স্ট্রেইট হওয়ার সহজ উপায়

রাত বারোটা বাজে। আমি বসার ঘরের টিভিটা চালু করলাম। টিভির ভলিউম যতটা সম্ভব কম করে রাখলাম। পাশের ঘরের বাবা আর আম্মা ঘুমাচ্ছে। আমি মাঝরাতে টিভি দেখছি শুনলে গজব হয়ে যাবে।
আমি টিভির দিকে মন দিলাম। রাতের এই সময়ে টিভিতে ছেলেদের গোপন সমস্যা সমাধানের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়।
আমি চ্যানেল পাল্টাতে লাগলাম। হ্যাঁ, এইতো একটা বিজ্ঞাপন। একটা মধ্যবয়সী লোক পেটে হাত দিয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন বিজ্ঞাপনটাতে। আমি আগ্রহ নিয়ে দেখতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে আবিস্কার করলাম এটা “বাই বাই পাইলস” নামক কোনো এক কোম্পানির বিজ্ঞাপন।
বিজ্ঞাপনের ভদ্রলোক জানালেন তিনি বহুদিন যাবৎ পাইলস রোগে ভুগছিলেন।
তারপর তিনি “বাই বাই পাইলস” নামক আয়ুর্বেদিক ওষুধ খেয়ে মুহূর্তেই সুস্থ হয়ে গেলেন। সুস্থ হয়ে তিনি বলতে লাগলেন, “বন্ধুরা, আমি আগে পাইলস রোগে ভুগতাম। ঠিকমতো বাথরুম করতে পারতাম না। বাথরুম করার সময় আলপিনের খোঁচার মত লাগত। আমি অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি৷ অপারেশনও করিয়েছি। কাজ হয় নি। তারপর আমি “বাই বাই পাইলস” ওষুধ খাওয়া শুরু করি। ওষুধ খাওয়ার এক সপ্তাহ পরেই আমার পাইলস সেরে গেল। তাই আর বলছি কী! এখনই স্ক্রিনের নিচে দেয়া নম্বরে কল করুন। এখন কল করলে সঙ্গে পাচ্ছেন আরেক ফাইল “বাই বাই পাইলস” সম্পূর্ণ বিনামূল্যে!”
আমি আবার চ্যানেল পাল্টাতে লাগলাম। পাইলস রোগে আমি ভুগছি না। আমার দরকার অন্যকিছু।
কিছুক্ষণ পরে আরেকটা চ্যানেলে চোখ আটকে গেল। এখানেও বিজ্ঞাপন হচ্ছে৷ আমি মনে হয় এটাই খুঁজছিলাম৷ হ্যাঁ, এটাই।
বিজ্ঞাপনটায় দেখা গেল আরেক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরলেন। ঘরে ঢুকেই তিনি বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
লোকটা ঘুমিয়ে পড়ার পর টিভি স্ক্রিনে দুঃখ ভারাক্রান্ত একটা মহিলা উদয় হলেন। মহিলা বলতে লাগলেন, “আমার স্বামী আগে অফিস থেকে বাড়ি এসে ক্লান্ত হয়ে এভাবেই ঘুমিয়ে পড়ত। ওর গায়ে তখন এতটুকুও শক্তি ছিল না। তারপর, আমি ওকে “টাইগার হারবাল” ওষুধের কথা বলি। ও অনলাইনে অর্ডার করে। বন্ধুরা! এক ফাইল শেষ হওয়ার আগেই আমার স্বামী তরতাজা হয়ে উঠল। সে ফিরে পেল তার পুরনো ‘জোস’! তাই আপনারা এখনই স্ক্রিনে দেয়া নম্বরে কল করুন। এক ফাইল-ই যথেষ্ট৷ মূল্য ১ টাকা কমে ১৯৯৯ টাকা।”
আমি একবার সমস্তটা ভেবে নিলাম। গতমাসে বাসা থেকে কেমিস্ট্রি স্যারের বেতন নিয়ে স্যারকে দিই নি। সেই ১০০০ টাকা আমার কলেজ ব্যাগের গোপন এক জায়গায় লুকানো আছে। আর এই মাসে বাড়ি থেকে ফিজিক্স স্যারের বেতন নিয়েও স্যারকে দেই নি। এর বাইরেও গত রোযার ঈদে জমানো প্রায় ৭০০ টাকা এখনো আছে। মোট মিলিয়ে তিন হাজার টাকার কাছাকাছি টাকা এই মুহূর্তে আমার কাছে জমা আছে। তাই, এক ফাইল ওষুধ কেনাই যায়।

২।
আমি স্ক্রিনে দেয়া নম্বর ফোনে তুললাম। নম্বরটায় কল দিলাম। ভারী কণ্ঠের এক লোক ফোন ধরলেন। আমি যত সম্ভব নীচু গলায় কথা বলতে লাগলাম। আমি বললাম, “হ্যালো!”
ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠ উত্তর দিল, “টাইগার হারবাল অফিস। কে বলছেন?”
– আমি আবির বলছিলাম।
ওপাশ থেকে যন্ত্রের মতো উত্তর এলো, “হ্যাঁ বলুন। আপনি আমাদের কোন প্রোডাক্ট টা চাচ্ছেন?”
আমি বেশ কিছুক্ষণ ইতস্তত করতে করতে বললাম, “আপনাদের কাছে স্ট্রেইট হওয়ার কোনো ওষুধ আছে? এই ধরুন এক সপ্তাহের ভেতর গ্যারান্টিসহ স্ট্রেইট বানিয়ে ফেলা হয় টাইপ কিছু?”
ওপাশের ভদ্রলোক থতমত খেলেন বুঝতে পারলাম। তিনি সরু কণ্ঠে বললেন, “ভাই স্ট্রেইট মানে কী? আমি আবার ইংরেজিতে দুর্বল।”
আমি বললাম, “আমার মেয়েদের তেমন ভালোটালো লাগে না। ছেলেদের ভালো লাগে। আর যদি সেই ছেলের হাসি সুন্দর হয় তাহলে তো কথাই নেই। যাহোক, এখন আমি চাচ্ছি আমার যেন মেয়েদের প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং সুন্দর ছেলেরা যেন আমার দুচোখের বিষ হয়ে যায়। আছে এই ধরণের কিছু?”
উনি বললেন, “ভাই, মাফ করেন। আমাদের কাছে এই রোগের চিকিৎসা নেই। আপনি ভালো ডাক্তার দেখান।”
বলেই উনি লাইন কেটে দিলেন।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। তখনও টিভিতে টাইগার হারবাল কোম্পানির বিজ্ঞাপন হয়েই যাচ্ছে। আমি টিভি বন্ধ করে দিলাম।
*
আমি আমার ডায়েরি নিয়ে বসলাম। গত পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে আমি নিজের উপর একটা পরীক্ষা চালাচ্ছি। বিজ্ঞানের ভাষার এক্সপেরিমেন্ট। এক্সপেরিমেন্টের নাম দিয়েছি “স্ট্রেইট হওয়ার পরীক্ষণ।”
এই পরীক্ষার সমস্ত খুঁটিনাটি আমি ডায়েরিতে লিখে রাখছি।
আজ ৯ই ফেব্রুয়ারিতে লিখলাম, “টিভির বিজ্ঞাপনে দেয়া হারবাল ওষুধ খেয়ে স্ট্রেইট হওয়া যায় না। তাই এই নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে না।”
ফেসবুকের অসংখ্য পোস্ট কিংবা পেইজ থেকে আমি স্ট্রেইট হওয়ার বেশ কয়েকটা উপায় ডায়েরিতে তুলে রেখেছি। গুগল থেকেও কিছু পেয়েছি। ঠিক করেছি সবগুলোর সত্যতা আমি যাচাই করব। এরকম কয়েকটা উপায়ের উদাহরণ হলোঃ

১. বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। (যদিও নির্দিষ্ট এই বিষয়ের কোনো ডাক্তার আছে কিনা জানি না।)

২. নিজের মানসিকতা পাল্টাতে হবে। ফেসবুক এবং গুগল অনুযায়ী নিজে ছেলে হয়ে আরেকটা ছেলের প্রতি প্রবল আগ্রহ জন্মানোর বিষয়টা পুরোপুরি মানসিক সমস্যা। হরমোনের গন্ডগোলের জন্য এটা হয়। তাই, ছেলেদের প্রতি আবেগের বিষয়টা ঘুরিয়ে মেয়েদের দিকে নিয়ে যেতে হবে। (আমি সেই চেষ্টাতে আছি। ভালো কোনো মেয়ে এখন খুঁজছি।)

৩. যোগব্যায়াম করতে হবে। বিখ্যাত এক সন্ন্যাসী স্ট্রেইট হওয়ার একটা আসন উদ্ভাবন করেছেন। বিখ্যাত সন্ন্যাসীর মতে এই আসনে একটানা একমাস বসে থাকলে মানুষজন স্ট্রেইট হয়ে যায়।

৪. ছেলেদের থেকে একশ হাত দূরে থাকতে হবে। রাস্তাঘাট, ক্লাস, গাড়ি-ঘোড়া কোথাও ছেলেদের সঙ্গে চোখাচোখি খেলা করা যাবে না। এই সমস্ত মেয়েদের উদ্দেশ্যে করতে হবে এখন থেকে।

যাহোক, উপায়গুলো পড়ে আমি যোগব্যায়াম করতে যোগব্যায়াম বসলাম। গত ৬ দিন ধরে ব্যায়ামটা করছি। পা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। তবুও মুখ বুঁজে সহ্য করছি।

৩।
লক্ষণীয় ফল অবশ্য পাচ্ছি না। ছেলেদের বরং আগের চেয়ে বেশি ভালো লাগছে। এইতো সেদিন কলেজের এক মাস্তান ধরণের সিনিয়র ভাইকে দেখে ক্রাশ খেলাম। অথচ এই ধরণের উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেদের আমি আগে দুই চোখে দেখতে পারতাম না। “আসন”টা করে সম্ভবত উল্টো ফল আসছে।
শুধু ওই মাস্তান বড় ভাই-ই না। আমাদের পুরো পাড়াতে আমার অসংখ্য ক্রাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এই ধরুন আমাদের বাড়ি থেকে বের হয় খুব বেশি হলে ১০০ গজ পরে আমার এক ক্রাশ থাকে। সেই বাড়ি থেকে ডানদিকে আরো ১০০ গজ পরে আরেকজনের বাড়ি।
আমি যদি বাড়ি থেকে অসময়েও বের হই, তাহলেও ওদের ৩-৪ জনের সঙ্গে দেখা হয়েই যাবে। যদিও, এদের নিয়ে আমি সাধারণত খুব বেশি মাথা ঘামাই না। জানি তাদের সাথে কখনই কিছু হওয়া সম্ভব না।
ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করতে করতে আমার পাশে একটা মেয়েকে কল্পনা করার চেষ্টা করতে লাগলাম। এটা ভাবতেও কেমন জানি লাগে। সে মেয়ে যতই সুন্দর হোক না কেন। আমি ভাবতে পারি না।
যোগব্যায়ামে মনে হয় কাজ হচ্ছে না।
*
পরদিন সকাল সাতটায় রসায়ন স্যারের কাছে পড়তে গেলাম। আমি যেই স্যারের কাছে রসায়ন প্রাইভেট পড়ি, উনি খুবই ফালতু ধরণের স্যার।
আগেই বলেছি আমি রসায়ন স্যারের বেতন দেই নি। কারণ, জৈব রসায়ন নামের ভয়ংকর একটা অধ্যায় তিনি মাত্র দুই দিনে শেষ করেছেন। যে স্যার জৈব রসায়ন দুই দিনে শেষ করে তাকে মাস শেষে পুরো বেতন দেয়া যায় না। তাই আমি তার বেতন কেটে রেখে দিয়েছি। ওই টাকা তিনি ইহ জনমে আর পাবেন না।
রসায়ন প্রাইভেটেও আমার দুইজন “ক্রাশ” বিদ্যমান। তাদের একজন আবার খুবই ভালো ছাত্র। সাধারণত অতিরিক্ত ভালো ছাত্ররা বাস্তব জীবনে গাধা টাইপ হয়। তবে, সে তেমন না। আর অন্যজন মাঝারী ধরণের ছাত্র। কিন্তু, দেখতে দুজনেই রাজপুত্রের মত।
রসায়ন প্রাইভেটে তাই আমার সময়ের একটা বড় অংশ কাটে ওদের দুইজনের দিকে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকিয়ে থেকে। এইতো সেদিন “মাঝারি ধরণের ভালো ছাত্র” আমাকে প্রায় ধরেই ফেলেছিল।
তবে, স্ট্রেইট হওয়ার নিয়মানুযায়ী আমি আজ তাদের দু’জনের গা বাঁচিয়ে একেবারে সামনের বেঞ্চে গিয়ে বসলাম।
স্যার তখন পড়ানো শুরু করলেন। সাধারণত স্যার প্রতিদিন পড়া শুরু করার আগের বিশ মিনিট ধরে মজার মজার কিন্তু খুবই সস্তা ধরণের কিছু কৌতুক শোনান। সেগুলো শুনে আমাদের ব্যাচের প্রায় সব ছেলে-মেয়েরা হেসে লুটোপুটি খায়। এসময় ব্যাচের মেয়েদের ইমপ্রেস করার জন্য ছেলেরাও কিছু হাসির গল্প বলে। যেগুলো আরো অখাদ্য।
আমার যেহেতু স্যারকে অসহ্য লাগে তাই অতি কষ্টেও স্যারের মজার মজার কৌতুকে আমার হাসি আসে না।
কৌতুক শেষে স্যার আজকে নতুন অধ্যায় ধরলেন। পরিমাণগত রসায়ন। যথারীতি তিনি একদিনে পুরো অধ্যায় শেষ করে ফেললেন। আমি কিছুই বুঝলাম না। অধ্যায়টার অঙ্কগুলো তো নয়ই।
পড়তে পড়তে আমি বহু কষ্টে আমার ওই দু’জন ক্রাশের দিকে তাকানো থেকে নিজেকে আটকালাম। তাদের একজন আজকে কালো রঙের শার্ট পরে এসেছে৷ ছেলেদের সবচেয়ে বেশি মানায় কালো রঙের জামাকাপড়ে। তারপরেও ওদের দিকে তাকাতে পারলাম না।

৪।
আমি আমাদের ব্যাচের মেয়েদের দিকে তাকালাম৷ মেয়েদের দিকে তাকালেই ভেতর থেকে “বোন বোন” ফিলিংস আসে। যেমন, দীপিকা পাড়ুকোন কিংবা হালের ক্রাশ মেহজাবিনকে দেখলে মনে হয়, “আহা! এমন একটা বড় বোন থাকলে কতই না ভালো হতো।” তারপরেও, ঠিক করলাম আমাদের ব্যাচের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করব।
কিন্তু কে বেশি সুন্দরী? আমি খেয়াল করেছি- আমার পছন্দের সঙ্গে স্ট্রেইট ছেলেদের পছন্দ কখনই মেলে না৷ ওরা যে-ই মেয়েকে রূপবতী চন্দ্রাবতী বলে, আমার কাছে সেই মেয়েকে কাজের বুয়া টাইপ লাগে৷
তারপরেও মেয়েদের একজনকে বাছাই করলাম।
*
কলেজে গিয়ে সেই মেয়ের উপর নজর রাখতে শুরু করলাম। নিজের সমস্ত আবেগ দিয়ে তাকে নিজের পাশে কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। হচ্ছে না, কিছুতেই পারছি না। আমি আরো বেশি মনোযোগ দিলাম। নিশ্চয়ই আমি পারবো! না পারার কিছু তো নেই।
আমি মাথা ঠান্ডা রেখে মেয়েটার দিকে এগুতে লাগলাম। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে স্ট্রেইট ছেলেদের ভেতর যেসমস্ত সংকোচ কাজ করে, আমার ভেতর তা নেই। তাই আমি হাসিমুখেই জিজ্ঞেস করলাম, “আজকে রসায়ন যে অধ্যায়টা স্যার পড়িয়েছে তা কি বুঝেছ?”
আমি কথা বলছি দেখে মেয়েটা অবাক হয়ে গেল। বলল, “ওই অধ্যায়টা আমার আগেই শেষ হয়ে গেছে। দুই জায়গায় প্রাইভেট পড়ি তো এইজন্য।”
আমি বললাম, “ও। আমি তো কিছুই বুঝলাম না স্যার কী পড়ালেন। তোমার কাছে কি নোট হবে?”
মেয়েটা হেসে বলল, “আমিও বুঝি নি। ওই স্যারের কাছে প্রাইভেট না পড়লে আবার পরীক্ষায় মার্ক কাটে৷ তা না হলে কবে পড়া বাদ দিতাম উনার কাছে। আর, নোট আছে আমার কাছে। কাল প্রাইভেটে নিয়ে আসব।”
আমিও হেসে বললাম, “অনেক উপকার হলো!”
মুখে হাসি থাকলেও সমস্যা হচ্ছে, মেয়েটার প্রতি আমি কোনো টান পাচ্ছি না আমি। মেয়েটার চেয়ে বরং কলেজ গেইটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটাকে বেশি সুন্দর লাগছে। যুবক ছেলেটা আবার হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে গল্প করছে। তার গায়ের শার্টের রঙটাও কী সুন্দর! ইচ্ছা করছে ছেলেটার সঙ্গে গিয়ে গল্প করি।
এসময় আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা বলল, “আচ্ছা ভাইয়া আসি তাহলে। একটু পরেই ক্লাস শুরু হবে।”
আমি হাসিমুখে বললাম, “আচ্ছা। পরে কথা হবে।”
কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম সেই মেয়ে আরেকটা ছেলের হাত ধরে হাঁটাহাঁটি করে বেড়াচ্ছে। কী আশ্চর্য! বয়ফ্রেন্ডও জুটিয়ে ফেলেছে। তাহলে কি আমার সমস্ত পরিকল্পনা বৃথা গেল?
তখন একরাশ হতাশা আমাকে ঘিরে ফেলল। ওরা কত সহজে বয়ফ্রেন্ড পেয়ে যায়! আমি কেন হাজার খুঁজেও পাই না? পৃথিবীতে মনে হয় আমিই একমাত্র সিঙ্গেল রয়ে গেছি।
বিষন্ন মুখে আমি ক্লাসে গিয়ে বসলাম।
*
বাড়ি আসার সময় আমাদের পাড়ার দু’জন ক্রাশ এর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এদের একজন ইঞ্জিনিয়ারং পড়ছে। আর অন্যজন চাকরি করে।
ইঞ্জিনিয়ার ছেলেদের প্রতি আমার আলাদা ধরণের মোহ কাজ করে। যদিও আমার পরিসংখ্যান অনুযায়ী এদের বেশিরভাগই নিয়মিত গোসল করে না এবং এলোমেলো থাকতে পছন্দ করে। আগেভাগে না জানিয়ে যদি এদের ঘরে ঢোকা যায়, তাহলে অবধারিতভাবে দেখা যাবে ঘরে জামাকাপড়, বইখাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আর শার্ট-প্যান্ট নিয়মিত না ধোয়ার কারণে সেগুলো দিয়ে বিকট গন্ধ বের হচ্ছে। তারপরেও ভালো লাগে।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেলেটাকে দেখে আমি মাথা নিচু করে ফেললাম। উঁহু, তাকাবো না। স্ট্রেইট আমাকে হতেই হবে। আশেপাশে কোনো মেয়ে আছে কিনা আমি খুঁজতে লাগলাম।

৫।
হ্যাঁ, একটা মেয়ে আছে। আমি আমার আবেগের সমস্তটা মেয়েটার দিকে ধাবিত করলাম। ইঞ্জিনিয়ার ছেলেদের জন্য যে মোহ আপনাআপনিই চলে আসে, মেয়েটার ওপর সেই মোহ জোর করে আনার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমি কল্পনা করতে লাগলাম যেন মেয়েটাকে নিয়ে আমি দূর পাহাড়ে বেড়াতে গিয়েছি। সে আমার হাত ধরেছে। আমিও হাত ধরেছি। কল্পনা করতে করতেই হঠাৎ বুঝতে পারলাম মেয়েটার জন্য আমার “বোন বোন” ফিলিংস আসতে শুরু করেছে। মনে হলো এই যেন মেয়েটা ছুটে এসে আমার হাতে রাখি বেঁধে দিয়ে বলবে, “ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।”
উফ্! কী বিদঘুটে একটা ব্যাপার।
মাঝখানে আবার পাড়ার এক বিবাহিত লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। লোকটার এমন বিশ্রী স্বভাব। সঙ্গে বউ নিয়ে বের হলেও এমন ড্যাবড্যাব করে তাকান আশেপাশের ছেলেদের দিকে। নজরের বাইরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ওইভাবেই তাকিয়ে থাকেন। মাঝেমাঝে মনে হয় উনার স্ত্রীকে বলি, “আপা শোনেন। আপনার হাজবেন্ডের গোপন কিছু সমস্যা আছে। আপনাকে মনে হয় বিয়ের আগে বলে নি। আসলে জানেন….।”
আমাকে দেখে সেই বিবাহিত লোক যথারীতি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন। কিন্তু, আমি পাত্তা দিলাম না। বিবাহিত লোকদের পাত্তা দেয়ার কিছু নেই।
আমার দ্বিতীয় ক্রাশ অফিস থেকে দুপুরের খাবার খেতে মোটরসাইকেলে চড়ে বাসায় আসছিল। সে দেখি আবার সানগ্লাস পরেছে। কিছু ছেলেদের সানগ্লাসে এত মানায়!
আমি ভাবনার জগতে ডুব দেয়ার আগেই নিজের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণে এনে ফেললাম৷
*
রাতে ফেসবুকের কিছু পেইজে মেসেজ দিলাম। যতদূর দেখলাম, এই পেইজ গুলো মানুষকে স্ট্রেইট বানিয়ে দিতে কাজ করে থাকে। পেইজগুলার নাম উদ্ভট ধরণের। একটা পেইজের নাম “আসুন পাপ থেকে দূরে থাকি।”
সেই পেইজে একজন ডিগ্রীধারী ডাক্তারের ফোন নম্বরও দেয়া দেখলাম। তিনি নাকি এই রোগ সারান। লোকটা আবার আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে কী সব ডিগ্রি নিয়েছেন। এতগুলা ডিগ্রি আছে এমন একজনকে নিশ্চয়ই বিশ্বাস করা যায়। তাই আমি সেই নম্বর ফোনে তুললাম।
কল দিলাম। ওপাশ থেকে ফোন তুললেন একজন মিনমিনে কণ্ঠের লোক। লোকটা বললেন, “হ্যালো!”
আমি বললাম, “হ্যালো ভাইয়া, আমি আবির।”
উনি বললেন, “কুন আবির?”
আমি উত্তর দিলাম, “ফেসবুকে আপনার একটা পেইজ আছে না- আসুন পাপ থেকে দূরে থাকি নামে? আমি ওইটা দেখে আপনাকে ফোন দিয়েছি। আপনি কি সত্যি সত্যি মানুষজনকে স্ট্রেইট বানাতে পারেন?”
উনি বললেন, “হ্যাঁ বাইয়া, আমি ইশটেরেট বানাই। সমুস্যা কি আফনার?”
লোকটার উচ্চারণ শুনে আমার মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ল। ফোন কেটে দিলাম।
দ্বিতীয় আরেক পেইজে দেয়া নম্বরে কল দিলাম। ফোন ধরে এক ভদ্রমহিলা কর্কশ গলায় খেঁকিয়ে উঠলেন, “এই কে রে।”
আমি আবার ফোন কেটে দিলাম। আশ্চর্য! এদের সবাই-ই কি ভুয়া?
*
আচ্ছা, বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা কি এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না? পারলে কোন ধরণের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার? অনেকের মতে এটা মানসিক সমস্যা। তাহলে কি সাইকিয়াট্রিস্ট? নাকি গোপন সমস্যামূলক ডাক্তার?
আমি গোপন সমস্যা সমাধান করেন এমন ডাক্তারের চেম্বারে যাবো বলে ঠিক করলাম। আমাদের বাড়ির কাছেই একটা বড়সড় ক্লিনিক আছে। সেখানে নিশ্চয়ই এই ধরণের কোনো ডাক্তার আছেন।

৬।
ক্লিনিকে যাওয়ার দিন সকাল থেকেই আমার ভেতরে চাপা আনন্দ কাজ করতে লাগল। ডাক্তারদের নিয়ে আমি প্রচুর গল্প পড়েছি। এর মধ্যে একটা গল্পের কথা এখনও মনে আছে৷ গল্পের এক কিশোর ছেলে যায় আরেক যুবক ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারকে সমস্যা বলার এক পর্যায়ে কিশোর ছেলেটা ডাক্তারকে যথেষ্ট রোমান্টিকতার সঙ্গে বলে, “আমি যে-ই রোগে ভুগছি, তা আপনি কখনই সারতে পারবেন না ডাক্তার! আমার যে ছেলেদের ভালো লাগে।”
তখন উত্তরে ডাক্তার বলেন, “আমি জানি আমি সারতে পারব না। কারণ, তুমি যেই সমস্যায় ভুগছ, আমিও তাতে ভুগছি। তাই আসো, আমরা দুই রোগী এক হয়ে যাই।”
গল্পটা লুতুপুতু ধরণের হলেও আমার মতো মানুষের জন্য যথেষ্ট ভালো। তাই, আমি সকাল থেকেই ভাবতে শুরু করলাম আমার সঙ্গেও গল্পটার মতো কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে নাকি।
হয়তো দেখা গেল আমি যেই ডাক্তারের কাছে গিয়েছি সেই ডাক্তার আমাকে পছন্দ করে ফেললেন। তারপর স্টেথোস্কোপ দিয়ে আমার হার্টবিট মেপে বললেন, “তোমার হার্টবিট এতো দ্রুত হচ্ছে কেন? এই-যে আবার বাড়ছে। আমি কথা বললেই বাড়ছে কেন বলো তো?!”
তখন আমি (সমস্ত নিয়ম ভুলে গিয়ে) বলবো, “ওগো ডাক্তার মশাই! তুমি আমাকে কী জাদু করেছ বলো তো? তোমার জাদুতেই তো এই দশা হয়েছে আমার।”
এরপর রোমান্টিক কোনো এক গান শুনতে শুনতে আমরা দুইজন হাত ধরাধরি করে দূর পাহাড়ে চলে যাবো।
চিন্তাভাবনা গুলোকে আবার আটকে ফেললাম। কোন শার্ট পরে যাবো এটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলাম। তারপর ঠিক করলাম সাদা রঙের শার্ট পরবো। সাদা শার্টের সঙ্গে কালো ফ্রেমের চশমা অনেক ভালো যায়। চশমা নেই।
ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকার পর আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। চেয়ারে পঞ্চাশোর্ধ বয়সের এক লোক বসে আছেন। লোকটার জুলফির সব চুল পাকা। সবসময় ভ্রু কুঁচকে থাকেন।
আমি গিয়ে তার সামনে বসলাম। উনি বললেন, “তো বলো তোমার কী সমস্যা?”
আমি বললাম, “আমি স্ট্রেইট হতে চাই। স্ট্রেইট হওয়া যায় এমন কোনো ওষুধ কি আছে?”
ডাক্তার মহাশয় কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছোটখাটো একটা বক্তৃতা দিয়ে দিলের, “অন্ততঃ আমি তো কোনো ওষুধের নাম জানি না। তুমি ছাড়াও এর আগে তোমার মত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তাদের সবাই-ই স্ট্রেইট হতে চায়। সৌভাগ্য বলো আর দূর্ভাগ্যই বলো, অন্তত আমার জানা মতে ওষুধ খেয়ে স্ট্রেইট হওয়া যায় না।”
আমি বললাম, “কিন্তু অনেকে যে বলে ডাক্তাররা এর চিকিৎসা করতে পারেন।”
উনি সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন, “না।”
আমি বললাম, “হয়তো এমন হতে পারে যে, অন্য কোনো ডাক্তার এটা করতে পারবে। পারবে না?”
উনি গম্ভীর গলায় বললেন, “না।”
আমি আবার বললাম, “তাহলে অনেকে যে বলে এটা মানসিক সমস্যা। তা কি নয়?”
উনি বললেন, “তোমার কী মনে হয়? এটা মানসিক সমস্যা?”
আমি বললাম, “না।”
উনি বললেন, “হোমোফবিক মানুষজন অনেক রকম কথা-ই বলবে। বলবে এই করলে স্ট্রেইট হওয়া যায়, ওই করলে স্ট্রেইট হওয়া যায়। ওইগুলোর বেশিরভাগই ভুয়া।”
আমি মাথা নাড়ালাম।
চলে আসার সময় উনি ভিজিটও নিলেন না। শুধু ইংরেজিতে বললেন, “May God always be with you.”

৭।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে মনে আমি অনেক কথা ভাবতে লাগলাম। বাড়ি এসে সোজা ডায়েরি নিয়ে বসলাম। ফেসবুক আর গুগল থেকে পাওয়া সমস্ত নিয়ম কেটে দিলাম। তারপর কয়েক লাইন লিখলাম,
“সব গুজব। সঅঅঅব। যোগব্যায়াম, মেয়েদের সাথে আরো বেশি সময় কাটানো, ছেলেদের থেকে একশ হাত দূরে থাকা এসবে কোনো কাজ হয় না। বরং নিজেকে আরো বেশি কষ্ট দেয়া হয়ে যায়। খুব সম্ভবত চেষ্টা করে স্ট্রেইট হওয়া যায় না। এটা জন্মসূত্রে পেয়ে আসতে হয়। তাই বৃথা চেষ্টার কোনো মানে হয় না।

তাই, আমার মতে স্ট্রেইট হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে স্ট্রেইট না হওয়া।
আঙুর ফল টক? হ্যাঁ তাই।”
*
পরদিন সকালে রসায়ন পড়তে গেলাম। আজ যেহেতু আমার কোনো বাঁধা নেই, তাই গিয়ে আমার ক্রাশদের সঙ্গে বসলাম।
পড়তে পড়তে “মাঝারি ধরণের ভালো ছাত্র” আমাকে প্রায় ফিসফিস করে বলল, “কী ব্যাপার? তুমি কি এতদিন আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিলে? কথাটথা বলতে না। কী হয়েছে?”
প্রশ্ন শুনে আমি খানিকটা অবাক হয়ে গেলাম। সে বলল, “শোনো, প্রাইভেটের পরে বাইরে একটু দাঁড়াবে। কথা আছে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে আমার হার্টবিট হুহু করে বাড়তে শুরু করলো।
দেখলাম ওর ব্যাগের ভেতরে কয়েকটা গোলাপ ফুল রাখা। লুকিয়ে রাখতে চাইছে। কিন্তু দেখে ফেলেছি। আমাকে দেবে নাকি? তাই তো মনে হচ্ছে। খুশিতে আমার নাচানাচি করতে ইচ্ছা করছে।
পড়া শেষে বাইরে দাঁড়ানোর পর সে আসল৷ সবাই চলে যাওয়ার পর সে হন্তদন্ত হয়ে বলল, “এই গোলাপ গুলো ধরো তো। এগুলো তোমার জন্য। আজ কলেজে আসছ তো?”
আমি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম। তার প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ালাম। সে বলল, “ফটোকপির দোকানে কয়েকটা সাজেশন ফটোকপি করতে হবে। তুমি যাবে? আসো যাই।”
বলে সে আমার হাত ধরে টানতে টানতে হাঁটতে শুরু করল। আমি একদৃষ্টে তার দিকেই তাকিয়ে রইলাম। সে বলল, “সামনে তাকাও। অ্যাক্সিডেন্ট করবে গাধা ছেলে।”
এসময় আমি হেসে ফেললাম। হাসতে হাসতে দুজন হাঁটতে থাকলাম।

লেখকঃ ফাহিম হাসান

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.