নিভে যাওয়া তারা

প্রিয় অনি,
হঠাত করে কিছু না বলে চলে আসায় চিঠিটা লেখা। আসলে কিছু বলতে গেলে আর আসা হত না।তুই আসতে দিতিস না। তাইতো আমার এইভাবে চলে আসা।
আমি এখন হাজার হাজার মাইল দূরে। বাবা মায়ের কাছে। টরেন্টো তে।

আজ তো তোর বিয়ে।আজ নিশ্চয় আয়শা মঞ্জিল লাল নীল বাতি তে সজ্জিত। গেটে লণ্ঠন ঝুলছে। আর ঘরে ভিতর সানাই এর শব্দ। জামাই বেশে তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। তুই তো নিশ্চয় সাদা শেরওয়ানী পরেছিস। কেন যে তুই সব সময় এমন রঙ পছন্দ করিস। মেরুনে তোকে দুর্দান্ত মানাবে। এই রঙ নিয়ে তোর সাথে কত ঝগড়া , মান অভিমান। এখন ভাবলে হাসি পায়। কত না ইম্যাচিউরড আচরণ করেছি।
আয়শা মঞ্জিল আমার স্বপ্নের বাড়ি। আজকে আমি যেখানে থাকি সেটাউ অনেক অত্যাধুনিক একটা ফ্ল্যাট। কিন্তু আমার মনে হয় না আমার জীবনে আর কোন বাড়ি আয়শামঞ্জিলের মত আপন হবে।

প্রথম যেদিন ভাড়া নেয়ার জন্য আসলাম আয়েশা মঞ্জিলে সেদিনের কথা তোর মনে আছে?তুই এত কাঠখোট্টা আচরণ করেছিলি কেন বল তো? তোর বাবা , মা মানে আঙ্কেল আন্টি ঢাকার বাইরে থাকেন। তুই একা এত বড় বাড়ি নিয়ে বসে আছিস। ছাদের ঘরটা ভাড়া দিবি। সে বিজ্ঞাপন দেখে আসা। কিন্তু কি অবস্থা। আমার কি কি নিয়ম মেনে চলতে হবে সেগুলো বললি তুই। তারপর বিদায় দিলি। এক কাপ চা পর্যন্ত অফার করলি না। রুড ব্যবহার কেন করেছিলি? আমি তো জানি আমাকে দেখে সেদিন তুই ক্রাশ খেয়েছিলি। সেটা ঢাকার জন্য কি এই আচরণ?
এর পর মাঝেই মাঝেই দেখা হত। সিঁড়ি বেয়ে নামতে অথবা ভাঁড়া দেয়ার সময়।কিন্তু একরাতে ছাদে তুই আমাকে টেলিস্কোপ সহ দেখলি। তারা দেখা আমার বহুদিনের পূরানো শখ। কিন্তু তুই যে তারা দেখতে পছন্দ করিস তা জানতাম না।তুই আগ্রহ দেখালি তারা দেখারএরপর থেকে এক সাথে কত তারা দেখেছি। তোকে দেখিয়েছি কোন টা সপ্তর্ষিমণ্ডল , কোনটা কালপুরুষ আর কোন টা লুব্ধক।তারা দেখার ফাঁকে ফাঁকে কত গল্প। এই কথা সেই কথা।এইভাবেই না গড়ে উঠলো আমাদের বন্ধুত্ব। আমি এখন আর তারা দেখি না। ভালউ লাগে না। আমার জন্মদিন তুই মনে রেখেছিলি। আমরা বাইরে ডিনার করলাম। তারপর তুই প্রথম আমাকে গান শুনালি গিটার বাজিয়ে। এই গান নাকি শুধু তুই বিশেষ মুহূর্তে বিশেষ মানুষ কে শোনাস।কিন্তু আর কোন সময় হাজার অনুরধ করলেও শোনাস না। তখন মনে হল আমি কি তোর বিশেষ মানুষ হয়ে উঠছি। আর ততদিনে আমি তো তোর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি।

তারপর এলো সেই বিশেষ বৃষ্টিস্নাত রাত্। সেদিন ছিল আষাঢ়ের প্রথম দিন। রাত বাজে ১১ টা। বৃষ্টি অঝোরে পড়ছে। বাংলাদেশের বৃষ্টির তো সৌন্দর্য আলাদা। আমি বৃষ্টি ভালবাসি। আর বাংলাদেশে এসে বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে ভিজবো না তা কি করে হয়। এত রাতে কেউ নেই ছাদে। শর্টস পরে খালি গায়ে বৃষ্টি তে ভিজছি। কিন্তু আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে ১১ টা সময় তোর আসার কথা। আমি ম্যানেজমেন্টে পড়েছি। তুমি তোর একটা বিজনেজ প্রজেক্টের ফাইল দেখাতে চেয়েছিলি। তুই ছাদে উঠে আমাকে এই অবস্থায় দেখে বলেছিলিস বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নাকি গায়ে লাগাতে হয় না। অসুখ হয়। তুই নিজে আমার ঘর থেকে তোয়ালে নিয়ে এসে মাথা মুছে দিয়েছিলি।আর বকা দিচ্ছিলি বৃষ্টিতে ভেজার জন্য। কিছু কিছু বকাউ মধুর হয়। মনে হয় এভাবে এরকম ভাবে বকার মত মানুষ না থাকলে জীবন টা তো অপূর্ণ

এরপর আমার ঘরে বসে কফি খেতে খেতে বৃষ্টি দেখছিলেম ২ জন,। বাইরে বৃষ্টির ঝম ঝম আওয়াজ। সাথে বজ্রপাত। শিলা পরা শুরু করলো । কিন্তু বুঝলাম শিল কুড়নোর কথা বললে তোর কাছে আবার বকা শুনতে হবে। হঠাত দপ করে বাতি নিভে গেল। বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল।জেনেরেটর তখনো লাগানো হয় নি। আমি মোমবাতি জ্বালালাম। মোমবাতির আলোয় সব কিছু মায়াময় লাগছে। এক দৃষ্টি তে তুই আমার দিকে তাকিয়ে ছিলি। কি দেখছিলি অত ?আমি কিন্তু তোর চোখের গভীরতা দেখছিলাম।তারপর তোকে পেলাম আমি। অনেক আপন করে। নিজের করে। তোর জীবনের গহীনে প্রবেশ করলাম। এটাই ভালবাসা। আমরা তখন আর একে অন্য কে ছাড়া থাকতে পারি না। আমি প্রায়ই উপরের ঘর ছেড়ে তোর ঘরে এসে থাকি , আবার তুই আমার ঘরে। এক সাথে রান্না করি। বাজার করি। কেমন জানি একটা সংসার সংসার ব্যাপার।
সব ভালই চলছিল কিন্তু হঠাত খবর পেলাম তোর বাবা মা মানে আঙ্কেল আন্টি ঢাকা আসছেন।আমার মন্ এক্টূ খারাপ হল। তার মানে এই আমাদের সংসার সংসার ব্যাপার টা এখন বন্ধ হয়ে যাবে। তুই বললি আঙ্কেল আন্টি বেশি দিন থাকবেন না। চলে যাবেন। তখন মনে একটু শান্তি পেলাম। আসলে এইভাবে ভাবা স্বার্থপরতা ছিল। বৃদ্ধ বয়সে বাবা , মা ছেলের সাথেই থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। আর আমি কিনা তা চাইছি না। আমার নিজেকে সেদিন খুব ছোট মনে হয়েছিল
পরের শুক্রবার তুই রেলস্টেশন আঙ্কেল আন্টি কে আনতে গেলি। আমি তাদের জন্য লাঞ্চ রেডি করলাম। এতদূর ভ্রমণ করে তারা নিশ্চয় ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত থাকবেন। সব ঠিক ছিল কিন্তু আঙ্কেল আন্টির সাথে রিমি নামের একজন তরুণী আসলো। দেখতে খুব সুন্দরী তা বলবো না। কিন্তু চেহারায় একটা মায়া রয়েছে।কিন্তু চোখে কেমন একটা বিষণ্ণতা। আমি কক্ষনো রিমি নামের কারো কথা তোর মুখে শুনি নাই। তাই অবাক হলাম। তোকে জিজ্ঞেস করলে তুই বললি মেয়েটার বাবা , মা মারা গিয়েছেন একটা রোড এক্সিডেন্টে। এবং তার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তাই আঙ্কেল আন্টির সাথে থাকেন। আমি ভেবে অবাক হলাম মেয়েটির কি কোন আত্মীয় স্বজনও নেই? তারপর ভাবলাম এটা আঙ্কেল্ আন্টির মহানুভবতা।

একটা ব্যাপার খুব অবাক লাগতো রিমির সাথে কক্ষনো তুই একটা কথাও বলতি না। কিন্তু রিমি সবসময় তোর কোন না কোন কাজ করে দেয়ার চেষ্টায় রত থাকতো। যেমন কাপড় কেঁচে দেয়া, তুই ঘরে না থাকলে তোর ঘর গুছিয়ে দেয়া। তোর প্রিয় খাবার রান্না করা। আমি জানতাম না বুঝতাম না কিভাবে সে জানে তোর প্রিয় খাবার কোন গুলো।কিন্তু একটা ব্যাপার আমি বুঝলাম মেয়েটি তোর প্রেমে পরেছে।

এদিকে আমার সাথে আঙ্কেল আন্টির খুব ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমি প্রায়ই যেতাম তাদের সাথে গল্প করতে। কখনো রান্না করে নিয়ে যেতাম। বয়স্ক মানুষ সঙ্গ পেলেই খুশি হয়। কিন্তু রিমি দূরে থাকতো । কক্ষনো আমার সাথে গল্প করতে আসে নাই। আমার মনে হয় রিমি আমাকে কেন জানি অপছন্দ করতো। কিন্তু অপছন্দ করার তো কোন কারণ নেই।

একদিন কথায় কথায় আঙ্কেল বলে ফেললো রিমি আর তুই ছোট বেলার বন্ধু। মানে তুই ক্লাস ফাইভে ঢাকায় এসে ঢাকার একটি স্কুলে ভর্তি হয়ে যাস। তার মানে ক্লাস ফাইভে পড়ার আগে থেকেই রিমি তোর বন্ধু ছিল। কিন্তু এই কথা তো কক্ষনো তুই আমাকে বলিস নাই। তাহলে কি রিমির সাথে আগে তোর কোন রিলেশন ছিল। যার জন্য রিমির কোন কথা আমাকে তুই বলতে চাস না? আর রিমি বা কেন তোর ব্যাপারে এত আগ্রহী। তোর আগে কার সাথে কি সম্পর্ক ছিল তা নিয়ে আমার মাঝে কোন মাথা ব্যাথা নাই। কিন্তু তুই সত্য গোপন করলে , মিথ্যা বললে তা আমি মেনে নিব না।

তোকে জিজ্ঞেস করার পর তুই খুব চিৎকার করলি। এরকম ভাবে ঝগড়া আগে কখনো তোর সাথে আমার হয় নি। আমি এসব চিৎকার জাস্ট নিতে পারি না। আমি মোবাইল অফ করে দিলাম। সারা রাত্ মোবাইল অফ থাকলো।

পরের দিন উদ্ভ্রান্তের মত ভোর বেলা আমার ঘরে এসে নক করা শুরু করলি। আমি দরজা খুলে তোকে দেখে আমার মায়া হল। বুঝলাম সারা রাত তুই ঘুমাস নি। তোকে এত টা শাস্তি আমি না দিলেও পারতাম। এরপর তুই খুলে বললি ব্যাপার টা কি
রিমি তোর ছোট বেলার খেলার সাথি। তোরা এক সাথে খেলেছিস , বড় হয়েছিস। কিন্তু এখন সমস্যা হচ্ছে আঙ্কেল , আন্টি যে কোন মুল্যে রিমির সাথে তোকে বিয়ে দিতে চায়। কিন্তু তুই রাজি না। তুই নিজে রিমি কে বলেছিস তুই একজন ছেলে কে ভালবাসিস। তুই সমকামী। তারপরও নাকি রিমি দমে যাই নাই । সেও যে কোন মুল্যে তোকে বিয়ে করতে চায়।
এইবার বুঝলাম কেন রিমি আমার সাথে কথা বলে না । দূরে দূরে থাকে। আমাকে অপছন্দ করে,। সব আমার কাছে পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। রিমি কেন সারাক্ষন তোর সব কাজ করে দিতে চায়। কিন্তু এর সমাধান কি? তুই বললি আমার সাথে কানাডা চলে যাবি। আর দেশে থাকবি না।আমি কানাডার সিটিজেন। বাংলাদেশে একটা প্রজেক্টের কাজে এসেছি।আমার মনে হচ্ছিল হাতে স্বর্গ পেয়েছি। কিন্তু যত হাসি তত কান্না। দাবার বোর্ড উলটে গেল সেই রাতে।

রাত ১১ টা আমার ঘরে নক করলো একজন। আমি ভাবলাম তুই এসেছিস। খুলে দেখি রিমি দাঁড়িয়ে আছে। আমি খুব অবাক হলাম এত রাতে আমার ঘরে সামনে দেখে। সে আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলল সে ২ টা কথা বলবে ঘরের বাইর থেকে। ছাদে। তারপর যা বলল তা আমি কখনো ভাবতেও পারি নাই। তুই আমার কাছে এত বড় সত্য গোপন করলি?
রিমি আর তুই যখন ক্লাস ফোর এ পড়িস তখন ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী তোদের বিয়ে হয়। যদিও সেটা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ না। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বৈধ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ কি তা মানে। সমাজের কাছে রিমি এখন তোর স্ত্রী। আর সে তো ছোট বেলা থেকেই তোকে স্বামী মনে করে আসছে।এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর থেকে তুই রিমির সাথে আর কথা বলিস না। তখন তুই বুঝতে পেরেছিস তুই সমকামী, কিন্তু রিমি এতদিনে তোকে ভালবেসে ফেলেছে। আর তুই যে সমকামী সেটাও কিন্তু তখন তুই বলিস নাই। যখন বলেছিস তখন সে অসহায়। তার বাবা , মা কেউ বেঁচে নেই। এক মাত্র তোর পরিবার ই তার তখন ভরসা ছিল। এখন কিভাবে তুই তাকে চলে যেতে বলিস? সে কোথায় যাবে? সমাজের কাছে সে বিবাহিত। তার আরেকজনের সাথে কি এখন এই সত্য প্রকাশ করে বিয়ে দেয়া সম্ভব? তারপরও সে আমাকে এমন একটি প্রস্তাব দিল সেটা শোনার পর আমি সেদিন ঘুমাতে পারি নাই। সে বলেছিল আমাদের ২ জন এর সম্পর্ক থাকবে। আমরা এক ঘরে থাকবো। কিন্তু রিমি ও আমাদের সাথে থাকবে যতদিন না সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। সে কোন দিন স্ত্রী এর অধিকার চাইবে না যতদিন সে আমাদের সাথে থাকবে। কিন্তু তারপরও অনুষ্ঠান করে একটা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করা হোক। কারণ তা ছাড়া সমাজের লোক জন নানা কুকথা বলবে। এবং আঙ্কেল আন্টি মানে তোর বাবা মাউ যাতে কিছু না বুঝতে পারে।এই বুড়ো বয়সে তারা হয়তো এই ব্যাপার টা মেনে নিতে পারবেন না।
আমি অনেক ভেবেছি ।আমরা কেউই টিনেজার না। আমাদের বাস্তবতা মেনে নেয়ার ক্ষমতা এখন হয়েছে। সব সময় আবেগ দিয়ে সব কিছু বিচার করা যায় না। সিদ্ধান্ত নিতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। কখনো কখনো মনে হয়েছে বুকের উপর ৪০ মন ওজনের পাথর বসিয়ে দেয়া হয়েছে।

কিন্তু কথা হচ্ছে আমি বা তুই কেউই এই মেয়েটির চেয়ে অসহায় নয়। আর তোর কিছু ভুল ছিল,। সেই ভুলের মাশুল কিন্তু রিমি কেই দিতে হচ্ছে;।
সুতরাং তার দিক আমাদের দেখতেই হবে। আর রিমি যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটা মেনে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বরং আমার মনে হয় তুই রিমি কে বিয়ে করেই সুখী থাকবি। তাই আমি দূরে সরে যাচ্ছি। তোকে না বলেই কানাডা চলে এলাম আর যোগাযোগ অফ করে দিলাম।আমি বরং তোর নিভে যাওয়া তারা হয়ে থাকলাম।

কারো জন্য কারো জীবন থেমে থাকে না,। জীবন তার নিজস্ব গতিতেই চলে। আমার জীবন নিশ্চয় থেমে থাকবে না। হয়তো আমার জীবনেও কেউ আসবে। শেষ কথা যেটা বলবো তোদের বেবি হলে একবার দেখে যাবো।কারন আমি জানি তখন তোর থেকে সুখী আর কেউ থাকবে না। আর তোর সেই সুখ আমি দেখতে চাই।ভাল থাকিস।

ইতি
তোর নিভে যাওয়া তারা

লেখকঃ অরণ্য রাত্রি

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.