পরিচয়

(১)
কলিং বেলের শব্দ হতেই ইমু ছুটে গেল দরজার দিকে।
দরজা খুলতেই সে তার বাবা শফিক হোসেনকে দেখতে পেলো।
শফিক হোসেন ইমুর হাতে দুটো ক্যাডবেরি চকলেট দিতেই সে চুপচাপ চলে গেল।
শফিক হোসেন তার একমাত্র ছেলেকে খুব ভালোবাসে।
তবে ছোট বেলা থেকেই ইমু তাকে এড়িয়ে চলে।
শফিক হোসেনের ধারণা হয়তো ভয় থেকেই এমনটা হয়েছে।
ছেলেরা সচারাচর বাবাকে ভয় পায়,আর মা হয় তাদের বন্ধুর মতো।
মিনারা বেগম রান্না ঘরে রাতের জন্য রান্না করছে।
এই বাড়ির অদ্ভুত নিয়ম হলো,কেউ কারো সাথেই তেমন কথা বলে না।
শুধু রাত হলেই শফিক হোসেন বাসার কাজের ছেলে আসাদের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠে।
এই ব্যপারটা মিনারা বেগমের একদম পছন্দ নয়।
তবে এখন আর সে এই ব্যাপার গুলো আমলে নেয় না।
রাতের খাবার শেষে মিনারা বেগম বিছানার উপর বসে শরৎচন্দ্রের গল্পের বই পড়ছে।
পাশেই ইমু ঘুমিয়ে আছে।
রাতে মিনারা বেগমের খুব সহজে ঘুম হয়না।
আর ঘুম হলোও, ঘুমের মধ্যে সে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে।
কোন স্বপ্নে দেখে, তার বাসার কাজের ছেলে আসাদ হলুদ শাড়ী পড়ে ঘোমটা দিয়ে বসে আছে আর সে তার হাতে পায়ে হলুদ মেখে দিচ্ছে।
আবার কোন কোন স্বপ্নে দেখে, মিনারা বেগম তার পড়নের লাল বিয়ের শাড়ীটা খুলে আসাদকে পড়িয়ে দিচ্ছে আর সে নিজে বসনহীন হয়ে যাচ্ছে।
শারীরিক কথা চিন্তা করে আগে মিনারা বেগম ঘুমের ঔষধ খেতো, এখন আর খাচ্ছে না, কারন ঔষধেও ঘুম হয়না।
শফিক হোসেন আলাদা কক্ষে ঘুমায়।
মিনারা বেগম আর শফিক হোসেন এক ছাদের নিচে থাকলেও, তাদের ভেতর ব্যবধান অনেক।
হঠাৎ পাশের ঘরের দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেল মিনারা বেগম। সে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিলো।
.
সকাল হতেই শফিক হোসেন অফিসে বের হয়ে গেলো।
শফিক হোসেন সকালে নাস্তা বাইরে করে।
শফিক হোসেন আগে বাসে করে অফিসে যেতো, এখন নিজে গাড়ি কিনেছে।
তাই গাড়িতে করেই যাওয়া হয়।
রোজ ইমুও তার সাথে গাড়িতে করে স্কুলে যায়, তবে ইমুর স্কুল বন্ধ থাকায় কয়েকদিন থেকে তাকে একাই যেতে হচ্ছে।
.
মিনারা বেগম ঘুম থেকে উঠেছে অনেক সময় হয়েছে।
আজ তার ছোট ফুপুর আসার কথা।
মিনারা বেগমের বিয়ের পর তার ছোট ফুপু রহিমা বিবি ছাড়া আর তেমন কেউ এবাড়িতে আসেনা।
রহিমা বিবির তিন ছেলেই ঢাকাতে থাকে, তাই বাধ্য হয়ে তাকে ঢাকাতেই থাকতে হয়।মাঝে মাঝে সময় কাটানোর জন্য মিনারা বেগমের কাছে চলে আসে।
হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠলো!
মিনারা বেগম দরজা খুলতেই রহিমা বিবি মুখ ভর্তি পান নিয়ে হেসে বলল, কেমন আছিস মিনা?
মিনারা বেগমকে রহিমা বিবি সেই ছোট বেলা থেকে আদর করে মিনা বলে ডাকতো।
মিনারা বেগম বলল,ভালো,তুমি কেমন আছো?
রহিমা বিবি বাসায় ঢুকে বোরখা খুলতে খুলতে বলল, আর ভালো, তোকে বলবো সব। আগে একটু জিরিয়ে নেই।
রহিমা বিবি চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসে বলল, হ্যারে মিনা তোর জামাই বের হয়ে গেছে?
-হ্যা বের হয়ে গেছে।
-তা তোর পোলা কই?
-আছে হয়তো কোথাও।
-আচ্ছা তোর জামাই এখনো কি আলাদা ঘুমায়?
-হ্যাঁ ফুপু, তার পাশে কেউ ঘুমালে তার ঘুম হয়না তাই!
-শোন এসব হলো পুরুষ ব্যাটাগো অজুহাত, দেখ হয়তো কোন মেয়ে সঙ্গে চক্কর আছে।
-ছি ছি কি বলো এসব তুমি? ইমু চলে আসলে শুনতে পাবে।
রহিমা বিবি ফিসফিস করে বলল, তুই খুলে বলতো, তোর জামাইয়ের সাথে কি তোর কোন ঝামেলা চলে?
– বাদ দাও ওসব কথা, আমি তোমার জন্য নাস্তা নিয়ে আসছি।
কিছু সময় পর মিনারা বেগম রাস্তা নিয়ে আসলো।
রহিমা বিবি বিস্কুট চায়ে ভিজিয়ে খাচ্ছে আর বলছে, শোন মিনা ডাক্তারের কাছে যেমন রোগীর কোন কিছু লুকাতে নেই, তেমনি মুরব্বিদের কাছে পারিবারিক কথা লুকাতে নেই।
মিনারা বেগম চুপ করে রইলো।
রহিমা বিবি বলল, চুপ করে থাকলে সমাধান হইবে? আমি তো সেই অনেক দিন থেকেই দেখছি তোর রুম আর তোর জামাইয়ের রুম আলাদা। শোন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন ফাঁকা থাকলে ঐ ফাঁকা জায়গায় শয়তানে বাসা বাঁধে।
মিনারা বেগম বলল, থাকুক না যে যার মতো, আর আমি তো সুখেই আছি।
রহিমা বিবি বলল, চুপ কর তুই, আমি সব বুঝি। শোন মিনা পুরুষ মানুষকে বস করার একটা উপায় আছে।যদি কাজটা সফল হয়, তাহলে তোর জামাই তোর আঁচল ধইরা থাকবে।
মিনারা বেগম বলল, কি উপায় ফুপু?
-ইয়াকুব আলীর মাজারে একজন মওলানা আছে। তার তাবিজের অনেক গুন।
– কেমন গুন? কোন প্রমাণ আছে?
-আরে শোন আমার বড় ছেলের বউটা বড়ই বজ্জাত মেয়ে, স্বামীর কথা শুনতো না! আর আমি ছিলাম তার দুই চোখখের বিষ। মওলানা সাহেবের তাবিজ এনে দিলাম, এখন সব ঠিক।
-ও
-তুই চাইলে তোর জন্যও একটা তাবিজ আনতে পারি।
-আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি বসো আমি দুপুরের রান্না করতে যাচ্ছি।

(২)
মিনারা বেগম রান্না করছে আর ভাবছে, সত্যি যদি রূপকথার গল্পের মতো সোনার কাঠি আর রূপোর কাঠি এসে সব কিছু ঠিক করে দিতো!
.
দুপুরে খাওয়াদাওয়া শেষ সবার।
রহিমা বিবি মুখে পান নিয়ে বুকের আঁচল ফেলে বিছানার উপরে পা ছড়িয়ে বসে আছে।
আজ প্রচুর গরম পড়েছে, ফ্যান চলছে কিন্তু গরম কমছে না।
মিনারা বেগম বলল, ফুপু বুকের আঁচল ঠিক করো, আমার ছেলে চলে আসতে পারে।
রহিমা বিবি আচঁল ঠিক করতে করতে বলল, ও পোলাপান মানুষ এসব বুঝবে না।তা হ্যাঁরে মিনা তুই তো আমাদের বাসায় গেলেওতো পারিস। সারাদিন তো বাসায়ই থাকিস।
-একাজ ওকাজ করতে করতে আর সময় পাইনা।
-আচ্ছা সময় করে একদিন যাস, আমি আজ তাহলে উঠবো।
-আচ্ছা দাড়াও আমি আমাদের বাসার কাজের ছেলেটাকে ডাক দেই, ও তোমাকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আসবে।
মিনারা বেগম ইমুকে ডাকতে লাগলো, ইমু, ইমু!
ইমু এসে বলল, আমাকে ডাকছিলে মা?
-হ্যাঁ তুই একটু আসাদকে ডেকে নিয়ে আয় তো।
ইমু ছুটে আসাদকে ডাকতে গেল।
কিছু সময় পর আসাদ দরজার পাশে এসে দাড়িয়ে মাথা নিচু করে বলল, আফা ডাকছেন?
মিনারা বেগম বলল, হ্যাঁ, তুই একটু আমার ফুপুকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আয় তো।
-যে আচ্ছা, অহনি যাইতাছি।
রহিমা বিবি বোরখা পড়তে পড়তে বলল, শোন মিনা তোকে কোন চিন্তা করতে হবে না, আমি তাহলে যাচ্ছি। পরের বার যখন আসবো তখন আমি মওলানা সাহেবের তদবির নিয়ে আসবো।
মিনারা বেগম বলল, তুমি সাবধানে থেকো।
.
.
সন্ধ্যা নামতে এখনো অনেক সময় বাকি।
মিনারা বেগম সিড়ি বেয়ে ছাঁদে উঠছে।
কিছু দূর ওঠার পরই ইমুর খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পেলো সে।
ছাঁদে উঠে সে দেখতে পেলো ইমু আসাদের সাথে খেলছে।
মিনারা বেগম ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই ইমু আর আসাদ চুপ হয়ে গেলো।
মিনারা বেগম ইমুকে বলল, ইমু তুই একটু নিচে যা তো।
ইমু আস্তে করে হেটে নিচে নেমে গেলো।
আসাদ চুপ করে দাড়িয়ে আছে।
মিনারা বেগম আসাদকে বলল, তোকে না কতো দিন ইমুর কাছে আসতে নিষেধ করেছি?
-আফা ও বাচ্চা মানুষ, ও কাছে আসলে কি কইরা ওরে সরাইয়া দেই কন তো!
মিনারা বেগম বিরক্ত হয়ে বলল, যাহ আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা।
আসাদ চলে যাবে এমন সময় মিনারা বলল, আচ্ছা শোন, তুই রোজ রাতে তোর ভাইজানের ঘরে চাস কি?
আসাদ চুপ করে রইলো।
মিনারা বেগম বলল, কি হলো উত্তর দে।
আসাদ বলল, আপনারা হইলেন আমার মালিক। আপনারা যা কইবেন আমার তো তাই হুনতে হইবো।
মিনারা বেগম ছাঁদের ওয়াল ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।
এই মূহুর্তে সে আসাদের সাথে তার পরিচয়টা গুলিয়ে ফেলছে। নিজেকে বড্ড একা মনে হচ্ছে তার।

.
শফিক হোসেন বাসায় ফিরেছে অনেক সময় হয়েছে।
তার প্রচুর মাথা ব্যাথা করছে,তাই বিছানায় শুয়ে আছে।
আসাদ শফিক হোসেনের মাথায় কাছে দাড়িয়ে মাথা টিপে দিচ্ছে।
কিছু সময় পর ইমু পাশে এসে দাঁড়াল।
শফিক হোসেন ইমুকে বলল, কিছু বলবি বাবা?
-তোমার কি বেশি খারাপ লাগছে বাবা?

-না আমি ঠিক আছি,শুধু মাথাটা ব্যাথা করছে।
শফিক হোসেন ইশারায় আসাদকে চলে যেতে বলল।
শফিক হোসেন বিছানার উপর পা ঝুলিয়ে বসে, ইমুকে তার পাশে বসাল।
ইমু তার বাবাকে পাশ থেকে জড়িয়ে বসে আছে।
কিছু সময় পর মিনারা বেগম এসে ইমুকে বলল, ইমু এবার চলে এসো, ঘুমানোর সময় হয়েছে।
ইমু চৌকি থেকে নেমে ছুটে গিয়ে তার মায়ের হাত ধরলো।
হঠাৎ শফিক হোসেনের বুকের পূর্ণ স্থানটা শূন্য মনে হলো।
.
মিনারা বেগম ইমুকে শুইয়ে দিলো।
লাইব্রেরী থেকে যে গল্পের বই গুলো আনা হয়েছিল তা সব পড়া শেষ তার।
মিনারা বেগম ভাবছে কাল বিকেলে বই গুলো ফেরত দিয়ে আসতে হবে,আর নতুন বই আনতে হবে।
সে আজকের রাতটা পার করার উপায় খুঁজে পাচ্ছে না।
দীর্ঘ দিন রাতে বই পড়তে পড়তে নির্ঘুম রাতটা আজ কাটছে না।
মিনারা বেগম বিছানার উপর বসে বারবার পড়া গল্পের বই গুলোর পৃষ্ঠা গুলো উল্টাচ্ছে।
বিছানার পাশেই টেবিল লাইট জ্বলে আছে। দেয়াল ঘড়িটা টিকটিক শব্দ করছে।
মিনারা বেগমের মাথায় যন্ত্রণা শুরু হলো।
সে লক্ষ্য করছে রাত যতই গভীর হচ্ছে, ঘড়ির আওয়াজ আরো তীব্র হচ্ছে।
কিছু সময় পর মিনারা বেগম বিছানা থেকে উঠে, ঘড়িটা দেয়াল থেকে নামিয়ে ঘড়িটার ব্যাটারি খুলে দিতেই সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মিনারা বেগম জানালার পাশে চেয়ার পেতে বসে আছে।
রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টে হলুদ বাতি জ্বলছে।
মিনারা বেগম দূর থেকে অনেক সময় থেকে লক্ষ্য করছে হলুদ বাতিটার চারপাশে কিছু পোকা উড়ছে। কিছু ছোট বড় পোকা।
দূর থেকে আযানের শব্দ ভেসে আসছে। দু’একটা পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে।
দেখতে দেখতে হলুদ ল্যাম্পপোস্টের আলো ক্রমশ আবছা হয়ে যেতে লাগলো।
প্রকৃতি তার বুক থেকে রাতকে বিদায় দিচ্ছে।
কি নিষ্ঠুর এই নিয়ম, রাত আর দিন প্রকৃতির মাঝে থাকলেও কারো সাথে কারো কোন মিল নেই।

(৩)
সকালের কাজ শেষ করে বিকেল হতেই মিনারা বেগম কিছু গল্পের বই হাতে লাইব্রেরীর দিকে যাচ্ছে।
মিনারা বেগম বই হাতে লাইব্রেরীতে হেটে যেতেই পছন্দ করে। এই ব্যাপারটা তাকে পুরনো কথা গুলো মনে করিয়ে দেয়। সেই কলেজ , বই হাতে কলেজে যাওয়া।
এই কথা গুলো ভাবতে ভাবতে হাটতে তার ভালো লাগে।
সে কিছু পথ হাটার পর লাইব্রেরীতে প্রবেশ কতেই যেন চারিদিকের সব কোলাহল বন্ধ হয়ে গেলো।
মিনারা বেগম লাইব্রেরীতে ঘুরে কিছু বই সংগ্রহ করে রিসিপশনে বই গুলো এন্ট্রি করতে নিয়ে গেল।
রিসিপশনের মহিলা মিনারা বেগমকে দেখেই হেসে বলে উঠলো, কেমন আছেন আপা?
-জ্বি ভালো, আপনি?
-আমিও ভালো আছি। তা আপনাকে আর আগের মতো দেখছিনা যে?
-সংসারের কাজ শেষে সময় পাইনা ভাই।
-সংসার সামলে আপনি এভাবে বই পড়েন দেখলে খুব ভালো লাগে।
-ধন্যবাদ। আজ তাহলে আসছি।
-আচ্ছা আবার দেখা হবে।
মিনারা বেগম বই হাতে আবার বাসার উদ্দেশ্যে হাটতে লাগলো।
.
কিছু দূর হাঁটার পর সে থমকে দাড়াল!
মিনারা বেগম পিছনে ফিরে চমকে উঠে বলল, আলী ভাই আপনি এখানে?
আলী মিয়া বলল, অনেক আগে তোমাকে এই লাইব্রেরীতে দেখেছিলাম। তারপর থেকে রোজ এখানে আসি, ভাবি যদি কখন দেখা হয়।
মিনারা বেগম চুপ করে রইলো।
আলী মিয়া বলল, তুমি একটুও বদলাওনি মিনারা,সেই আগের মতোই আছো।
মিনারা বেগম বলল, কই আমি তো অনেকটাই বদলে গেছি।আমার নাম বদলেছে, পরিচয় বদলেছে।
আলী মিয়া বলল, তোমার সাথে এক কাপ চা খাওয়া যাবে?
মিনারা বেগম সম্মতি জানালো।
.
মিনারা বেগম আর আলী মিয়া চায়ের দোকানের টেবিলে বসে আছে।
কাচের কাপের চিনি ঘোটার টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে।
মিনারা বেগম বারবার পুরনো স্মৃতির সাথে বর্তমান সময়টা গুলিয়ে ফেলছে।
.
আলী মিয়া চায়ের দোকানে বসে একটা কাগজে কি সব যেন লিখছে।
মিনারা একটা ব্যাগ কাদে আলী মিয়ার সামনে দাড়াতেই আলী মিয়া বলল, আরে বসো তোমাকে একটা হিসাব দেখাব।
মিনারা বেগম কাদের ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে চেয়ারে বসলো।
আলী মিয়া বলল, তোমাকে আজ এতো চুপচাপ লাগছে কেন?
-আলী ভাই আমি আপনাকে একটা কথা বলবো।
-সে পরে শুনবো, আগে এই হিসাবটা দেখো। আমাদের ভবিষ্যৎ সাংসারিক হিসাব।
মিনারা চুপ করে রইলো।
আলী মিয়া বলল, কি চুপ করে আছো কেন?
-আলী ভাই আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। সামনের সপ্তাহে আমার বিয়ে।
আলী মিয়া তার হাতের হিসাবের কাগজটা ছিড়ে টুকরো করে পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো।
আলী মিয়া মিনারাকে বলল, কোন সমস্যা নেই, আসো তাহলে আমারা দুজন মিলে তোমার নতুন সাংসারিক খরচ হিসাব করি।
আলী মিয়া একটা নতুন পৃষ্ঠা বের করে কলম দিয়ে লিখতে যাবে এমন সময় মিনারা আলী মিয়ার হাতের উপরে হাত রাখলো।
আলী মিয়া মিনারার চোখের দিকে চেয়ে দেখলো, চোখ তার ছলছল করছে।
মিনারা বলল, আমাকে মাফ করবেন আলী ভাই। এই বিয়েটা না করলে আমার আর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া হবে না।
মিনারা বেগম টেবিল থেকে উঠে চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।
আলী মিয়া টেবিলের উপরই চুপ করে বসে রইল।
.
চা দিয়েছে অনেক সময় হয়েছে।
আলী মিয়া মিনারা বেগমের হাতের উপর হাত রাখতেই সে চমকে উঠে হাতটা সরিয়ে নিলো।
আলী মিয়া বলল, কি ভাবছো?
-কিছু না আলী ভাই।
-তোমার চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
-ও হ্যাঁ।
আলী মিয়া চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল, মিনারা আমার চাকরি হয়েছে তা তো শুনেছ। চাকরি পাওয়ার সাথে সাথে তোমার শ্বশুর বাড়ির ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে ছিলাম।
মিনারা বেগম কোন উত্তর দিলো না।
মিনারা বেগম আলী মিয়ার চিঠি পেয়েছিল ঠিকই, তবে চিঠির উত্তর পাঠায়নি।
আলী মিয়া হতাশ ভঙ্গিতে বলল,চাকরিটা যদি তোমার বিয়ের আগে পেতাম!
মিনারা বেগম বলল, আমার এখন উঠতে হবে। বাসায় ছেলেকে রেখে এসেছি।
আলী মিয়া চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে আবাক দৃষ্টিতে মিনারা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার ছেলে! নাম কি?
মিনারা বেগম একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, ওর নাম ইমু, আজ তাহলে চলি।
ইমু নামটা শুনে আলী মিয়া আচমকা বসে পড়লো আর কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
.
মিনারা আর আলী মিয়া সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে আছে।
আলী মিয়া পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে মিনারার হাতে দিলো।
মিনারা চিরকুটের ভাজ খুলতেই দেখতে পেলো তাতে লেখা আছে “ইমু”
মিনারা বলল, এটা কি আলী ভাই ?
আলী মিয়া বলল, তোমার আমার ছেলের নাম। আমি চাই আমাদের ছেলের নাম খুব ছোট্ট করে খুব আদুরে একটা নাম হবে। আচ্ছা মেয়ে হলে কি রাখা যায় বলো তো।
মিনারা চিরকুটটা হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, আলী ভাই আপনি একটা পাগল।সে হাসতে হাসতে ছুটে পালিয়ে গেল।
.
পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে,তারা প্রিয় মানুষটিকে সারাজীবন পাশে পাওয়ার সৌভাগ্য নিয়ে জন্মায় না। তবে তারা প্রিয় মানুষটির স্মৃতি বহন করে চলে, সারাজীবন চলে।
.
সন্ধ্যা হয়েছে অনেক সময় হলো।
মিনারা বেগম ইমুর পড়ার টেবিলে বসে ইমুকে পড়াচ্ছে।
সামনেই তার পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষা।

(৪)
কলিং বেল বেজে উঠলো।
আসাদ দরজা খুলে দিতেই শফিক হোসেন বলল, কিরে আসাদ ইমু কই?
আসাদ বলল, সে পড়তাছে।
শফিক হোসেন কয়েকটা প্যাকেট হাতে মিনারা বেগমের রুমের দরজার সামনে দাড়াতেই ইমু পড়া রেখে ছুটে আসলো তার বাবার কাছে।
শফিক হোসেন প্যাকেট গুলো ইমুর হাতে তুলে দিতেই ইমু খুব আনন্দের সাথে প্যাকেট গুলো খুলতে লাগলো।
প্রথম প্যাকেটটা খুলতেই একটা চকচকে কলম বক্স বেরিয়ে আসলো।
ইমু হাসি মুখে তার বাবার দিকে তাকাল।
শফিক হোসেনও দাড়িয়ে দাড়িয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে।
ইমু দ্বিতীয় প্যাকেটটা খুলতেই একটা নীল খেলনা গাড়ি বেরিয়ে এলো।
হঠাৎ ইমুর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।
মিনারা বেগম মুখ ফিরিয়ে বলল, নীল রং ইমুর পছন্দের নয়।
কোন এক বিশেষ কারনে নীল রং ইমুর পছন্দ না।
শফিক হোসেন ইমুকে বলল, আচ্ছা বাবা মন খারাপ করার কিছু নেই, আমি কাল পাল্টে এনে দেবো।
.
মাঝে অনেক দিন কেটে গেলো।
আজ সকালে রহিমা বিবি এসেছে।
সে এসেই মিনারা বেগমকে হাত ধরে টেনে আলাদা রুমে নিয়ে গেলো,আর রুমের দরজা বন্ধ করে দিলো।
মিনারা বেগম বলল,কি হয়েছে ফুপু?
-তোর জন্য মাওলানা সাহেবের কাছ থেকে তদবির এনেছি, কেউ দেখলে সমস্যা হবে। দেয়ালেরও কান আছে।
রহিমা বিবি তার ব্যাগ থেকে একটা পোটলা বের করে তার ভেতর থেকে একটা মাদুলি সহ তাবিজ বের করে মিনারা বেগমের হাতে দিলো।
মিনারা বেগম বলল, এটা কি করতে হবে?
রহিমা বিবি বলল, এটা যে কোন শনিবার তোর জামাইয়ের বিছানার নিচে রাখতে হবে, আবার তার সামনের শনিবার তাবিজটা বের করে যে কোন নদীতে ফেলে দিতে হবে। কিন্তু সাবধান মিনা তাবিজটা যখন নদীতে ফেলবি তখন কিন্তু নদীতে জোয়ার থাকতে হবে, ভাটি হলে কিন্তু ভয়ংকর কান্ড ঘটবে।এমনকি তোর জামাইয়ের সাথে তোর সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট হয়েও যেতে পারে।
মিনারা বেগম চুপচাপ সব শুনলো।
.
মিনারা বেগম এসব বিশ্বাস করেনা। তবুও সে সব নিয়ম ঠিকঠাক পালন করেছে।
শনিবার তাবিজ রেখে সামনের শনিবার নদীতে তাবিজ ফেলা হয়েছে। কিন্তু তাবিজ ফেলার সময় নদীতে জোয়ার ছিলো না ভাটি ছিল এই ব্যাপারে মিনারা বেগম নিশ্চিত না।
বড় নদীতে জোয়ার ভাটি বোঝা যায় না।
রহিমা বিবি বলেছিল একসপ্তাহের মধ্যেই সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু বেশ কিছু দিন হয়ে গেলো।
মিনারা বেগম আর শফিক হোসেনের সম্পর্ক সেই আগের মতোই আছে।
নদীতে ভাটি থাকলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার কথা ছিল, তাও হয়নি। আবার সম্পর্কের উন্নতিও হয়নি।
.
ইমুর পরীক্ষা শেষ,ফালাফলও প্রকাশ হয়েছে । বছর শেষে জানুয়ারির প্রথম দিকে আবার ষষ্ঠ শ্রেনীর ভর্তি শুরু হয়েছে।
নতুন ক্লাস ইমুর ভালো লাগে না।
বিকেলে ইমু একা ছাঁদে বসে আছে।
নতুন স্কুলে যাওয়ার পর থেকেই সে চুপচাপ।
মিনারা বেগম ইমুকে খুঁজতে খুঁজতে ছাঁদে উঠে ইমুকে দেখতে পেলো।
মিনারা বেগম ইমুর পাশে গিয়ে দাড়িয়ে বলল, কি ইমু তোর মন খারাপ।
ইমু তার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, মা আমার বাবা কি খুব খারাপ?
মিনারা বেগম ইমুকে জড়িয়ে ধরে ভয়ের সাথে বলল, তোকে কি কেউ কিছু বলেছে?
-বড়দের কাছে বাবার পরিচয় দিলে কেউ কেউ খুব বাজে কথা বলে, আমি সে গুলো শুনতে পাই।
-বাবারা কখনোই খারাপ হয়না ইমু।
ইমু তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, তাহলে তুমি কেন বাবার সাথে কথা বলো না?
মিনারা বেগম এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারলো না।
কিন্তু তার মনে পড়ে গেলো সেই রাতের কথা,যখন ইমু তার গর্ভে ছিলো।
.
মাঝ রাতে পানি পিপাসা পাওয়ায় ঘুম ভেঙে গেছে মিনারা বেগমের। বিছানার পাশে তাকিয়ে দেখলো তার স্বামী শফিক হোসেন বিছানায় নেই।
মিনারা বেগম পানি খেতে গিয়ে দেখলো জগে পানি নেই। তাই মিনারা বেগম গ্লাস হাতে আস্তে আস্তে হেটে হেটে রান্না ঘরের দিকে এগোচ্ছে।
কিছু দূর এগোতেই চাপা কন্ঠে শফিক হোসেনের কথা শুনতে পেলো সে।
মিনারা বেগম আরো একটু এগোতেই আধো-আলোতে শফিক হোসেন আর তার বাসার কাজের ছেলেটাকে দেখতে পেলো।
মিনারা বেগম তাদের দেখে আচমকা চমকে উঠল আর হাতের গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে গেলো।
শফিক হোসেন আর কাজের ছেলেটা হকচকিয়ে উঠলো।
কাজের ছেলেটা মেঝেতে খুলে রাখা তার প্যান্টটা পড়েই ছুটে পালিয়ে গেল।
.
মিনারা বেগমের সন্ধ্যা থেকে প্রচুর মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়েছে।
কলিং বেলটা বেজে উঠলো।
মিনারা বেগম দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললো।
শফিক হোসেন তার স্ত্রীকে দেখে অবাক হলো।
অনেক দিন পর সে আজ দরজা খুললো।
শফিক হোসেন দরজা পেরিয়ে হেটে যাবে ঠিক এমন সময় মিনারা বেগম বলল, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
শফিক হোসেন অবাক হয়ে বলল, কি কথা?
-একটা জিনিস চাইবো দেবে?
-তোমার কোন কিছুই আজ পর্যন্ত অপূর্ণ রাখিনি, এই দায়িত্বটাতে আমার কোন ভুল ছিলো না।
মিনারা বেগম মৃদু হেসে বলল, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
শফিক হোসেন চুপ করে রইলো।
মিনারা বেগম কাঁদোকাঁদো কন্ঠে বলল, তুমি আমাকে আর আমার ছেলেকে মুক্তি দাও তোমার পরিচয় থেকে। এই যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছিনা।

(৫)
মিনারা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লো।
শফিক হোসেন করুন ভাবে বলল, মিনারা আমি হয়তো আমার অনুভূতি গুলো কাউকে বোঝাতে পারবো না। তুমি চলে যেতে চাইলে আমি তোমাকে আটকাবো না, সে অধিকার আমার নেই। কিন্তু ইমুর সাথে আমার সম্পর্কটা নষ্ট করো না।
মিনারা বেগম বলল, তোমাদের সম্পর্ক নষ্ট করার ক্ষমতা আমার নেই।
শফিক হোসেন দীর্ঘশ্বাস নিঃস্বাস ফেলে বলল, তোমাদের থাকার জায়গা আমিই ব্যবস্থা করে দেবো, সেখানে আর তোমাদের আমার পরিচয় নিয়ে বাঁচতে হবে না।
মিনারা বেগম কাঁদতে লাগলো।
শফিক হোসেন তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমার মতো একটা ভালো মেয়ের মর্যাদা দিতে পারিনি।
অনেক দিন পর শফিক হোসেন মিনারা বেগমকে জড়িয়ে ধরলো।
চারিদিকের পরিবেশটা কেমন পাল্টে যাচ্ছে।
.
কিছুদিন পর মিনারা বেগম তার ছেলেকে নিয়ে তার স্বামীর গৃহ ত্যাগ করলো।
শফিক হোসেন তাদের থাকার জন্য যে জায়গার ব্যবস্থা করেছিল, মিনারা বেগম সেখানে যায়নি। নতুন ঠিকানার কথা শফিক হোসেনকে কিছুই বলেনি সে।
মিনারা বেগম চলে যাওয়ার পর শফিক হোসেন তাদের অনেক খোঁজ করেছে, কিন্তু কোন খবর বা তাদের কোন ঠিকানা পাওয়া যায়নি।
.
.
পাঁচ বছর পর!
মিনারা বেগম নিজেকে নতুন ভাবে গুছিয়ে নিয়েছে। সে এখনো ঐ দিনের কথা ভাবে, যেদিন তার ফুপুর দেওয়া তাবিজ নদীতে ফেলেছিল। তার মনে হয় ঐ দিন সত্যি নদীতে ভাটি ছিলো। আর ভাটির জলে পুরনো সব সম্পর্ক ভেসে গেছে।
ইমু অনেক বড় হয়ে গেছে, তার মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল বের হয়েছে কিছু দিন হলো। ভালো ফলাফলের জন্য সে সবার কাছে প্রশংসিত হয়েছে।
.


শীত আসতে এখনো এক মাস বাকি।
কিন্তু আজ সকালে চারপাশ কুয়াশায় ভরে গেছে। কখনো কখনো কুয়াশা মাখা সকাল শীত আসার আগমনী বর্তা দেয়।
মিনারা বেগম বাসার সামনে বসে আছে। কিছু সময় পর সে লক্ষ্য করলো কুয়াশার মধ্যে দূর থেকে কে যেন হেটে আসছে, ঠিক স্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে না। লোকটা আরো কাছে আসার পরেও সে স্পষ্ট ভাবে দেখতে পারছে না।
মিনারা বেগম উঠে দাড়াল, সে তার পাশে টেবিলের উপর রাখা চশমাটা চোখে দিয়ে একটু সামনে এগিয়ে গেল আর একটা ব্যাগ হাতে শফিক হোসেনকে স্পষ্ট ভাবে দেখতে পেলো।
শফিক হোসেন বলল, কেমন আছো মিনারা?
মিনারা বেগম কোন উত্তর না দিয়ে অবাক হয়ে শফিক হোসেনের দিকে তাকিয়ে আছে। গত পাঁচ বছরে কতো কিছু পাল্টে গিয়েছে। শফিক হোসেনের মেঘ কালো চুল গুলোর মাঝেও সাদা আভা দেখা দিয়েছে।
শফিক হোসেন বলল, চশমা নিয়েছো কবে থেকে?
মিনারা বেগম একটু লজ্জা পেয়ে বলল, আজকাল চশমা ছাড়া কোন কিছু স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাই না।
-চশমা পড়ার পর কিন্তু তোমাকে বুড়ি বুড়ি লাগছে।
-তোমারও তো চুল পেকে গেছে, বুড়ো তো আমরা হচ্ছি।
-এখনো কি রাত জেগে থাকো?
মিনারা বেগম কোন উত্তর দিলো না।
শফিক হোসেন বলল,ইমু কোথায়?
-ও ঘুমাচ্ছে, এখনো ওঠেনি।
-কোথায়?
মিনারা বেগম বলল, এসো আমার সাথে।
মিনারা বেগম ইমুর ঘরের দরজার সামনে গিয়ে থমকে দাড়াল।
শফিক হোসেন আস্তে আস্তে ইমুর ঘরে প্রবেশ করলো। সে ইমুর চৌকির পাশে বসে ইমুর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। আর ভাবতে লাগলো ছেলেটা কতো বড় হয়ে গেছে।
ইমুর ঘুম ভেঙে গেছে।
ইমু তার বাবার হাত সরিয়ে দিলো।
মিনারা বেগম ইমুকে বলল, তোর বাবা, তোকে দেখতে এসেছে।
ইমু বিরক্ত হয়ে বলল, কিসের বাবা? ইনি এখানে এসেছে কেন?
শফিক হোসেন অবাক হয়ে তার ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো।
মিনারা বেগম রেগে বলে উঠলো, বাবার সাথে কেউ এভাবে কথা বলে।
ইমু বলল, শুধু তার পরিচয়ের জন্য মানুষ আমাদের আড় চোখে দেখে। সবাই আমাকে তুচ্ছ করে বলে,আমার বাবা একজন সমকামী। এটা কোন পরিচয়?
মিনারা বেগম ইমুর কাছে এসে ইমুকে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল, আমার চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যা তুই।
ইমু কাঁদতে কাঁদতে বলল, সমাজে একজন চরিত্রহীন লোকও বাঁচতে পারে, কিন্তু আমি কেন পরিচয়হীন বাঁচতে পারছিনা মা।
শফিক হোসেন ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো। সে দুহাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে বারান্দায় চেয়ারে বসে পড়লো।
কিছু সময় পর মিনারা বেগম শফিক হোসেনের কাদে হাত রাখলো।
শফিক হোসেন তার মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে মিনারা বেগমকে বলল,ইমুর কোন দোষ নেই। সব দোষ আমার।আমার জন্যই তোমাদের জীবনটা নষ্ট হয়ে গেলো।
শফিক হোসেন চেয়ার থেকে উঠে একটা ব্যাগ আর একটা চিঠি মিনারা বেগমের হাতে দিয়ে বলল, এতে ইমুর জন্য কিছু জিনিস আর একটা পাঞ্জাবি আছে,এটা ওকে দিয়ে দিও।
শফিক হোসেন বেরিয়ে হাটতে লাগলো।
মিনারা বেগম তাকিয়ে আছে তার দিকে। এই প্রথম খুব কষ্ট হচ্ছে লোকটার জন্য তার।
পরিচয় থেকে মুক্তি দিতে গিয়ে শফিক হোসেন আজ নিজেই পরিচয়হীন।
শফিক হোসেন গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিলো।সে গাড়ি চালাচ্ছে আর পুরনো দিনের কথা গুলো ফ্লাশব্যাগের মতো তার সামনে আসতে লাগলো_
শফিক হোসেন তার বাবার দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে।
তার বাবা তাকে বলল,কিরে ওখানে দাড়িয়ে আছিস কেন?কিছু বলবি?
-না বাবা এমনি কিছু না।
-এদিকে আয়।
শফিক হোসেন বাবার পাশে গিয়ে বসলো।
তার বাবা তাকে বলল, তোর মন খারাপ?
-ঠিক মন খারাপ না। বাবা একটা কথা বলি?
-বল কি বলবি।
-আচ্ছা বাবা আমার বিয়েটা বাদ দিলে হয়না?
-বিয়ে বাদ দেবো, কিন্তু কেন?
-আমার মনে হচ্ছে এই বিয়েতে আমি সুখী হতে পারবো না।
-ধূর এমন সবারই মনে হয়।তোর মাকে বিয়ে করার আগে আমারও এমন মনে হয়েছিল।এখন দেখ আমরা কতো সুখে আছি। আর মিনারা মেয়েটা ভালো,তোকে সুখে রাখবে।
শফিক কিছু একটা বলতে গিয়েও বললো না,থমকে গেলো।
চারিদিকে বিয়ের আলোক রশ্মি জ্বলে উঠতে লাগলো।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা ট্রাকের আলোক রশ্মিতে চোখ ঝাপসা হয়ে গেল শফিক হোসেনের আর গাড়িটা ট্রাকের ধাক্কায় উল্টে খাদে পড়ে গেলো।

(৬)
মিনারা বেগমের ইমুর কাছে গিয়ে বসলো।
ইমুর চোখমুখ লাল হয়ে আছে।
মিনারা বেগম ইমুকে চিঠিটা আর ব্যাগটা দিয়ে বলল ,এগুলো তোর বাবা দিয়েছে, ভালো লাগলে খুলে দেখিস।
ইমু চিঠিটা তার পড়ার টেবিলের উপর রাখলো।
কিছু সময় পর ইমু অনিচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাগ খুলে দেখতে পেলো নীল রঙের একটা পাঞ্জাবি। নীল রং তার পছন্দ নয়, তাই রংটা দেখে বিরক্ত হয়ে পাঞ্জাবিটা ছুড়ে ফেলে দিলো সে।
.
মিনারা বেগমের মাথায় যন্ত্রণা করছে খুব।
হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠলো।
মিনারা বেগমের টেলিফোনটা ধরতে ইচ্ছে করছে না।
দ্বিতীয় বার আবার টেলিফোনটা বেজে উঠলো।
মিনারা বেগম অনিচ্ছা নিয়ে টেলিফোনটা ধরে বলল, হ্যালো কে?
– আপনি নিশ্চয়ই মিনারা বেগম।
-জ্বি বলুন।
-আমি থানা থেকে বলছি, শফিক হোসেন আপনার কি হয়?
মিনারা বেগম ভয়ে ভয়ে বলল, আমার স্বামী।
-শফিক হোসেনের পকেট থেকে আপনার ঠিকানা আর টেলিফোন নম্বর পেলাম। এই মাত্র আপনার স্বামী কার অ্যাকসিডেন্ট করেছে।
মিনারা বেগম হঠাৎ তার হাত থেকে টেলিফোনটা ছেড়ে দিলো।
টেলিফোনের ওপাশ থেকে বারবার বলছে, হ্যালো, হ্যালো। আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?
.
মিনারা বেগম ইমুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। হাসপাতালের মর্গে বাবার লাশ সামনে নিয়ে ইমু পাথরের মতো দাড়িয়ে আছে।
.
শফিক হোসেনের লাশ দাফন করা হয়েছে।
আজ দিনটা যে কি ভাবে কেটেছে ইমু ভাবতে পারছেনা।
মিনারা বেগম ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে আছে আর শফিক হোসেনের কথা ভাবছে। মানুষ বেঁচে থাকলে কেউ তাকে নিয়ে খুব একটা ভাবে না। কিন্তু মৃত্যুর পর তার সব স্মৃতি গুলো একবার স্মৃতিচারন করা হয়।
বাইরে বাতাস বইছে, মনে হয় বৃষ্টি নামবে।
ইমু ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে।
হঠাৎ বাতাসের বেগে টেবিলের উপর রাখা ইমুর বাবার দেওয়া চিঠিটা নিচে পড়ে গেল।
ইমু উঠে গিয়ে চিঠিটা হাতে নিয়ে চৌকির উপর বসলো।
ইমু আস্তে আস্তে খাম থেকে চিঠিটা বের করে চিঠির ভাজ গুলো খুলে চিঠিটা পড়তে লাগলো _
.
.
প্রিয় “ইমু”
তোমাকে সেই ছোট্ট দেখেছিলাম। তোমার জন্মের পর তোমার মুখ দেখে আমি জগতের সব ভুলে গিয়েছিলাম।তখন আমার নিজের পরিচয় বলতে মনে হয়েছিল আমিও একজন বাবা। আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করো,অবশ্য তোমার আমাকে ঘৃণা করার পর্যাপ্ত কারন আছে। একটা কথা কি জানো? জীবন শুধু চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না।জীবনে অনেক অচাওয়াও কখনো কখনো পূর্ণ হয় অতৃপ্ত ভাবে।আমার জীবনের কাহিনীটাও ঠিক তেমন। আমার বা আমাদের মতো মানুষের জীবনটা কেমন জানো, ঠিক পরগাছা গাছের মতো। আমাদের যে স্থান আছে সে স্থানটা ঠিক আমাদের নয়। আমাদের সারাজীবন তাদের সাথেই থাকতে হয়,যারা আমাদের কখনোই বুঝলোই না। আমরা চাইলেই আমাদের চাওয়া পাওয়া গুলো মন খুলে কাউকে বলতে পারি না। বলতে পারলে হয়তো আমি আজ এই স্থানে থাকতাম না। আমার বিয়ের আগে আমার বাবা বলেছিল বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কিচ্ছু ঠিক হয়নি। আসলে নিজের সত্তাটাকে কখনো হত্যা করা যায় না,আমিও পারিনি। আজকাল নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়। জীবনে না পারলাম নিজে সুখী হতে, না পারলাম তোমাদের সুখে রাখতে। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।
ইতি
তোমার বাবা।
.
ইমু ঘরের কোনে পড়ে থাকা নীল রঙের পাঞ্জাবিটার দিকে তাকাল। সে মনে মনে ভাবছে, মানুষ চাইলেই তার পছন্দ অপছন্দ গুলো পরিবর্তন করতে পারে না। তাহলে একজন মানুষ কি ভাবে তার সত্তা পরিবর্তন করবে। এটা অসম্ভব।
ইমু আবার চিঠিটার উপরে চোখ রাখলো আর এক হাত দিয়ে চিঠিটার লেখা গুলো স্পর্শ করছে। বাইরে বাতাস বইছে। ইমুর চোখ দিয়ে নিস্তব্ধে ক্রমাগত জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
চোখের জল গুলো চিঠির উপরে পড়ে তার বাবার লেখা জেল পেনের কালি গুলোকে ক্রমশ মুছে দিচ্ছে।

লেখকঃ নিশো

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.