স্মৃতিচারণ

ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল কাকরাইল মসজিদের সামনে একটা চায়ের দোকানে।

সময়টা ২০১৮ সালের কোন একদিন। আমি ওখানে একটা টিউশনি করতাম।পড়ানো শেষে ছাত্রের বাসায় চা নাস্তা খেয়ে বেইলি রোড ধরে হাটতে হাটতে মেসে ফিরতাম। জীবনটা খুব রঙীন লাগতো।

তেমনি একটা বৃষ্টির দিনে ওকে দেখলাম জুবুথুবু হয়ে ভিজতে। ইচ্ছে করে যে ভিজছে না বুঝতে পারছি। কিন্তু ওর মাথায় কেউ ছাতা ধরে নি সেদিন। বার কয়েক চোখাচোখি হতেই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। হয়তো লজ্জায় বা অভিমানে। কে জানে!

ওর কথা আর মনে থাকে না আমার। ওর মতো এমনি অনেককে দেখি। এত খেয়াল করার সময় কই? আমি ব্যস্ত হয়ে যাই পড়াশুনা নিয়ে। সপ্তাহান্তে বন্ধুদের সাথে চা-চক্রের মধ্যে পাঠ-চক্র বসে। প্রচুর বই পড়তে হয়। বইএর সারসংক্ষেপ আত্মস্থ করে তা সবাইকে বুঝিয়ে বলতে হয়। আলোচনা হয়। হুমায়ূন থেকে ছফা, সমরেশ থেকে জীবনানন্দ! কেউই বাদ যায় না এই চক্র থেকে। আহা জীবন! আহা রে জীবন!

আমি হাজার চক্রে পাঁক খেয়ে ওকে ভুলতে থাকি। আমার মনে পড়ার জায়গায় কোথাও ও নেই! থাকার কথাও না। একদিনের দেখা, বার কয়েক চোখাচোখি! কে মনে রাখে এসব। কিন্তু ওর চাউনিটা বেশ মায়াময় ছিল। কাঁদছিল? না-কি বৃষ্টির কারণে? কে জানে!

দুমাস ধরে টিউশনের বেতন দেয়নি।পকেট একদম খালি। টাকা দিতে না পারার কারনে মেস থেকে আমার মিল বন্ধ করে দিয়েছে। তিনদিন ধরে ভাত খাইনি৷ বন্ধুদের কাছে টাকা ধার তাইতেও লজ্জা লাগে। সারাদিন জল খেয়ে থাকি আর সন্ধ্যায় ছাত্রের বাসার চা নাস্তার জন্য অপেক্ষা করি। এমন সময় নিরাপদ সরক চাই আন্দোলনে ছাত্ররা সবাই রাস্তায় নামে। সে আন্দোলনে আমিও সামিল হয়েছিলাম,আবেগের টানে। সকাল থেকে রোদ বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় কাকরাইল মোড়ে আন্দোলন করি। দুপুরে কিছু ভাইয়ারা এসে সবার হাতে এক প্যাকেট করে ভুনা খিচুড়ি ধরিয়ে দিয়ে যায়। খুধায় চো চো করতে থাকা পেট নিয়ে আমি শান্তিতে চোখ বুজে বড় করে খিচুড়ির গন্ধ নেই। খিচুড়ির সুঘ্রাণের পরিবর্তে পঁচে যাওয়া মাংসের গন্ধ পাই। আৎকে উঠে চোখ খুলে ওকে আবিষ্কার করি। ও আমার সামনে! তাকিয়ে আছে, খাবারের দিকে।

আমি খিচুড়ির প্যাকেট খুলে ওকে সাধি, ও হাপুসহুপুস করে খেয়ে নেয়। আচ্ছা ক’দিন ধরে খায় না ও?

আমার মায়া লাগে। ওকে খাওয়ানোর ইচ্ছা জাগে। ব্যাগ হাতড়ে খুচরো কিছু পয়সা বাদ দিয়ে ১৫ টাকা পেলাম। বাস ভাড়া-ই আছে ১০/-। ওকে খাওয়াবো না নিজে বাসায় ফিরবো? পরে ভাবলাম রাস্তা তো অবরুদ্ধ, হেটেই বাসায় ফিরতে হবে।

ও তাকিয়ে আছে আমার ব্যাগের দিকে। ভাবছে আরো খাবার এনেছি। আমি হাসি দিয়ে ওর দিকে তাকাই। ও হাসি ফেরত দেয় না। মলিন মুখে মাটির দিকে চেয়ে থাকে।

টং দোকান থেকে পাওয়ারুটি কিনে ওকে খাওয়াচ্ছিলাম দেখে আশেপাশের মানুষ বেশ আতঙ্ক নিয়ে আমাদের দেখছিল। কাউকে খাওয়ানো পাপ?

পঁচা গন্ধটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিলো। নাকে রুমাল ধরে রেখেও কুলকিনারা করতে পারছিলাম না। ওর দিকে তাকালাম। শান্তি নিয়ে খাচ্ছে। ওর পিঠে হাত রাখলাম। ও খেয়েই যাচ্ছে। ওর গায়ের সাথে আষ্টেপৃষ্টে একটা বস্তা বাঁধা। পুরোটা খুলে আর স্থির থাকতে পারি নি।মুখে হাত দিয়ে চিৎকার দিলাম। এ-ও সম্ভব!

পুরো পিঠ জুড়ে রক্ত আর পুঁজে মাখামাখি। বোধহয় পুড়ে গেছিলো বা অসুখে হয়েছে। কেউ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় নি। দেখতে বাজে লাগে বা গন্ধ বেরোয় দেখে হয়তো কেউ মায়া করে বস্তা বেঁধে দিয়ে গেছে। আমি পাগল হয়ে যাই। ওকে বাঁচাবো কী করে? কোনদিন তো টাকা চাই নি কারো কাছে।

ফিরে এসে বাসার পুরোনো যত বই আছে, ব্যাগে ভরে রাখলাম। নীলক্ষেতে বিক্রি করতে গিয়ে আবার কান্না পেলো। পুরোনো বই কিনতে গেলে ১০০’র কমে পাওয়া যায় না, আর বিক্রির বেলায় ১০/২০ টাকা! এ-ও সম্ভব?

আমার জমানো পয়সা, খুচরো টাকা মিলিয়ে ১৫৫ টাকা হয়। বন্ধুদের জানালাম। ওরা রাজি হয় না। ওরা দেশের স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে সড়ক আন্দোলনে ব্যাস্ত। অন্যের জন্য ডাক্তারের কাছে ছোটার সময় নেই!

আমাকে আর আন্দোলন টানে না। চায়ের আড্ডা,গ্রুপ স্টাডি কোন কিছুতে আমি আর আগ্রহ পাই না। আমি মরিয়া হয়ে যাই ওকে বাঁচাতে। এক্সট্রা ক্লাশ, ইম্পোর্ট্যান্ট ক্লাশ, কঠিন টপিক, গ্রুপস্টাডি বাদ দিয়ে রোজ বের হই ওর জন্য। রমনা-সোহরাওয়ার্দী ঘুরে বেরাই দুজনে। ও আমার গা ঘেষে বসে থাকে। আমরা পাওয়ারুটি কিনে খাই। পাওয়ারুটিতে ভেজানো বেশি দুধ-চিনি দিয়ে চা আবার ওর খুব পছন্দ। লোকে অবাক হয়ে দেখে আমাদের। আমি লজ্জা পাই না। ও কি পায়?

সময় গড়ায়, ওর চিকিৎসার কিচ্ছুটি হয় না। আমি প্রার্থনা করে ওকে ফু দিয়ে দেই। কাঁদি ওর সামনে। ও হাত বাড়িয়ে আমার হাত ছুঁয়ে দেয়। আমি মুখ চেপে কান্না গিলে ফেলি। ও বুঝে ওর প্রতি আমি অন্যকিছু অনুভব করি। আমাকে ও হতাশ করে না। আমাকে দেখলেই দৌড়ে আসে আর রাস্তা ভরে যায় রক্তে আর পুঁজে! লোকে নাক ছিটকায়।

কালবৈশাখী না হলেও মাঝের চারদিন তীব্র ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল সেবার। কম্বল-লেপ নামানো লেগেছিল। কী যেন নিম্নচাপ চলছিল। কান ফাটানো বজ্রপাত আর বৃষ্টি। সূর্যই দেখা যায় নি! আমার মন পড়ে থাকে ওর কাছে। ও যে রাস্তাতেই থাকে। এ-ই অসময়ের বৃষ্টিতে ওর থাকার জায়গা হবে তো? খেতে পাবে তো? কেউ খেতে দেবে তো ওকে?

আমার গলা দিয়ে খাবার নামে না। ঘুমাতে পারি না। ওকে মনে পড়ে। মন কেমন করে ওঠে ওকে দেখার জন্য। বৃষ্টি বন্ধের জন্য প্রার্থনা করি, মানত করি। বৃষ্টি কমে। আমি ছুটে যাই কাকরাইল মসজিদের সামনে। ও নেই!
সোহরাওয়ার্দী, রমনা, বেইলি রোড শান্তিনগর এলাকা কোথাও ও নেই। বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। ঠিক আছে তো ও? প্রথম দেখা হওয়ার সেই চা দোকানে গেলাম। মামা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলছিলেন, “মইরা গ্যাছে ঠাডা পইড়া। বিসটির মদ্যে এ-ই মাতা হেই মাতা দৌড়াইতে নিয়া রাস্তার মদ্যেই ঠাডা পইড়া মইরা আছিলো। সোরার্দির যেনে ময়লা হালায়, ওনে ফালায় থুইছে, দেহেন গিয়া!”

খুতখুতানি স্বভাবের জন্য ময়লা সহ্য হতো না আমার। কিন্তু আমি ঐদিন দৌড়ে গেছিলাম ওকে দেখার জন্য। ওর ডেডবডি ডাস্টবিনে! কীভাবে সম্ভব?

ময়লা সরিয়ে রাখা ২টা লোক কাজ করছিল মন দিয়ে। আধ খাওয়া সিঙ্গারা, চিপ্সের প্যাকেট সব দিয়ে ভরা জায়গাটা। আমি কী দিয়ে শুরু করবো ভেবেই পাচ্ছিলাম না। একজন মাথা তুলে জিজ্ঞাসা করলো, “কী চাই?”
আমি ঘটনা বললাম। আশ্চর্য! আমি কাঁদছি না। আমার কান্না পাচ্ছে না। ওকে বাঁচানোর জন্য যতটা কেঁদেছিলাম, ওর মারা যাওয়ার খবরে অতটা খারাপ লাগছে না বরং শান্তি লাগছে। ওর আর কষ্ট হবে না, কেউ ওকে নাক ছিটকাবে না, এটা ভেবেই শান্তি লাগছিল।

“ঐ যে ঐহানে। ” মামাদের এমন উক্তিতে চমকে তাকালাম।
“হ্যাঁ, এটাই ও।” পুড়ে গেছে শরীরটা। ওকে আমি চিনি, যে অবস্থাতেই থাকুক, চিনবো।

“মামা, ওর কবর হবে না?” বোকার মতো প্রশ্ন করে মাথা নিচু করে ফেললাম। বুঝলাম, এটা তো সম্ভব ই না। বেওয়ারিশ বলে কথা!

“মাইনষেরই কবর হয় না আজকাল, আবার কুত্তার!” হাসছেন উনারা। আকাশ-বাতাস কাঁপানো হাসি। কিন্তু এত বিদঘুটে লাগছে কেন হাসিটা?

আমি ছাতা বন্ধ করে ভিজতে ভিজতে চায়ের দোকানের দিকে পা বাড়ালাম। দুধ-চিনি বেশি দিয়ে এক কাপ চা খাওয়াই লাগবে, পাওয়ারুটি ভিজিয়ে।

লেখকঃ মৃন্ময় রায়

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.