শালপাতার রোদন

অন্ধকার রাত।কৃষ্ণপক্ষ চলছে।এখানে যেন আরো বেশি অন্ধকার; গভীর জঙ্গল। পোকারা ডাকছে বিদুর বিলাপে। মাঝেমাঝে পাখি ডানা ঝাপটা দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। শেয়াল,বন্য বেড়াল চহরম মহরম করে ছুঁটে যাচ্ছে।
গাজীপুরের একটা প্রত্যন্ত এলাকা এটা হবে ।গ্রামটার উত্তরে এই শালবন। মাইল চারেক বিস্তৃত এ বন।এখানে বনগুলো কিছুটা উঁচু হয়;আর নিচু জমিকে বাইদ বলা হয়।
দিনেরবেলাতেও খুব কম মানুষের চলাচল এখান দিয়ে।মনুষ্য ভয় নয়তো, নানা লোককাহিনীর ভয়ে।

আমার তো প্রায় সব জানা।কারণ,আমি একজন সাইকোলজিস্ট। একটা কেইস আমিই হ্যাঙ্গেল করছি;একমাস ধরে।
তবে রোগিকে কাউন্সিলিং করিয়ে জবানবন্দি থেকে আজ যতটুকু জানতে পারছি তাই লিখছি। সবকিছু আজই বলল কেন?
গল্পটা অন্যরকম স্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহ নেই।
রোগী কিছুটা সুস্থ শারীরিকভাবে, তবে মানসিক ভাবে বিপর্যস্থ।বুঝা যাচ্ছে খুব গুরুতর শকড হয়েছে।তবে রোগীকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে বেশ।
তারপর শুরু করি;

রাস্তার এখানে একটা ত্রিমোড়। দুদিকে গ্রাম, অন্যটি বনের গভীরে চলে গেছে। বনের ভেতরে যাওয়া রাস্তাটা তৈরি করেছে কাঠুরেরা আর কিছু যৌনতা লোভী রাক্ষসেরা।
যৌনতায় যাদের ভাতের চেয়েও বেশি খিদে থাকে।
একটা ঢিপঢিপ আলো ক্রমশ এদিকে এগিয়ে আসছে; মোবাইলের টর্স হবে। আরহাম দাঁড়িয়ে আছে ত্রিমোড়ে।
আজ তার ভয় নেই।নেই কোন পিছুটান। ভালবাসার মিলন নাকি অন্যকিছু?

ভালবাসলে ভীতুরাও হয়ে যায় সাহসী। অনায়াসেই করে ফেলতে পারে অসাধ্য কাজ।শুধু ভালবাসার জন্য।
দূর থেকে আলোটাকে উড়ে আসা ধবল অগ্নিকুণ্ড মনে হচ্ছে।
চৈত্র মাস তবুও হালকা শীত শীত লাগছে।
আলোটা কাছে আসতেই মানব অবয়বে দাঁড়িয়ে গেল একচেনা মানুষ।শুধু চেনা নয় যাকে আপাদমস্তক জানা,জানা তার পরিধি, সীমাবদ্ধ, শরীরের ভাঁজ,এমনকি তার দুর্বলতাও।
নাম তার নাজিম (আমার রোগী)।
পাশের গ্রামে ওর নানু বাড়ি। বছর দুয়েক হলো ওর বাবা মা এখানে আছে।ওর কোন মামা নেই এজন্য।

*

টেনে টেনে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমায়? কিছুটা নিচু আর উদ্ধেগী গলায় জিজ্ঞেস করছে নাজিম।
-এত উতলা হচ্ছো কেন?ভয় তো তুমি পাচ্ছোনা।তুমি যে পুরুষ; সুপুরুষ। তোমার তো রাতবিরেতে ঘুরে অভ্যেস আছে।আমি সেক্ষেত্রে আনাড়ি বলতে পারো;আরহাম বলছে।
-এভাবে বলছো কেন?
– এত অবাক হচ্ছো কেন আজ? এর আগে যে আমরা দুজনে জঙ্গলে আসিনি তা কিন্তু নয়;
– কি করতে চাচ্ছ?
– আরে তুমি যে আজ অবুঝ হয়ে গেলে।এর আগেও কতকবার তোমার আমার এসব হয়েছে।
আজ নাজিম কিছুটা বিরক্ত। শুধু আজই বিরক্ত নাকি আরো আগে থেকে?
কেনইবা বিরক্ত?
তারপরো এলো। কেন এলো?
শুধুই কাম,লোভ, ভালবাসা নাকি দায়বদ্ধতা?
*
শালবনের অনেকটা গভীরে এসে গেছে তারা।এখানটা খোলামেলা। গোলা করে কিছুটা জায়গার গাছকাটা হয়েছে।চুরি করে গাছ কেটে মাঝেমাঝে কয়লা বানানো হয় এখানে।
হঠাৎই একটা গাছের সাথে লটকিয়ে ধরেছে আরহাম নাজিমকে।
তারপরই ঠোঁট কামড়ে ধরে চুষতে থাকে আরহাম।
আস্তে আস্তে সাড়া দিতে থাকে নাজিম।অল্প ছোঁয়াতেই নাজিম বড্ড যৌনকাতুর হয়ে উঠে।অনেক বেশি যৌনতাপ্রিয় মানুষগুলো যেমন হয়।
আরহাম ওর হাতদুটো গাছের পেছনে নিয়ে বেঁধে দেয় চুমুর তালে তালে।
নাজিম আকস্মিক ঠোঁট ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, হাত বাঁধলে কেন?
আজ কিছুটা অন্যরকম হউক,বলেই আরহাম নিজের ঠোঁট কামড়ে একটা অশালীন ভঙ্গি করে।
নাজিমের লোভাতুর চোখ অন্ধকারেও চকচকিয়ে উঠে।
আবার শুরু হয় চুম্বন পর্ব।নাজিমের প্যান্টের জীপারে হাত ঢুকিয়ে দেয় আরহাম।শক্ত হয়ে উঠা পুরুষাঙ্গ।
নাজীমের শরীর জেগে উঠেছে পুরোপুরি।

*
আরহাম এবার দূরে চলে এলো। অন্ধকার; কিছুই দেখা যাচ্ছেনা।মোবাইলের টর্সটাও বন্ধ হয়ে গেছে।
হঠাৎ অনেকগুলো মরিচবাতি জ্বলে উঠলো।চারদিক মৃদু আলোয় ভরে গেছে। যেন জোনাকিরা আলো ছড়াচ্ছে।
এই অন্ধকারে এক মোহময় আবেশ তৈরি করেছে। আরো অনেক কিছু তৈরি এখানে; দড়ি, কাঠ, বিয়ারিং দিয়ে ক্যারিং তৈরি করা। নাজিম ভাবছে কয়লাপুড়ার কাজে লাগে হয়তো।
কোন জনমানব নেই চারপাশে।দুটি পুরুষ মানুষ একান্ত একাকিত্বে।

আবরার এগিয়ে এসে নাজিমের শরীরে আবরণ খুলে দেয়। নগ্ন হয়ে আছে নাজিম।তার পৌরুষ দাঁড়িয়ে আছে; কাঁপছে।
নাজিম বলে,এতকিছু কবে করলে,কিভাবে করলে ?আমায় কিছু জানাও নি কেন?
– যাকে ভালবাসি তার জন্য এসব করাই যায়। অপেক্ষা করো আরো অনেক কিছু ঘটবে সামনে।আজ রাতের কথা যতদিন বাঁচবে ভুলতে পারবেনা।
কথায় কিছুটা চাপা আক্রোশ আজ।
যদিও নাজিম এসব বুঝেনা,বুঝতে চায়ও নি কোনদিন। এই অতিরিক্ত পৌরুষেরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মান,অভিমান ধরতে পারেনা।
নগ্ন শরীরে নাজিমকে আজ বিশ্রী লাগছে।এমনিতে ও বেশ সুন্দর,লম্বা। সুপুরুষ বলতে সমাজ যা বুঝায় আমাদের তেমনই।
কেন এমন লাগছে? কারণ আছে নিশ্চয়!
*
আরহাম নিজেকেও অনাবৃত করে ফেলে।ভালবাসার খেলায় আব্রু থাকেনা;অন্ধকারও না।
নাজিমের উদ্বেলিত পুরুষাঙ্গ নিজের ভেতরে নিয়ে নেয় আবরার। পুড়ে যাচ্ছে নাজিম।আর্তশীৎকারে ঘোমট হয়ে গেছে বন। দুর্বার উঠানামায় উদ্বেলিত হচ্ছে প্রকৃতি।
শালবন যেন হরমোরিয়ে উঠছে।
এমন মিলন আর আগে দেখেনি প্রকৃতি।
একটা চরম মুহূর্তে আবরার দূরে চলে আসে।
ফিরে তাকায়; অশ্রুসজল চোখে।
নাজিম এখন যেন অসহায়।সব পুরুষই বীর্য স্খলনের আগে সবচেয়ে অসহায় হয়।
কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেছে আবরারের কান্নায়।কি হয়েছে চলে গেলে যে?
– খুব অসহায় লাগছে নিজেকে তাই না?এমন অসহায় আমি গত একবছর ধরেই।
যেদিন থেকে বুঝেছি আমি শুধু তোমার যৌনতার পাত্র সেদিন থেকে।ভালবাসার নাম করে তুমি (বলতে গিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে)।আমি তোমার আর পাঁচটা মানুষের মতও গুরুত্ব পাইনা।কেমন যেন দূরে থাকো তুমি। আমায় চাপা ঘৃণা কর তুমি,আমি বুঝতে পারি।
শুধু আমিই কেন? আরিফ,নাবিলা,মৌসুমি আরো বলব নাম তারাও ঠকছে।তুমি সমকামীর ভান ধরা এক বিষাক্ত উভচর যৌনলোভী।সমকামীতা শুধুমাত্র যৌনতাতে নয় সেটা তুমি কোনদিন বুঝনি; আর বুঝতে হবেওনা।চোখের জল মুছে নেয় অতিদর্পে।আর কেউ ঠকবেনা আজকের পর।
– কি করতে চাইছো তুমি? আমি সত্যিই তোমাকে ভালবাসি। আমাদের দু বছরের সম্পর্ক মিথ্যে নয়।
-চুপ; আর মিথ্যে বলোনা।
হঠাৎই ব্লেডের ছোট্ট আঁচড় দেয় নাজিমের পুরুষাঙ্গে। ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠে ও।

তুমি পাগল হয়ে গেছ নাকি? কি করছো এসব?

ল্প বিন্দু বিন্দু রক্ত ঝরছে।শালপাতায় পরে কালো হয়ে যাচ্ছে।যেন বিষাক্ত রক্ত।প্রতারকের রক্ত যদি নীল বিষাক্ত হতো;
-হ্যা আমি পাগল ছিলাম তোমায় ভালবেসে।নিজের সবটা দিয়ে, নিজের স্বত্তা জোড়ে তোমাকে জড়িয়ে নিয়েছিলাম।আমি ভেবেও ছিলাম তুমিও আমাকেই ভালবাসো। কিন্তু নাহ……

*
বলেছিলাম না আজকের রাত তুমি কোনদিন ভুলতে পারবেনা।আরহাম ওর মুখে কাপড় গুঁজে দেয়।চোখের পাতায় আঠা লাগিয়ে দেয় যেন ইচ্ছে করলেও চোখ বন্ধ না করতে পারে।এবার পুরুষাঙ্গে ব্যান্ডেজ করে দেয়।গত দুদিন ধরে সব জোগাড় করছে আরহাম।

-তারমানে হচ্ছে;আমি তোমাকে মারব না।
নাজিম যেন কিছুটা আশ্বস্ত হলো কিন্তু ভীতি গেলনা।আজ আরহাম যেন সাইকো হয়ে গেছে।উন্মাদ হয়ে গেছে।
-তোমার পুরুষাঙ্গ বেয়ে বেয়ে শুধু রক্ত ঝরছিল আমার গত এক বছরের ঝরা অশ্রুর দাম হয়ে।

আর কথা বাড়াবো না তোমাকে বলেও কোন লাভ নেই।
আমি মুক্তি চাই,মুক্ত পাগল আমি।

সামনের গাছে বাঁধা দড়িটা খুলে আনে আরহাম; ফাঁস গিট দেওয়া। নিজে উঠে যায় নাজিমের ঠিক সামনে রাখা একটা গাছের ডালে।
কান্নার বিলাপে প্রতিটা শালপাতা যেন হো হো শব্দ করছে।নিরব সাক্ষী হচ্ছে তারা।
নিশাচর পোকাগুলোও বিলাপ করছে; বলছে ভালবাসা যেন এমন না হয়-এমন না হয়।

*
নাজিম; খুব ইচ্ছে করে তোমার ছোঁয়া পেতে,ইচ্ছে করছে প্রথম যেদিন আমায় জড়িয়ে ধরেছিলে সেই অনুভূতি নিতে।
তোমার হয়তো মনেই নেই।প্রথম দেখা, প্রথম প্রণয় এসব দিন।
মনে পড়ে;তুমি আমার গ্রামে এলে বেড়াতে আগন্তুক হয়ে।
অচেনা একটা ছেলে।কি রুপ তোমার,কি পৌরুষ তোমার।আমি তো মুগ্ধনয়নে তাকিয়ে আছি।
তুমি গলা খাঁকারি দিয়ে বললে ; মকবুল মামার বাড়ি কোনটা?
আমি ইতস্তত হয়ে বললাম বাবাকে কি দরকার?
সেই হলো জানাশোনা। যাওয়াআসা প্রেম প্রণয়।
বৃষ্টির রাত্রে তোমার বাড়ি থেকে যাওয়া।তারপর প্রথম প্রণয়।
তুমি যে এতটা প্রেমিক ছিলে আমি অবাক হয়ে যেতাম।
আসলে অতিরিক্ত প্রেমিকদের প্রেমিক নয় লুচ্চা বলা উচিৎ।
নাজিম তোমার হাতে দেখ একটা দড়ি! ওটা ছেড়ে দাও।
“তোমার হাতেই হউক আমার মুক্তি রচনা” বলে কান্নায় মাথা নত হয়ে গেল আরহামের।
কি হলো; ছেড়ে দাও।নইলে তোমার মৃত্যু আমার হাতেই।
ভয়ে তড়িঘড়ি করে ছেড়ে দিল দড়ি।আগে থেকেই গাছের মগডালে বিয়ারিং এ বাঁধা দড়ি। দড়ির ছেড়ে দেওয়া প্রান্ত গিয়ে আটকে গেল।
নাজিমের মুখের কাছে এসে আটকে যায় আরহাম।যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে আরহাম; মৃত্যু যন্রণা। ফাঁস লেগেছে গলায়। ভালবাসায় লেগেছে ফাঁস।অক্সিজেন ফুরিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর।
হাতপা ছুড়তে থাকে আরহাম।
জিহ্বা বেড়িয়ে আসে মুখটা কালো হয়ে নিথর হয়ে পড়ে থাকে তার নগ্ন দেহ।
নাজিম শক্ত মূর্ত পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। কি দেখছে সে? একটা মানুষের করুণ মৃত্যু।মৃত্যুর ভয়ানক এ দৃশ্য না দেখলে কল্পনাও হয়তো করা যায়না।চোখ বুঝতেও পারছেনা ও আঠায় লাগানো।
আর সহ্য করতে পারছে না নাজিম।যেন ও মারা যাবে। তাৎক্ষণিক সিনড্রোমেটিক স্ট্রোক হয় নাজিমের।অজ্ঞান হয়ে হেলান দিয়ে পড়ে লাশের গায়ে।
**
ভোরের আলো ফুটছে। শালপাতা নড়ছে।শব্দ হচ্ছে।
একদল কাঠুড়ে আসছে এদিকে।
এসেই তাদের ভয়ার্ত চিৎকারে জেগে উঠে গ্রাম।
পুলিশ আসে। লাশ নিয়ে যাওয়া হয়।নাজিমকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।চিকিৎসা চলে।
একমাস পর আমার কাছে আসে। হাসপাতালের ডাক্তাররাই রেফার করে আমার কাছে।সাইকোলজিস্ট দেখাতে।কারণ; নাজিম আর স্বাভাবিক আচরণ করছেনা।শুধু বিলাপ করছে আমিই দোষী। আরো নানা বকবক।
একমাস কাউন্সিলিং এর পর কিছুটা সুস্থ।
সব সত্য কথা বলেছে আমায় যা যা ঘটেছিল। সারসংক্ষেপ ও বড্ড যৌনকাতুর ছিল মানে সেক্সফ্রিক।ওর কাছে ছেলে মেয়ে কিছুই বাদ ছিল না।প্রথমে প্রেম ভালবাসা দিয়ে দুর্বল করে যা করার করত।
কিন্তু এটা ভাবতো না অপরজন বিশ্বাস করে স্বপ্ন দেখছে।
আরহাম ছিল তেমনই স্বপ্নবিলাসী।সৎ,অল্পতে তুষ্ট একজন।এই মানুষই আবার ভুল ভাঙলে ভয়ানক হতে পারে তা কেউ জানেনা।তখন তারা হয়ে উঠে প্রতিশোধ পরায়ণ সাইকো।
*
রাত আনুমানিক তিনটে।ফোন বাজছে আমার। চশমা পড়ে রিসিব করি।কেউ একজন কান্না বিজড়িত হয়ে বলছে নাজিম মারা গেছে।রক্তবমি করছিল আপনার ওখান থেকে আসার পরই।হাসপাতালে কিছুক্ষণ আগে মারা গেল ও।

——————– সমাপ্ত——————–

লেখকঃ পরিশ্রান্ত পথিক
প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.