খাঁচায় ফেরার গান

লেখকঃ পরিশ্রান্ত পথিক

“তুমি পালাও।ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে।আমাদের চিন্তা করো না। আর এখানে কখনো আসবে না”- এক স্ত্রীর আর্তনাদ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে।
মন যখন ব্যাকুল, প্রকৃতি তখন রুষ্ট। কালবৈশাখী ঝড় হচ্ছে।সমান তালে বৃষ্টির বরিষণ।
পাথরের ন্যায় গুটি গুটি আম ঝরে পরছে।
দৌড়ে পালাচ্ছে অপল।
পেছনে ফেলে যাচ্ছে তার অস্তিত্ব। তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তার মা কে। না চাওয়া তবে ভাগ্যে পাওয়া স্ত্রী কে ফেলে আসতে হচ্ছে। মাত্র চারমাস আগেই বিয়ে হয়েছে তাদের।
যখন নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা প্রধান কর্তব্য, তখন জগতের আর সব কিছু তুচ্ছ।
ঝড় কিছুটা লাগাম দিয়েছে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি অব্যাহত।
রাতের দ্বিপ্রহর শেষ।
অচেনা মুয়াজ্জিনের আযান ভেসে আসতেছে।
পুব দিগন্ত রঙিন হচ্ছে।
অপলের মন বিষাদ মলিনবিধুর।
অজানা ভবিতব্য হাতছানি দিচ্ছে।
শংকায় ধুকছে সে।নিয়তি তাকে কোথায় নিবে?

***

আস্তে আস্তে ফর্সা হয়ে গেছে অন্ধকার।
ঝড় শেষে মার্তণ্ড তার আগ্রাসী ভাব দেখাচ্ছে।
অপল রাতে আশ্রয় নিয়েছিল অজানা গাঁয়ের কোন এক দোকানের বারান্দায়।
দোকানী এসে গেছে।
– কি ভাই, এইহানে কি?
– না মানে কাল রাতে এসেছি তো।
– (অপলকে থামিয়ে দিয়েই) অহ,বুঝছি কাম করতে আইছেন।তয় এত আগেই আইছেন কেন?এহনো তো ধান কাটা লাগেনি।
আর কিছু ভাবতে পারছে না সে।সত্য মিথ্যের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে সে।ভ্যাবলাকান্তের মত তাকিয়ে আছে।
দোকানী বলল- আরে ভাই, এহনো দাঁড়িয়ে।যান ভাই বাজারের দক্ষিণ পাশে বটতলায় গিয়ে বসেন।ভাগ্য ভাল থাকলে কেউ নিয়া যাইতেও পারে কাম করাইতে।ওইটাই আমাদেত কামলার হাট।
বেঁচে থাকার তাগিদে কিছু তো করে খেতে হবে।
প্রকাণ্ড বটগাছ।
পাশেই নদী। অজানা নদী।তার বয়ে চলার গতির মত সে।
দুপুর গড়িয়ে বেলা হেলে যাচ্ছে পশ্চিমে।
অভুক্ত সে। এখান থেকে চলে যাবে মনস্থির করে নিয়েছে।
অদূর থেকে ভেসে আসছে ফটফট আওয়াজ।
হয়তো কোন পুরানো মোটরবাইক।
অবিকল যেন গ্রিক দেবতা বসে আছে গাড়ির উপর।
কালোচশমায় ঢাকা চোখ,কাঁধ পর্যন্ত চুল।বাতাসের তোড়ে উড়ছে মৃদু ছন্দে।লম্বামন্ত লোকটা, অভ্রতামাটে গায়ের রঙ।
এদিক পানে একবার চেয়ে নিল সে।কিছুদূর যেতেই গাড়ি ঘুরিয়ে অপলের সামনে এলো।
কালোচশমা সরিয়ে আয়তকার মায়াভরা চোখ দিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
কি নেশা সে চোখে,কি আকর্ষণ।
এবার তার মুখনিঃসৃত বাণীঅর্চনার পালা।
– আপনি কি কাজ করতে এসেছেন?
-(অজ্ঞতায়) হ্যাঁ।
-আচ্ছা, উঠে পরুন বাইকে।আপনার কাজের দায়িত্ব আমার।
বাধ্য ছেলের মত উঠে পরল অপল।
শাঁ করে ছুটে গেল মেঠো পথের পরে। পথের দুপাশের ধানের শিষ উঁকি দিচ্ছে এ অবেলায়।
বাতাসের অতিপ্রবাহে গ্রিক দেবতার কেশরাশি অপলের মুখে ছটা মেরে দিচ্ছে।
বহুবছরের লালিত স্বপ্ন এভাবে পূরণ হবে ভাবনার বাইরে অপলের।
আবারো তার প্রস্ফুটিত বাক্য নিঃসৃত হল।
-আমি মুকুল।বলতে পারেন এ অঞ্চলের প্রতাপশালী বাবার একমাত্র বাউণ্ডুলে পুত্র।
আপনি কোথা থেকে এসেছেন? নাম কি?
– আমি অপল।কুড়িগ্রাম থেকে এসেছি(প্রথম মিথ্যে)।
মোটরবাইক এসে থামল দক্ষিণামুখী মস্ত এক রঙিন টিনের বাড়ির সামনে।কাঠের শরদল করা বাড়িটি। চালটি নীল রঙের আর কাঠের ফাঁকেফাঁকে টিনগুলো হরেক রঙের।

যেন এক রঙধনুময় বাড়ি। পাঁজরের ভেতরে গেঁথে থাকা রঙের বলয়।
অনেকটুকু জায়গা নিয়ে উঠোন।পূর্বপাশে রান্নাঘর,টিনের চালে কালির ছাপ দেখে বুঝা যাচ্ছে। পশ্চিম পাশে বড় ঘর।এটা হয়ত গুদাম ঘর।কিন্তু এঘরে দুটা দরজা, তার মানে ভেতরে পার্টিশন করা।
উত্তরের ঘরের বারান্দায় কাঠের হেলানো চেয়ারে আধোশুয়া হয় আছেন মকুলের বাবা। অপল সালাম জানালো।সালামের জবাব নিল কি নিল না তা অপরিস্ফুট।
মুকুল অসহায় কণ্ঠে বলল বাবা, আমার কাজে সাহায্য করার জন্য এক লোক এনেছি।
আপনি চাইলে রাখতে পারি।
এদিক পানে একবারো না তাকিয়ে জবাবে সে বলল,এনেই যখন ফেলেছ রেখে দাও।তবে মাসে তিনহাজার টাকার বেশি আমি দিতে পারব না এই বলে দিলাম।
-আচ্ছা বাবা।

হয়ত এর থেকে ভাল অবস্থা ছিল অপলের।শহরতলীতে ছোট একটা বাড়ি।আর ছোট একটা মোম বানানোর কারখানা। বাবা মারা যাবার পর ওই সব সামলাচ্ছে।অনিচ্ছায় বিয়ে করেছে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। চলে যাচ্ছিল সুখস্বাচ্ছন্দে।
মুকুল তার কয়েকটি জামাকাপড় দিল। অপলের গোসল শেষে খেতে দিল তার মা।
ইতোমধ্যে রাত হয়ে গেছে।
অজানা জায়গায় এভাবে ভাগ্য সহায় হবে ভাবা যায় না।ভাবনা জুড়ে ফেলে আসা বিগত অতীত কি ভুলা যায়?
পশ্চিমের ঘরে চৌকির উপর শুয়ে আছে সে।কিছুটা গরম পরেছে।জানালা খুলতেই গন্ধরাজের সুগন্ধে মৌ মৌ করছে সারাঘর।
চোখটা লেগে আসছে অপলের।পরক্ষণেই দরজায় ঠকঠক আওয়াজ।
খুলতেই গ্রিক দেবতা হাজির।এক লহমায় টেনে নিয়ে গেল তাকে।মায়া কেন বাড়ছে?
-কোন সমস্যা হচ্ছে না তো?
ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই আপনাকে আমার ঘরে রাখার।বাবা আরো চটে যেতে পারেন।
– না না, ঠিক আছে।এইটুকুই আজকাল করে কয়জনে।নেহাত আপনি ভাল মানুষ তাই। অচেনা অজানা কাউকে আশ্রয় দেয় না আজকাল।
– কিছু মানুষকে চিনতে হয় না।জানতে হয় না তাকে।মন যে তাকে চিনে নেয় অবলীলায়।
ওহ হ্যাঁ,কাল সকাল সকাল বেরুতে হবে ঘুমিয়ে পড়ুন।

***

প্রত্যুষ।
উঠে পরেছে অপল।কলপাড়ে এসে কয়লা দিয়ে দাঁত মাজছে সে।
পেঁয়ারা গাছের ডালে দোয়েল পাখিটা শিষ দিচ্ছে বারবার।জোড়ার সঙ্গিনীকে খুঁজছে হয়ত।
-আরে বাহ,শহুরে ছেলে দেখছি উঠে পরেছে।
– আমি শহুরে কে বলেছে?
-বলতে হয় নাকি।বলেছিলাম না চিনতে,জানতে হয় না।চিনে নিয়েছি।তবে চিন্তা করবেন না আমি আপনার অতীত জানতে চাইব না।
আর হ্যাঁ, চলুন যেতে হবে।
– কোথায় যাব এখন?
– যেখানে পথের শেষ।জলরাশি নিশ্চুপ সেখানে।বিস্তীর্ণ মাঠ। তারপর কেউ নেই।আছে শুধু উদ্দাম বায়ু আর প্রসস্ত বায়ুমণ্ডল।
– কি বলছেন বুঝতে পারছিনা।
– এত বুঝে কাজ নেই।চলুন যাওয়া যাক।

প্রাতরাশ সেরে নিয়ে বাইকে করে রওনা হল ওরা।
এত দেখছি কাব্যের ছলে বলা সব মিলে যাচ্ছে।পথের শেষ মানে তারপর জলরাশি নদী। ঝড়ো বাতাস বইছে।
এটা একটা চর।নদীর বুকে জেগে উঠা। শুধু বলেনি তরমুজের খেতের কথা।
লোকেরা কাজ করছে সেখানে। একটা তরমুজ হাতে নিয়ে কাঠের সাহায্যে ভেঙে নিল মুকুল।খড় দিয়ে বানানো চালার নিচে বসে আছে দুজন যুবক।কামড়িয়ে খাচ্ছে রক্তাভ তরমুজ। আর মুচকি হাসছে দুজনেই।
আড়চোখের চাহনি ধরা পড়ছে বারংবার। নিজেদের সংযত করছে পরক্ষণেই।এ যে আজন্ম টান।
গল্পগুজবে দুপুরটা কাটিয়ে দিল দুজনেই।খাওয়া হল গুটা চারেক তরমুজ।
-এই বুঝি আমার কাজ?
– আপনাকে তো আমার সঙ্গ দেওয়ার জন্যই এনেছি।
-কেন গার্লফ্রেন্ড নেই?
– ওসব আমার পোষায় না।
এবার নিরবতা।
সূর্য নিভে যাচ্ছে। গাছগুলি নিচে ডুবে যাচ্ছে।জোড়ায় জোড়ায় নীড়ের পাখিগুলো নীড়ে ফিরছে।
ফেরা হয়নি অপলের। চোখ বেয়ে দুফোঁটা অশ্রু বিসর্জিত হয়।
মুকুল হয়ত বুঝে গেছে তার নির্লিপ্ত ক্রন্দন।
-থাকনা অতীত পাছেই।তাকে মনে রেখে কষ্ট পেয়ে কি হবে।তারচেয়ে ভাল বাকি জীবনটুকু একটু ভালকরে বাঁচতে।
সন্ধ্যে নামার পর বাড়ির পথে ছুটছে বাইক।শুনশান পথ।ঝিঝিপোকারা ডাক শুরু ককরে দিয়েছে।
পথের দুধারে ধান খেত।কাঁচামেঠো পথ।উঁচুনিচু। অজান্তেই এক হাত মুকুলের কাঁধে চলে গেছে অপলের।সুযোগ বুঝে মুকুল ও কষে ব্রেক মেরে দিল। একজনের পৃষ্ট আরেকজনের বক্ষ মিশে গেছে।
ঝোঁক সামলাতে না পেরে সোজা ধান খেতে।
কাঁদা দিয়ে মাখামাখি দুজনেই।
মুকুলকে টেনে উঠাতে গেল অপল।

মুকুল হেঁচকা টানে নিজের বুকের উপর নিয়ে নিল অপলকে। কিছু বুঝে উঠার আগেই ঝাপটে ধরে অপলের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়েছে মুকুল।
অপল যেন নির্জীব।
পূর্ণবয়স্ক দুজন যুবক।এখন আর অভিনয় করা যায় না।ভেতরাত্মা যে অভুক্ত জন্ম থেকে।আজ দুজন এক হয়ে গেছে।
কয়েক মুহূর্ত পর। উঠে দাঁড়াল দুজনেই।
এবার অপল জড়িয়ে ধরে আবার ডুবিয়ে দিল ঠোঁট। সুখের স্বর্গ রচিত হচ্ছে লালারসে।
বাড়িতে গিয়ে গোসল করে নিল তারা।বাবার বকুনিঝকুনি পেল বিনা খরচে।
রাত বাড়ছে।
দুজন পুরুষযুবা আধোশুয়ে আছে পাশাপাশি। অপলের মাথা মুকুলের বক্ষে।
অপল তার অতীত বলছে,
সেদিন ঝড়ের রাত।আমার বিবাহিত স্ত্রীকে বিয়ে করতে চেয়েছিল পাড়ার আধবুড়োটা।
বিয়ে করতে না পারায় আমার উপর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল।
কিন্তু ঈশ্বরের কৃপায় নিজের লোকের ছুড়ির আঘাতে মরে বুড়োটা।
তাই সেদিন প্রাণ বাঁচাতে ছুটে এসেছিলাম।
জানি, আমার মা আর বউকে আর কেউ কিছু করতে পারবেনা। তারপর আর কিছু জানতে পারিনি।স্ত্রীর মাথার কসমের কারনে যোগাযোগ ও করতে পারিনি।

***

তিন বছর পর।
মুকুল আর অপলের অজানা সম্পর্ক চলছে বেশ। দুজনার সঙ্গ যেন বাতাসে অক্সিজেনের মত।নিজের গুছিয়ে নিয়েছে তারা।অতীত বিচ্ছেদ ভুলে বসেছে অপল।পৃথিবীর আর কেউ জানেনা মালিক-শ্রমিকের জায়েজ ভালবাসার নাজায়েজ সম্পর্ক।
১লা বৈশাখ।
মুকুল আর অপল এসেছে শহরতলীর মেলায়।হাজারো মানুষের ভিড়।
নাগরদোলার কড়কড় শব্দ, হাজার বাঁশির কর্কশ ধ্বনিতে মুখরিত এ অঙ্গন।
ভিড়ের মাঝে এক মহিলা মুকুলের সামনে এসে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।বছর তিনেকের এক বাচ্চা মা মা বলে কেঁদে উঠছে।
অপল সেদিকে তাকাতেই তার চোখ আটকে যায়।
তিনবছর আগে ফেলে আসা অতীত আজ তার সামনে।
এ যে তার বিবাহিত স্ত্রী।
ঝড়ের রাতে, প্রাণের ভয়ে পালিয়ে আসা অতীত।
মেলা জনাকীর্ণতা থেকে দূরে আনা হল তাকে।
মুখে পানি ছিটাতে জ্ঞান ফিরল তার।
জল ভরা চোখে অপলকে জড়িয়ে ধরল সে।
ছোট্ট বাচ্চাটি কেঁদেই চলেছে।মুকুল চেষ্টা করেও থামাতে পারছেনা তাকে।
মুকুল এবার নিস্তব্ধ।
মা তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বলল,বাবু এই দেখ তোমার বাবা।
কথাগুলো বুকের মুচড় দিয়ে উঠল অপলের।
এ তার ঔরসজাত সন্তান।
চোখের পানি বাঁধ মানছে না তার।বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল ও।
মুকুল সব বুঝে গেছে।
সে নিরবে চলে যাচ্ছিল।
অপল তার হাত ধরে নিল।
দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে অশ্রুবিসর্জন দিতে থাকল।
মুকুল শুধু মাথা নেড়ে এটাই বুঝাতে চাইল আর হয় না এ অবাস্তব সম্পর্ক।
তিন বছরের সম্পর্ক আজ বিচ্ছিন্ন।
হাতের বাঁধন ছিন্ন করে সে মিলিয়ে গেল ভিড়ে।
নিজের সন্তানের মায়ায় সে ভুলে গেল এক নিমিষে মুকুলকে।
সন্ধ্যে নামার আগে পাখির ন্যায় নীড়ে ফিরে যাচ্ছে অপল। তার আপন সংসারে।
ভিড়ের গভীরে শুধু একবার পলক ফেলে গেল সে।বুকে এক অবৈধ দীর্ঘশ্বাস।
::::::::::::::::: সমাপ্ত ::::::::::::::::::::

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.