পরজনমে

[সোনার পাত্রে ভাত খাওয়া যায় কিন্তু রান্না করা যায় না।কারন তার প্রকৃতিগত সৃষ্টি তেমন।তেমনি খাঁটি সোনার সাথে খাদ না মিশালে তা দিয়ে গহনা হয় না।তাই নিজের আশে পাশের সব মানুষকেই গ্রহন করতে হয়।সৃষ্টির কিছুই তুচ্ছ নয়।]

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

এক.
দুরের চাঁদের আলো খুবই লোভনীয়।সেই চাঁদ গায়ে কলঙ্ক নিয়ে কতই না অপরূপ।অন্যের আলোয় আলোকিত হয়েও সে সবার প্রিয়।তার দিকে তাকালে চোখ নামানোর ইচ্ছা হয় না।তার নরম জ্যোৎস্না মনে কাব্য জাগায়।
জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছিল অভি।এই চাঁদ আজ তার মনকেও কবি করে দিল।কেন হলো সে কবি।একি কবিতা?নাকি চাঁদের পিছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস তুলে ধরা।সে বুঝে উঠতে পারে না।ইশানের সাথে ইদানীং খুবই মনোমালিন্য চলছে।সে এখন ইশানিকে চিনতে পারে না।এই কি সে ইশান!
যেদিন ইশানকে প্রথম দেখে সেদিন ছিল ভারতের নবমুক্তি।জাজমেন্ট ডে।২০১৮ সাল।ভারতে সমকামিতা ডিক্রিমিনালাইসড হলো।আর বাঙালিরা আশা দিয়ে নতুন বুক বাঁধল।একদিন আমরা ও পাবো।সেদিন কলেজের ক্লাস বাঙ্ক করে আসার সময় মোবাইলে এই খবর পেয়ে ইচ্ছে করছিল পাখি হয়ে যায়।একদিন সে ও পাবে।উত্তরায় নামি লোকের বাস।সে পথে যানজট নেই।দু হাত উঁচিয়ে সে উপরে তাকিয়ে আসছিল।হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে দুম করে পড়ে গেল।ভেবেছিল কোনো অভিনয় শিল্পী।পড়ে তাকিয়ে দেখল একটা ছেলে।চোখে চশমা,গাল ভরা দাড়ি।পোশাক দেখে মনে হলো অফিস যাচ্ছে।কিন্তু হেটে!
হেটে অফিস যাওয়ার মত কেউ উত্তরায় থাকে না।আর এই মানুষ যে বস তা সিউর।ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই দেখল পাশে গাড়ি।ড্রাইভার কি যেন করছে।অভি একবার দেখল তারপর একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল,”সরি।”
-ইটস ওকে।এত খুশি দেখাচ্ছে যে।কলেজ বাঙ্ক?
-না না।আজ ত্রি সেভেন্টি সেভেন উঠানো হল।
ছেলেটা একবার আপাদমস্তক অভিকে দেখল।তারপর আর কিছু কথা হলো না।অভিও নিজের ভুল বুঝে কেটে পরার ধান্দায় ছিল।এমনিতে এখানে কেউ এত কথা বলে না।তবে ওই ছেলে আগ বাড়িয়ে বলল তাই তার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।সে কি করবে।আর তাতে তো প্রমানিত হচ্ছে না যে সে সমকামি।অবশ্য এটা সত্যি।
কিছুদূর যেতেই ছেলেটা আবার ডাকল।
-হে লিসেন!
-ইয়েস?
-কোন কলেজে পরো?
-কেনো?
-আ…তোমার আইডি পাওয়া যায় কি?

সেই শুরু।তারপর ফেসবুকে কথা তার পর প্রেম।এখনও চলছে সে প্রেম।কিন্তু শুধু রং ফিকে হয়ে এসেছে।উভকামীদের কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।কিন্তু অভি করেছিল।কারন উভকামী মানেই সে সুযোগ সন্ধানী নয়।তাদেরও মন আছে।তারাও ভালবাসতে জানে।শুধু সঠিক মানুষ দরকার।তা শুধু উভকামীদের নয় সবার ক্ষেত্রেই একজন সঠিক মানুষ সব কিছু ভাল রাখতে পারে।লোহায় যতক্ষন পরশ পাথর না লাগে সে লোহা লোহায় থেকে যায়।সোনা হয় না।এই আশায় বুক বেধেই আজ চাঁদ দেখছে অভি।ইশান তার শরীরে মিশে আছে।বয়সের দোষ বড়ই ভয়ঙ্কর জিনিস কিনা।তাই কাছে পাওয়া মানুষ এর প্রতি মাঝে মাঝে আবেগ ভারি হয়ে যায়।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।অভি মনে হয় এই জন্যই বসেছিল।উঠে গিয়ে তাড়াতাড়ি ফোন ধরল।ওপাশে গলাটা ইশানের।কিন্তু বড়ই অপরিচিত শোনাচ্ছে।
-হ্যালো অভি।
-ইশান।কি হয়েছে তোমার?
-কেন?
-তুমি আজ কয়েকদিন যাবত আমার সাথে দেখা করছো না।ঠিক করে কথা বলছো না।ফোন ধরছো না।এসব কি?
-এ তো হওয়ার ছিল।
-কি বলছো!
-আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে অভি।কাল গায়ে হলুদ।
-বিয়ে!আর কাল হলুদ।তুমি আমাকে জানা..আর তুমি রাজি কি করে হয়ে গেলে?আমার কি হবে।আমাদের কি হবে?
-কি হবে মানে।আমরা ছেলে অভি।বিয়ে তো করতেই হতো।এটা বাংলাদেশ।আমাদের এই ভালবাসার কোনো মানে নেই।
-ইশান..
-আমার কথা শোনো।তুমিও বিয়ে করে নাও।এসব ভাল না।
-আচ্ছা?বাহ!তুমি জানো আমি গে।তবুও এসব বলার মানে কি।আর কোনটা খারাপ।সেদিন রাতে খারাপ ভাল কোথায় ছিল ইশান?তোমার স্ত্রী কে সেটা জানাতে পারবে?ভুল আমার ছিল ইশান।সাপ জাতে সাপই হয়।ডোরার বিষেরও জ্বালা আছে।
-অভি দেখো আমি নরমাল..
-নরমাল!ইশান বদদোয়া দিই না।কিন্তু ভাল থাক সে দোয়াও করলাম না।রাখি।

অভি ফোনটা কেটে দিল।কান্না পাচ্ছে।খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে।কিন্তু চুপ থেকে সে বেশি শান্তি পাচ্ছে।কে বুঝবে তাকে।জন্মের পর থেকে মেয়েলি বলে সে কথা শুনে বড় হয়েছে।না আছে পরিবারে মুল্য না আছে বন্ধুদের কাছে।সে কেন বিয়ে করতে চায় না তা ইশান কি বুঝবে?সে কেন এমন তা বন্ধুরা কি বুঝবে?সে কেন গে তা সমাজ কি বুঝবে?যেখানে তার মা বাবা তাকে বুঝেনি।সে কেন এমন?

এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা কত কঠিন তা সে ছাড়া কেউ জানে না।যতক্ষন এই পরিস্থিতিতে এই সমাজের মানুষগুলো না পড়বে ততক্ষন তারা বুঝবে না।
ইশান ও তো বুঝেনি।অভি চুপ চাপ বিছানায় বসল।ঘরের সিডি প্লেয়ারটা অন করল।তারপর পাশের ড্রয়ার থেকে ওষুধ এর বাক্স বার করল।ঘুমের টেবলেট গুলো হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন।সে কি মরবে?কিন্তু কেন মরবে?তার জন্য কে কাঁদবে?
না,সে মরেনি।ওষুধ গুলো ছুড়ে ফেলে বিছানায় শুয়ে পড়ল অভি।সিডি প্লেয়ারে গান বাজছে জয়িতার কন্ঠে।

“বনমালী তুমি,পরজনমে হইও রাধা..”

দুই.
দড়জা আটকে জানাল দিয়ে তাকিয়ে বসে আছে রেবতী।নিচে জমিলা আপা পানের বাটা নিয়ে বসে খদ্দেরের সাথে কথা বলছিল।কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই তার।এ তো আপার নিত্য কাজ।প্রতিদিন নতুন খদ্দের একজন থাকেই।মেলা বাজারের শেষ দিকে শান্তিনীড় বিল্ডিংটা তাদের বেশ্যালয়।

সেই সতেরো বছরে এখানে এসেছিল সে।সেদিন মা বাবা মারা যাবার পর মামার হাত থেকে বাঁচতে সে পালিয়ে এসেছিল।রাস্তায় জমিলা আপা তাকে পেয়ে এখানে আনে।খাবার দিল থাকার জায়গা দিল।তার সাথে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া ভাগ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।যে অত্যাচার থেকে বাঁচতে সে এখানে পালিয়ে এল।সেই অত্যাচার সে হাসি মুখে গ্রহন করতে শিখে গেল।বহু চেষ্টাতে সে পালাতে পারেনি।এখন সবচেয়ে চড়া দাম তারই।কথায় বলে দুর থেকে শিমুল ফুল সবচেয়ে সুন্দর।সত্যই তাই মনে হয়।

তবে সে এখন বসে আছে পুরোনো খদ্দেরের জন্য।ওই পাড়ার দ্বিজলাল এর ছেলে নকুললাল এখানে বহু আগে থেকে আসে।সেই তার যখন একুশ কি বাইশ ছিল আর রেবতীর আঠারো।সে ছেলেও অন্যদের মত পশুত্ব নিয়ে আসে।আর নিজ পাপ ছেড়ে মানুষ হয়ে ফিরে যায়।কিন্তু সেই মানুষের প্রেমে রেবতী কি করে আবদ্ধ হলো তা এক বিস্ময়।বহু পুরুষের ছোঁয়া পাওয়া নারী এই এক পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট কেন হলো তা সে জানে না।এর কোনো ভবিতব্য নেই সে জানে।কিন্তু ছেঁড়া ফুলকেও পানিতে ভিজিতে রাখলে তা কিছু সময় সতেজ থাকে।তেমনি এক আশায় সে বুক বেঁধেছে।

রাত গভীর হলো।ঠিক যখন রেবতী জানালা আটকে দিবে তখন ঢুলতে ঢুলতে নকুলের প্রবেশ।ধীরে ধীরে তার ঘরের দিকে অগ্রসর হলো নকুল।রেবতী আয়নাতে একবার নিজের মুখটা দেখে নিল।বড় টিপ আর মোটা সিঁদুর নকুলের বড় পছন্দ।তাই রেবতী প্রতিবার তার জন্য আলাদা করে সাজে।দড়জায় টোকা পড়ল।রেবতী ছুটে গিয়ে দড়জা খুলল।ঘরের বাতি নিভল।নকুলের গায়ের ভোঁটকা উগ্র গন্ধ ছড়াতে লাগল।

****

নকুল উঠে বসল।নেশাটা ছেড়ে দিয়েছে।রেবতী চাদর টেনে উঠে বসল।
-নকুলবাবু একটা কথা বলব?
-বলো।
-আমাকে ভালবাসবেন?আমাকে নিয়ে পালাবেন?
-কিহ!
একটানে রেবতীর হাতটা শরীর থেকে সরিয়ে উঠে দাঁড়াল নকুল।ছি ছি।বিয়ে করলে সুশীল চরিত্রবান মেয়েকে।বেশ্যাকে বিয়ে!ছি!
-কি হলো বাবু।
-তোকে?ছাড় মাগি।চরিত্রহীনাকে বিয়ে করবে নকুল?
-বাবু!
-বেশ্যাদের স্বামী লাগে না।এমনিই তো চরিত্র খারাপ।
-আচ্ছা?তা আপনার চরিত্র খানা কোনদিক দিয়ে খাসা?আমার পেটের বাচ্চা আপনার।আমার কাছে আর কোনো খদ্দের আসতে দিইনি।
-ছি।তোর পেটে সন্তান পড়লে তা নষ্টার সন্তান বুঝলি?
-আমার সন্তান যদি নষ্টার সন্তান হয় তাহলে আপনার সন্তান ও দুশ্চরিত্রের সন্তান।সে যেই মায়ের পেটেই পরুক।
-দেখ রেবতী সব মেয়ে তোর মত রাস্তার ছিনাল নয়।
রেবতী কথা শেষ করতে না দিয়ে উঠে দাড়াল।চোখ চিক চিক করছিল।রাগে ক্ষোভে দুঃখে।সে সায়ার উপরে উড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নকুলের পকেটে হাত দিয়ে সব টাকা বের করল।সেগুলো টেবিলে রেখে সোজা নকুলের কলারে ধরল।নকুল চমকে উঠল।
-রেবতী কি করছিস?শাল….
-বেশ্যাকে চরিত্রহীনা বানানো যায় না বাবু।বেশ্যার তো চরিত্রই নেই।

হেঁচকা টানে সে নকুলকে নিচে নিয়ে চলল।নিচে আরো খদ্দের বসে।এমন মাঝে মাঝেই হয়।টাকা কম পেলে আরো মেয়েরা এমন করে।তাই তারা কেউই চকিত হল না।শুধু উঠে দাঁড়াল জমিলা আপা।এত দিনের খদ্দের আজ হলো কি?
-রেবতী!কি করছিস।কি করেছে নকুল বাবু।
-এই বাবু আর জনমেও যেন আমার ঘরে না যায় এ আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম আপা।
-আচ্ছা বোন।কিন্তু হলো কি?
ওদিকে নকুল একবার চিৎকার করে উঠল।
-আপা কাজটা কিন্তু ভাল হচ্ছে না।বাইরের কেউ দেখলে আমার ইজ্জত যাবে।রেবতী ছাড় বলছি।থানা পুলিশ করব কিন্তু।
-তুই রেবতীকে পুলিশের ভয় দেখাস?আয় আজ আমার সাথে আজ তোকে সোজা বাজারের মধ্যে নিয়ে ফেলব।পুলিশ সুপার আমার পালা গোলাম।
রেবতী নকুলকে টানতে টানতে সোজা বাজারে মধ্যে নিয়ে গেল।অন্য মেয়েরা শুধু বিল্ডিং থেকে বের করে দেয়।কিন্তু বাজারের মাঝামাঝি এনে ফেলে দেওয়া দেখে সবাই হা করে আছে।নকুল এবার উঠে সজোরে একটা থাপ্পড় মারল রেবতীকে।
-বেশ্যা মাগি।তুই আমার গায়ে হাত দিস!

রেবতী এক পলকের জন্য ইচ্ছা হচ্ছিল মরে যায়।এই নকুলকেই সে ভালবেসেছিল?কিন্তু রাগ এবার চিন চিন করে ছড়িয়ে পড়ল।রেবতী পা থেকে জুতা খুলে সটান নকুলের মুখে মারল।সবাই হতবাক।
-তুই বেশ্যাকে শুতে দেখেছিস।বেশ্যার বেশ্যামো দেখিসনি বাবু।আজ দেখবি।
বলে সে নকুলের পাঞ্জাবী বুকের বা পাশে হাত রেখে ক্ষণকাল থামল।তারপর খামছে সেই দিক ছিড়ে দিল।
*****
পরের সন্ধ্যায় আবার মজলিশ বসল।জমিলা আপা নিজ কন্ঠে গান ধরেছে।
“তুমি পুড়িও তখন আমারই মতন
বুকে লইয়া দুঃখের চিতা।।
বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা।”
দু ফোটা চোখের জল জানান দিল যে সে পরজনমের আশায় বসে আছে রেবতীও।

তিন.
গাগড়াটা একটু উচুতে তুলে দেবকি এগিয়ে গেল।চাঁদের আলো মাটিতে চুমু খাচ্ছে।আর দুটো অপেক্ষার চোখ দাড়িয়ে।ডেরার বাইরে দাড়িয়ে আছে দেবকি।গুরুমা মানা করছিল বারবার।রাত বিরাতে এভাবে দাড়িয়ে থাকা ভাল না।কিন্তু আজ তিন বছর সে এভাবেই দাড়িয়ে অপেক্ষা করে।তার কেষ্টদার জন্য।সেই কেষ্টদা।সেই ভালবাসা যাকে সে ফেলে রেখে এসেছিল নদীর ওপাড়ে।
জন্মগত আলাদা মানুষ সে নিজে।নইলে আজ সে দেবানুজ থেকে দেবকি হতো না।হ্যাঁ সে হিজড়া।তার বৃত্তি হিজড়া।কিন্তু সে তো চেয়েছিল ভদ্র সমাজে বাঁচতে।শুধু নিজের মত করে।কিন্তু নিজের মত করে বাঁচা সে সমাজের নিয়মে নেই।যেদিকে নদী নিজের মত বইতে পারে না সেই দিকেই বাঁকের সৃষ্টি হয়।তাই তার জীবনেও বাঁক এসেছিল।পরিবারে জায়গা পেল না।সমাজে পেল না।মসজিদ মন্দিরে পেল না।পেল তার গুরুমার কাছে।

সেই যে সে গ্রাম ছেড়ে এপাড়ে এল আর যায়নি।গ্রামে তাকে বুঝত একমাত্র তার কেষ্টদা।আর সেদিন তার হাত ধরে বলেছিল,”তুই যা দেবা।আমি তোরে আনতে যামু।”নিতে এলেও দেবকি ফিরবে না।কিন্তু কেষ্টদা তো এখানে আসবে।সে তো ওই রাতে তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল ভালবাসে।তারপর জোনাকির আলো কত সাক্ষীই না হলো সে রাতের।কেষ্টদা এখানে চলে আসতে পারে।কিংবা তাকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে।
-এলা দেবকি।এদিক আয়।আর খারাইয়া থাহিস না।বাতাস লাইগ্যা অসুখ করব।
-যাই গুরুমা।
দেবকি আর দাঁড়ালো না।এই নিরাশ হয়ে ফিরে আসা তার নিত্যকর্ম।ঘরে বসে আলতা দিচ্ছিল দেবকি।কেউ গল্প করছিল।হঠাৎ বাতাসে কুপিটা একটু নড়ে উঠল।তার সাথে ভেসে এলো অতি চেনা এক কন্ঠ।
-দেবা।

দেবকির ভেতরে একবার মোচড় দিয়ে উঠল।কেষ্টদা!হ্যাঁ হ্যাঁ কেষ্টদা!নিশ্চয় সে এসেছে।সবাই উঠে বাইরে এলো।বাইরে এসে দেখল সেই কেষ্টদা।একটু ও পাল্টায়নি।পাল্টে গেছে সে নিজে।কিন্তু তার মন প্রান আজও কেষ্টদার জন্যই।
-কেষ্টদা!এতদিন পরে আইলা।আমি রোজ তোমার জন্য ওইহানে খারাইয়া থাকতাম।আইজ তিন বছর হইল।আমার কথা মনে পড়ে না?
-পরে তো।কিন্তু এত চাপের মাইঝে থাকি।সময় হইয়া উঠে নাই।
-তিন বছরে বুঝি ঘুমাও নাই?
গুরুমা ধমকে উঠলেন।
-আহা দেবকি।পুলায় আইছে তারে খানা পিনা তো দে।তা আ গো বাজান।খাইতে পারবা তো আমাগের ঘরে?নাকি মায়েরে ঘেন্নাও?
-না না মাসি।ছি ছি।
এখনও ডেরাই কারো খাওয়া হয়নি।দেবকি তার ভাগের মাছের ভাজিটা কেষ্টদার পাতে তুলে দিয়ে পাশে বসল।কেষ্টদাকে দেখে দেখে তার প্রান ভরে না।চোখ বার বার জলে ভরে যায়।এতদিন পরে কেষ্টদা এলো।এতদিন কি করে ছিল সে।কতই দুঃখ না জানি হয়েছে তার।কত কষ্ট না জানি সে পেয়েছে।

খাওয়া শেষে কেষ্ট বাইরে এসে অনেকক্ষন গল্প করল।নিজের কথা তেমন কিছুই বলল না।আগের কথা সব এড়িয়ে যাচ্ছিল।যাওয়ার আগে গুরুমাকে বলল,”মাসি কাইল আপনাগো দাওয়াত।দেবা আমার কাছের মানুষ।তাই বাড়ি বইয়া আইসা দাওয়াত দিলাম।কাইল সারাদিন আপনাগো আমার বাড়ি থাকতে হইব।”
-কিসের দাওয়াত কেষ্টদা?
-আরে আসল কথা তো ভুইলাই গেছি।আরে তোর বউদির সাত মাস।সাদের অনুষ্ঠানে তোরা সবাই যাইবি।

দেবকির পায়ের নিচে হঠাৎ কেঁপে উঠল।তিন বছর ধরে সে স্বপ্নের অবাস্তব মেঘে সে ভাসছিল আজ এক কথায় সে মাটির বাস্তবতায় যেন মুখ থুবড়ে পড়ল।পৃথিবী রসাতলে আজ কোনো ফারাক পাচ্ছে না সে।গুরুমার দিকে তাকাল একবার।বেচারি কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না।শেষ দিকে কেষ্ট ফিরে গেল।কাল পুজো আছে বলে গুরুমা তাকে সান্তনা দিয়ে দিল।
এই জন্যই কি কেষ্টদা আগের কথা এড়িয়ে যাচ্ছিল?দেবকি সবার আড়ালে হঠাৎ ডেরা ছেড়ে পরেরদিন ঘাটের কাছে গেল।রাত অনেক হল।মাঝি চাচা তাকে ভালই চিনে।তার নাইয়ে করে সে তার বাড়ির কাছে এলো।তিন বছর পর তার বাড়ির প্রতি কোনো টান অনুভুত হল না।শুধু কেষ্টদার বাড়ির পিছনের জঙ্গলে কেষ্টদাকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করল,”কেষ্টদা চলো পলাইয়া যাই।তুমি না আমারে ভালাবাস।”
-একি কথা দেবা।ছিঃছিঃ।তোর কি মাথা খারাপ?আমি মরদ পোলা।না না এ হয় না।
হাত তুলে হাত জোর করে কেষ্ট চলে গেল।দেবকি ফিরে চলে।

****

মধ্য রাত।চাঁদ আকাশের মাঝে।নদীর জল চিক চিক করে সেই আলোয়।সে জল টানে দেবকিকে।ইচ্ছা করে ঝাঁপ দেয়।কিন্তু সে দেয় না।মাঝি চাচা এককালে বাউল দলে গান ও করতেন।দেবকিকে কত শুনিয়েছে।
-চাচা একখানা গান ধরো না।বুকটা জানি ছিড়া যায় গো চাচা।গাও না।
মাঝি চাচা বাউল সুরে গলা ছেড়ে গান ধরে।ধ্বনিত হয় তা পুরো নদীতে।এপাড় ওপাড়।
“ভাবিয়া শরদ কয়,ওহে কৃষ্ণপদ
প্রেমের মায়া ডোরে আমারে বান্ধিও।।
আমি মরিয়া হইব,শ্রীনন্দের নন্দন
তোমারে বানাইব আধা…আধা।।
বনমালী গো তুমি পরজনমে হইও রাধা”

লেখকঃআনন্দ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.