এমিল

লেখক: নিরালোকে দিব্যরথ


১.

: ব্যালেন্স চেক কর, স্যার। একশ’ টাকা পৌঁছে গ্যাছে।
: মনে চাইছে তোমাকে না একটা ঠুসে মারি।
: বাহ! কেন! আমি বুঝি কথা বলব না? তিনি হচ্ছেন, একটা ফকিরজাদা, কঞ্জুষ। শোনেন, আমারও গরজ আছে।

ভ্রু কুঞ্চিত হল শাহজাদার।
: এই যে পয়সাওয়ালা লোক। ব্যালেন্স আমার কাছে পাঠিয়েছ, আর সবগুলো ফোন দিচ্ছ তুমি। আমারটা থেকেই যায়।
: এই তুমি চুপ কর তো। আমার ফুসফুসের আধেক, আমার কলজের গোটাখানকে কল করব আমি। তাতে তোমার কেন পোড়ে!
: পোড়ে। অ্যাশট্রে লাগে।

বানোয়াট কেওসের পর সে তুড়িতে একগুচ্ছ গোলাপের হাসি দেয়। তারপর প্রশ্ন করে- আচ্ছা শোন না, আমাকে কেন ভালবাস?
: কেন? তুমি এক্কেবারে শিশুর মত, তুলো। আর কী প্রখর বুদ্ধি তোমার! স্বভাবে বেবিডল, এর মধ্যেই জীবনের ব্যাখ্যা চোদাও! সত্যি বলছি, আমি অবাক হই। তুমি হচ্ছো করুণাময়, দানবীর। কঞ্জুষ আদমজাদাকে কৃপা করে আশিক হয়েছ- যাকে ছাড়া কিছুই বোঝ না, মিঃ পারফেক্ট বয়ফ্রেন্ড, বুঝলে, বুঝলে!


২.

চট্টগ্রাম রেলওয়ে বোর্ড। সাত রাস্তার মোড়ে সেদিন সন্ধ্যায় সোডিয়াম, নিয়নের বাতি জ্বলেছিল! ল্যাম্পপোস্টের আলোর রঙ ঠিক মনে পড়ছে না। তবে মোড় পেরিয়ে এই শিরীষতলা মঞ্চটা ছিল না, এটুকু শাহার খুউব মনে আছে।

কে কেন প্রশ্ন করছে?
বললে পুঙ্খানুপুঙ্খ গুছিয়ে বলা দরকার। বেয়াড়া মন স্মৃতির পরতে পরতে ঘুরে বেড়াবে, তখন সব আদ্যোপান্ত বয়ান না দিলে যে আশা পূরণ হবে না।
কিন্তু জ্বর শরীরে এক রত্তি কলম চলছে না। তবু সুযোগ দিলে চেষ্টা করে দেখব, হাতড়ে যদি মাল পাই। আরম্ভ করি।

দুই হাজার তের ইংরেজি। কোন মাস? কী বারে? তারিখ? না, সবটা মনে নেই। শুধু বিকেলের পর সন্ধে- এরপরে রাত- এই ধারাবাহিকতা ফর্সা মনে আছে।
শাহা তার ভাল শার্টটি পরা, ছাইরঙ, সাদা স্ট্রাইপের (ঐ বছরই পরে একদিন যেটা ছিঁড়ে গিয়েছিল); সেদিন বোধহয় ছিঁড়ে গিয়েছিল শুধু উপরের দুই বোতাম।

শিরীষতলা না থাকলেও পাহাড়ে বাঁধানো ঘাটটা ছিল। এমিল তাকে খুঁচিয়ে বলেছিল, স্যার গো, তোমায় পরিপাটি দেখাচ্ছে। আর এই, আপনার বয়ফ্রেন্ড আসবে নাকি?

তারপর একগাল হেসে বলল, যাই হোক, তোমাকে খুব হট লাগছে।

পেন্ডুলামের হঠাৎ দিকভ্রান্ত হওয়ার মত শাহার বুকে একটা চিনচিনে ব্যাথা হয়েছিল। কী এমন সাংঘাতিক ঘটনা শোনাবে এমিল, গত রাত অবধি যার অজানা আশঙ্কায় শাহার চোখের নিচে ছয় ঘন্টার মধ্যেই কালি পড়ে গিয়েছিল।

রাত দুটো নাগাদ সে ছটফট করেছিল। তখন এ জন্যেই বোধহয় এমিল তাকে শুধু সান্ত্বনা দিতেই বলল, কোনও খুনে ব্যাপার নয়- আশ্বস্ত করছি।

শাহার মনে বিরাম নেই- দুরভিসন্ধি আঁচ করে!

এত অধৈর্য হচ্ছো কেন, একটু বোস না- ঘাটে জোর করে তার আঙুলে টান দিল এমিল। কিন্তু এবার শাহার পাথরের মুখাবয়বে দেখল ভাবনার লেশমাত্র নেই।

সেদিনের গত রাতে।
ঘড়ির কাটায় রাত নটায় শাহা নিজের বুকে ভালবাসার শান্ত নদী টের পেয়েছিল, মিস করেছিল। বলল- “এমিল, ভালবাসি, ভালবাসি”।
জবাবে এলো, “বলব বলব করে ভাবছি।”
“কী বলবে, বলো?”
এরও জবাবে…

“তোমার সঙ্গে আমার একটা জরুরি কথা আছে, স্যার”- এমিলের আট শব্দের প্রলয়, সেই বাক্য শাহার মনে যে বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তার পরের দিন চোখে দেখার পরে এমিলের নিশ্চয় মায়া-দয়া হতে থাকে। স্যাটায়ার দীর্ঘ হত তা না হলে।

এমিলের সারকথাটি হল, “তোমার সঙ্গে আমার এই সম্পর্ক কন্টিনিউ করা বড্ড ভুল হবে রে, স্যার। আমার মা আর বাবাকে আমি দুঃখ দিতে পারব না, অনেক ভালবাসি যে। তোমাকে ভাল লাগে আমার, মায়াবি হাসিটা ভাল লাগে, অসাধারণ কণ্ঠের আবৃত্তি, সুন্দর মন, মানসিকতা, সব ভাল লাগে। তুমিই আমার লোমহর্ষক সুখ। কিন্তু ভালবাসি এই মিথ্যে দাবি আমি করতে পারব না। কী হল, কিছু খাও?”
: না, না।

শাহার মনে ঠুনঠুন কলসির বিষণ্ণতা বেজে উঠেছিল, সে বিষণ্ণতা সিআরবির আড্ডার লোকারণ্য জনশুন্য করে দেয়া। কেউ নেই। শাহা ভাবতে থাকল, ‘ভাল লাগে’ বলা সহজ, কোনও জড়তা নেই, ঘেরাটোপ নেই, সত্যি ভাল লাগে, নাকি মিথ্যে ভাল লাগে তা নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজের অহেতুক কোন্দল নেই। কিন্তু ‘ভালবাসি’ বলা? কত সমীকরণ, কত সত্য-মিথ্যের খেলা, কত জেরা, কত ঠকানো, কত ‘সখী ভালবাসা কারে কয়’!

শাহার অকারণে মনে পড়েছিল, সাতদিন আগে রেলওয়ের মাঠের এই বাঁধানো ঘাটকে সাক্ষী রেখে, এমিলের পাশে বসে সে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল এমিলেরই উদ্দেশ্যে- ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’। অবশ্য ‘কাকে’ এ প্রশ্নের উত্তর সে এবং এমিল ছাড়া কেউ হিসেব রাখেনি। ঘটনাটা না জেনে কমেন্টবক্সে কয়েকজন মন্তব্য করেছিল- ‘আমিও ভালবাসি, শাহজাদা, আমরাও ভালবাসি।।

হ্যাঁ, কালনাগিন বদনবইয়ে তাদের পরিচয়। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা দিয়েছিল এমিল।

ঘোর লাগা ভাবনায় শাহা চোখ বন্ধ করলে এমিলের হাত লাগল ওর কপালে।
: কী ভাবছ, কিছু বলবে না?
: না তো।
: কিছু বলবে না তুমি। সবকিছু সহজে মেনে নিচ্ছ, স্যার?

: শাহা-
বিব্রত, অস্থির হয়ে এমিল চেঁচাল-
: শাহাজাদা-
: এমিল, আমি কি বলেছি আমি মেনে নিয়েছি?
: তাহলে?
: আমি কিছুতেই মানছি না। ইন ফ্যাক্ট, মানতে আমি পারছিই না, এমিল। খুব কষ্ট হচ্ছে। রাতে ঐ ভয়টাই আমি পেয়েছিলাম। জানতাম ভয়টা বদলাবে না। তাই তোমার জীবন, তোমার স্বাধীনতায় আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই না।
: উঠি আমি?
: একটু বোস না।
: কতক্ষণ?
: এই ধর, ঘন্টা তিন।

এই শিরীষতলের সম্ভবত সতের ফুট পেছনে বটগাছটির মূলগুটিকা নৈর্ঋত কোণসহ দশদিকে আজ ছড়িয়ে গ্যাছে। তখনও মূলের বিস্তৃতি ছিল। রঙচাওয়ালা খোঁজ নিয়ে যেত এইখানে এইপাশে। অথবা ‘ঝালমুড়ি চনাচুর ঝালমুড়ি চনাচুর’ বলে হাঁকত দাঁড়িওয়ালা এক লোক। লোকটা নেই। তবে লোক আছে।

সেদিনের সন্ধ্যানামা আবছা আলোয় মৌন আঁধারিতে এ গাছের গুড়িতে বসবে না, যখন বলল এমিল, আবার ভেতরে অন্ধকার গুহার মত দেখে তখন বলেছিল- চল, তোমার কাছে একটা জিনিস চাইব।

“অসম্ভব, আমি পারব না যে”- অটল, দৃঢ়, শাহা দাবি প্রত্যাখ্যান করায় তার শার্টের কলার চেপে ধরে এমিল একটা কি দুটো বোতাম ছিঁড়েও দিয়েছিল। হুঁশ ফিরে এলে সাথে সাথেই ছেড়ে দিল রেহাই না দিয়ে-
: বিনা বাক্যব্যয়ে আমি তোমাকে তিন ঘন্টা দিয়েছি। আমার অন্তিম এই আশা তুমি পূরণ করবে না?
: ছ্যাঃ ভাল করে ব্রাশ কর তুমি, মুখে গন্ধ। অসহ্য।

এমিল দমে গিয়েছিল। হো হো স্বরে হেসে উঠে পরক্ষণে নিজের দুটো হাত কব্জা করে মুখে চেপে ধরল নিজের। কী যেন ভাবল। তারপর সটাং সরে গিয়ে তর্জনী দেখিয়ে- ‘এখনই আসছি আমি, তুমি কিন্তু উঠবে না’ বলেই ভাগল।

: যাও কই?
শঙ্কিত হয়ে ওর ঠিক ঘাড়ের কাছে হাত রাখতে চাইলে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে একটা জেদে এমিল ঘোষণা করেছিল, ঐ মুখে চুমো আমি খাবই, ফ্রেশ মিষ্টি গন্ধ পাবে, একটু সময় দাও, অপেক্ষা।

মাগরিবের নামাজ শেষে পাশের মসজিদে মুসল্লির দল বেরিয়ে গেলে অযুর ঘরটিতে ঢুকল এমিল।
সাতদিন আগে, ননাই স্যারের হাত ছেড়ে এই জীবনে অন্য কোত্থাও যাবে না, মাথা কুটে দিব্যি দিয়েছিল এই ছেলেটা। মনে পড়তেই শাহা আপন মনে বিদ্রুপে ভ্রু কুঁচকাতে থাকে।

বিদায়বেলা। এবারে তিন ঘন্টার ঋণ শোধ করা চাই!

মুখ ধুয়ে জিভে ফ্রেশনারের লেবেনচুষ ঘষে এইদিকে ছুটে আসছে এমিল, অপলক তাকিয়ে শাহার মনে বাজল আবারও বিষণ্ণ গান- এই যে, তার ভেতরে ভূমিকম্পের আঘাতে ভেঙেচুরে হয়ে গেল ভীষণ ফাঁকা, ছিঁটোফোটাও কি বুঝতে পারছে না এমিল?

তুমি ভালবেসেছ, মিথ্যে ফিরিশতি কত শোনাবে? অভিযোগ করে বসল এমিল- এমন নিষ্প্রাণ চুমু শত্রুকেও কেউ দেবে না, এখন তো ব্যাড স্মেলের দোহাই দিতে পারবে না, মৌমাছি ভিড়বে আমার পাশে।

: বেশি বোক না তো, শত্রুকে চুমু দিতে যাবেই বা কোন বনমানুষ?- বলেই দৈত্যের মত এমিলের দুই স্তন নিজের স্তনের সঙ্গে সজোরে চেপে ধরে ওর ঠোঁট জিভ সব দাঁত দিয়ে আক্রোশে কামড়ে দিল শাহা। তারপর সেই কাব্যিক চুমো ত্রিশ মিনিটেও বিরাম পেল না। মাঝে শব্দ নেই। শাহা জানে, মুখের ঐ দুর্গন্ধ থাকলেও এমিলের সবটুকু থুথু সে চেটে খেত পরমানন্দে। তার ভেতরে কুঁড়ে খাওয়া বুকফাটা এই নিশব্দ আর্তনাদ, এক লোহিত সাগরের অভিমান কিছুই এমিল বুঝল না রে। অকারণে, অপ্রয়োজনে লজেন্স চিবোল।

এক সপ্তাহ আগে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল সেই স্মৃতি : এমিলের ভীষণ লাল হাতের আঙুল ধরতে গেলে সে অসহ্য শিহরণে হাত সরিয়ে নিয়েছিল, তারপর বলেছিল, জানতো প্রিয়, একটি মেয়েকে আমি ভীষণ পছন্দ করি, সেও আমাকে, আমদের সম্পর্কে যাওয়া প্রায় চূড়ান্ত। কিন্তু এখন তোমাকে ছাড়া আর কিছু ভাল লাগছে না। আমরা বয়ফ্রেন্ড হব।

উভকামী এমিলের মনে দৃঢ় প্রত্যয় এসেছিল একগামিতার। সে এ হৃদয়ে শাহা ব্যত্যয় দ্বিতীয় নাম খোদাই করবে না। শাহার মানসপট থেকেও মক্ষিকাদের নাম মুছে ফেলা চাই, এমিল ঐশীগ্রন্থের হলফ করিয়েছিল। অদ্ভুত ভাল লাগা কাজ করেছিল শাহার।

কিন্তু এমিল যৌন শিহরণ সইতে পারে না।

ছাই ছাই! চাই না শরীরিক মিলন। “এমিল আমার, শুধু আমার এমিল” শুধু এই একটা চিরন্তন ভরসায় আজীবনে শাহা নিষ্কাম ব্রতচারী হতে পারে, যার অন্য নাম দেয়া যেত, নন প্লেটোনিক প্লেটোনিক শঙ্কর ।

কীভাবে ঐ সময়ে লোকাল বাসে কামোত্তজেক পুরুষের যৌনাঙ্গের ঘষা শাহা উপভোগ করতে ভুলে গেল! অনির্বচনীয়! কেউ জানবে না পবিত্র সেই অনুভব, বুকের মধ্যে একটা প্রশান্ত মহাসাগর। শত জনমে দেখা মেলে না, আজ এসে ঠিক টের পায় শাহা। যদিও হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু তাতে তার কী দোষ!

দুঃখ হল, এ জীবনে দুর্ভাগা আর কক্ষনওই বুকের ঐ একটা বালিশের, ঐ একটা শান্তির পরশ পায়নি, ঐ প্রথম, ঐ শেষ নিশ্চিন্ত হওয়া, ব্যাপ্তি মাত্র দুটো সাপ্তাহিক বন্ধের সাধারণ অন্তর।

সাতাশি তে জন্ম তার। তেরতে এসে এমিলের সেই চুমো। আজ দুহাজার বিশের এপ্রিলে, তেত্রিশ বছর।

সুনীলের ‘কেউ কথা রাখেনি’ প্রিয় কবিতা, এ বছরই প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রবালদ্বীপ ট্যুরে শাহা পড়েছিল। এত সুন্দর আবৃত্তির গলা! ডিপার্টমেন্টের গণ্যমান্য ব্যাক্তিরা বাহবা দিয়েছিল। কিন্তু এমিল নাকি বরুণা?

আজকে শাহা ন্যাকামি অথবা বাঙময় বাক্যে জর্জরিত করেছে বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদী প্রেমিকদের, প্রত্যেকেই এমিলের পরবর্তী। অবশ্য এমিলের চেয়ে বেশিই স্থায়ী হয়েছিল তারা, তিন মাস… পাঁচ মাস… চৌদ্দ মাস অব্দি। কিন্তু শাহা বিশ্বাস করে না কাউকে। রাত দশটায় ঘরে ফিরে এসে দরজা ভিজিয়ে একা কম্পিউটারে একটা বিয়োগাত্মক সঙ্গীতায়োজন পুনঃপুন বাজিয়ে দিয়ে এমিলের পর তো আর কখনও কারও জন্য হু হু করে কান্না আসেনি তার। এখন সে হয়েছে ‘প্র্যাকটিকেল’।

এমিলের বিদায়ের রাতে ঘরে ফিরে ডেস্কটপের টেবিলে উপুর হয়ে পড়ে তার কান্না ছোট বোন দেখে ফেললে শঙ্কিত হয়ে বলেছিল, “কী হলো, ববাই।” দুর্বল স্বরে কী যেন জবাব দিয়েছিল শাহা, বোধহয়- “পিঞ্জর ছেড়ে গেছে টুনটুনি।” কথা না বাড়িয়ে ছোট বোন তার বুকের কাছে শাহার মাথা ঘেষে ঘেষে নিজেও চোখে পানি ঝরিয়েছিল।

সেই দুইহাজার তের। বটতলায় এই এমিলই শাহার দরবারে কাঙালের মত শুধু একটা কিস চাইল। ত্রিশ মিনিটের বেশি লেগেছিল গরম ওষ্ঠজোড়, অধরজোড় বিচ্ছিন্ন হতে। অথচ আগে সামান্য আঙুলের ডগা ছোঁয়াতেই অসহ্য যৌনতার জ্বালায় ছিটকে সরে যেত ছোকরা।

তৃপ্তির ঢেকুর তুলে এমিল বলেছিল “রাত ন’টা, হালিশহর যেতে হবে, জানতো স্যার, এবার আমায় উঠতে হবে।”
: স্যার সম্বোধন আর কোর না। শুনলে ছ্যাদা হয়ে যাচ্ছি। ব্যাথা পাচ্ছি।


৩.
এমিল কৌতূহলী হয়ে বললে, গল্পের ঐ ছেলেটা হালিশহরের নাম নিয়েছিল কেন?
: আই ব্লকে থাকত বলে।
: ভগবান, আমার ওখানে।

মিলে গেছে, কারণ এমিলকে বলেছিলাম, ‘এই গল্প সত্য ঘটনা অবলম্বনে’।

এমিল আনন্দিত স্বরে খুঁচিয়ে বলল, “এই স্যার, আমার সঙ্গে মিলিয়ে দেবেন।”
: লাইন মারবে নাকি? যাই হোক, সে দেশে নেই- মা-বাপসহ দেশ ছেড়ে গেছে।
: অহ, কই গ্যাছে?
: অস্ট্রেলিয়ায়, ফর গুড। মহাকাব্যিক প্রেমে ফেঁসে যাচ্ছিল বলেই না সপ্তাহ না ঘুরতেই তার সম্বিৎ ফিরে এল…

এভাবে শুরু করে একটা গীতিকাব্য গোছের প্রবন্ধ লিখে গলা ধরে এল আমার। ঘটনা সুবিধার নয় এমিল বুঝতে পেরে থামিয়ে দিল, থাক বাদ দিন। শুনছেন?

: হেই, ইউ দেয়ার? আমার কোনও দোষ নেই, একটা কথা বলছি, শুনছেন? আই মিস ইউ। আবারও বলছি আমার কোনও দোষ নেই।
: আমি চুপ
: আপনি মুড়ি খান। আচ্ছা স্যার না ডাকলে কী হয়!
: এক স্যারের উপর সেই লেভেলের ক্রাশ খেয়েছিলাম। স্যার আর স্টুডেন্টের প্রেমের মত প্রেমের আনন্দ আর হয় নাকি! তোমার আমার বয়সের যে সেই একই ব্যবধান। ফ্যান্টাসি বোঝ।


৪.

এক এপ্রিল, দুই হাজার বিশ ইংরিজি। সকালবেলায় পঞ্চাশোর্ধ্ব (বয়স) উভকামী বাসেত খান আমায় কুশল বিনিময় করলেন, “তোমার রিলেশনটির খবর কী?”

ক্লান্তিকর সেই জিজ্ঞাসা। হয় ‘আছে’ নয় ‘নেই’ ঘূর্ণিতে পড়ে গ্যাছি। উত্তর দিলেম ছোট্ট বাক্যে, এখন খুব ভাল।
: দেখা হল আর?
: দেখা আর কী করে হবে দাদা, বলুন? ভাটিয়ারিতে যাব ভেবেছি, পরিস্থিতির ভয়ে যাইনি, বিশ মার্চে হয়েছিল সিআরবিতে, শিরীষতলার সামনে সে আমাকে প্যান্টের পকেটে থেথো চকোলেট দিয়েছিল, মজা করে খেয়েছি। এরপর তো বাড়ি চলে এলাম। কভিড নাইনটিনের হুমকিতে সব্বাইয়ের মত আমিও গৃহবন্দি।
: তা বেশ! কিন্তু বলোনিতো কী নাম ওর?
: এমিল।
: খুব সুন্দর নাম। শিশুতোষ সুন্দর একটা ছবি দেখেছিলাম, ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’।

হাসি পেল আমার, ‘এমিল’ নামটি আমার সম্পূর্ণ বানোয়াট। বাসেত খান সেটাকেই রসিয়ে চলেছেন। আচ্ছা বলো তো, সবে সম্পর্কের এগার দিন হল। দুই সপ্তাহও নয়। এখনই যদি প্রচারের আলোয়! ভাবা যায়!

বাসেত খান বকে গেলেন, “বাংলাদেশের শিশু-চলচ্চিত্রে ঐ ছবিটি এখনও সেরা। তবে এখন দেখলে কেমন লাগবে জানি না।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.