চন্ডাল

মইনুদ্দিনের লাশটা মরে পড়ে ছিল পুরাতন খালের পাশে।কত দিন ধরে পড়ে আছে তা কেউ জানে ন। বিকেলের দিকে জরু মোল্লার বউ কলমি শাক তুলতে এসে দেখল কচুরিপানার আড়ালে কার যেন পা দেখা যাচ্ছে৷ ভয়ে সে আর সেখানে না দাঁড়িয়ে দু একজনকে ডেকে এনে কচুরিপানা সরাতেই বেড়িয়ে এল মরে পঁচে যাওয়া লাশ।
এই পাড়ার হিন্দুদের সাথে প্রায় মইনুদ্দিনের ঝামেলা লেগেই থাকত। পুলিশ এসে সংকর আর তার ভাই নারায়ণকে ধরে নিয়ে গেল।
এর পর থেকেই এলাকায় থম থমে একটা পরিবেশ।
সৌরভের বাড়ি বাসুদেবের পাশের গ্রাম শ্রীরামপুরে৷ সে এসেছিল বোনের বাড়িতে দু দিন থাকতে। এসেই দেখল তার জামাইবাবু নারায়ণ কে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। দিদিকে সামলাবে নাকি পাঁচ বছর বয়সি ভাগ্নিকে।

মইনুদ্দিনের তিন ছেলে।বড় দুই ছেলে মাদ্রাসায় পড়ায়, উচ্চমাপের আলেম। বিয়ে সাদি করে যার যার মত থাকে। মইনুদ্দিন এলাকার মসজিদে ইমামতি করত আর ব্যবসা ছিল। ছোট ছেলেটা ঠিক তার মনের মত হয়নি। কলেজে পড়ত, এখন ছেড়ে দিয়েছে।ইদানীং,আড্ডা বাজিতে দিন যাচ্ছে। যত দিন বেঁচে ছিল তত দিন সে তার ছোট ছেলেকে সারাক্ষণ বকাবকি করত৷। মইনুদ্দিনের তিন স্ত্রীর মধ্যে বড় বিবির ই তিন ছেলে৷ বাকিদের আর ছেলে মেয়ে হয়নি।
তার বিশাল সম্পত্তি। তার সব ই তার বাবা থেকে পাওয়া। নিজে বাড়িয়েছে বৈ কমায়নি। সাধারণ ইমামতি করে তার এত সম্পত্তির মূল কারন ছিল ব্যবসায় তার দূরদর্শিতা৷পারিবারিক জীবনে তার কলহ বলতে ছোট ছেলেটা ই। বাসুদেবের বাদ বাকি সবাই ইমাম সাবকে অপছন্দ করলে ও তার ছোট ছেলে মুহিব কে পছন্দ করত। মুহিব ডানপিটে আর নিজের মনের কথা শুনে চলা ছেলে। তার বাবা যেখানে প্রচন্ড রকম ধার্মিক সেখানে সে ধর্মের প্রতি উদাস।
এটা নিয়ে মইনুদ্দিনের আফসোসের সীমা ছিল না।

মুহিব মইনুদ্দিনের ছোট ছেলে। কোন মতে টেনে টেনু অনার্সটা শেষ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ বয়স সাতাশ আটাশ পার হয়ে গেছে।মইনুদ্দিন ছেলের বিয়ে নিয়ে চিন্তিত ছিল বলে মনে হয় না।ওর চিন্তাটা ছিল ভিন্ন দিকে। সেটা মুহিব ঠিক ই বুঝতে পারত। বুঝতে পারত বলেই হয়ত বাবার সাথে তার মনোমালিন্য ছিল।

সৌরভের মনে একটা খটকা সারাক্ষণ ই লেগে আছে। তার দুলাভাই নিত্যান্ত ই সাধাসিধে লোক ৷ মইনুদ্দিনের সাথে ঐদিনকার ঝামেলা টা ও ছিল তুচ্ছ বিষয়ে।গালাগালি পর্যন্ত ই সীমাবদ্ধ ছিল। এরকম তুচ্ছ কারনে আর যাই হোক, কেউ কাউকে মেরে ফেলতে পারে না। বরং মইনুদ্দিনের হত্যার পেছনের কারনটা হয়ত আরো গভীর। সৌরভের বয়স কম। বিশ বাইশ বছর হল। কিন্তু, এই বয়সে ই তার চিন্তা আর বুঝশক্তি অন্য যে কারো অপেক্ষা বেশি। সৌরভের মনে হল, আর যাইহোক তার দিদির জন্য হলে ও এই রহস্যের সমাধান প্রয়োজন।
মৃত্যু রহস্য ফাঁস না হলে তারা যে উকিল ধরেছে তিনি ও কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না।

বেলা বাড়ন্ত। মুহিব শশ্মান ঘাটে বাঁশি হাতে বসে ছিল। তার ভেতরে হঠাৎ করেই অশান্তির ঢেউ।পাশের বট গাছে দুটা ঘু ঘু বাসা বেঁধেছে। তারা এক মনে ডেকে যাচ্ছে।এই ভরদুপুরে পাখির ডাক মুহিবের কাছে বিরক্তিকর মনে হচ্ছে। সে বারবার চেষ্টা করে ও বাঁশিতে সুর তুলতে পারছে না। তার মন সত্য ই আজ বিক্ষিপ্ত। ছোট সময় থেকে আজ অবধি সে কেবল অবহেলা ই পেয়েছি। বাবা যত যত্ন করে বড় ছেলেদের তার এক সহস্রের এক ভাগ যত্ন ও তাকে করেনি। তার নিজের মায়ের ভালবাসা ও তেমন পাইনি। অথচ তার ছোট মা তাকে বরাবর ই ভালবেসেছে। বাবার মৃত্যুতে যেখানে পরিবারের সবাই বিষাদগ্রস্ত হওয়ার কথা ছিল সেখানে সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।সবার কথা কেন বলছে, সে ও তো এখন মুক্ত। কিন্তু,এই মুক্তি কি সে আদৌ চেয়েছিল?
চিন্তায় বাধা পড়ল জনৈক কন্ঠস্বরে৷
-শুনুন,নমস্কার।
মুহিব ফিরে তাকাল৷ ন্যাড়া মাথার একটা ছেলে। দাড়ি গোঁফ সব কামানো। ধুতি আর ফতোয়া পড়া৷ চোখে মোটা ফ্রেমের একটা চশমা৷ বয়স তার চেয়ে কম হলে ও দেখাচ্ছে খুব বেশি।
মুহিব কথা বলল
-কী ব্যপার?
-বসব?
-বসার কী দরকার? যা বলার বলে ফোটেন।
মুহিবের মনে হল ছেলেটা আশাহত হয়েছে।গম্ভীর ভঙ্গিতে অনুমতির অপেক্ষা না করে বসতে বসতে বলল।
-দরকার ত অনেক জনাব৷ কিন্তু, না বসে ত বলা যাবে না।
ছেলেটা মুহিবের শরীর ঘেষে বসেছে। তার বাবা মইনুদ্দিন এসব বেজাতের কাফেরদের দুচক্ষে দেখতে পেত না।নীলকান্তের সাথে চলার অপরাধে তার অনেক কথা শুনতে হত।
-সরে বসো।
ছেলেটা সরে না বসে চশমাটা চোখ থেকে খোলে বুক পকেটে রাখতে রাখতে বলল।
-আমি নারায়ণের শ্যালক।
-কোন নারায়ণ?
-যে আপনার বাবার হত্যার দায়ে জেলে আছে।
-অ। তা আমি কী করতে পারি?
-কিছু করা লাগবে না৷ শুধু বলুন, আপনি কেমন আছেন?,
-ভালই।
বলেই লাফ দিয়ে উঠে একটা কচি বট পাতা ছিড়ে বাঁশি বাজাতে বাজাতে চলে গেল। সৌরভের কাছে মুহিবকে অদ্ভুত এবং অস্বাভাবিক মনে হল।

মইনুদ্দিনের তিন বউয়ের মধ্যে ইদানীং খুব মিল৷ সৌরভ যখন তাদের বাড়িতে গিয়েছিল তখন তিন বউ একত্রে বসে টিভি দেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিল। যাদের স্বামী সপ্তাহ খানেক আগে খুন হয়েছে তাদের এত খুশি থাকাটা সত্য ই বিস্ময়কর। সৌরভ তাদের স্ত্রীদের কাছে মইনুদ্দিনের ভিন্ন এক চরিত্রের কথা শুনল। প্রাচীন পূরাণের গল্পে এই শ্রেণীর মানুষদের অসুর হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা আছে।
সারা দিন গ্রামের নানান জনের সাথে সৌরভ কথা বলল। মইনুদ্দিন কেমন লোক ছিল,তার ছেলেরা কে কেমন এইসব। সবার কাছেই মইনুদ্দিনের নানান অপকর্মের কথা আর তার ছেলেদের নিরবতার কথা শুনল। তবে মুহিবকে গ্রামের লোকেরা মহাপুরুষের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সৌরভের মনে হল, আসল খুনিকে বের করতে মুহিব তাকে সাহায্য করতে পারে।

মুহিব যখন শশ্মানে পৌঁছাল সৌরভ তখন সেখানে বসা। মুহিব পাশে গিয়ে বসতে বসতে বলল,
-বাড়িতে গিয়েছিলেন কেন?
সৌরভ ফিরে তাকিয়ে বলল
-কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য?
-প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমি ই যতেষ্ট৷ বাড়ি যেতে হবে না আর।
সৌরভ মুচকি হেসে বলল
-প্রশ্ন করলে উত্তর দিবেন?
-দিতে বাধ্য নই৷ তবু ও দিব৷
-আপনি ভাল করেই জানেন আমার জামাইবাবু খুন করতে পারে না। তবু ও কেন নিশ্চুপ?
মুহিব আকস্মিক সৌরভের ন্যাড়া মাথায় থাপ্পড় দিয়ে বলল।
-তুমি বুঝবে না, চন্ডাল।
সৌরভ বিস্মিত হয় তাকিয়ে রইল৷ মুহিব সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে হনহন করে আধারে মিলিয়ে গেল।
সৌরভ বুঝে পেল না এই ছেলেটা এত অদ্ভুত কেন৷

মুহিবের বাকি দুই ভাই ইদানীং খুব ঝামেলা করছে সম্পত্তি নিয়ে।তাদের দাবি মইনুদ্দিনের বাকি দুই বিবিকে বাসা থেকে বের করে দিয়ে সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নেওয়া। রাতে যখন বাবার কোন অংশ কে নিবে এই ব্যপারে আলোচনা হচ্ছিল মুহিব তখন চুপ ছিল। গাবতলির মিল বড়ভাই, উত্তর পাড়ার ইটভাটা ছোট ভাইয়ের, আর রসুলপুরের চাল কল মুহিবের৷ বাড়ি আর কৃষিজমি সমান ভাগে ভাগ হবে।কথার এক পর্যায়ে মুহিব মুখ খোলল
-সব ত ভাগ করলি কিন্তু দক্ষিণ পাড়ার পতিতালয় কার ভাগে যাবে? তাছাড়া, বাবার সুদের ব্যবসা কে করবে? আর হ্যা,নারী পাচারের মত কালো ব্যবসাগুলোর দায়িত্ব ও কাউকে না কাউকে নিতে হবে।
মুহিব কথাগুলো বলল খুব শান্তভাবে।বাকি দুই ভাইসহ পরিবারের বাকি সবাই চুপ। বিষয়টা এমন নই যে তারা জানত না। তারা সবাই জানত। শুধু কিছু বলত না।

রাতে সৌরভের ঘুম হয়নি একদম। ভোরে ঘুম থেকে জেগে স্নান করে পূজা সেরে বাহিরে আসার পর খেয়াল হল বট তলায় কেউ একজন বসা৷ মুহিব ধুতি ছেড়ে প্যান্ট, আর টি শার্ট পড়ে নিল।চশমাটা চোখে দিয়ে বের হয়ে সোজা বটতলায়। সে জানে মুহিব বসা। ইদানীং মুহিব তাকে খুব টানে। মনের দিক দিয়ে। বিষয়টা তার কাছে অদ্ভুত মনে হচ্ছে। যখন তখন ফোন দিয়ে বলে
-কী করো চন্ডাল।
বলেই সে কি অট্টহাসি।সৌরভ সেই হাসিতে মুগ্ধ হয়। তার দুলাভাই জেলে দু মাস হল। বোন আর ভাগ্নির দেখাশোনা সেই করছে।এই দু মাসে আসল খুনির রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে না৷ দিন দিন সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে৷ কখনো তার মনে হচ্ছে খুনটা হয়ত মুহিবের বড় ভাইদের মধ্যে কেউ করেছে৷ কখনো মনে হয়েছে খুনটা বাহিরের কেউ করেছে। তার স্ত্রীদের ও সন্দেহ হয়েছে তার। কিন্তু সন্দেহের বশে ত উকিল মামলা লড়তে পারবে না। দরকার প্রমাণ। সৌরভের কেন জানি মনে হয়, মুহিব কিছু না কিছু জানে।
সৌরভ মুহিবের পাশে বসতে বসতে বলল
-ভদ্রলোকের ঘুম হয়না?
মুহিব উদাস গলায় উত্তর দিল
-তুমি ঘুমিয়েছিলে চন্ডাল?
-না, ঘুমাইনি। আমি রাতে কম ঘুমাই।
-ক্যান,কম ঘুমাও ক্যান?
-তুমি বুঝবে না।
-মাথায় ত খুব সুন্দর চুল গজিয়েছে। ধুতি ছেড়ে প্যান্ট পড়লেই ত সুন্দর লাগে। সন্ন্যাসী সেজেছিলে কেন?
-ও তুমি বুঝবে না। বাবার নামে পূজো দিয়ে ছিলাম।
-আহারে!! চন্ডাল৷
বলেই কোন ডান বাম না দেখে সৌরভের গালে চুমু খেয়ে চলে গেল৷ সৌরভের সারা শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। সে নিজেকে সামলে চার দিকটা একবার দেখে নিল৷ কেউ দেখেনি ত?

হাতের তালুতে নিয়ে গাঁজাটা ভাল করে মলতে হয়। তারপর সেটা সিগারেটের খোলে ঢুকিয়ে আগুন জ্বালিয়ে টানতে হয়। মুহিব সিগারেটে আগুন লাগিয়ে টানার আগ মূহুর্তে সৌরভ এসে বসল পাশে। সে আজ পাঞ্জাবি পড়েছে৷ সদ্য তারুণ্য তার অবয়বে। গিলে খাওয়ার মত দেহ আর চোখ ধাধানো রূপ। মুহিব সিগারেট মুখে দেওয়ার আগে সৌরভ সেটা টেনে নিল। মুহিবের চোখ লাল হয়ে আছে। সে অগ্নি দৃষ্টিতে সৌরভের দিকে তাকাল সৌরভ সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে সিগারেট ছুড়ে ফেলে বলল
-গঞ্জিকা সেবন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
মুহিব রাগতে গিয়ে ও না রেগে বলল,
-কী জন্য আসলা চন্ডাল?
-কথা আছে।
-কী কথা? জলদি বলে ভাগো।
-তোমার বাবা যেদিন খুন হল সেদিন তুমি কোথায় ছিলে?
মুহিব সৌরভের প্রশ্নে অপ্রস্তুত হলে ও দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
-বাড়িতে।
-কিন্তু তোমার মা বলল সেদিন অনেক রাত পরে তুমি মদ খেয়ে বাসায় ফিরেছিলে।
-কোথায় ছিলে?
-বন্ধুদের সাথে।
-মিথ্যা কেন বললে প্রথমে?
-বাড়িতে যা চন্ডাল। এসবে পড়িস না। তুর জন্য মায়া হয়। মায়াটা নষ্ট করিস না৷
-মুহিব মিয়া,আমার একটা নাম আছে। সেই নামে ডাকবেন।
মুহিব আবারো সৌরভকে বিব্রত করার জন্য তার গালে চুমু খেয়ে বলল
-থাকুক ওসব নাম। তুরে আমি চন্ডাল ই ডাকব।
সৌরভ আজ আর বিব্রত হয়নি৷ মুচকি হেসে বলল
-চুমু খেলে কেন? এটা কেমন ব্যবহার৷
-চুমু খেতে ভাল লেগেছে, তাই খেয়েছি।
-লোকে দেখলে ভাববে কী?
-লোকে ভাবলে আমার বাল ফালান্তি।
-ছি! এসব কেমন কথা?
-তুই বুঝবি না বললাম না।
সৌরভ মুহিবকে টেনে তার ঠোট কামড়ে ধরে চুমু খেয়ে বলল।
-নাও। এবার বেশ ভাল করে বুঝো।
মুহিব নিজেকে সামলে নিতে পারল না। হুট করে উঠে চলে গেল। সৌরভ পাশের কালীমূর্তির দিকে তাকিয়ে অট্টহেসে মাটিতে লুঠিয়ে পড়ল।

সেদিন রাতে সৌরভ বাজার থেকে ফিরছিল টুকটাক কেনা কাটা করে। ঠিক তখন পেছন থেকে একজন এসে জড়িয়ে ধরল৷ আমাবস্যার রাত। বিদ্যুৎ নেই সারা গ্রামে। আকস্মিক জড়িয়ে ধরাতে সৌরভ আৎকে উঠল আর তার হাত থেকে বাজারের ব্যাগ মাটিতে পড়ে গেল। সে পিছনে তাকাতে যাবে ঠিক তখন অজ্ঞাত ব্যক্তি তার ঠোট জোড়া কামড়ে দু হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
সৌরভের বুঝার আর বাকি রইল না যে এটা মুহিব৷
সে নিজেকে ছাড়িয়ে বলল
-এসব কী করছ তুমি মুহিব? ভুলে যাচ্ছ, আমি একটা ছেলে। মাথা ঠিক আছে?
মুহিব আবারো জড়িয়ে ধরে গলায় চুমু খেয়ে বলল,
-না৷ মাথা ঠিক নেই। তোমার কথা ভাবলেই আমার মাথায় গন্ডগোল হয়ে যায়।
-এটা কেমন কথা?
-জানি না৷ আমাকে তোরে আদর করতে দে চন্ডাল।
-আদর! কিন্তু কেন?
-বুঝিস না, বুঝিস না তুই? ভালিবাসি তরে৷ চার মাস হল বাবা মারা গেল৷ তুই না থাকলে অনুশোচনায় আমি মারা ই যেতাম। কাছে আয় চন্ডাল। ভালবাসতে দে আমাকে।
সৌরভ তখন মুহিবের বশে৷ কিছু সে ভাবছে না। সে নেশায় পড়ে গেছে মুহিবের চুম্মনের৷ সে মাতালের মত যখন সৌরভের বুকে আলতো করে কামড়ে ধরল তখন সূখে সৌরভ মুহিবের মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরল। মুহিব সৌরভ কে হাত ধরে টেনে রাস্তার পাশের কুঠির ঘরটাতে নিয়ে গেল। বাজার পড়ে রইল রাস্তায়।
আমাবস্যার রাত৷ বিদ্যুৎহীন গ্রাম। মেঘলা আকাশ আর নিরব গ্রাম্য পথের ধারের কুটিরে মুহিব সৌরভকে দুর্বায় শোয়ে বস্ত্রহীন করতে লাগল। ঠোটে, গলায়,বুকে, নাভীতে সর্বত্র তখন চুমুর চাদর৷ কখনো মুহিব, কখনো সৌরভ। আদরের জোয়ারে বৃষ্টি নামল অঝোরে। সেই রাতে মুহিব সৌরভের দেহে প্রবেশ করল৷ প্রথম বারের মত জীবনের এমন অদ্ভুত সুখে সৌরভ নিজেকে সুখি হিসেবে ভেবে নিল৷বাহিরে অঝোড় ধারায় বর্ষণ আর ভেতরে দুজন তরুণের মিলনে স্বয়ং প্রজাপতি কোপিত হল কি না কে জানে৷ পাশেই বাজ পড়ল। তার শব্দে সৌরভ মুহিবকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
তার পিঠে আচড় কেটে ঠোট কামড়ে ধরল।

ঐদিনকার পর সৌরভ আর মুহিব নিজেদের অন্য এক জগতে আবিষ্কার করল।যখন সুযোগ পেয়েছে তারা সুখের জন্য মিলিত হয়েছে৷ তারা উপভোগ করেছে ভালবাসার প্রতিটি স্পর্শ।অনুভব করেছে হৃদয়ের সহস্র না বলা কথা।হরিহর প্রাণের মত তারা ছুটে চলছিল অজানা সুখের দিকে।জীবনের এই সুখের মুহুর্তে সৌরভ ভুলেই গিয়েছিল যে তার জামাই বাবু জেলে। তার দিদি অসহায়। যার বাবার হত্যার দায়ে তার জামাই বাবু জেলে তার সাথে ই তার প্রেম। তার মিলনে ই সে সুখি।

বছর ঘুরার এক মাস পূর্বে মোকাদ্দমার ডেট এলো। উকিল ফোন করে জানিয়ে দিল আদালতে যাওয়ার তারিখ। এর দু দিন দিন আগে মুহিব আর সৌরভ বসে ছিল শশ্মান ঘাটের সিড়িতে। সৌরভকে চিন্তিত দেখে মুহিব প্রশ্ন করল
-কী হল চন্ডাল? মন খারাপ নাকি চিন্তিত?
-চিন্তিত।
-কিসের জন্য?
-তোমার বাবার খুনি কে সেটা নিয়ে।
– খুনটা আমি করেছি চন্ডাল। আমার নিজ হাতে।

সৌরভের পায়ের তল থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল।তার মনে হচ্ছিল তার দম বন্ধ হয়ে যাব। নিজেকে সামলে সৌরভ বলল-
-এসব কী বলছ তুমি? কেন বলছ এসব?
-যা সত্য তাই বলছি। এখন তুমি চায়লে আমার নাম বলে তোমার জামাই বাবুকে মুক্ত করতে পার।
তারপর দুজন ই চুপ। নিশ্চুপ শশ্মানের প্রতিটি বৃক্ষ,প্রাণী।মুহিবের চোখ টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়িছে। সৌরভ আজ ভিন্ন এক মুহিব কে দেখল
-কী হয়েছিল মুহিব? ভগবানের দোহায়,দয়া করে আমাকে বলো।
মুহিব বলতে লাগল।

-বাবার নারী পাচারের ব্যবসা ছিল। এটা নিয়ে প্রায় ঝামেলা হত। গ্রামের সহজ সরল মহিলাদের বিদেশে কাজের নামে পাচার করে দিত। বিষয়টা বুঝতে পারি দু বছর আগে। আমি চুপ ই ছিলাম। প্রশাসনের লোকদের আর রাজনৈতিক ছত্র ছায়াতে এসব করতেন তিনি। ধর্মের মুখোশ পড়ে অন্যায়ে লিপ্ত শয়তান ছিল আমার বাবা। ঐদিন রাতে বাড়ি যাওয়ার পথে একটা শব্দ শুনে বাবার ঘরের দিকে যেতেই দেখি আমাদের বাড়ির কাজের মহিলা রহিমার দশ বছরের মেয়েটাকে….নিরবস্ত্র করে বেধে রেখেছে। পাশেই রহিমা নিরবস্ত্র হয়ে পড়ে আছে৷ তার সারা শরীর রক্তে রঞ্জিত। বাচ্চাটার সারা শরীরে কামড়ের দাগ। যোনী হতে রক্ত ঝড়ছে ৷ পাশে ই আমার পিতা নামের জন্তুটা যৌন আনন্দে কাতড়াচ্ছে। এসব দেখে আমার মাথা ঠিক থাকিনি। আমি দৌড়ে গেলাম ঐখানে৷ রহিমার মাকে কাপড়টা দিয়ে বাচ্চাটার বাধন খোলতে লাগলাম।আমাকে দেখে মইনুদ্দিন বিব্রত না হয়ে বরং রেগে গেল। আমার চিৎকারে আমার তিন মা ছোট এল। আমাকে মইনুদ্দিন গলা চিপে ধরে বলল
”হারামজাদা,মুখ খোললে তরা সবাই শেষ”তুই নিজে ই ত জারজ’এই বাড়ির কাজের বেডির পোলা”
আমি রাগে মায়ের দিকে তাকালাম। মা আচল দিয়ে মুখ ডাকল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।মইনুদ্দিন কে ধাক্কা মারি শরীরের সকল শক্তি নিয়ে। দেয়ালে ধাক্কা লেগে মইনুদ্দিন পড়ে যায় মেঝেতে। আমি বের হয়ে যায় বাড়ি থেকে। রাতে গিয়ে শুনি মইনুদ্দিন বেঁচে নেই। ধাক্কায় নাকি মারা গেছে। আমার মায়েরা আমাকে বাঁচানোর জন্য বাবার লাশটা রহিমার স্বামী আর কাদের কে দিয়ে ফেলে দেয় খাল পাড়ে।
মুহিব কথাগুলো বলে শান্ত হল। সৌরভ কিছু বলতে পারিনি। তার মুখে বলার মত কিছু নেই। সে উঠে চলে গেল। মুহিব শশ্মান ঘাটে বসে রইল সারা রাত। তার ভেতরে কষ্টের ফোয়ারা বয়ছে৷ ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছে। এ ভয় জেল পুলিশের না। এই ভয় সৌরভ কে হারানোর। সৌরভ যদি তাকে ছেড়ে যায় সেই ভয়।

সারা রাত্রি সৌরভ ঘুমায়নি। সে ভেবেছে মুহিব কে নিয়ে,সে ভেবেছে তার দিদি আর ভাগ্নিকে নিয়ে৷ একদিকে বোন আরেক দিকে ভালবাসা৷ একদিকে পরিবারের দায়িত্ব আরেক দিকে মুহিবের মত অসাধারণ ভাল একজন মানুষ। মইনুদ্দিন খারাপ ছিল। তার শাস্তি সে পেয়েছে। এতে মুহিবের যেমন দোষ নেই, তেমন দোষ নেই তার জামাই বাবুর ও। সৌরভ সারা রাত ভেবে ও কী করবে বুঝে পেল না৷ সে যদি কাল উকিলকে সব বলে তবে মুহিব কে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে৷ কাদের কে কড়া করে ধমক দিলেই সে সব বলে দিবে। সে মুহিব কে হারাবে। আর যদি প্রমাণ না থাকে, তবে প্রমাণের অভাবে নারায়ণ আর সংকরের ফাঁসি হবে না৷ বড়জোর জেল হতে পারে৷ দিদি আর ভাগ্নিকে সে দেখতে পারবে৷ কিন্তু মুহিবের মত মানুষের দরকার আছে আমাদের সমাজের জন্য৷ তার হাত ধরে ই হয়ত এলাকার হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা চলে যেতে পারে।
নাহ! সৌরভ মুহিব কে হারাতে দিবে না।

মোকাদ্দমায় উপযুক্ত তথ্য প্রমাণের অভাবে এটা প্রমাণিত হয় যে নারায়ণ আর সংকর মইনুদ্দিন কে খুন করেনি। আর ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী মইনুদ্দিনের মৃত্যু হয়েছে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য। ন্যাসারাল ডেট হিসেব ধরে পুলিশের মামলা খারিজ হয়ে যায় আর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

বিকালের দিকে। বাসুদেব আজ শান্ত। মুহিব সিগারেটের খোলে গাঁজা ঢুকাচ্ছিল। সৌরভ তার পাশে এসে বসল। সূর্য তখন পাটে বসেছে। মুহিব এক ঝলক তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল
-তিন দিন পর এলে চন্ডাল।
সৌরভ মুহিবকে ধাক্কা দিয়ে ঘাসের উপর ফেলে দিয়ে তার শরীরে ঝুঁকে বলল
-চন্ডাল আমি নয়, চন্ডাল তুমি। নিজে ও বাঁচলে বাকিদের ও বাঁচালে। এত বুদ্ধি কোথা থেকে আসে?
মুহিব সৌরভের ঠোটে চুমু খেয়ে আবেগে গলে গিয়ে বলল
-কোথা থেকে আসে জানি না৷ তবে তুই সাথে থাকলে আমার কিচ্ছু লাগবে না।

ডুবন্ত সুর্য উকি দিয়ে অস্ত যাওয়ার আগে চন্ডালদের ভালবাসা দেখে গেল। মাঝে মাঝে ইশ্বরের কি হিংসে হয় না? এত প্রেম নিয়ে যারা ভালবাসে তাদের প্রতি?

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.