অভিমান

১/

এক ইরানি কবি লিখেছিলেন,

‘যদি চাঁদের প্রত্যাশা কর, তাহলে রাত্রি হতে
পলায়ন করো না।
যদি গোলাপের প্রত্যাশা কর, তাহলে
কাঁটার ভয় পেওনা।
যদি ভালোবাসার প্রত্যাশা কর, তাহলে
অাপন সত্বা হতে পালিয়ে যেও না।

এই কবির নাম, সুফি জালালুদ্দিন রুমী। তাকে সুফিদের সম্রাট বলা হয়।
যদি ভালোবাসার প্রত্যাশা কর,তাহলে অাপন সত্বা হতে পালিয়ে যেওনা,, এ কথার অর্থ কী!!
‘অামার দেহটা পুরুষের, কিন্তু হৃদয়টা একটা নারীর।অামি একজন নারীর প্রতি নয়, একজন পুরুষের প্রতি অাকৃষ্ট হই।সুদর্শন পুরুষের বুকে মাথা রাখতে ইচ্ছে জাগে।তার পেছনে জড়িয়ে ধরে বাইকে চড়তে সুখ সাধ জাগে। তার ঠোঁটের মিষ্টি স্পর্শ পেতে মন অানচান করে।কেন করে! এর উত্তর অামার জানা নেই।।
এক মনে চুপ করে ভাবছে সাব্বির। সে এ বছর অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। সুদর্শন একটা ছেলে।যে কোন মেয়ে এক ইশারায় ওর প্রেমে পড়বে।সিল্কি চুল, স্টাইলিশ দাড়ি,সব কিছুই মুগ্ধ করার মত।সে ইচ্ছে করলেই কোন অপরূপা তরুণীর সাথে প্রেম-জাল বুনতে পারে।এতে তার প্রকৃত সত্তা’কে অস্বীকার করা হবে।কেননা সে নারীর প্রেম নয়, পুরুষের প্রেম তার কাম্য। সুতরাং সে যদি তার হৃদয়ের চাওয়া অনুযায়ী প্রকৃত ভালোবাসা চায়, সুতরাং তার উচিত হবে না, তার অাপন সত্তা হতে পালিয়ে বেড়ানো।
সাব্বির তার সত্তা হতে পালালো না।
সাব্বিরের চেয়ে মাত্র চার বছরের বড় ওর অাপন ছোট চাচা’র নাম সামশ।সামশ অারবি শব্দ, এর অর্থ সুর্য্য। শামস এবার অনার্স পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি এসেছে, এখনো রেজাল্ট বের হয়নি।এর মধ্যেই বাড়িতে অালোচনা চলছে শামসের বিয়ের বিষয়ে।

২/
শামস ঢাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি জিম করতো।সিক্সপ্যাক বডি দেখে যে কোন মেয়ে ক্রাশ খাবে।টকটকে ফর্সা ওর গায়ের রঙ। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির মধ্যে এক জোড়া লাল ঠোঁট যেন ওর সৌন্দর্য দ্বিগুন করে দিয়েছে।
শামস, সাব্বিরের রুমে ঘুমাতে লাগলো।কেননা অারেকটা ঘরের কাজ চলছে।সেটা শেষ হলে সামশ অালাদা রুমে থাকবে বউ নিয়ে। সাব্বিরের ঘরে একটাই খাট। দুজনকে কষ্ট করে এক খাটে ঘুমাতে হয়।

৩/
এখন সন্ধ্যা ৭ টা। সাব্বির পড়তে বসেছে। এমন সময় শামস সাব্বিরের রুমে ঢুকলো। একটা বই হাতে নিয়ে খাটে বসতে বসতে বললো, পড়ালেখা কেমন চলছে তোর?
সাব্বির চোখ বন্ধ করলো, এই একটি মাত্র বাক্য ‘ পড়ালেখা কেমন চলছে তোর,, অসংখ্য বার প্রতিধ্বনিত হয়ে সাব্বিরের কানে বাজতে লাগলো।পৃথিবীতে যেন কোন মানুষ নেই।যেন কোন পুরুষ নেই।যেন তারা দুজন ছাড়া কোথাও অার কিছু নেই।শামস এর এই ভরাট কণ্ঠ ধ্বনি যেন সুর তাল লয়ে ভেসে ভেসে অাসছে কোন স্বর্গ হতে। যেন ঢেকে বলছে. এসো এসো এসো।
মুহূর্তেই সাব্বিরের ভাবনার বাঁধন কেটে গেলো শামস এর মোবাইলের শব্দে। সাব্বির বড্ড লজ্জিত হলো। অাকণ্ঠ লজ্জায় ডুবে গেলো সে। কী ভাবছি এসব! মানুষ জানতে পেলে কী ভয়ানক হবে! লজ্জায় সমাজে চলা যাবে! পরিবার, অাত্মীয় সবাই ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে। সাব্বির জবাব দিলো,, এই তো চলছে।

৪/
শামস বাড়ি এসেছে দু দিন হলো। একদিন ছোট অাপুর বাসায় ছিলো।অাজ বাড়ি চলে এসেছে। প্রচুর শীত পড়েছে ইদানীং। কম্বল দুটো কে এক সাথে করে দুজন এক সাথে ঘুমাতে গেলো।রাত বারোটায় শামস অতল ঘুমে ঘুমিয়ে গেলো।কিন্তু সাব্বিরের চোখের দু পাতা এক হলো না।রাত দুটো কিংবা অাড়াইটা নাগাদ সাব্বির অনুভব করলো এক জোড়া হাত তাকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে নিচ্ছে। সাব্বির সুখের সাগরে নিমজ্জিত হলো। এই দীর্ঘ সময় জেগে থাকা অাঁখি যুগল অাপনা’তেই মুদে এলো।

শামস’সের শরীর থেকে ভেসে অাসা সৌরভময় পারফিউমের ঘ্রাণ, দড়ির মতো পাকানো পেশীর বাঁধন, পৌরষদীপ্ত স্পর্শে সেই রাতে সব বাঁধন ভেঙে ফেলে, সমস্ত ভয়, লোকলাজ পেছনে ফেলে সাব্বির ডুবে গেলো এক নিষিদ্ধ প্রণয়ে। সমাজ বিরুদ্ধ, ধর্ম বিরুদ্ধ, রাষ্ট্র বিরুদ্ধ এক ভয়াবহ যাত্রাপথে অগ্রসর হলো বিশ বছরের এক তরুণ। তার ওষ্ঠ যুগল মিশে গেলো শামস এর ওষ্ঠ জোড়ায়।
যৌবনের উত্তপ্ত সময়টি পার করা শামস, কতক্ষণ নিজেকে ধর্ম, সমাজের ভয় হতে অাটকে রাখতে পেরেছিলো!!
শামস হয় তো ঘুমের ঘোরে কোল বালিশের অভ্যাসে সাব্বিরকে জড়িয়ে ধরেছিলো।কিন্তু সাব্বির যা করলো, তাতে ভালোবেসেই হোক, কিংবা কাম উন্মমত্তায়-ই হোক, শামস কয়েক মুহূর্ত পরেই সাড়া দিলো। রাত্রির তৃতীয় প্রহরে দুটি যুবক মেতে উঠে অাদিম খেলায়। সমস্ত লাজ লজ্জা, ভয় ত্যাগ করে দুজন যুবক রাতভর এই নিষিদ্ধ প্রণয়ে মেতে রইলো।

৫/
পরদিন সমস্ত দিন সামশ তার এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে বসে রইলো। ঘৃনায়,লজ্জায়, সমগ্র দিন সে ভয়ানক মানসিক যন্ত্রণায় অাবদ্ধ রইলো। ছি, অাপন ভাতিজা’র সাথে এসব অামি কী করলাম। এর চেয়ে মৃত্যু ও ভালো ছিলো। রাগে দুঃখে সে কেঁদে ফেললো।সে দিন রাত অাটটায় সে বাসায় ফিরলো।ডিনার করেই সে রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়লো।সাব্বির বাজারে গেছিলো। এসে দেখে ছোট চাচ্চু দরজা লাগিয়ে রেখেছেন ভেতর থেকে। সে একবার ভাবলো ডেকে বলবে দরজা খুলতে। অাবার কী ভেবে যেন বসার রুমে গিয়ে টিভি দেখতে লাগলো। রাত দশটা বেজে গেলো।সামশ দরজা খুলছে না দেখে সাব্বিরের মা গিয়ে নক করলো। সাব্বির ধপাস করে দরজা খুলেই অাবার খাটে গিয়ে উপুর হয়ে শুয়ে পড়লো। সাব্বিরের মা চলে যাবার পর শামস উঠে এসে টাশটাশ করে কয়েকটা চড় থাপ্পড় দিলো সাব্বির কে। সাব্বির কাঁদলোও না, হাসলোও না। চড় খেয়ে মাথা নীচু করে চেয়ারে বসলো। শামস এর চোখ টকটকে লাল হয়ে অাছে। দুজনেই নীচের দিকে তাকিয়ে অাছে।
শামসঃ এমন কেন করলি? তোর কি একটুও ভয় হলো না? অান ইজি লাগলো না?
সাব্বির নীরব।ওর চোখ থেকে ফোটা ফোটা জল ঝরছে।
শামস উত্তেজিত হয়ে, হাত মুঠোবদ্ধ করে তেড়ে এসে বললো, জবাব দিচ্ছিস না কেন?
এমন সময় সাব্বির উপরে তাকালো।চোখভর্তি জল।সে তাকালো সামশ এর চোখ বরাবর। অশ্রুসজল এই চোখ যেন কত কি বলতে অাকুল।কিন্তু কোন অজানা, অদৃশ্য দেয়াল যেন তার সব বাক্যকে রুদ্ধ করে রাখছে।শামস এর মন পরম ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো।
শামস তার মুঠো ছেড়ে দিলো।অাদরে পরম মমতায় ভাতিজাকে বুকে জড়িয়ে নিলো।
এতক্ষণ যেই অদৃশ্য দেয়াল সাব্বিরকে অাবদ্ধ করে রেখেছিলো, এখন তা সরে গেলো।সাব্বির হু হু করে কেঁদে ফেললো।কেঁপে কেঁপে সে কান্না করতে লাগলো।
সাব্বিরঃ অামি তোমাকে অনেক ভালোবাসি ছোট চাচ্চু।অামি একজন সমপ্রেমী চাচ্চু।অামি অনেক চেষ্টা করেছি কোন মেয়ের সাথে রিলেশান করি, কিন্তু পারিনি।হয়ে উঠেনি।
অামি অনেক বুঝিয়েছি নিজেকে।কিন্তু পারিনি। অামি কোন সুদর্শন যুবকের সঙ্গী হতে চাই সারা জীবনের জন্য। তার ভালোবাসায় ডুবতে চাই।তার অাদরে, শাসনে, রাগে অনুরাগে কাছে থাকার তীব্র ইচ্ছে অামার সত্তা জুড়ে। অামি অামার এই সত্তা হতে পালিয়ে গেলে, ভালোবাসা কী তা হয়তো অামার অজানা-ই রয়ে যাবে।
চাচ্চু অামি ভালোবাসতে চাই।ভালোবেসে মরতে চাই।
কান্না জড়ানো কণ্ঠে এক নিশ্বাসে বলে ফেললো সাব্বির।
শামস কোমল গলায় জড়িয়ে রেখেই জিজ্ঞেস করলো, তুই কি অামাকে ভালোবাসিস? তোর জীবনের সঙ্গী হিসেবে পেতে চাস?
সাব্বির মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর দিলো।
এবার শামস পরম মমতায় অালতো করে সাব্বিরের কপালে চুমু দিলো। ঠিক সেই সময় সাব্বির অাবারো কেঁদে ফেললো।
বিশ বছরের এই ছোট জীবনে এই মুহূর্তটিই হয়তো চরম অানন্দের।সেই অানন্দেই হয়তো অশ্রুধারা উৎগলিত হচ্ছে।

৬/
সে দিন হতে সাব্বির, শামস এর বুকে ঘুমায়। দুজন কত যে গল্প করে, রাতগুলো এভাবেই অানন্দে কেটে যেতে লাগলো।প্রতিটি রাত তাদের নিষিদ্ধ প্রণয়ের সাক্ষী হতে লাগলো।’ নিষিদ্ধ খেলায় প্রতি রাতে নিষিদ্ধ রসে তাদের বিছানা সিক্ত হতে লাগলো। সাব্বির প্রতি রাতে শামস’কে জড়িয়ে রেখে বলতো’ চাচ্চু প্রমিজ করো এভাবেই তোমার বুকে রাখবে সারা জীবন।
শামস মৃদু হেসে, অারো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলতো, কোথায় যাবো অামার এত কিউট রাজপুত্রটাকে ছেড়ে?
এ দিকে শামস এর বিয়ের কথাবার্তা এগিয়ে চলেছে।এক রাতে সাব্বির, বাচ্চাদের মত শামস এর বুকে মুখ লুকিয়ে অাদুরে গলায় বললো, চাচ্চু একটা কথা বলবো?
শামসঃ হুম বল্।
সাব্বিরঃ তুমি কি সত্যিই বিয়ে করে ফেলবে?
শামস চুপ করে রইলো।

সাব্বির অাবার বলতে লাগলো, তাহলে তুৃমি যে বলেছিলে, কখনো বিয়ে করবে না।অামরা এক সাথে থাকবো!
শামস এবার বললো ‘ বোকা ছেলে এত ভয় পাচ্ছিস কেন?
এবার মুখে বিষন্নতার ছাপ এনে বললো’ দেখ অামি বিয়ে করতে এখনো অনিচ্ছুক। কিন্তু অাম্মু মানে তোর দাদির খুব ইচ্ছে তিনি যেন অামার বিয়েটা দিয়ে মরতে পারেন।বৃদ্ধা মানুষ। কখন কী হয়ে যায়, তাই উনাকে না করতে পারিনি।তবে তুই শুনে রাখ, তোর চাচি’কে এখানেই রাখবো।অার তোকে অামার সাথে ঢাকায় নিয়ে যাবো।অাম্মার মৃত্যুর পর অামি এই বিয়ে ভেঙে দেবো প্রমিজ।
শামস, সাব্বিরের ঠোঁটে চুমু খেয়ে সে রাতে ঘুমিয়ে গেলো।

৭/
অাজ শামস এর বিয়ে।চারদিকে রঙিন অালোয় জ্বলমলে।বাড়ি ভর্তি মেহমান। শামস সেলুন থেকে ক্লিন হয়ে মাত্র বাসায় এসেছে।সাব্বিরকে তাড়া দিচ্ছে দ্রুত সেলুনে যেতে।সাব্বির যেতে চাইলো না।অাবার কী ভেবে যেন গেলো।সাব্বিরকে লাগছে রাজপুত্রের মত।সে সাদা পায়জামার সাথে পড়েছে লাল পাঞ্জাবি। হাতে ঘরি, ব্রেসলেটে ও কে অাজ এত্ত চমৎকার লাগছে যে, অাগত ললনাদের গোপন অাঁখির গোপন চাহনি সরছেই না তার থেকে।
এক ফাঁকে সাব্বির, শামস’কে ডেকে রুমে নিয়ে গেলো।
শামসঃ কী বলবি দ্রুত বল, অাব্বা কী যেন বলবেন বলেছেন।
সাব্বির কতক্ষণ কাচুমাচু করলো, সে বলবে কি না।
শামস কিছুটা বিরক্ত হচ্ছে। বিরক্তিতে চোখের ভ্রু কুঁচকালো।
সাব্বিরঃঅাচ্ছা যাও, তোমার সময় নষ্ট করবো না।বলেই ফেলি কেমন?
শামস অধীর আগ্রহে কথাটা শুনতে চাইছে।ঠিক তখনি শামস এর বাবার গলা শোনা গেলো। বাবার ডাকে সারা দিতে গিয়ে শামস চলে গেলো।যাবার সময় বলে গেলো, অাচ্ছা একটু পর অাবার অাসছি। এত জামেলার ভেতর শামস ভুলে গেলো সাব্বিরকে সে কথা দিয়েছিলো কথাটা শোনার জন্য সে অাবার অাসবে।

৮/
এখন সন্ধ্যা ৬ টা। একটু পরেই শামস বর বেশে বেরিয়ে যাবে।সবার মাঝে একটা উত্তেজনা। শামসকে বর বেশে এত অপূর্ব লাগছে যে, সাব্বির সেই অানন্দে প্রায় কেঁদেই ফেলল।কত আনন্দ বেদনার কাব্য লুকিয়ে আছে সে চোখের জলে তা কে জানে! সেই সন্ধ্যায় শামস তার বন্ধুদের নিয়ে একটা মাইক্রোতে বসলো।মুরুব্বিরা উঠলো অারেকটায়।সাব্বিরকে শামস তার সাথে বসতে বললো।সাব্বির বললো, সে যাবে মেয়েদের মাইক্রোতে।সেটাতে তার কাজিনরাও অাছে। ওরা সবাই এক সাথে মজা করতে করতে যাবে।
সাব্বির, শামস’কে মাইক্রোতে তুলে দিয়ে এক পলক প্রিয় চাচ্চুকে মন ভরে দেখে নেয়। তারপর অল্প হেসে বলে, বিদায়..।
শামস কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলো এমন সময় মাইক্রো ছেড়ে দিলো। গাড়ির ভেতরে থাকা ওর বন্ধুদের কোলাহলে সেই শব্দ হারিয়ে গেলো।মাইক্রো চলতে শুরু করলো।সাব্বির এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে দিকে। ওর অজান্তেই দু ফোটা চক্ষুজল সেখানে মাটিতে মিশে গেলো।

শেষ পর্যন্ত সাব্বির গেলো না। পেটে ব্যথা হচ্ছে এই বলে সে থেকে গেলো। সাব্বিরের মা ও গাড়ি থেকে নেমে এলেন। ছেলেকে এ অবস্থায় রেখে যাবেন না। এদিকে বরের গাড়ি অারো দশ মিনিট অাগেই রওয়ানা হয়ে গেছে।
সাব্বির ডিনার করে, গ্যাসের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে যাবার জন্য নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়লো।

৯/
শামসের বালিশের নীচে একটা ডায়রি অাছে। ডায়েরিটাতে শামস প্রায় রাতেই কবিতা লিখতো। সেই ডায়েরিতে ভাঁজ করা এক পাতার একটি চিঠি।অাসলে চিঠিও না।চিরকুট থেকে একটু বড়।

প্রিয় চাচ্চু!
অামি জানি না, তুমি অামাকে ভালোবেসেছ কি না।কিন্তু বিশ্বাস করো, অামার অন্তর্যামী জানেন, কতটা ভালোবেসেছি তোমায়।পরিবার, ধর্ম, সমাজ সব কিছুর ভয় ত্যাগ করে তোমাকে ভালোবেসেছি। তোমাকে নিয়ে কত সুখ স্বপ্ন দেখেছি ঈশ্বর জানেন।
তোমাকে যে কথাটি বলার জন্য ডেকেছিলাম, তা হলো, অামার জানার বড্ড ইচ্ছে ছিল, অাচ্ছা অামি না হয় সমপ্রেমীী বলে তোমাকে ভালোবেসেছি। কিন্তু তুমি তো তা নও, তাহলে তুমি কেন অামাকে ভালোবাসতে?
অামি ভালোবাসি, তাই প্রতিদানে ভালোবাসতে? নাকি দেহক্ষুধা মেটাতে এই দেহটাকে ভালোবাসতে?
অামি এই প্রশ্নের জবাব অনেক খুঁজেছি।কিন্তু পাই নি। এটাই জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম।
একবার ভাবতাম, তুমি অামাকে ভালোবাস,, অাবার মনে হতো বাস না। অাচ্ছা চাচ্চু, তুমি যদি চাইতে এই বিয়েটা এড়াতে কোন পথ কি বের করতে পারতে না? নিশ্চয়ই পারতে। কিন্তু কেন পার নি!
অামি চাই তুমি সুখে থাকো। এই ভালোবাসা-বাসির খেলায় কখনো হয়তো লিমিট ক্রস করেছি। তোমার গালে কামড়ে দিয়েছি। নাকে কামড়ে দিয়ে দাগ বসিয়ে দিয়েছি।এক রাতে তুমি জোড়াজুড়ি করছিলে, অামি তোমার গেঞ্জি ছিঁড়ে দিয়েছিলাম। এসব মনে রেখো না প্লিজ। অামায় ক্ষমা করে দিও।
অামি তোমাকে মুক্তি দিলাম চাচ্চু। তোমার সারা জীবনের বোঝা হয়ে তোমার কষ্ঠের কারণ হতে চাই না।
অারো কত কী ভেবে রেখেছিলাম, তোমাকে বলবো। কিন্তু এখন সব ভুলে গেছি। সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অামার পৃথিবীটা যেন বদলে গেছে। সব কিছুই অচেনা মনে হয়। পৃথিবীর
সমস্ত বাতাশ যেন বিষাক্ত হয়ে গেছে।
অামার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে চাচ্চু।
অনেক কিছুরই ভাগ দেয়া যায়। কিন্তু ভালোবাসার ভাগ কি দেয়া যায় বলো?
অামার এই অভিমানী মনকে কত বোঝাতে চেয়েছি।সে মানতেই চায় না, কী করবো বলো!
এই শোন, তুমি কিন্তু বলতে পারবে না, অামি তোমার কাছ থেকে বিদায় নিই নি। অামি কিন্তু তোমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে বলেছি, বিদায়। অাচ্ছা যাও এখন বলছি অারো সুন্দর করে।
অালবিদা প্রিয়তম।।

১০/
এখন রাত দশটা বিশ। সাদা পায়জামা,লাল টুকটুকে পাঞ্জাবি পরা সাব্বিরের দেহটা ওর রুমের সিলিং ফ্যানে ঝুলছে সেই সন্ধ্যা থেকেই। হয়তো এভাবেই ঝুলবে সারা রাত। ।মাত্র বিশ বছরের একটি যুবক কী নিদারুণ যন্ত্রণায় এমন করে, নিঃসঙ্গ অবস্থায় পৃথিবীকে বিদায় জানালো, কেউ হয়তো কোনদিন জানবে না।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে অপূর্ব এই যুবকের দেহটা যেন এই বন্ধ ঘরের পিনপতন নীরবতায় ভয়ানক একাকীত্ব অার এক রাশ বেদনায় ঝুলে অাছে।
হায় রে মানব জীবন! কত তুচ্ছ তুমি। এই এক জীবনে মানুষ কত কী চায়, এক বিন্দু সুখের অাশায়। কেন এত রহস্যময় এই মানব জীবন! কেন হৃদয়ের কাঙ্ক্ষিত মানুষটির বুকে মাথা রেখে মৃত্যুর সাধ পূর্ণ হয় না! কেন এই ভয়ানক জ্বালা, অাঘাত নিয়ে মরতে হয় এমনি করে!
কতটা ভালোবাসলে এই পরিমাণ অভিমান জমে!
যে অভিমানের স্রোতে ভেসে যায় কত ভালোবাসার প্রদীপ।
কত নামহীন প্রেম, অখ্যাত হৃদয়ের তীব্র হাহাকার, করুণ বেদনা মিশে যায় কালের অতল তলে।
সমাপ্ত।

লেখকঃ নাবিল শাফাত

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.