কলমী বন্ধু

সারাবাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও অফিসের ফাইল গুলো চোখে পরছে না।রুম্পা বাসায় নাই বেশ কদিন।আর ও না থাকলে আমার কোন কিছুই ঠিক ঠাক ভাবে পাইনা।ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি গেছে দিন চারেক আগে।খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে দ্বিতীয় তরফা আবার শুরু করলাম।
ছোট ছেলের টেবিলে হাত রাখতেই ওর স্তুপ করে রাখা বইগুলো সব নিচে পড়লো।কপালে বিরক্তির ছাপ এনে নিচে সেগুলো তুলতে নিলেই দেখি ছেলে কত সুন্দর ড্রয়িং করেছে!আমি,রুম্পা আর মাঝখানে সে।
ফাইল খুজা বন্ধ করে ওর বই খাতা গুলোর পাতা উল্টাতে মনোনিবেশ করি।ঠোটে মুচকি হাসি আমার।হাহা,হাতের লেখা একদম পঁচা,ঠিক আমার মত।
পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে চোখ পড়লো বড় করে লাল কালতে টিচারের লেখা “Write a letter to your pen friend about your country”
তারপর আমার ছেলের লেখা লেটারে চোখ বুলালাম খানেক্ষন। একজন কে মনে পরলো খুব।এখন আবার তারে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে হলো।চলে যাই স্টোর রুমে রাখা পুরোনো ট্রাঙ্কের কাছে।একদম পেছনের দিকে।ধুলোবালির ঝুলে একদম চেনাই যাচ্ছে না সেটিকে।কোনো রকম খুলেই যত্ন করে রাখা পুরোনো কিছু ছবির অ্যালবাম,মায়ের ব্যাবহার্য জিনিসপত্র,আর কোনায় যত্ন করে রাখা একটা ব্যাগ দেখি।আস্তে আস্তে খুল্লাম।দু তিনটে চিঠি সেখানে যত্ন সহকারে রাখা।বাকি গুলো তো সেবারই ফেলে দিয়েছিলাম।এগুলো খাটের নিচে পড়ে থাকায় এখনো আছে।
নস্টালজিক হয়ে যাই খুব।অতীতে ডুব দিলাম।
————
সেদিন স্কুল থেকে কাঠফাটা রৌদ্রে বাড়ি ফিরেই সিলভার কার্প মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছিলাম গোগ্রাসে।হুট করেই পাশের বাড়ি থেকে শুনলাম সজল ডাকছে
“সপন রে,ও সপন একটু বাইরে আয় তো”
“চাইরডা খায়া লই,তারপর আইতাছি।তোরা গোসল কর”
“আরে হালা খাইয়া লই না কয়ডা”
“আরে চিডি আইছে তর নামে”
“কিহ,খাড়া আইতাছি”
এই বলেই হাতে পানি দিয়ে বেরিয়ে গেছিলাম সেদিন।
যেয়ে দেখি রত্না ফুফু বলেন”তোর নামে মনেহয় কেউ চিডি দিছে।ব্যাডায় ভুলে আমাগো ঘরে গেছিলো গা”
আমি পিওনের দিকে একটা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করি
“আমার নামে কে চিডি দিলো?? “
তিনি সুন্দর ভাবে উত্তর দিলেন”সুমন নামের এক ভদ্রলোক ঢাকা থেকে পাঠিয়েছেন চিঠি খানা।আপনি ই কি স্বপ্ন??”
“জে আমি সপন,স্বপ্ন না তো”
“স্বপ্ন কে তবে আপনাদের বাড়িতে??”
রত্না ফুফু বলেন”স্বপ্ন মপ্ন নাই।ওর নামেই আইছে চিডিডা।ওরে দিয়া দ্যান।”
পিওন মাম বলেন”তাও ঠিক, বাড়ির ঠিকানা তো এটাই,তাহলে আপনিই হয়ত।একটা স্বাক্ষর লাগবে যে”
আমি স্বাক্ষর দিয়ে চিঠি খানা নেই।রত্না ফুফু,সজল,আর জসিম কাকা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।তারপর সজল বলে”শহর থেইকা কে পাঠাইলো রে চিডি??”
“আরে আমিই কি জানি নাকি!দেইখা নেই।”
বলে ঘরে চলে যাই।আস্তে আস্তে চিঠিটা খুলেই পড়া শুরু করি,
প্রিয় স্বপ্ন,
জানিনা কোথাকার তুমি;কি তোমার পরিচয়।ভালো আছো তো??ভাবছো কে আমি তাইনা?সবুর করো বলছি শোনো,আচ্ছা তোমার নাম স্বপ্ন নাকি অন্য কিছু!
অজ্ঞাত এই তুমি কেমন তা আমার অজানা।কোনো পরিচয় ই জানিনা তোমার,স্বপ্নেই তোমার বসবাস।
তাই তোমায় স্বপ্ন ডাকলাম।
.
আমি পলাশ,ঢাকা থাকি।মোহাম্মদপুরের স্থানীয় আমি।এবার দ্বাদশ শ্রেনীতে পড়ি।তুমি চাইলে আমরা বন্ধু হতে পারি।আমার তেমন বন্ধু নেই ।হবে কি আমার কলমী বন্ধু??
যদি আমার বন্ধুত্বে সাড়া দাও তবে চিঠির জবাব দিও,আমি অপেক্ষায় থাকবো।আর একটা প্রমিস রাখতে হবে কিন্তু,আমাদের বন্ধুত্বের কথা কাওকে জানাবে না।
আর হ্যা তোমার নাম,কোথায় পড়াশোনা অথবা কাজ করো তা কিন্তু অবশ্যই জানাবে,কেমন??
ইতি,
পলাশ।
++++
খামের উপরের ঠিকানায় চোখ বুলালাম।নাহ ইনাকে তো আমি চিনিই না।তাছাড়া শহরে কেউ থাকতো না আমাদের।তবুও বেশ কৌতুহল হলো সেই অপরিচিতের উপর।শহুরে মানুষ!ইশ!বন্ধুত্ব হলে কত বেড়াতে যেতে পারবো।পাশের বাড়ির মিজান তো কত যায় ওর আত্মীয়দের বাসায়।আমিও যেতে পারবো।কিন্তু যদি বন্ধুত্বের ফাঁদে ফেলে পাঁচার করে দেয়!আব্বা রোজ বলে পাঁচারকারীদের সম্পর্কে।মনে দোটানা কাজ করছিলো খুব।তাই সাথে সাথে আর উত্তর দেইনি।সজল,রত্না ফুফু পরের দিন চিঠি সম্পর্কে জানতে চাইলে বলে দেই ভুলে চলে এসেছে।ওই চিঠি আমার না।তাই ছিড়ে ফেলে দিয়েছি
তিন চার দিন পর স্কুল ছুটির পর দুপুরে বাসায় ফেরার সময় আকাশ কালো হয়ে উঠে, বাসায় যেতেই তুফান উঠে।
হুট করেই ইচ্ছে হলো সেই পলাশ কে উদ্দেশ্য করে কিছু লেখি।মনের মাধুরী মিশিয়ে শুদ্ধ ভাষায় লিখলাম
“প্রিয় পলাশ,
শুরুতেই প্রীতি ও শুভেচ্ছা নিও।আশাকরি ভালোই আছো??আমিও বেশ ভালো আছি।তোমার বন্ধুত্বের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে চিঠিখানার জবাব দিলাম।
.
আমি স্বপ্ন নই,সপন।সবে ক্লাস নাইনে পড়ি।বাবা মসজিদের ইমাম,মা সেলাই কাজ করেন।
জানো আমার অনেক বন্ধু আছে।আমরা রোজ পুকুরে ঝাপ দেই,গাছে উঠে আম পেড়ে খাই,জাম কুড়াই,নদীতে সাঁতরাই।জানো মাঝে মধ্যে ট্রলারে উঠে অনেক দূর থেকে আসি।ঘুরতে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।আর ভালো লাগে পুকুরে ডুবাডুবি খেলতে,কে কতক্ষন ডুব দিয়ে থাকতে পারি সেই প্রতিযোগিতা করি আমরা।জানো মাঝে মধ্যে আমরা ওপাড়ার ছেলেদের সাথে বাজিতে ম্যাচ খেলি।ক্রিকেট আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলা।সেবার ও পাড়ার রুবেলের সাথে আর প্রিয় বন্ধু সজলের তো মারামারিই লেগে গেছিলো।আমিও দু-চার ঘা বসিয়ে দিয়েছি।
আজ অনেক লিখলাম গো।আসলে এর আগে কখনো চিঠি লেখিনি তো তাই।ইচ্ছে হচ্ছে আরো বলতে।তবে এবার না,পরে বলবো।আজ এটুকুই কেমন??”
(তারপর দুই আঙ্গুল ফাকা রেখে একটা ছন্দ লিখেছিলাম)
“আতা গাছে তোতা পাখি,ডালিম গাছে মৌ
তুমি আমি প্রিয় বন্ধু জানবে নাকো কেউ”
এরপর দুটো হাত ও মাঝখানে গোলাপ ফুল এঁকে দিয়ে সমাপ্তি করি চিঠির।
ভাজ করে বইয়ের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখি চিঠিখানা।কাল ইনভেলাপ কিনে চিঠিটা পাঠাতে হবে।
.
চিঠি পাঠায়েছি দুদিন হলো।জানিনা পলাশ পেয়েছে কিনা।আচ্ছা ও কি আমার মত গ্রামের ছেলের সাথে সত্যিই বন্ধুত্ব করবে!
এসব চিন্তা করতাম মাঝে মধ্যে।
.
পরের সপ্তাহেই আমার কাছে চিঠি আসে আবার।এবার সপন নামেই এসেছে।কেউ যেন না জানে,তাই আমি দৌড়ে পিওন মামার কাছ থেকে চিঠিটা নিয়ে পেয়ারা গাছে উঠে যাই।একটা পোক্ত ডালে বসে চিঠিটা পড়া শুরু করি।
সেখানে ও লিখেছিলো
“সপন,তোমাকে আমি স্বপ্ন নামেই ডাকবো। আমি ভালো মন্দে মিলানো আছি।

আমার বন্ধুত্ব গ্রহন করায় আমি খুব খুশি।অন্তত কেউ তো এলো যে আমার কথা শুনবে।আমি আমার সব অনুভূতি গুলো বলতে পারবো তোমার সাথে।
.
জানোই তো আমার বন্ধু নেই তেমন।কেউ মিশে না আমার সাথে।কেন মেশেনা তা আমিও জানিনা।তবে ওরা খুব কটুক্তি করে আমায় নিয়ে তাই আমিও যাইনা মিশতে।আমায় ওরা খুব বাজে নামে ডাকে।ওটা তোমায় বলা যাবেনা।তুমিও হয়ত তখন ও নামেই ডাকবে।বন্ধু,আমায় নিয়ে কখনো উপহাস করবে না কিন্তু;তাহলে আড়ি নেব।
জানো,আমার সবচেয়ে ভালো লাগে ছবি আঁকতে।আমি অনেক ভালো ছবি আঁকি।তোমার একটা ছবি পাঠিয়ো তো।আমি ওটা দেখে তোমার ছবি এঁকে পাঠিয়ে দেব।
স্বপ্ন,জানো আমি তেমন কোথাও ঘুরতে যাইনা।বাবা আমায় নিয়ে খেলার সময় পান নি ছোটবেলায়।মা বেচে নাই।বাবার নাকি আরেকটা স্ত্রী ছিলো।বাবা সেখানেই থাকতো।আমায় রমিজা ফুফু দেখাশুনা করেন।তার বাসা পাশেই।দুবেলা রেধে ঘর পরিষ্কার করে যায়।
আমার ছেলেবেলা ভালো কাটেনি।এখনো ভালো কাটেনা।জানো খুব একা আমি।রোজ কারেন্ট গেলে আমি ব্যালকনিতে বসে থাকি। কারেন্ট যাওয়ার সাথে সাথে সবাই জোড়ে চিৎকার করে উঠে।তারপর ওরা অনেক খেলাধুলা করে।চোর-পুলিশ,গোল্লা­ছুট,জুতা চোড় আরো কত!আমার বয়স ওদের চেয়ে বেশি হলেও ইচ্ছা করে ওদের সাথে খেলি।কিন্তু হয়ে উঠেনা গো।আমার উচ্ছা করে ঘুড়ি উড়াতে।তুমি ঘুড়ি উড়াতে পারো??
.
যদি পারো জানিয়ো।তোমার সম্পর্কে আরো কিছু বলবা কিন্তু।আমি অপেক্ষায় থাকবো”
.
আমি বাসায় চলে যাই।মন টা কেমন খচ খচ করছিলো।ছেলেটা আসলেই বড্ড একা।কিশোর বয়স হলেও ওকে যেন বুঝতে শুরু করি আমি।আমার চেয়ে ও কত বড় হলেও কেমন যেন বাচ্চামো করে লেখে, হাহা।দেড় বছরের রাব্বিও ওর চেয়ে চালাক।কাকা ঠিকই বলে, শহুরে ছেলেগুলো একদম গাধা টাইপ।
তবুও কেন যেন আসক্ত হচ্ছিলাম ওর প্রতি।
.
সেবার ওকে দেব বলে স্টুডিও তে যেয়ে কত রকম ছবি তুললাম!কালো চশমা পরে,চশমা ছাড়া,চেয়ারে বসে, দাড়িয়ে।তারপর ওকে আবার চিঠি দেই।আমার কৈশরের দিনগুলি যেভাবে কাটাই,স্কুলে কি করি না করি সবটা লেখলাম।বাতেন স্যার কে আমরা”গোপাল ভাঁড়”,বিউটি আপা কে আমরা”বিউটিশিয়ান”,শফি­ক স্যার কে “বুইড়া দাদু” যা বলে ডাকতাম তা ও ওকে জানাতাম।সজল এটুকু বসেই প্রেম করে তাও বলি ওকে।অথচ আমি মেয়েদের সাথে তেমন কথা বলি না ।আমার ছোট বোন পলাশ কে দেখতে চায়,তাই সেবার ছবিও চেয়েছিলাম।
.
আমি চিঠি দেওয়ার পর পরই পলাশ ছবি পাঠায়।আমিও ওর জবাবের আশাতেই থাকতাম।এক অবাক করা বিষয় ছিলো যে আমার দৈনন্দিন রুটিন থেকে অনেকটা পিছিয়ে গেছিলাম।ওর কথাই মাথায় ঘুরতো।সেবার ওর একটা ছবি পাঠিয়েছিলো।আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে।কি সুন্দর একটা মানুষ!শহুরে ছেলে গুলো কেন যে এত সুন্দর!লজ্জ্যা লাগছিলো আমার খুব।ইশ!আমি কি সব পোষাক পরে ছবি দিচ্ছি।আব্বাকে বলতে হবে একজোড়া বুট জুতা কিনে দিতে।সেবার খুব জোড় করায় আব্বা বলেছিলো মেট্রিক পরীক্ষায় লেটার মার্ক পেলে আমায় দামী জুতা কিনে দেবে।এতদিন!আমি সব আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।
পরের বার শুকনো একটা গোলাপ ফুল পাঠিয়েছিলো আমার জন্য।আর লিখেছিলো”সব চিঠির শেষে একটা গোলাপ আঁকো তুমি তাই এই গোলাপ টা তোমার জন্য পাঠালাম।আমার বইয়ের ভেতরে ছিলো এটা।শুনো আমার দেওয়া একটা চিঠিও হারাবে না কিন্তু!”
.
আমি ওর দেওয়া সব কিছু যত্ন করে রাখতে শুরু করি।ও ফুল,কবিতা,ছোট কবিতা লিখে পাঠাতো।আমার বিভিন্ন স্টাইলে তুলা ছবি গুলো হুবহু এঁকে পাঠিয়েছিলো ও।কতটা প্রানবন্ত ছিলো সেগুলো!শুধু তাতে প্রান পতিষ্ঠা করলেই একজন জীবন্ত সাদা কালো মানুষ হতো।

দিন কে দিন চিঠি আদান প্রদান বেড়ে যায়।আমরা প্রতি সপ্তাহে অপেক্ষা করতাম একটা চিঠির জন্য।একটু দেরী হলেই আমাদের অস্থিরতা বেড়ে যেত খুব।দু একবার মন কষাকষিও হয়েছিলো এ নিয়ে।কিন্তু দুজনেই পাগলা হয়ে যেতাম;চিঠি না দিয়ে কেউই থাকতে পারতাম না।
যেথায় যেতাম ওকে মনে পড়তো খুব।সারা সপ্তাহে কি করেছি সব জানাতাম।ও হয়ত খুব আগ্রহ সহকারে পড়তো।প্রত্যেকটা লাইনের প্রেক্ষিতে পরের চিঠিতে ও উত্তর দিতো।আর ওর চিঠিতে থাকতো এক চাপা কস্ট,বলতো না খুলে,কিন্তু আমার অনেক জানতে ইচ্ছা করতো ওর সবটা। ওর চাপা কস্টগুলো আমায় ওর প্রতি অনেকটা আসক্ত করে ফেলে।
বয়ঃসন্ধি চলছিলো,যৌন অনুভূতি অল্পতেই জেগে উঠতো।মাঝে মধ্যে অতিষ্ট লাগতো খুব।পলাশের ওই সরল মুখটা চোখে ভাসলেই রাতে খুম কাম জাগতো।
.
মা খেয়াল করলেন আমার কাছে চিঠি আসে।ব্যাপারটা মা তেমন ভালো চোখে দেখতো না।সেবার খুব জোড় করলে বলি” মা,ও আমার শহুরে বন্ধু।খুব ভাব আমার লগে।”
মা রাগী কন্ঠে বলেছিলেন”শুন,এইসব শহরের ছেলেরা খুব চালাক।হে গো লগে কারো ভালো বন্ধুত্ব হইতে পারেনা।কোন বিপদ ঘরে আনোস আল্লাহই জানে।আগে ভাগে ওর লগে যোগাযোগ বন্ধ না করলে কিন্তু তোর আব্বারে জানাইতে বাধ্য হমু”

আমি রাগে তারাতারি ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ি।পলাশ খুব ভালো ছেলে,মাকে বুঝাতে ব্যর্থ হলাম আমি।তাই রাগ করে ঘুমের দেশে পাড়ি জমাই তারাতারিই।
দরজার কড়া নাড়ার শব্দ পাই গভীর রাতের দিকে।ঘুম জড়ানো চোখে আস্তে আস্তে দরজা খুলেই দেখতে পাই পলাশ কে!চোখ কচলে বলি
-এ-মা তুমি??এত রাইতে আইছো??
-হ্যা তোমার জন্য এসেছি।আমার যে আর ভালো লাগেনা
-আমারো তো ভালো লাগেনা,তোমারে ছাড়া।
এই বলেই ওকে জাপ্টে ধরে বিছানায় যেতেই ঘুম ভেঙে যায়।ইশ রে!
লজ্জ্যা পেয়ে যাই,বাহিরে যেয়ে পরিষ্কার হয়ে ঘরে ফিরি।পলাশ কি নিয়ে ঘটা স্বপ্নদোষ!ভাবতেই লজ্জ্যা পাচ্ছিলো খুব।ছেলেটার চেহারা মুখে ভেসে উঠছিলো বার বার,আর সাথে বুকে কেমন চিনচিনে সুখ!ওকে ভালোবাসতে না পারলে আমার মরন তুল্য লাগবে।যত বার ওকে মনে পরতো ততোবার ওকে পাবো নাকি পাবো না এসব ভেবে মন খারাপ হতো।
এর পরের চিঠিতে ওকে ভালোবাসার কথা জানাতেই হবে।
.
স্কুলে যাওয়ার পথে চিঠিটা ডাকবাক্সে ফেলে দেই।এবারের চিঠিতে ওর প্রতি আমার অনুভূতি বলে দেই।চিঠিতে কাব্যিক ভঙ্গীতে লেখি
“পলাশ আজ আর আমার জীবন,দিনকাল সম্পর্কে বলতে ইচ্ছা করছেনা।জানো আমি ভালো নাই।তোমার কথা ভাবলেই মন টা খারাপ হয়া যায়।কিভাবে বলি যে আমি তোমায় ভালোবাসি!সজল যেমন তন্নিকে ভালোবাসে,রাকিব সাদিয়ারে যেমনে ভালোবাসে আমিও ওমনে ভালোবাসি তোমারে।
আমি তোমারে ভালোবাসি পলাশ।ভাবতাছো এসব কি বলি!সত্যই বললাম।আমার মত গ্রামের গরীবকে ভালোবাসো কিনা জানিনা।আমরা দূরে থাকি এটা ভাবতাছো কি তুমি?আমার তিন বছরের বড় রত্না ফুফুও তো ফুফারে চিঠি দিয়া ভালোবাসছিলো।আমরাও পারমু দেইখো।”
বেচারা আমি!জীবনের প্যাঁচ তখন ও বুঝতে শিখিনি।আগ-পিছ না ভেবেই অনৈতিক সম্পর্কের আহবান করি।অবশ্য আমারই বা কি দোষ!এতকিছু বুঝার বয়স ই তো হয়নি তখন।

শেষে লেখি,যদি ভালোবাসো তবে হাতটা বাড়াও।
তারপর একটা ছন্দ আর দুটো টিয়া পাখি এঁকে দেই
“একটি গাছে দুইটি পাখি করে টিউ টিউ
তোমায় আমি ভালোবাসি আই লাভ ইউ”
.
ডাক বক্সে চিঠিটা ফেলে স্কুলে চলে যাই।যেতে যেতে দেরী হয়ে গেলো খানেকটা সময়।স্কুলে যেয়েও একটু শান্তি পাইনা।স্বপ্না আর আমার নামে মিল থাকায় ওরা খুব মজা নিতো।দুস্টমি করতো।
.
অনেকটা দিন হয়ে যায়,পলাশের চিঠির জবাব পাইনা।অস্থিরতা বাড়তে থাকে খুব।তবে কি ও চিঠিটা পায়নি!আরেকটা চিঠি লেখলাম।সেখানে বললাম”তুমি কি আগের চিঠিটা পাওনাই।নাকি আমি গ্রামের গরীব ছেলে বলে উত্তর দাওনা।সমস্যা নাই,না ভালোবাসলে বইলা দিতে পারো।আমি আর চিঠি দিমু না।আচ্ছা আমিও ছেলে তুমিও ছেলে এইডা নিয়া ভাবতাছো না তো?সমস্যা নাই,আমরা খালি প্রেমই তো করুম,তাইনা?
জবাব দিও।”
চিঠিটা দিয়ে ক্লাসে যেতেই ফয়সাল মজা করা শুরু করলো আমায় আর স্বপ্না কে নিয়ে।।মাথা গরম থাকায় রেগে ওরে দু ঘা লাগাই।ও বললো”তোরে আমি দেইখা নিমু।এমন মজা দেহামু,খালি দেহিস”
“আরে যাহ যাহ,আমাগো বাড়ির রাস্তা দিয়া আইতে দেহি খালি তোরে,পা কাইটা দিমু” আমিও উত্তর দিলাম।
.
চিঠি জমা দেওয়ার পরদিনই ওর উত্তর পেলাম।তারমানে এটা আগের চিঠির উত্তর ই ছিলো।ভয় হচ্ছিলো ও কি উত্তর দেবে!
চিঠিটা নিয়ে বিলে চলে যাই।দুপুরে এ সময়ে কেউ আসেনা।আস্তে আস্তে চিঠিটা খুলেই দেখি বেশ বিড় সড় একটা জবাব,আমার চেয়ে বড় আর পরিপাটি থাকায় বেশ সুন্দর করে উত্তর দিয়েছিলো।
“স্বপ্ন,
তোমায় আমি স্বপ্নের মতই ভাবি।জানো আমি স্বপ্ন দেখতেই ভুলে গিয়েছিলাম প্রায়।তুমি এসে আমায় আবার স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছো।
আমি তোমার চিঠিতে প্রান পাই জানো??সারা সপ্তাহ জুড়ে এই চিঠিটার অপেক্ষাই করি।
তবুও আমি ভালো নাই।তোমায় ভালোবাসি কিনা তা বলার আগে আমার সম্পর্কে কিছু শুনে নাও।যেহেতু আমায় ভালোবাসো বলেছো,আমার সম্পর্কে জানা দরকার।
জানো স্বপ্ন,আমি একা বড় হয়েছি।সেই ছোট থেকে কেউ মিশতো না আমার সাথে।সবাই হাসতো,কারন আমার কথা বলার ধরন নাকি মেয়েদের মত।আমি নাকি হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলি!অথচ আমি ইচ্ছা করে এভাবে বলতাম না।হাফলেডিস বলে ক্ষেপাতো সবাই।তাই মিশতাম না ওদের সাথে।জানো স্বপ্ন,আমার একটা লজ্জ্যার কথা আছে।কাওকে বলিনি কখনো।আজ বলছি,রমিজা ফুফুর স্বামী মাঝে মধ্যেই বাসায় আসে।তারপর একটা নোংরা খেলা খেলে।উনি আমায় রমিজা ফুফুর মত করে ব্যাবহার করে।
ছোট বেলায় আমার খুব কৌতুহল লাগতো।কিন্তু এখন আর ভাল্লাগে না।আমি নিষেধ করলেই উনি বলেন আমার এসব নাকি সবাইকে বলে দেবে।তাই কাওকে বলতেও পারছিনা।কি করবো বলোনা? আমিও তোমায় ভালো বাসি স্বপ্ন”
.
চিঠিটা পড়ে আমার ভীষন আনন্দ লাগছিলো সেদিন,গায়ের গেঞ্জিটা খুলে হাতে তুলে উপরে ঘুরিয়ে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ করেই চলে যাই পুকুরে।দু-তিনটা ডুব দিয়ে বাসায় ফিরি।বিকেল হওয়ায় মা কিছুক্ষন বকা দিয়ে ভাত দেয়।তৃপ্তি সহকারে গিলে খেলতে চলে যাই।
মাঠে ফয়সাল কে দেখে আবার মেজাজ টা বিগড়ে যায়।এই সময়ে ঝামেলা করার কোনো মানেই হয়না,চলে আসি তারাতারি।। মন টা ভীষন উড়ুউড়ু করছিলো।
বাড়ি ফিরেতেই দেখি বকুল তলায় কতগুলো ফুল পড়ে আছে।কুড়িয়ে নেই পলাশের জন্য।ওকে এবার একটা মালা বানিয়ে খামে পাঠিয়ে দেব এই ভেবে।

.
রাতে লন্ঠন জ্বালিয়ে পড়া শেষ করেই পলাশের চিঠিটা আরেকবার পড়লাম।এবার নজর গেলো সেই রমিজা ফুফুর স্বামীর ব্যাপারটা।উনি কি পলাশ কে….!! আমাদের গ্রামের রুবেল ব্যাপারিও তো গ্রামের ছোটছেলেদের নিয়ে এসব করে,তারপর ধরা খেয়ে কতগুলো টাকা জরিমানা দিতে হয়েছিলো উনার।ক্লাসের সবাই এসব নিয়ে কতই না মাতামাতি করেছে সেবার।।আমি লন্ঠনের আলো খানিকটা বাড়িয়ে চিঠি লেখা শুরু করি
“প্রিয় পলাশ
জীবনের সবচে আনন্দের দিন আজকে।আমি খুব ভালো আছি আজ, খুব!আজ থেকে তুমি আমার লাভার।উম্মাহ আমার সোনাপাখি রে,ভালোবেসে পাগল করিলি রে।

জানো পলাশ, গ্রামের রুবেল ব্যাপারী ধরা খাওয়ার পর অনেক টাকা জরিমানা করছে গ্রাম বাসী।তুমি তোমার ফুফারে বলো তুমি সবারে এসব বইলা দিবা।তাইলে হয়ত তিনি থামবো।আর না হইকে আমি মেট্রিক দিয়া ঢাকা আসমু।আমার হাতে যেই শক্তি,ঘুষি দিয়া নাক ফাটায়া ফেলমু।
পলাশ তোমারে আমার খুব দেখতে ইচ্ছা করে।কিন্তু তা সম্ভব না।মা যাইতে দিবো না।আর আমি শহরেরে কিছু চিনিনা।
জানো ফয়সাল নামের একটা বদমাইশের সাথে আমার মারামারির মত হইছে।স্বপ্না রে নিয়ে আমায় খুব ক্ষ্যাপায়।তুমি হয়ত হাসছো তাই না.?
হাসো তুমি।তোমার হাসিই খুব ভালোবাসি ময়না পাখি।
আর এই ফুলের মালাটা শুধু তোমার জন্য জানপাখি”
.
তিন চারদিন পরেই আবার চিঠি আসে।স্কুলে যাওয়ার পথেই পিওনের কাছ থেকে চিঠি খানা নিয়ে সোজা স্কুলে চলে যাই।তারাতাড়ি খামটি খুলে দেখি দুটো কাগজে চিঠি।পড়ার সময় পেলাম না,স্যার ক্লাসে ঢুকে গেছেন।দৌড়ে চলে যাই।
দ্বিতীয় ঘন্টায় শুনি হেডমাস্টার স্যার আমায় ডেকেছেন।বৃত্তি পেলাম নাকি!তারাতারি চলে গেলাম স্যারের কাছে।সালাম দিয়ে ঢুকতেই দেখি স্বপ্না একপাশে দাড়িয়ে কাঁদছে।খানেকটা ভয় পেয়ে যাই।
কিছু বুঝার আগেই স্যার আমায় মোটা বেত দিয়ে উড়াধুরা বাড়ি দিতে শুরু করেছিলেন।আমি কোনোভাবেই তাকে থামাতে পারিনি।দেখি তিনি একটা কাগজ ছিড়ে ঝুড়িতে ফেলে দেন।
তারপর আব্বা আর মাকে খবর দেন।আমার অপরাধ কি জানতে চাইলে জানতে পারি আমি নাকি স্বপ্নাকে কু-প্রস্তাব দিয়েছি,আরো কত কি!আমি তেড়ে স্বপ্নার দিকে গেলেই আব্বা আমার কলার ধরে রাখে।
সেবার খুব ঝামেলা হয়েছিলো।আমায় ইচ্ছে মত সবাই ধোলাই করে।আব্বা কথা বলেনি অনেক দিন।
.
সবাই চলে গেলে আমি স্যারের সেই ছেড়া টুকরো গুলো কুড়িয়ে নেই।তারপর বাসায় ফিরি অনেক সন্ধ্যায়।মা ও কথা বলেনি রাগ করে।আমার দম বন্ধ লাগছিলো খুব।
হাতে,উরুতে,পিঠে বেতের দাগ বসে গেছিলো।আমি কাগজ গুলো মিলাতে চেস্টা করেই দেখি,সেখানে একটা বড় করে লেখা “আই লাভ ইউ স্বপ্না”আর পাশে কিছু নোংরা কথা লেখা।এগুলো আমার লেখা ছিলোনা।কে করলো এমন টা!
তারাতারি করে ব্যাগ থেকে পলাশের চিঠিটা বের করি।দুটো কাগজ ছিলো;এখন একটা কাগজ আছে মাত্র।
তার মানে পলাশের দেওয়া চিঠি টা ছিলো এটা।কেউ হাতে পেয়ে হয়ত স্বপ্ন কে স্বপ্না বানিয়েছে।সেবার পলাশ লেখেছিলো” তুমি কি আগের বারের চিঠি টা পাওনি??বললাম তো ভালোবাসি”
.
পরের দিন আবার হেড মাস্টার স্যারের অফিসে যেয়ে
স্যার কে সব বুঝিয়ে বলি।লেখাও আমার না।আমার বুঝতে বাকি রইলোনা এটা ফয়সালের কাজ।কিন্তু ফয়সাল ও বুঝতে পারেনি স্বপ্না হেড মাস্টার কে বিচার দেবে।সেদিন ছুটির পর ফয়সাল নিজ থেকেই ক্ষমা চায়।তারপর আমাদের বন্ধুত্ব বেশ ভালো হয়।
তারপরের কাহিনীগুলো ছিলো স্বপ্নের মত।খুব দ্রুত কেটে যাচ্ছিলো।
চিঠি আদান প্রদান বেড়ে যায়।কেটে যায় অনেক গুলো দিন।পলাশ জানায় ও ওর ফুফাকে ভয় দেখিয়েছে।তিনি এখন আর ওর সাথে অসভ্যতা করেনা।তবে কেমন করে যেন তাকায়।হিংস্র চিতাবাঘ এর মত!
.
সেবার শীত কালের ঘটনা।তখন আমি ক্লাস টেনে।চুটিয়ে প্রেম চলছিলো আমার আর পলাশের।পলাশ কে চিঠি দিয়েছিলাম দিন তেরো চৌদ্দ আগে।ওর চিঠির কোনো উত্তর পাইনি।সন্ধ্যায় চাদর গায়ে দিয়ে পিওনের কাছে গেলাম।তিনি জানালেন এখনো কোনো চিঠি আসেনি।সেখানে বসেই আমি আবার চিঠি দিলাম।
চিঠির পর চিঠি দিলাম পলাশের আর কোনো খোঁজ নাই।বুক টা চৌচিড় হয়ে যাচ্ছিলো।ভয়,উত্তেজনা­ কাজ করতো!আচ্ছা ছেলেটা ভালো আছে তো??ওর অসুখ না তো!কোনো খোজ ই পাইনি ওর আর।
আমার প্রতীক্ষা বাড়তে থাকে দিনকে দিন।নাহ!আমার পলাশের আর কোন খবর নাই।সজল কে প্রেম করতে দেখলে বুকটা মুচড়ে উঠতো।
প্রতি সপ্তাহে পিওন মামার কাছে যেয়ে বসে থাকতাম।মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে আবার চিঠি দিতাম।কোনো উত্তর আসতো না।
.
পলাশ চলে যায় বুকে বড় দাগ দিয়ে।আর কখনো যোগাযোগ হয়নি ওর সাথে।মেট্রিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে আব্বা আমায় দামী বুট কিনে দেয়।ওগুলো পরে বন্ধু সজলকে নিয়ে একবার ঢাকা আসি।ওর ঠিকানায় ওকে খুঁজলেও সন্ধান পাইনি আর।ওকে নাকি ওর বাবা নিয়ে গেছে অন্য কোথাও।সেবার খুব রাগ করেছিলাম,শপথ করি আর প্রেম করবো না।করিও নাই।একদম রুম্পাকে বিয়ে করি।
.
এখনো মনে আছে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তির আগের দিন চাদর মুড়ি দিয়ে এক সন্ধ্যায় বেড়িয়ে যাই।সেদিন আমার খুব অস্বস্তি লাগছিলো।মনে হচ্ছিলো যে আমি দম নিতে পারবো না।
গাছতলায় বসে কাঁদি কিছুক্ষন।নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি “আচ্ছা ওকে কেন ভালো বাসতে গেলাম??ও তো একটা পুরুষ.মা ঠিকই বলে, শহুরে ছেলে গুলো বড্ড ধোকাবাজ।আমি গ্রামের গরিব ছেলে তাই হয়ত ভালোবাসেনি।”
সাথে একটা পলিথিন ছিলো।ওর দেওয়া সব কিছু এতে জমানো ছিলো।আমায় আঁকা ছবিটা,ওর লাল গেঞ্জি পরে একটা ছবি আর শুকনা একটা গোলাপ রেখে বাকি সব বিলের মধ্যে ছুড়ে মারি।চোখ থেকে পানি ঝড়ছিলো খুব।কচুরিপানার মধ্যে তলিয়ে যেতে থাকে এতদিনের জমানো আবেগ আর আমার ভেতর থেকে নিষ্কাষিত হতে থাকে করুন প্রেমিকের আর্তনাদ।আমি হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জোড়ে একটা চিৎকার দেই।নাহ!কোনো শব্দ হয়নি সেদিন।

লেখকঃ দিহান হাওলাদার

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.