিহাস লীলার জন্মের এক বছর পরই ওম জন্ম নেয়।অথচ এই মহিলা নিঃসন্তান ছিলেন বলেই তার সপত্নী এসেছিল সংসারে।ওমের মা বেশিদিন বাঁচেন নি।ওমের যখন চার বছর তখন তিনি গত হন।সেই থেকে লীলার সাথেই সে বড় হয়েছে।যদিও তার বিমাতা তাকে সহ্য করতে পারেন না।তবুও সেই ছোট ওম আজ এত বড় হয়ে গেছে।আর একবছর পর স্নাতক তৃতীয় বছরে।সব্য পড়ার ভিতরেই চাকরী পেয়ে গেছে।তাই তার মা বিয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
-লীলা,লীলা।
-হু!!হ্যাঁ?
-কি ভাবছো?
-আমি বাড়ি যাব।
-আমাকে ক্ষমা করো লীলা।এ বিয়ে আমি করতে পারব না।তোমার জীবন আমি নষ্ট করতে পারি না।তাই তোমাকে সব জানিয়ে দিলাম।
-আসি।
বলে লীলা উঠে চলে গেল।

বাড়িতে ঢুকতেই কাকিমার সাথে দেখা।

বাড়িতে ঢুকতেই কাকিমার সাথে দেখা।বড়ই ব্যস্ত ভঙ্গিতে ছুটাছুটি করছেন।লীলাকে দেখে থাকলেন।এগিয়ে এসে থুতনি ধরে বললেন,”ও মেয়ে!কোথায় ছিলে এতক্ষন?ওদিকে দিদি বাড়ি মাথায় করছেন।”
-কাকিমা!ওম কোথায়?
-ওম?ওর কি আর শান্তি আছে?কিছু মনে করিস না মা।জানিসই তো দিদি কেমন।এখন গিয়ে সামনে দাড়া।যতবার ওমকে দেখছে ততবার বকছে আর বলছে তোকে খুঁজে আনতে।ওদিকে ওকে হাজার কাজ দিয়ে রেখেছে।কোনটা করবে?
-হ্যাঁ আমি যাচ্ছি।
কাকিমা আবার হাক পাড়তে পাড়তে একদিকে চলে গেলেন।লীলা কিছুক্ষন দাড়িয়ে কি যেন ভাবছিল।তারপর সে মায়ের ঘরের দিকে গেল।ঘরে গিয়ে দেখল মা মাথা ধরে বিছানায় বসে।মনে হয় প্রেসার বেড়েছে।
-মা।
-এই যে মহারানী।কোথায় যাওয়া হয়েছিল?
-একটু বান্ধবীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম মা।
-বিয়ের আগের দিন বান্ধবীর সাথে দেখা করা কি এতই জরুরী?কাল হলে জাত যেত?
-কেনো?
-শোনো মেয়ের কথা।বিয়ের আগের মন্দ বাতাস লাগলে কি করবি?
-লাগুক।
-কি?অলক্ষ্মী!দুর হ।দুর হ এখান থেকে।
লীলা চলে এলো।মা একটু বেশিই মাথা গরম করে সব কিছুতে।এই যুগে এসেও কিসের চিন্তা নিয়ে বসে আছে।সেদিকে লীলার আর খেয়াল নেই।সে মনে মনে খুজছিল ওমকে।সে একবার ঘরে গেল।সেখানে নেই ওম।তারপর দু একজনকে জিজ্ঞাসাও করল।তারা কেউই জানে না।এ বাড়িতে কাজ শেষ হয়ে গেলে ওমের খবর নেওয়ার মত লীলা ছাড়া আর কেউ নেই।লীলা কিছুক্ষন দাড়িয়ে ভাবল।তারপর হঠাৎ মনে হল চিলেকোঠার কথা।ছাতে চিলেকোঠার ঘরে মাঝে মাঝে বসে থাকে ওম।সেখানেই পাওয়া যাবে তাকে।

চিলেকোঠার একপাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে আছে ওম।নিচে এত সাড়া শব্দ।এত লোক।অন্যদিন হলে তার ঠিকি ভাল লাগত।কিন্তু আজ সে সত্যি অনুভব করছে যে তার মা নেই।একটা সন্তানের বাবা মারা গেলে সে অনাথ হয়ে যায়,কিন্তু মা মারা গেলে সে আশ্রয়হীন হয়ে যায়।অনেক কথা মনে পড়ছে তার।চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
সেই প্রথম কলেজে সব্যসাচী মিত্র নামে সেই সবচেয়ে সুন্দর ছেলেটাকে দেখা।সে যখন যাচ্ছিল তখন সেই ছেলেটা তাকিয়ে ছিল।তাকানোটা কেমন হাভাতে মনে হয়েছিল ওমের কাছে।কিন্তু চোখাচোখি হতে যখন সে লজ্জা পেয়ে গেল তখন বেশ ভাল লাগল তাকে।অকারনেই ভাল লেগেছিল।তখন বয়সটাই এরকম ছিল।যৌবনের আগের মুহূর্তে অকারনেই কাউকে ভাললাগা মানুষের স্বভাব।কিন্তু সে ভাল লাগা এভাবে স্থায়িত্ব পাবে তা কে জানত!
মনে পড়ে সেই দিনের কথা যেদিন তাকে প্রথমবার চুমু খেয়ে সব্য বলেছিল “ভালবাসি।”আর মনে পড়ে সেই রজনী।সেই নেশা ধরা রাত।যে রাতে সব্যর বাগানে হাস্নাহেনা ফুটেছিল।সব্য তখন পড়া শোনা করার জন্য আলাদা থাকত।ওম কোথায় কেন বাইরে আছে সে কথা লীলা ছাড়া কেউই কখনো জিজ্ঞাসা করে না।সেদিন কামদেব স্বয়ং নেমে এসেছিলেন।আর পঞ্চশরের আঘাত করেছিলেন সেই দুই যুবকের বুকে।রজনীর কালো অন্ধকারে সেদিন মধুকর মধু অন্বেষণ করে ক্লান্ত হয়।কিন্তু তার তৃষ্ণা নিবারণ হয় না।হাস্নাহেনার গন্ধে আমোদিত হয় সেই বাগান বাড়ি ঘর।
শেষ রাতে সব্যর বুকে মাথা রেখে সে ঘুমিয়েছিল নিষ্পাপ শিশুর মত।পুরো সৃষ্টির কাছে যা পাপ,সেই পাপ শরীরে নিয়েই সে শুদ্ধ হয়েছিল।হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে সে সব্যর দিকে তাকাল।
-সব্য ঘুমাওনি?
-ওম।আমরা সত্যি এক থাকতে পারব কি?
-আমাদের ভালবাসা অপবিত্র নয়।যদি না হয় তবে নিশ্চয় থাকতে পারব।
-আমরা কি পাপ করছি?
-যে সৃষ্টকারী আমাদের সৃষ্টি করেছেন।তিনিই আমাদের এক করেছেন।
সব্য তখন তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল আর বলেছিল,”ভালবাসি।”
ভাবতে ভাবতে পাথর হয়ে যায় ওম।তার চোখের পলক পড়ছে না।শুধু অপলক তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে।হঠাৎ একটা হাত তার কাঁধে পড়ে তার সাথে ভেসে আসে একটা পরিচিত গলা।
-ভাই!
ওম তেমনি বসে।নড়েনি,কথা বলেনি,পলক ফেলেনি।আবার আওয়াজ হয়।
-ভাই!!
এবার ওম উঠে সোজা জড়িয়ে ধরল লীলাকে।ফুফিয়ে কেঁদে উঠল সে।
-দিদি…দি…দিদদি…
লীলা এই জন্য প্রস্তুত ছিল।সেই কখন ভেবেছিল ছাতে আসবে।আর মাত্র এসেছে সে।বাড়ির লোক গুলোকে ইচ্ছা করছিল বের করে দেয়।কিন্তু এখন সেই চিন্তা নয় তার।এখন তার বুক ফেটে যাচ্ছে তার ভাইয়ের কান্নার শব্দে।বড় মা মারা যাবার সময় এভাবে তাকে ধরে কেঁদেছিল ছোট ওম।তারপর আর কাঁদেনি।আজ এভাবে দ্বিতীয়বার লীলাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।
-ভাই!বোস এখানে।বোস।
ওম ছাড়ল না।সেইমত দাড়িয়ে কাঁদতে লাগল।লীলা তার একটা হাত ওমের পিঠে আরেকটা মাথায় রাখল।মাথায় বাচ্চাদের মত হাত বুলাতে বুলাতে বলল,”কি হয়েছে ভাই?কষ্ট হচ্ছে?দিদিভাইকে বল।”
-দিদি..স..
-হ্যাঁ বল।
ওম সোজা হয়ে গেল।লীলার সাহস হচ্ছিল না আসল উত্তর শোনার।ওম সত্যটা চেপে গেল।চোখ মুছে বলল,”তুমি চলে যাবে দিদিভাই।আমার ভাল লাগছে না।”
লীলা ওমের গালে একটা হাত রাখল।
-এই জন্য কাঁদছিস?
-হু!
-শুধু আমার জন্য এত কষ্ট হচ্ছে?
ওম কথা বলল না।লীলা দেখছিল কত সুন্দর মিথ্যে বলতে জানে তার ভাই।কিছুক্ষন নিচে তাকিয়ে রইল লীলা।তারপর সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল ওমের গালে।

উলুধ্বনিতে চারদিক মুখর হয়ে উঠেছে।

চারদিকে সবাই ছুটাছুটি করছে।থমকে আছে শুধু লীলা।যাকে কেন্দ্র করে এত কিছু সে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছে পিড়ির উপর।একটু পর বউদির দল এসে তাকে স্নান করাল।স্নান শেষে যখন মাটির মুচি ভেঙে নিচে নামল তখন একজন বলল,”ও লিলি বল্ আইবুড়ো নাম খন্ডালাম।”
লীলা কথা বলল না।কিছুক্ষন পর তার কাকিমা বললেন,”মা,বলে ফেলো দিকিনি।রাজ্যের কাজ পড়ে আছে।”
লীলা সেইমত ঠাই দাড়িয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে কিছু বলল যার “খন্ডালাম” শব্দটা স্পষ্ট হল।সকলে প্রসন্ন হল।
রাত বারোটায় লগ্ন।এত লোকের আসা যাওয়া খাওয়া সব মিলিয়ে একটা এলাহি কান্ড তো বটেই।লীলা সারাদিন কিছুই খায়নি।মায়ের দিকে সে তাকাতে পারছিল না।এত গরম মেজাজের সেই মহিলাটাকে আজ খুবই নিরীহ মনে হচ্ছিল তার।
**
এগারোটায় ট্রেনের শব্দ হলো।লীলাদের বাড়ি থেকে তা স্পষ্ট শোনা যায়।লীলা ঘরে আয়নার সামনে বসে আছে।কয়েক মিনিট পর বাইরে একটা হই হই রব উঠল।লীলা উঠল না নড়ল না।একটু পর এক ছোট বোন দৌড়ে আসে তার ঘরে।
-দিদি,বর নেই।
লীলা এবার উঠে দাড়ায়।তার মুখ কঠিন হয়ে এসেছে।সে সোজা ঘর ছেড়ে বের হয়ে যায়।বাড়ির মহিলারা অনেকে উঠোনের মন্ডপে জমা হয়েছে।বরযাত্রী সকলেই এখানেই।বরও এসেছিল।সাড়ে দশটার দিকে সে কি একটা দরকারে একটু বাইরে গেছে ঘর ছেড়ে।তারপর থেকে আর খুজে পাওয়া যাচ্ছে না।ওদিকে ঠাকুর মশায় তাড়া দিচ্ছেন।লগ্নে আর এক ঘন্টা বাকি।কিন্তু ফোনের তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।সাথে পাওয়া যাচ্ছে না ওম কে।
লীলা দৃঢ় পায়ে মন্ডপের দিকে এগিয়ে আসে।তার মাথার বিশাল চুড়নি আলাদাভাবে বানানো হয়েছিল।সেটা মাটিতে হিচড়ে আসে।সবাইকে চমকে দিয়ে লীলা মন্ডপে দাড়িয়ে বলে,”বর আসবে না।এ বিয়ে হবে না।”
মা এগিয়ে এসে বলল,”কি বলছিস এসব?আর তুই এখানে কেন?ঘরে যা লিলি।”
-না মা।বর আসবে না।
-কে বলেছে এসব।
-আমি বলছি।
বরের বাবা এগিয়ে এলেন।বললেন,”এসব কি বলছ মা?”
-বাড়ির লোক রেখে অন্যদের যেতে বলুন।আমি সব বলছি।
সবাই চলে গেল।লীলা সেইমত দাড়িয়ে রইল।তারপর বলল,”সব্য আর ওম পালিয়ে গেছে।”
সব্যর বাবা কিছুই বুঝলেন না।শুধু তার মনে পড়তে লাগল সব্য একদিন আকুতি করেছিল যে সে এই বিয়ে করবে না।লীলা বলে চলে।তার মা তার কথা শুনে অবাক হয়।
-সব্য এ বিয়েতে রাজি ছিল না মা।
-লিলি!তুই ঘরে যা।কি আজেবাজে বকছিস।
-ও অন্য কাউকে ভালবাসে।
-কাকে?
-ওমকে!
-কি?কি বলছিস?পাগল হয়ে গেছিস?ওরা দুজন ছেলে।ছি!
-ওরা সমকামি মা।ওরা একে অপরকে ভালবাসে।তাই ওরা পালিয়ে গেছে।
-তুই কি করে বলছিস এসব?
লীলা তার হাত দুটো তুলে ধরে।সে হাতে মোটা এক জোড়া বালা ছিল।সেগুলো নেই।লীলার মা চমকে যায়।
-বালা কোথায়?
-আমি ওমকে দিয়ে দিয়েছি।আর আমি বলেছি ওদের পালিয়ে যেতে।
-কার অনুমতি নিয়ে তুই বালা ওকে দিয়েছিস?
-বালা গুলো বড়মার ছিল মা।ও ওর ভালবাসার সাথে চলে গেছে তাই ওর জিনিস ওকেই দিয়েছি।
এবার সব্যর বাবা আবার বললেন,”ছি ছি!ওসব রোগ।ওসব আমার ছেলের ছিল না।তোমার ভাই হিজড়ার কারনে এমন হয়েছে আমার ছেলে।”
-জেঠু আপনি আমার বড় বলে আমার ভাইকে যা ইচ্ছা বলে যেতে পারেন না।আমাকে আমার সীমায় থাকতে দিন।
পুরোহিত এতক্ষন চুপচাপ শুনছিলেন।তিনি বসে থেকে বললেন,”একি অনাচার।ছি ছি।এসব কি?”
-কেন ঠাকুর মশায়?আয়াপ্পা কাদের পুত্র?

স্তব্ধ বিয়ে বাড়ি।স্তব্ধ সকলে।কিছুক্ষন পর লীলার মা চিৎকার করে উঠলেন।
-ওই অলক্ষুণের জন্য সব হয়েছে।
তারপর স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,”আপনি পুলিশে খবর দিন।”
-মা সমকামিতা অপরাধ নয়।
-এটা বাংলাদেশ লিলি।ওদের নষ্টামো বের করছি।
-কেউ যদি আজ পুলিশে খবর দেয় আমি এক্ষুনি আমার শরীরে আগুন দেব।
“লীলা!”হঠাৎ তার বাবা এসে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল।লীলা পড়ে গেল।
-কি দোষ ওদের বাবা?ভালবাসা কি এতই খারাপ?এটা কি পাপ?
-আমি ওকে ত্যাজ্য করলাম।
-ও তোমার ছেলে ছিলই বা কবে।বাইশ বছর ধরে শুধু মুখে বলেটাই বাকি ছিল।আজ মুখেও বলে দিলে।
-আমি মানি না এসব।
-তাতে এখন আর কিছু আসে যায় না বাবা।
কিছুক্ষন পর পুরোহিত ক্ষুন্ন স্বরে বললেন,”লগ্ন পেরোলো।মেয়ে লগ্নভ্রষ্টা হইল।”
বলে তিনি উঠে গেলেন।
লীলা হাতে ধরা সিঁদুর কৌটোটা মন্ডপের আগুনে ছুড়ে ফেলল।আগুন তখন জ্বলছে।গনগনে সেই আগুনের দিকে তাকিয়ে লীলার চোখে ওমের মুখ ভেসে উঠল।

রাত অনেক হয়েছে।ট্রেনে প্রায় সবাই ঘুমিয়ে।ওমও ঘুমিয়ে আছে সব্যর কাঁধে মাথা রেখে।নিশ্চিন্ত কিন্তু অপরাধ বোধে বিব্রত এক ঘুম।সব্য তার মুখে দিকে তাকায়।আর সে স্বপ্ন দেখে একসাথে বাঁচবার।অধিকার নিয়ে।

[সমাপ্ত]

[বিঃদ্রঃকোনো ধর্মকে ছোট দেখানো আমার উদ্দেশ্য নয়।এখানে শুধু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।]

লেখকঃ আনন্দ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.