কেউ কোথাও নেই

আজ সুহাস বিষন্ন মনে একা ছাদের এক কোনে বসে আছে। সে তার জীবনের হিসেব মেলানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু তার জীবনে প্রাপ্তির থেকে হারানোর সংখ্যাই বেশি। প্রথমে তার দিদি নন্দিতা তার পর সুদীপ আজ কেনো যেনো সে তার বেচেঁ থাকার কোনো কারনই খুজে পাচ্ছে না। সব যেনো শুন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।একরাশ বিষন্নতা, শুন্যতা তাকে ঘিরে ধরেছে ছাদে পাখির কলকাকলি যেনো আজ তার কাছে অসহ্যকর লাগছে আকাশ যেনো আজ তাকে গিলে খেতে চাচ্ছে।

১.

সুহাস আর নন্দিতা একই মায়ের পেটে জন্ম নেওয়া দুই ভাই বোন। সুহাসের বয়স যখন ৮ আর নন্দিতার ১২ তখনই তার মা তাদের ছেড়ে পরলোকে গমন করেন। সুহাসের মা মারা যাওয়ার আগে নন্দিতার হাতে সুহাসিনী কে দিয়ে বলেছিলো,

“মা আমার সুহাস কে দেখে রাখিস “

সেই থেকে নন্দিতাই ছিল সুহাসের দিদি মা।সুহাসের খেলার সাথী থেকে শুরু করে সব কথার সাথী,সকল আবদারের রক্ষক সবই ছিল নন্দিতা। ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো দুজন। ছোট বেলা থেকেই সুহাসের তার দিদির সাজার জিনিস এর প্রতি ছিল এক চৌম্বকের মত টান। সুহাস বাইরে খেলতে পছন্দ করতো না।তার ভালো লাগতো তার দিদির সাথে পুতুল খেলতে,ভালো লাগতো দিদির সাথে রান্না বাটি খেলতে, দিদির সাজার জিনিস গুলো দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে।তখন নন্দিতা দশম শ্রেণির ছাত্রী আর সুহাস তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।একদিন সুহাস কাদঁতে কাদঁতে এসে নন্দিতা কে বললো,

দি ভাই আমার কেনো অন্য ছেলেদের মতো খেলতে ভালো লাগে না? কেনো আমার তোমার তোমার সাজার জিনিস দিয়ে সাজতে ভালো লাগে?

তখন নন্দিতা হেসে বললো আরে ধুর বোকা এতে কাদঁতে আছে? আমিই ত দেবী মা কে বলে ছিলাম আমাকে যেনো একটি বোন দেয় আর মা বলে ছিল তার একটি ছেলে চাই তাই দেবী মা তোকে বাইরে থেকে ছেলে আর ভেতরে আমার ছোট বোন হিসেবে বানিয়েছে। তখন সুহাস একটা বিজয়ের হাসি দিয়ে বলে মানে? তখন নন্দিতা বলে মানে তুই বাইরে থেকে শিব ঠাকুর আর ভেতরে পার্বতী মা।

তখন সুহাস আর নন্দিতা দুজনই হাসতে হাসতে লুটিয়ে পরলো মাটিতে। তার পর কেটে গেলো ৩ টি বছর এর মধ্যে তাদের বাবার ব্যবসার প্রায় ভগ্নদশা সেই নিয়ে তাদের বাবা সবসময় চিন্তায় মগ্ন থাকে আর তার উপর পাড়ার লোকের তার বাবাকে সুহাস কে নিয়ে কথা শোনানো আর তার প্রতিক্রিয়া এসে পরে সুহাস উপর কিন্তু যখনই সুহাস এর বাবা তাকে মারতে যাবে তখনই নন্দিতা দাড়ায় সুহাসের সামনে ঢাল স্বরুপ।
কয়েকদিন যাবত সুহাস তার দিদিকে চিন্তিত দেখে।তার দিদির সেই ভূবন ভোলানো হাসি আর সে দেখতে পায় না। যে হাসি দেখলে সুহাস সব কষ্ট ভুলে যেতো সেই হাসি আর দেখতে পায় না। তো দিদিকে জিজ্ঞেস করলো “কি হয়েছে তোর দিদি? ” নন্দিতা এক রাশ দিয়ে একটা ছবি দেখিয়ে বললো এই দ্যাখ তোর জামাই বাবু। সুহাস তো দূর্গা পূজার প্রতিমা দেখার মতো আগ্রহ নিয়ে ছবিটাতে তাকালো। দেখলো এক রাজ পুত্রের মতো ছেলে। তো সুহাস জিজ্ঞেস করলো দিদি তুই এতো চিন্তা কিসের বাবা কে বল। নন্দিতার সেই হাসি মাখা মুখ টা সাথে সাথে রুপ নিলো কালো মেঘাচ্ছন্ন আকাশে। সাথে সাথে নন্দিতা মুখে চিন্তার ভাজ পরে গেলো আর নন্দিতা কি যেনো ভাবতে লাগলো তখন সুহাস বলো “কিরে দিদি বলবি না বাবাকে?” তখন নন্দিতা বললো এই ছবিতে যাকে দেখসিস এটা হলো রনবীর আমার স্কুলের পাশের কলেজেই পরে।কিন্তু ওর বাবা মা আমাকে মেনে নিবে না কারন আমি ওদের তুলনায় অনেক ছোট ঘরের মেয়ে আর আমাদের জাত ও এক না। আর বাবাকেও বলতে পারবো না বাবা জানলে আমাকে নদীর জলে ভাসিয়ে দেবে। তো তাই রনবীর আমাকে ওর সাথে পালাতে বললো আমি ভাবছি কি করবো। তখন সুহাস কাদো কাদো মুখ নিয়ে বললো দিদি মা তুই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি? তখন নন্দিতা তা বললো আরে না বোকা আমি ত তোকে আমার সাথে নিয়েই যাবো ।

২।
তো একদিন নন্দিতা আর স্কুল থেকে ফিরে এলো না। সে রনবীর এর সাথে পালিয়ে গেছে। পাড়ার লোক জানাজানি হওয়ার পর সুহাসের বাবা রাগের মাথায় সুহাস কে অনেক মেরেছিল।সেদিন আর নন্দিতা ছিল না বাচাঁনোর জন্য। সে দিন জীবনে প্রথম বার সুহাসের প্রথম তার দিদির উপর অভিমান করলো আর বললো দিদি তুই আমাকে মিথ্যে কেন বললি? আমাকে কেন একা রেখে গেলি? আমাকে কেন তোর সাথে নিয়ে গেলি না?
এভাবেই কাটতে থাকে তার দিন। দিন দিন তার উপর তার বাবার অত্যাচার বাড়তেই লাগলো। একদিন পাসের পাড়ার একটা লোক এসে বললো বাবাকে যে তারা নাকি দিদির লাশ পাশের পাড়ার একটা ঘরে ফাসির দড়িতে ঝুলতে দেখেছে
সুহাসের আকাশ পাতাল সব এক হয়ে গেলো সে তার বাবার আগে দৌড়ে চলে গেলো আর গিয়ে দেখলো তার দিদির নিথর দেহ ঝুলছে আর নিচে একটা চিঠি। সে চিঠি টা খুললো আর দেখলো তাতে লেখা

“আমি জানি ভাই তুই আমার উপর রাগ করে আছিস। আমি কেন তোকে আমার সাথে আনি নি তুই আমাকে জিজ্ঞেস করছিস। কিন্তু যখন তুই চিঠি টা পাবি আমি আর বেচেঁ নেই। জানিস আমি ভেবেছিলাম আমার সংসার টা গুছিয়ে তোকে আমার কাছে নিয়ে আসবো কিন্ত সেটা আর আমার হোলো না। তুই ভাবছিস আমি তোর সাথে এমন টা কেন করলাম। জানিস ভাই রনবীর আমাকে ভালোবাসে নি। ও আমার দেহ টাকে ভালোবেসেছিল ও আমায় এই কয়েকদিন ভোগ করার পর আমাকে ছুড়ে ফেলে দেয়। আমি আর এই অপমান সহ্য করতে পারি নি রে।আর তোদের কাছে ফিরে যাই নি কারন সমাজের লোকের কাছে আমি কুলটা তকমা নিয়ে বেচে থাকতে পারবো না। আমাকে ক্ষমা করে দিস ভাই।আমি মাকে দেয়া কথা রাখতে পারলাম না। ভাই সত্যিকারের ভালোবাসলে অনেক কষ্ট পেতে হয়। ভাই তুই কখনো কাউকে ভালোবাসিস না ভাই। আর আমাকে ক্ষমা করিস ভাই
ইতি
তোর দিদি।

সুহাসের আকাশ যেনো মাথায় ভেঙ্গে পরলো সে মানতেই পারছে না তার দিদি আর এই দুনিয়ায় বেচেঁ নেই সে কান্নায় ভেঙে পরলো। সে মেনে নিতে পারে নি যে দিদি তাকে মায়ের মমতায় বড় করেছে সে দিদি আর তার কাছে নেই।কেউ আর তাকে বলবে না যে ভাই কাদঁছিস কেনো? আমি আছি ত এই যে আমার কাছে।
এর পর কেটে যায় অনেক গুলো দিন। তার দিদির কথা ভেবেই কাটে তার দিন ।

৩।
আজ সুহাস তার কলেজ জীবন শুরু করতে যাচ্ছে।সে রেডি হয়ে চলে গেলো কলেজে। সেখানেই তার পরিচয় হয় সুদীপ এর সাথে। সুদীপ তার পাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্র । সে সুহাসের জীবনে আসে যেমক্ন তৃষ্ণার্থ প্রথিকের কাছে আসে কয়েক ফোটা ঠান্ডা জল বৈশাখের তীব্র তাপদাহে দক্ষিণা বাতসের ন্যায়। সুদীপ যেনো তার জীবনের সব দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দিতে।আজ তার দিদিকে আর সুহাসের তেমন মনে পড়ে না। কারন সুদীপ তাকে মনে করতে দেয় না। এভাবেই সুদীপ এর হাত ধরে সেও ছেড়ে দেয় তার বাবার ঘর পাড়ি জমায় নতুন জীবনের স্বপ্ন চোখে নিয়ে নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।সাজায় তার নতুন সংসার। সুদীপ সারাদিন তার সাথে থাকে আর রাতে নিজের বাসায় চলে যায়। তাদের সম্পর্ক এক বছর যেতে না যেতেই সে সুদীপের মধ্যে কেমন যেনো আর সুহাস কে আগের মতো ভালোবাসে না। আগের মতো কথা বলে না।এখন সুহাসের কথা সুদীপ এর কাছে চিরতার চেয়েও তেতো মনে হয়।
একদিন সুহাস বাজার করতে গেলে দেখে যে সুদীপ শেরওয়ানি কিনছে এটা দেখে সুহাসের নিশ্বাস কেমন যেনো আটকে গেলো। সে সাথে সাথে বসে পড়লো মাটিতে।
সেদিন সুদীপ সুহাসের কাছে আসলে সুহাস সব জিজ্ঞেস করে যে শেরওয়ানি কেন কিনেছে তখন সুদীপ আর মিথ্যে বলতে পারলো না। সে বললো দেখো সুহাস আমাদের মধ্যে এতদিন যা ছিল ভুলে যাও তোমাকে দিয়ে জৈবিক চাহিদা মেটানো যায় সারাজীবন কাটানো যায় না। তুমি আমাকে বাচ্চা দিতে পারবে না। তাই আমি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি তো আমাকে তুমি ভুলে যাও।
এটা শোনার পর সুহাস যেনো বাক রুদ্ধ হয়ে গেলো সে যেনো দেখতে পেলো এক নিমিষে তার সাজানো সংসার ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেলো। তার যত্ন করে দেখা স্বপ্ন এক নিমিষেই আগুনে ঝলসে গেলো।
সে দিন এর পর সুদীপ আর কোনোদিন ও তার সাথে যোগাযোগ করে নি।

৪.

আজ সুহাসের তার দিদির লেখা শেষ কথা টার কথা অনেক মনে পরতেসে।দিদি ত বলেছিল যে,”ভাই কখনো কাউকে ভালোবাসিস না।সত্যিকারের ভালোবাসায় অনেক কষ্ট। কিন্তু সে তো সোনে নি নন্দিতার কথা।
হঠাৎ ঝমঝমিয়ে যেনো আকাশ কেদেঁ দিলো তার এই কষ্টে। আর তখন ই সুহাস যেনো দেখতে পেলো তার দিদি তাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে। তার দিদি তাকে বলছে কিরে তুই কাদঁছিস কেন? আয় আমার কাছে আমাদের পুতুলের বিয়ে দেওয়া ত এখনো বাকিঁ আছে। আয় তাড়াতাড়ি।সেদিন সুহাস চলে গেলো তার দিদির কাছে। এই সমাজ এই মুখোশদ্বারী মানুষের ভিড় থেকে অনেক দূরে যেখানে সুহাস কে কেউ তার মেয়েলী আচরনের জন্য কিছু বলবে না। নন্দিতা কে কেউ কুলটা বলবে না। যেখানে তারা থাকবে শান্তিতে।
তাদের ভালোবাসা ত ভুল ছিল না। আসলে কিছু শরীর পিপাসুদের কাছে তাদের ভালোবাসা ছিল ভোগের হাতিয়ার।ভালোবাসা ভুল নয় মানুষ গুলো ভুল।

লেখকঃ Nur Hossain Tanvir

প্রকাশেঃ সাতরঙ্গা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.