বেলাশেষে

লেখকঃ রাত সিংহ মেঘ

কফিকাপে ঠোঁট ছোয়াতেই বুঝলাম দেরি করে ফেলেছি, ধোয়া উঠা গরম কফিটা আমার অতীত স্মৃতিচারনের মাঝে ঠান্ডা শরবত একেবারে।

রাতের অন্ধকার যেমন বার বার ফিরে আসে তেমনি আমাদের অতীতও কখনো পিছু ছাড়ে না, কারণে অকারণে,ঘৃনায় ভালোবাসায় সর্বদা অতিত আমাদের তাড়া করে। তবে এখন আর বুকের গভীরে চিনচিনে ব্যাথাগুলো হয় না, একসময় সব সয়ে যায় । বরং ভাবতে ভালোই লাগে। অতীত এর কালো স্মৃতি হয়ে যায় এগিয়ে চলার শক্তি।

৪ বছর অনেকটা সময় তবুও মনে হচ্ছে আরে এইত সেদিনের কথা, অমাবস্যার মত অন্ধাকারাচ্ছন্ন সেই রাত, মেঘের চাদরে ঢাকা আকাশ, চারিদিকে পিনপতন নিরবতা, এ যেনো ঝড় উঠার পূর্বমুহূর্ত, হ্যা ঝড় উঠেছিলো সেদিন, আমার মনের মাঝে, এক রাক্ষুসে ঝড়, চূর্নবিচুর্ণ করছিলো আমায়,,,
ক্যাফে ২৪ আমার সবচেয়ে প্রিয় স্থান একপলকেই যেনো হয়ে উঠল অভিশপ্ত।

জয়ন্ত আমার ভালোবাসা, সেদিন কি হলো জানি না জয়ন্তেরর মাঝে যেনো সেদিন অন্য কেউ ছিলো, এই জয়ন্ত কে আমি কোনদিন দেখি নি আগে। কফির আমেজ নিয়ে ভারি ভারি গলায় বলছিলো…….চিল প্রিয়, বিয়ে তো করতেই হবে আজ না হয় কাল। এর জন্য এত কিসের কান্না। প্লিজ স্টপ ক্রায়িং। উফফ তোমার ন্যাকামো দেখলে……দেখো তুমি যদি কান্না না থামাও আমি কিন্তু চলে যাব এখনি, আমাদের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে, এটা একটা পাব্লিক প্লেস প্রিয়। ওহ গড।

আমি অপলক তার দিকে তাকিয়ে আছি, জানি না কেন চোখদুটো এত জ্বলছিল, চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। কথা বলতে পারছিলাম না,ধরা গলায় বললাম

– জয়ন্ত, তুমি তো বলেছিলে আমরা একসাথে থাকব, দু রুমের ছোট্ট গুছানোএকটা ফ্লাট, অল্পকিছু ফার্নিচার, তুমি আর আমি, হাজারো খুনসুটি, রাতে তুমি রান্না করবে আর সকালের ব্রেকফাস্ট আমি। কত স্বপ্ন জয়ন্ত, প্লিজ এভাবে শেষ হতে দিও না। প্লিজ জয়ন্ত আমি পারব না তোমাকে ছাড়া।

প্রতিউত্তরে জয়ন্ত দমফাটা উচ্চস্বরে হেঁসে বলেছিল, আর ইউ ক্রেজি প্রিয়। হাহাহাহাহাহাহ। ওহ গড, তুমি না….. এত ন্যাকা কেন তুমি।

জয়ন্তের কথাগুলো এমন ছিলো যেনো আমি খুব মজার কথা বলেছি বা খুব বোকা টাইপ কথা।

-প্রিয়, দেখো আমি বুঝতে পারছি তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছ, কিন্তু বাস্তবতা বলে একটা কথা আছে, এটাকে ভবিষ্যৎ বলে না। আমার একটা ফিউচার আছে, আর সমাজ, সমাজ কি বলবে। দেখো আমি তো তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি না, আমার বউও থাকবে তুমিও থাকবে, এখন প্লিজ আর কেঁদো না, আমাকে উঠতে হবে, বিয়ের অনেক কেনাকাটা আছে। তুমি কফিটা শেষ করে একটা রিক্সা ডেকে চলে যেও কেমন, বাই।

– জয়ন্ত প্লিজ আর কিছুক্ষণ থাকো আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।

-আহহহ প্রিয় বিরক্ত করো না, আজ নদীর সাথে আমার শপিং এ যাওয়ার কথা বিয়ের কেনাকাটা করার জন্য। ও বলতে ভুলে গেছি, আমার ওয়াইফ এর নাম নদী ।

-ও এখন থেকে নদীই তোমার সব, আর আমি, যখন বিয়েই করবে তবে রোজ রাতে আমাকে ক্ষতবিক্ষত করতে কেনো, তখন তো পা চাটতেও রাজি আর এখন নদী, ছি।
কথা গুলো হিসহিসিয়েই বলেছিলাম তবুও জয়ন্ত শুনেছিলো সব, কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, তোর মত হাফলেডিস পোলাদের বিছানায় মানাই ঘরে না, আর এত যে কথা বলছিস, বিছানায় গেলে তো ভালোই কোমড় নাচাতে পারতি, এখন এত কথা ক্যানো। তুইও মজা নিয়েছিস আমিও , ব্যাস।

এটাই ছিলো জয়ন্ত আর আমার শেষ কথা, সময় তার আপন গতিতে চলে যায়। না চাইলেও জীবনের তাগিদে সময়ের সাথে আমাদেরও চলতে হয়৷

সেদিন ঘন্টার পর ঘন্টা আমি কনকনে শীতে বাথরুমে শাওয়ার এর নিচে বসে ছিলাম, কান্নাগুলো যেনো আটকে গেছিলো, নিজেকে খুব নোংরা লাগছিলো, কাপড় ধোয়ার ব্রাশ দিয়ে সারা শরীর ঘষছিলাম, মনে হচ্ছিলো কেউ যেন সারাশরীরে বিষ্ঠা লাগিয়ে দিয়েছে কিছুতেই যেন পরিষ্কার হচ্ছে না।

স্বাভাবিক হতে একটু সময় লেগেছিলো ঠিকি কিন্তু আমি পেরেছি, সেই রাত আজ আমার চলার পথের সবচেয়ে বড় শক্তি।

ভাবিনি আর কখনো দেখা হবে জয়ন্তের সাথে,,, কিন্তু হলো। সত্যি ভাগ্যবিধির কাছে আমরা নিতান্তই খেলার পুতুল৷

৪ বছর, অনেকটা সময়, কালকে কি দিয়ে খেয়েছি সেটা হয়ত ভুলে গিয়েছি কিন্তু ৪ বছর আগের সেই রাত, জয়ন্ত এর বলা প্রতিটি কথা আজো আমার কানে বাজে, রোজ রাতে আমি যেনো ফিরে যায় ৪ বছর পূর্বে,
.
অনেক কিছু পালটে গেছে, পালটে গেছি আমিও। পালটে গেছে সময়ও, কে যেনো বলেছিলো হিস্ট্রি রিপিট ইটসেল্ফ, হ্যা ইতিহাসের পূরনাবৃত্তি হলো আবার ফিরে এলো সময় , তবে ভিন্নতা নিয়ে, এবার সময় আমার,

জয়ন্ত এর চোখের নিচে ব্যার্থতার অশ্রু চিকচিক করছে। আহ চরম প্রশান্তি, এতদিন এর অপেক্ষা, এত আক্ষেপ যেনো আজ পূরন হলো৷ এটাই দেখতে চেয়েছিলাম।

কি ব্যাপার জয়ন্ত খাচ্ছ না যে, সময় বদলে গেলেও এখানকার কফিটা কিন্তু আগের মতই রয়েছে, কিছু জিনিস যেনো কখনো বদলায় না, চিরন্তন থাকে। আচ্ছা, তোমার চোখ লাল কেন, কান্না করেছো নাকি??

জয়ন্ত আমার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে, যেমনটা আমি তাকিয়ে ছিলাম সেদিন, ভালো করে চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম এই কি সেই জয়ন্ত যে কোনদিন আমাকে একটুখানি দেখার জন্য বাসার নিচে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকত। রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে আমার সাথে কথা বলত,, আমি ঘুমিয়ে গেলে রাগ করে থাকত । সত্যি মানুষ চিনা বড় দায়৷

-কি হলো জয়ন্ত তাকিয়ে আছো কেনো ওভাবে, কি দেখছো??

আমার চোখেমুখে বিজয়ীর হাঁসি,

-আগের থেকে অনেক বদলে গেছো প্রিয় তুমি, আরো বেশি সুন্দর হয়ে গেছো।

এটাই জয়ন্তের বলা প্রথম কথা আমার উদ্দেশ্যে।

-হাহাহাহাহাহ তাই, সুন্দর তো আমি আগে থেকেই ছিলাম জয়ন্ত । তবে তা হয়ত তোমার চোখে পড়ে নি,,,একটু মোটা হয়েছি অবশ্য,,,,আর বদলে গেছি বলছো, হ্যা তা সময় আর কিছু কালো অধ্যায় আমাকে বদলাতে বাধ্য করেছে। কথায় বলে না মানুষ কারণে অকারনে বদলায়৷ আমিও বদলে গেছি কিছুটা কারনে আর কিছু প্রয়োজনে।

মনের মাঝে যেনো সেই তুমুল ঝড়টা আবার উঠেছে, অবাক লাগছে এতগুলো দিন বাদেও আমার এই নরকের কীট শ্রেনীয় প্রানীটার জন্য কষ্ট হচ্ছে, এখনো অনুভূতিগুলো মরে নি, নিজের উপরেই রাগ উঠছে৷

– তুমি কি আমায় এখনো মনে করো প্রিয়…? আমি তোমাকে প্রতি মুহূর্তে ভাবি, জানি প্রিয় বেলা যে চলে গেছে৷ তবুও এই বেলাশেষের সময় আজো তোমাকেই আপনা লাগে, তোমাকেই চাই প্রিয়৷

-হাহাহাহাহাহ ওহ জয়ন্ত, আমাকে দেখছো ভালো করে, আমি আর আগের প্রিয় নেই, যে তোমার এই সাহিত্য থেকে ঝাড়া দুটো কথা শুনে গদগদ হয়ে যাবে, সো প্লিজ এসব আর আমাকে বলো না ৷
আর এত সময়ই বা কোথায় তোমাকে নিয়ে ভাবার,
এনিওয়ে তোমার ওয়াইফ কেমন আছে? বললাম নিয়ে আসতে আনলে না?

-বড্ড অহংকার হয়েছে তোমার প্রিয়, এত অহংকার ভালো না, ভুলে যেও না অহংকার মানুষকে মাটিতে পতিত করে, এত অহংকার তো চাঁদেরো নেই মনে হয়।

– অহংকার করব কেনো জয়ন্ত এটাই সত্য, আর চাঁদ, সে তো কলঙ্কিত, আমি তো কলঙ্কিত নয়, এতটুকু অহংকার তো আমার শুভা পাই। অহংকার করার মত কিছু আছে বলেই অহংকার করছি তাই না। আর ভুলে যেও না চাঁদে গ্রহন লাগে হ্যা আমাতেও লেগেছিলো গ্রহন তবে গ্রাস করতে পারে।

কিছুটা নিরবতা, কাপের টুংটাং আওয়াজ, গরম কফির আমেজ..
আজ আকাশে গুমোট কালো মেঘ, ঝড়ের পূর্বাভাস।

কিছুটা আনমনেই জিজ্ঞেস করল প্রিয়, তো তোমার জব কেমন চলে, আর সংসার? , কি যেনো নাম বলেছিলে তোমার স্ত্রী এর , নদী তাই তো, কেমন আছে সে ???

নদীর কথাটা জিজ্ঞেস করতে গলা ধরে আসছিলো, চোখগুলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো৷

হাত থেকে কফি কাপ নামিয়ে কিছুটা চুপ থেকে জয়ন্ত বলতে শুরু করলো,….. আসলে কি জানো প্রিয়, আমার কপালটাই খারাপ,
নদীর সাথে বিয়ের পর আমি বেশ সুখীই ছিলাম, কিন্তু কেনো জানি বারংবার তোমাকে ফিল করতাম, হয়ত আগে বুঝি নি তোমাকে কতটা ভালোবেসেছিলাম, দিন যেতে লাগলো আমি ধীরে ধীরে নদীতে অভস্থ হতে লাগলাম, আমার পৃথিবী জুড়ে শুধুই নদী তখন,

একদিন অফিস সেরে বাসায় গিয়ে দেখি নদী ঘরে নেই, ছাদের কোনে আনমনে দাঁড়িয়ে আছে কাছে যেতেই বলল, আমার জীবনে অন্য একজন এসেছে জয়ন্ত, আমি আর আগের মত তোমাকে ভালোবাসতে পারবো না….
বুঝে উঠতে পারছিলাম না কি বলব, আমার ভ্যাবাচ্যাকা মুখটা দেখে নদী আওয়াজ করে হেঁসে উঠলো, হাতে একটা ম্যাডিকেল রিপোর্ট ধরিয়ে বলল তুমি বাবা হচ্ছ বোকা ,

নদী কনসিভ করলো…ভাবতে পারবে না আমি যে কতটা খুশি হয়েছিলাম তখন,নিজেকে মনে হচ্ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ,

এতটুকু বলে জয়ন্ত থামলো, ওর চোখে মুখে বাবা হওয়ার আনন্দ আবার কোন কিছু না পাওয়ার হতাশা,,
জনন্ত কিছুটা থেমে আবার বলতে শুরু করলো, কিন্তু জানোই তো সুখ বেশিদিন টিকে না, আমার কপালেও হয়ত তাই লিখা ছিলো, সব শেষ হয়ে গেলো এক নিমিষেই, কালঘড়ি থমকে গেলো৷ নদী আমাকে ছেড়ে চলে গেলো একা করে…।

জয়ন্তের চোখের কোনে একবিন্দু অশ্রু চকচক করছে, সত্যি সত্যি ভালোবেসেছিলো হয়ত নদীকে, যে ভালোবাসাটা আমি দেখতে চেয়েছিলাম আমার জন্যে । না পাওয়া ভালোবাসার কষ্টটা মৃত্যু যন্ত্রনার চেয়েও কঠিন৷

গুমোট আবহাওয়া আরো গুমোট হয়ে এলো, পরন্ত বিকেল রূপ নিলো কালো রাত্রিতে… যেখানে রয়েছে শুধুই অন্ধকারের হাতছানি..

প্রিয় একটু আড়মোড়া দিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে অবহেলায় জিজ্ঞেস করলো… শুধু শুধু তোমাকে ছেড়ে যাবে কেনো, কোন কারণ অবশ্যই তো আছে…

জয়ন্ত একটু স্থির হয়ে ঠান্ডা গলায় হ্যা আছে, সব দোষ আমার, আমার ভিতরের দ্বিতীয় সত্বা আমাকে শেষ করে দিয়েছে….নদী কন্সিভ করার পর থেকে আমার ভিতরের সত্বাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে লাগলো, নদীর অগোচরে চরিতার্থ করতে লাগলাম আমার কামনা বাসনাগুলো…ঠিক এমনি একদিন নদী আমাকে গোপন অভিসারে দেখে ফেলে…..

– এরপর সে তোমাকে ছেড়ে চলে যায় তাই তো, এত কিছুর পরেও বলছো তুমি নদীকে ভালোবাসেছিলে, ভালোবাসা মানে কি তুমি আদো জানো জয়ন্ত…..। যে সময়টাই তোমার নদীর ছায়া হয়ে পা্শে থাকার কথা ছিলো ঠিক সে সময়টাই তুমি মেতেউঠেছে শরীরী উল্লাসে৷ ধিক্কার জানাই তোমায় আর তোমার মত নরপিশাচদের।

জয়ন্তের চোখে অশ্রুসজল, অনুতাপ থেকে এই কান্না নাকি অভিনয় তা প্রিয় জানে না, তবে এক পৈশাচিক আনন্দ মিলছে এ থেকে৷

– সব হারিয়ে নিঃস্ব আমি, নদী চলে যাওয়ার ৬ মাসের মধ্যে ইতি ঘটলো আমাদের বৈবাহিক জীবনের, নতুন কারো সাথে আজ সুখে সংসার করছে৷ আমি আমার ভুলগুলো বুঝতে পেরেছি প্রিয়, আমি তখন বুঝি নি ভালোবাসা কি, ভালোবাসাহীন জীবন যে কতটা কষ্টের…….

জয়ন্ত কান্নায় ভেঙে পড়েছে, এত বড় ছেলেকে কাঁদতে দেখে অনেকেই তাকিয়ে আছে, ঠিক যেমনটা সে রাতে আমার দিকে সবাই হা করে চেয়ে ছিলো। হিস্ট্রি রিপিট ইটসেল্ফ।

কিছুটা সামলে নিয়ে জয়ন্ত আবার বললো আমি আজ তোমাকে ভিক্ষে চাইছি প্রিয়, আমি তোমার কদর আজ বুঝেছি প্রিয়৷ আমাকে ফিরিয়ে দিও না প্রিয়৷ এই যে আমার চোখের জল দেখছো এটা শুধুই তোমার জন্য, এই কান্না মিথ্যে নয়, আমি আবার তোমার হাতটা ধরতে চাই, আমি তোমাকে আকড়ে বাঁচতে চাই, প্লিজ প্রিয় আমরা আবার এক হয়ে যায় ….এবার সব ঠিক থাকবে,,,আর আমি যদি কোনো ভুল করি আমাকে শুধরে দিও, আর একবারটি আমার হয়ে যাও,,,,,,

মেঘের আড়াল থেকে সূর্য আবার উঁকি দিতে শুরু করেছে, এক চিলতে রৌদ ঝকমকিয়ে উঠেছে, ঝড় এলো এলো করে এলো না,

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম বাচ্চাদের মত কান্না করছে জয়ন্ত, কান্না করলে ওকে একদম বাচ্চাদের মত লাগে, কাছে গিয়ে চোখ দুটো মুছে দিলাম,
শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আমাকে..আলতো করে চুমু একে দিলাম ওর গালে….কানের কাছে হিসহিসিয়ে বললাম, ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি তোমায়, সারাটাজীবন এভাবেই বেসে যাব।
.

এতটুকু রাস্তা কি আমি একা যেতে পারতাম না, শুধু শুধু আসার কি দরকার ছিলো এক বাবা আর এক তুমি, তোমরা কি আমাকে বড় হতে দিবে না ‘অহম’ ।

বেলা ফুরিয়ে সাজ সন্ধ্যা, সূর্য অস্তমিত যায়, হালকা বাতাস সেই সাথে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, অহম ছাতা ধরে আছে….কি কারণে যেনো আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে,

– অহম, আমার খুব বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হচ্ছে,,, ছাতাটা সরাও…

অহম আমার দিকে তাকিয়েই আছে, কেউ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমার খুব অস্বস্তি হয়৷
অহম ছাতাটা আরো ভালো করে ধরেছে আমার মাথায়, যেনো বৃষ্টির ধারা যেনো একদম না লাগে আমার গায়ে,

– এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো, যেনো গিলে খাবে, চোখ সরাও তো, আমার আনকমফর্টেবল লাগছে, আর ছাতা সরাতে বললাম না… কোনো কথায় দেখি শোনো না তুমি।

অহম গোল গোল করে তাকিয়েই আছে, মুখে কোনো কথা নেই।

রাস্তাটা নিরব, বৃষ্টির কারণে আরো বেশি নিস্তব্ধতা ছড়িয়েছে। ভালো লাগছে,

আচমকা অহম হাত ধরে কাছে টেনে নিল, গলা জড়িয়ে ধরলো নাকে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে দিলো,

– উফফফ শুরশুরি লাগে তো, রাস্তার মধ্যে পাগলামি হচ্ছে, ছাড়ো তো,,,,,

অহম আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে আমায়, ওর কাছে হারানোর ভয়, এক রাশ সংশয়।

– তুমি জয়ন্তকে আজো ভালোবাসো তাই না প্রিয়…এত ভালোবাসো কেনো ওকে।

দূরের পাখিরা ঘরে ফিরছে ঝাকে ঝাকে, নিজেকে অহমের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘরে ফেরার পাখি দেখছিলো প্রিয়, মেঘ গুলো ভেসে ভেসে বেরাচ্ছে,

– আকাশ কত সুন্দর না তাই না অহম,,, কত হাজারো রঙ কত হাজারো রূপ৷ কখনো শ্বেত শুভ্র কখনো সীমাহীন নীল আবার কখনো কালচে ধূসর, আমাদের জীবনও ঠিক তেমনি, জীবনের বাকে বাকে কত হাজারো রঙের মেলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

অহম আমার দিকে তাকিয়ে আছে আবার আগের মত করে,,, বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগছে গায়ে, বছরের প্রথম বৃষ্টি,,,,

– না অহম, জয়ন্তকে আমি আর ভালোবাসি না,নিজেকে ভালোবাসি, ভালো আছি, ভালো থাকার জন্যেই নিজেকে ভালোবাসি,

– প্রিয় আমাকে ছেড়ে যাবে না তো, আমি তোমায় অনেক ভালোবাসি প্রিয়, আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো না, তবুও আমি তোমার পাশে থাকতে চাই, এটলিস্ট তোমার মাথায় ছাতা ধরার জন্য হলেও প্লিজ আমাকে পাশে রেখো।

আমি অহমের হাতটা শক্ত করে ধরলাম,,,, অহম আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে৷ কিছু শোনার অপেক্ষায়,

ছাতাটা নামিয়ে দিয়েছি, ভিজতে ভালো লাগছে…. লুকানো কান্না বৃষ্টির জলে ধোয়ে যাচ্ছে, অহম আমার কাধে হাত রেখে হাঁটছে…বৃষ্টিতে ভিজে নাজেহাল অবস্থা বেঁচারার, আমি ছাতাটা ধরলাম এবার,।

– ছাতাটা আবার তোললে যে,,, তোমার না ভিজতে ইচ্ছে হচ্ছিলো,

– না অহম, এখন আর ভিজা লাগবে না৷ একটা গান গাইবে, অনেকদিন তোমার গান শোনা হয় না,,
অহম আমার হাতটাতে চুমু দিয়ে গাইতে শুরু করলো…..

“তুমি চাইলে মেঘও ছিলো রাজি
অপেক্ষা শুধু বর্ষনের”

সামনে এগিয়ে চলেছি আমি, পিছনে ফেলে এসেছি ক্যাফে ২৪, ভালোবাসাগুলো ছাই হয়ে গেছে অনেক আগেই, আজ আবার একবিন্দু আ্শার জাগরণ হয়েছিলো, কিন্ত কিছু ভালোবাসা অপূর্ণ থাকাই ভালো…সব পেলে জীবনের মানেটাই থাকে না৷ জয়ন্ত আর আমি কখনোই আমরা হতে পারব না, দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা।

অহম আমার কল্পনাপ্রসূত প্রেম, যার বাস্তব কোন ভিত্তি নেই, আমাদের মত প্রিয়দের জীবনে হাত ধরে চলার মত কোন অহম আসে না, বলে না ভালোবাসি কিংবা পাশে থেকো প্রিয়, হাজারো প্রিয় তাই এভাবেই কল্পনাপ্রসূত অহম কে নিয়ে বেঁচে থাকে, যে আমার মন খারাপের দিনে কাছে টেনে নেই, একলা দিনে পথ দেখাই, হোক না তা কল্পনা,,,
এমন ভালোবাসাই বা ক’জন পায়।

বেলাশেষে এভাবেই অতীতকে পদতলিত করে এগিয়ে চলতে হয়, ভালো থাকার কারণে, নিজেকে ভালো রাখার কারণে। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে এই ভেবে পথ চলা। অপেক্ষা করি পথের শেষ সীমানায় হয়ত দেখা মিলবে এক টুকরো বাঁচার দিশা৷

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.