নব দিগন্তের তীরে


অনি আর আমি একসাথে স্কুলে গিয়েছি এবং একসাথে বনে বাদাড়ে ঘুরেছি।আর বাড়িতে আসলেই মায়ের বকুনিটা নিত্য দিনের ব্যাপার ছিল।কিন্তু পিসিমা কখনো চোখ পর্যন্ত রাঙিয়ে কথা বলতো না।সে নিজের পুত্র থেকে আমাকেই বেশি আদর যত্ন করিতো।মাঝে মাঝে পিসি আমাকে বলিত অনি যদি কন্যা হয়ে জন্মিতাম তাহলে কুশল তোমাকে আমার মেয়ে জামাই করে রাখতাম। ছোট ছিলাম তাই কথাটার অর্থ একরম বুঝিতে পারিতাম না ।অনির প্রতি আমার সবার থেকে বেশি দাবি ছিল, সে ধারণা আমার মনে বাল্যকাল হতেই বদ্ধমূল ছিল।সেই অধিকার মতে আমি তাকে ভালোবাসিতাম, শাসন করিতাম,মাঝে মাঝে শাস্তিও দিতাম।সেও সহিষ্ণুভাবে আমার সকল দাবি মানিত।পাহাড় সম তার রূপের প্রশংসা ছিল, কিন্তু আমার কাছে সে সৌন্দর্যের কোন গৌরব ছিল না। আমি শুধু জানিতাম অনি শুধু আমার জন্য পিসির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছে,সে আমার জন্য।


আমার পিতামহ শংকর চাটুয্যে পেশায় একজন জমিদারের নায়েব ছিল।তাহার পুত্র গৌড়শংকর মানে আমার পিতা একজন সরকারি কর্মচারি। বিশাল দোতলা বাড়িটা আমার পিতামহের তৈরি। দেখতে নতুন মনে হলেও এটাকে বছর অন্তরেক রং সুরকি দিয়ে নব যৌবন দেওয়া হয়। আমার মা অন্নপূর্ণা রায়। নামেও যেমন অন্নপূর্ণা গুনেও তেমন। আমার পিসি সারদা রায়,বিয়ের বছর তিনেক পর পতিদেবের মৃত্যু হয়।শশুর কূলের ঠায় হারিয়ে এসেছে বাবার কূলে। আর অনির্বান মুখার্জি আমার পিসতুতো ভাই। আমি কুশল চাটুয্যে, বাবা মায়ের একমাত্র পুত্র। আমার আগেও নাকি আমার মায়ের আরো দুজন পুত্র জন্মেছিল কিন্তু তারা বাল্যকালেই গত হয়েছে। বাল্যকালে পিসি আমাকে আর অনিকে একত্রে করিয়া আপনা আপনি বলিত ” আহা দুটিতে বেশ মানায়। ” সেই সময় থেকেই অনিকে আমার ভালো লাগিতো।


যখন প্রথম আমাকে আর অনিকে স্কুলে ভর্তি করা হলো আমরা এক সাথে স্কুলে যেতাম।স্কুলের স্যার আমাকে মাকাল ফল আর অনিকে পদ্মফুল বলিতো।এরও একটা বিশেষ কারণ ছিল, আমি পড়াশোনার বিশেষ কিছু পারিতাম না। কিন্তু অনি ছিল ক্লাসের সেরা ছাত্র। এরই জন্য আমি মাকাল ফল আর অনি পদ্মফুল। স্কুল ছুটির পর আমি আর অনি কাপালিদের চাষের জমি দেখতে যেতাম।এক সাথে হাত ধরে দিঘির পাড়ে দাড়িয়ে পদ্মফুল দেখতাম। একবার হরিহরের পিয়ারা বাগানে গিয়াছিলাম পিয়ারা চুরি করতে। হরিহর মশাই আমাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরল,অনি এক দৌড়ে পালিয়ে গেল। এর কিছু সময় পর যখন অনি আমার জন্য নিজে এসে হরিহর মশাইকে বললো ” কাকু কুশলের কোন দোষ নেই আমি ওকে এখানে নিয়ে এসেছি “। যা শাস্তি দেবার আমাকে দিন, তখন বুঝেছিলাম মানুষটা আমাকে ভালোবাসে।আমি ধর্মে কর্ম তেমন মানিতাম না। কিন্তু অনি ধর্ম কর্ম সব মানিত, মাসের প্রতিটি ব্রত সে পালন করিত।আমি যখন একাদশ শ্রেণিতে পড়িতাম তখন আমার একটা কঠিন ব্যামো হইয়াছিল।দেশের বড় বড় ডাক্তারদের ওষুধ পথ্য কাজ করেনি, তখন অনি আমার জন্য একাধারে সাত দিন উপোস করেছে। ইশ্বরের কাছে আমার জন্য কেঁদেছে অপসৃয়মান অস্তিত্বের জন্য। তার প্রার্থনার জন্যই হয়তো মৃত্যুর দেবতা আমার আত্মাকে রেখে গেছে, তার জন্যই হয়তো আমার বেঁচে থাকা।


-“কি দেখছো হা করে? কুশল তোমাকে বলছি। কি হলো কোথায় আছো। “
-“না মানে তোমাকে দেখছি। “
অনি বিরক্তিকর স্বরে বললো

-“আমাকে দেখার কি আছে। আমার কি নতুন করে রূপ ধরেছে। “

-“অনি একটা কথা বলবো?”

– হ্যাঁ বলেন জমিদার পুত্র।

– তুমি এতো সুন্দর কেন। আমি যত দেখি ততো তোমার নতুনত্ব আবিষ্কার করি।কি এমন নতুনত্ব পেলে আমার মাঝে। তোমার অনেক অভিমান।

-এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে কুশল। আজ বাদে কাল পরিক্ষা, তুমি এখন প্রেম কাব্য রচনা করতে বসেছো। তোমাকে নিয়ে আমি আর পারি না।

কুশল একটু মুচকি হেসে বললো তাই। তাহলে তো প্রেম কাব্য রচনা করতেই হয়। তারপর ভরাট গলায় বলল

পারাপারের ঘাটে প্রিয়
রইনু বাধা না
এই তরীতে হয়তো তোমার পড়বে রাঙা পা
আবার তোমার সুখ ছোঁয়াই আকুল দোলা লাগবে নায়,
এই তরীতে যাব মোরা আর না- হারা গাঁ,
পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বাধা না।।

এবার কিন্তু যাচ্ছে তাই করে ফেলবো তুমি থামবে।

অনি একটু আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরবে আমায়।খুব ইচ্ছে করছে তোমাকে আলিঙ্গন করতে।

না একটুও না, অনেক সহ্য করেছি তোমার আবদার। কুশল তোমাকে বলছি আর একটু পড়তে। একটু পরেই আবার ডাক পড়বে খেতে।

কুশল একটু রাগান্বিত হয়ে অন্য দিকে ঘুরে বসলো। অনি বুঝতে পারলো বেহায়াটা যা বলেছে তা না করলে সারা রাত এভাবেই থাকবে।তাই কোন উপায় না দেখে পেছন থেকে কুশলকে জড়িয়ে ধরলো। অমনি কুশল ঘুরে জড়িয়ে ধরলো অনিকে। অনি একটা চুমু দিবে আমায়।দেখো অনেক হলো এবার ছাড়ো। না ছাড়বো না, তুমি না দিলেও আমি তো দেবই। এই বলে কুশল অনির চোখে, গালে, কপালে চুম্বন একে দিল। কি এবার আমাকে তো ছাড়ো, এমন ভাবে ধরে আছো যেন সারাজীবন এভাবেই ধরে রাখবে।অনি কুশলের দিকে একাধারে তাকিয়ে কেঁদে দিল। এই বোকা কাঁদছ কেন? কুশল সারাজীবন থাকবে আমার সাথে এভাবে। বুড়ো হবে একসাথে। পাগল একটা, তোমার কুশল তোমাকে ছেড়ে কোথায় যাবে। তুমি জানো তোমাকে ছাড়া আমি অপূর্ণ, আমার পূর্ণতা পায় তোমাতে। কথা দিলাম সারাজীবন এভাবেই তোমার পাশে থাকবো।
কি হলো এবার তো চোখের জল মুছতে পারি। এই বলে কুশল অনির চোখের জল মুছে দিল।


দিন কাটছে। এমনি এক দিনের কথা । রাতের খাবার আয়োজন শেষ। সারদা ওপরে গেল অনি ও কুশলকে ডাকতে।” কুশল বাবা খেতে আয় ” তোর বাবা অপেক্ষা করছে। আজ সবাই একসাথে খাবে তাই।কুশল আর ইতস্তত না করে চলে গেলো।এমনিতে কুশল আর অনি সবার সাথে খায় না।

কুশলকে নামতে দেখে গৌড়শংকর বললো এসো বাবা, তোমার জন্যই বসে আছি। কুশল ভাবলো হয়তো বাবা তাকে কিছু বলবে।কুশল খাদ্য চোপাইয়ার কাছে এগিয়ে চেয়ারে বসলো। সারদা থালায় খাদ্য পরিবেষ্টিত করে কুশলের সামনে এগিয়ে দিল।কুশল খাবারে হাত দিয়ে বললো,” বাবা তুমি যেন কি বলতে চাইলে? গৌড়শংকর গলাটা হালকা ঝেড়ে বললো, অনি কোথায় তাকে তো দেখছি না? বাবা ও আসছে। কুশলের বাবা সারদাকে বললো দিদি তুই গিয়ে অনিকে ডেকে আন।সারদা উঠতে উদ্যত হলো অমনি দেখলো অনি, কামরা থেকে বের হয়ে নামছে। হ্যাঁ যা বলছিলাম সবাই এখানো আছো। কুশলের বয়স পঁচিশে পা দিল।কুশলের বিবাহের বয়স ক্রমে উত্তীর্ণ হইয়া যাইতেছে।তাই আমি ঠিক করেছি আমার বন্ধু রামলালের কন্যা সুনিতার সাথে কুশলের বিবাহ দিব।

গৌড়শংকরের কথা শুনে কুশল বজ্রবেগে উঠে দাড়ালো। অনি সবেমাত্র এসে চেয়ারে বসবে কিন্তু মামার কথা শুনে সেও দাড়িয়ে রইলো। তার আপাদমস্তক নড়ে উঠলো। কুশল রক্তরঞ্জিত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,”

এই মুহূর্তে আমার পক্ষে বিবাহ করা সম্ভব নহে।” আমার বিদ্যাভ্যাস সম্পূর্ণ না করিয়া আমি বিবাহ করিব না।

গৌড়শংকর রাগান্বিত কন্ঠে বললো, ” সুনিতার মতো এমন মেয়ে তোমার জন্য বসে থাকবে না।” তোমার সমস্যা কোথায়? বিবাহ কার্য সম্পন্ন করিয়া আবার বিদ্যাভ্যাসে মনোনিবেশ করতে পারো। কুশল তার বাবার দিকে তাকিয়ে বললো, বাবা আমার যদি আজীবন বিবাহ না করিয়া থাকিতে হয় আমি তাও থাকবো। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি বিবাহ করিব না। এই বলে কুশল খাওয়া ছেড়ে উঠে গেল নিজের কামড়াতে। পেছন থেকে সারদা, অন্নপূর্ণা বার বার করে বলছিল, বাবা খাবার রেখে উঠতে নেই অমঙ্গল হবে।কে শোনে কার কথা। অন্নপূর্ণা স্বামীর পানে তাকিয়ে বললো, “তোমাকেও বলি আর সময় পেলে না কথাটা বলার।” অনু তোমাকে বলছি ছেলেকে বুঝাও। সুনিতা অনেক ভালো মেয়ে, লক্ষী সামন্ত বটে। তাছাড়া রামলালের অবস্থা কোথায় সেটা তুমি জানো। এদিকে এসব কথা শুনে অনির চোখে জল চলে এলো। সবার চোখ এড়াতে সেও দৌড়ে উপরে চলে গেলো।


মাঝ রাতে সারদা খাবারের থালা নিয়ে কুশলের কপাটে কড়া নাড়লো। বাবা দরজা খোল, রাতের খাবারটা খেয়ে নে। রাতে না খেলে শরীর খারাপ করবে যে। কুশলের কোন সাড়া শব্দ শোনা গেল না। পাশের কামরা থেকে অনি বের হয়ে আসলো। কি হয়েছে মা? দেখনা অনি কুশল কে এতো করে ডাকছি কোন সাড়া দিচ্ছে না। এদিকে অন্নপূর্ণা এসে কিছু সময় বৃথা চেষ্টা করলো। কারো চেষ্টায় কোন কাজে আসলো না। মা তুমি আমার কাছে থালাটা দাও আমি দেখছি। এই বলে অনি সারদার হাত থেকে থালা নিজের হাতে নিয়ে সারদাকে সেখান থেকে বিদায় দিল।খাবার থালা হাতে নিয়ে অনি বেশ কিছু সময় কুশলকে ডাকলো কিন্তু তাতে কোন কাজে আসলো না। কুশল দরজা খোলো, তানা হলে আমি কিন্তু নিজের ভালো মন্দ একটা করে বসবো। তখন পারবে নিজেকে ক্ষমা করতে৷ অনির একথা কুশলের কর্ণগোচর হলো।দরজা খুলে দিয়ে কুশল সটান হয়ে দাড়িয়ে রইলো। কুশল এটা কি হচ্ছে? মামা না হয় শুধু তোমার বিয়ের কথাটা বলছে।তোমাকে তো আর বিয়ে দিয়ে দিবে না। এমন পাগলামির কোন মানে আছে।না আমি বুঝতে পারছি না, বিয়ে না করলে কিন্তু খাবার তো খাওয়া যায়। কুশল আড় চোখে অনির দিকে তাকিয়ে বললো,” আমি যদি বিয়ে করি তবে তোমার ভালো হয় তাই না। ” তুমি মুক্তি পাবে, আর তো আমার পাগলামোটা সহ্য করতে হবে না। অনি আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কারো সাথে নিজেকে ভাবতে পারি না। আমি পারবো না অনি আমি পারবো না । এই বলে কুশল অনিকে জড়িয়ে ধরলো। অনি নিজের চোখের জল আটকাতে পারলো না। অনি কুশলের মাথায় আলতো করে হাত দিয়ে বললো, পাগল একটা আমি কি কখনো তোমাকে বলেছি যে তুমি অন্য কারো হয়ে যাবে। তুমি আমার ছিলে,আছো এবং থাকবে। এবার লক্ষী ছেলের মতো এখানে বসো।অনি কুশলকে বসিয়ে খাইয়ে দিল আর কুশলও অনিকে খাইয়ে দিল। খাওয়া শেষ করে কুশল অনিকে বললো, অনি চলো আমরা কোন স্বীকৃত দেশে গিয়ে বিয়ে করে নিয়ে সংসার বাধি।এদিকে তাদের কথার কিছুটা ধাচ বাইরে থেকে সারদা শুনতে পায়।ওদের কথা শুনে সারদা মুখে আচল দিয়ে সাত পাঁচ ভাবতে থাকে। হায় ভগবান এ কেমন সন্তান পেটে ধরলাম। কোন পাপের শাস্তি আমায় দিলে। এসব ভাবতে ভাবতে সারদা দ্রুত সে স্থান থেকে প্রস্থান করবে, অমনি সিড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে যায়।বিকট চিৎকারের শব্দে সবাই ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে দেখতে পেল সারদা মেঝেতে পড়ে আছে। অনি ও কুশল ধরাধরি করে সারদাকে সোফায় শুইয়ে দেয়।এদিকে অন্নপূর্ণা সমানে মাথায় জল ঢালছে।কুশল ও অনি হাতে পায়ে তেল ঢলছে। কিন্তু কোন ফল হলো না। রাত যখন প্রায় শেষ হতে চললো, ঠিক তখনই সারদার হুশ ফিরলো।


পরদিন সারদাকে শহরের বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। সাথে কুশল, অনি,ও গৌড়শংকর। ডাক্তার সারদাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে গেছে। অনি সমানে কেঁদে যাচ্ছে। কুশল গিয়ে অনির কাধে হাত রাখতেই অনি কুশলকে জড়িয়ে ধরলো। অনি আমি একা হয়ে গেলাম, আমার আর কেউ রইলো না। আমি একেবারে অনাথ হয়ে গেলাম কুশল। দূর বোকা পিসিমার কিছুই হবে না। দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।ঘন্টা দুয়েক পর ডাক্তার এসে গৌড়শংকরের সাথে কিছু কথা বললো। কুশল ও অনি সেখানে আসার আগেই ডাক্তার চলে গেলো। বাবা ডাক্তার কি বললো? পিসির কি কোন গুরুতর কিছু হয়েছে? গৌড়শংকর অনির মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কিন্ত কিছু বললো না।অনি বলে উঠলো, মামা কিছু তো বলো? মায়ের কি হয়েছে? আমি কিছু বলতে পারবো না। ডাক্তার বললো কিছু পরিক্ষা আছে সেগুলো শেষ করে বলবে।আর শোন বেশি চিন্তা করিস না। আমি বাড়িতে যাচ্ছি, বিকেলে অনু আসবে। কুশল তুমি বাইরে থেকে খাবার এনে দুজনে খেয়ে নিবে।বাবার কথা মতো অনি দুপুরের খাবার নিয়ে আসলো। কিন্তু কিছুতেই অনিকে খাওয়াতে পারলো না। অবশেষে দিব্যি টিব্যি দিয়ে সামান্য কিছু খাওয়াতে পারলো। বিকেল তিনটা নাগাদ ডাক্তারের দেখা মিললো। ডাক্তার মশাই কুশল আর অনির কাছে কিছু বলতে চাইলো না। তিনি এসেই বললো” চাটুয্যে মশাই কোথায়? তার সাথে কিছু কথা আছে। কুশল এগিয়ে গিয়ে বললো, ডাক্তার কাকু আমাকে বলতে পারেন “।

তাছাড়া অনির মায়ের সমস্যা অনিকেও তো জানতে হবে। ডাক্তার একটু থেমে বললো দেখো আমি বুঝতে পারছি তোমাদের মনের অবস্থা। আসলে রোগীর শরীরের ডান পাশ অকেজো হয়ে গেছে। উনি খুব বেশি আঘাত পেয়েছে। তাছাড়া ওনার মানসিক অবস্থা বেশি ভালো না।ডাক্তারের মুখ থেকে একথা শোনার পর অনি মাটিতে বসে পড়লো। কুশল গিয়ে অনিকে উঠিয়ে একটা চেয়ারে বসালো। অনি তোমার ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। তোমাকে শক্ত হতে হবে। তাছাড়া তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই। আমি ও বাবা সর্বদা তোমার পাশে আছি। বিকেলে অন্নপূর্ণা এসে সারদার অকেজো হয়ে যাওয়ার কথা শুনে একেবারে ভেঙ্গে পড়লো।সন্ধ্যার পর অন্নপূর্ণা সারদাকে দেখতে গেল। সারদাকে দেখে অন্নপূর্ণা নিজের চোখের জল আটকাতে পারলো না। সারদাকে জড়িয়ে ধরে সে কাঁদতে শুরু করলো। একটু পর অনি ও কুশল গেল সারদাকে দেখতে। ওদের দুজকে দেখে সারদা ঘৃণা মিশ্রিত চোখে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।ওরা দুজনে গিয়ে সারদার পাশে বসলো, কিন্তু সারদা একটি বারের মতোও ওদের দিকে তাকালো না।কিন্তু ওরা দুজন এর কোন হদিস করতে পারলো না।


দিন পনেরো পর হাসপাতাল থেকে সারদাকে বাড়িতে নেওয়া হলো। অন্নপূর্ণা রিতি মতো সারদার দেখাশোনা করে। কাজের লোক রাখা হয়েছে। সংসারের সামান্য কাজটুকু এখন সারদার করতে হয়।বাকিটা কাজের লোক করে দেয়। অনি ও কুশলের পরিক্ষা শেষ। এখন অবসর সময় পার করছে। অনি মাঝে মাঝে মামার সাথে ব্যাবসায়ের কাজে এদিক ওদিক যায়। মাঝে মাঝে কুশলের কোলে শুয়ে বাতায়নের দিকে তাকিয়ে চন্দ্রিমা উপভোগ করে।

জানো কুশল আমার মাকে নিয়ে খুব চিন্তা হয়।এখনো নিজের একটা ব্যবস্থা করতে পারলাম না। এদিকে মায়ের এ অবস্থা, সব কিছু তো তোমরাই করছো। অথচ আমি একটা অপয়া, তোমাদের সব কিছু কেমন বসে বসে শেষ করছি।

অনির একথা শুনে কুশল অনির মুখ চেপে ধরলো। অনি ভুলেও কখনো মুখে একথা আনবে না। যাকিছু আমার তার সব কিছু তোমার। তাছাড়া বাবার ব্যাবসায় তো পিসিরও ভাগ আছে।পিসো মশায়ের রেখে যাওয়া অর্থ সম্পদ পিসি তো বাবাকে দিয়েছে।এখন অনেক রাত হয়েছে গিয়ে শুয়ে পড়ো।

পরদিন সকালে অন্নপূর্ণা সারদাকে স্নান করানোর জন্য উদ্যত হলো। সারদা অন্নপূর্ণানার দিকে তাকিয়ে বললো, বৌদি একটু কুশল ও অনিকে ডেকে দিবে। ” অন্নপূর্ণা কুশল ও অনিকে ডাকতে গেল। কুশল এদিকে আসবি বাবা তোর পিসি তোকে ডাকছে, সাথে অনিকেও। ওপর থেকে কুশল প্রতিউত্তর দিল আসছি মা। বাধ্য ছেলের মতো অনি ও কুশল সারদার শিহরে গিয়ে হাজির হলো। ওদের দুজকে দেখে সারদা অন্নপূর্ণাকে বললো, ” বৌদি তুমি একটু বাইরে যাও ওদের সাথে আমার কিছু কথা আছে। ” সারদার কথা শুনে অন্নপূর্ণা বাইরে চলে গেলো।

সারদা কুশলের দিকে তাকিয়ে বললো, ” কুশল বাবা কখনো তোকে ভাতুষ্পুত্র ভাবিনি। নিজের ছেলের মতো ভেবেছি। অনির থেকে তোকে বেশি ভালোবাসি। সেটা হয়তো তুই জানিস। পিসির মুখে একথা শুনে কুশল কেঁদে দিল। সে আর দাড়িয়ে থাকতে পারলো না। সারদার হাত ধরে বসে পড়লো।এবার সারদা অনির দিকে তাকিয়ে বললো, অনি তুই আমার অংশ। তোর বাবার মৃত্যুর পর আমি তোর মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে আছি। দাদা, বৌদি হাজার বার বলেছিল আবার বিয়ের পীড়িতে বসতে। কিন্তু তোর জন্য আমি সে সব বিসর্জন দিয়েছি। এ যাত্রায় মনে হয় আর বাঁচব না। তাই যে কটা দিন বাঁচি একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই। আমার খুব ইচ্ছে ছিল, ছেলের বউ দেখবো, তার সাথে এক সংসারে থাকবো। তাই বলি কি বাবা তুই বিয়ে করে নে।আমার ইচ্ছেটা পূরণ কর।সারদার একথা যেন বজ্রপাতের মতো মনে হলো অনির কাছে। কিন্তু কুশলের কাছে বেশ স্বাভাবিক মনে হলো।অনি আর এক মুহূর্তের জন্য সেখানে থাকতে পাররো না।সারদার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে।কুশল হাত দিয়ে সে জল মুছে দিল। সারদা কুশলকে বললো, কুশল আমি জানি তুই অনিকে ভালোবাসিস।পিসির কথা শুনে কুশল হতবাক হলো। কিন্তু কোনো কিছু বলতে পারলো না। কুশল বাবা তোরাতো বেশ পড়াশোনা করেছিশ, তোরাতো জানিস তোদের এ প্রেম কখনো স্বীকৃতি পাবে না। তাই বলি কি তুইও বিয়ে করে নে। সারদার এ কথায় কুশল শক্ত হয়ে গেল। পিসি তোমাকে আমার বিয়ের কথা চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু তোমাকে কথা দিতে পারি অনিকে বিয়েতে রাজি করানোর সব দায়িত্ব আমার। এই বলে কুশল সারদার কামরা থেকে বেড়িয়ে গেল। সন্ধ্যায় কুশল অনির কামরায় গিয়ে দেখলো সে শুয়ে আছে। অনির পাশে বসতেই কুশলকে সে জড়িয়ে ধরলো।কুশল অনির থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বললো, অনি আমি আজ তোমাকে যেসব কথা বলবো তা তোমাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। তুমি হয়েতো বুঝতে পারছো আমি কি বলতে চাইছি। কুশলের কথায় অনি বুঝতে পারলো যে তাকে বিয়ের পীড়িতে বসতে হবে। কিন্তু কুশল আমি যে তোমাকে ভালোবাসি সেটার কি হবে। অনি তুমি বোঝার চেষ্টা করো তোমাকে তোমার মায়ের জন্য আমাকে ছাড়তে হবে। তোমাকে তোমার মাতৃআজ্ঞা পালন করতে হবে। অনিকে বুঝাতে কুশলের বেশি কষ্ট হলো না। এদিকে গৌড়শংকর ঠিক করলো সুনিতার বিবাহ অনির সাথে দিবে।


অনির বিবাহের দিন ধার্য করা হলো। আসছে ফাল্গুনে প্রথম সপ্তাহে বিবাহ। আর দিন দশেক বাকি আছে বিবাহের। বিবাহের সামগ্রী কিনিবার জন্য আমাকে ঠিক করা হলো। তাই আমাকেই যেতে হলো কোলকাতায়। আমি আর অনি গাড়তে পাশাপাশি বসে আছি। কারো কোন সাড়াশব্দ নেই। যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে আমাদের দুজনের জীবন।

নীরবতা ভেঙ্গে কুশল বলে উঠলো, কি দেখছো অনি? না কুশল ভাবছি তুমি তোমার কথা রাখলে। আসলে এই নিভৃত্য এই জীবনের উপকরনের বেষ্টন হতে একদিন তো বের হতেই হতো। আর সেটা তুমি আমার বিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিবে।যখন প্রথম তোমার স্পর্শ পেলাম তখন জগতের মহিমাধ্যানে একান্তমনে তোমাকে চেয়েছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি যে জগতের এত নিষ্ঠুর বিকৃত রূপ দেখতে হবে।দেখ আজ আমাদের দুজনের জীবন এক সুতোয় গাঁথা মুক্তোর দানা হবার কথা ছিল। কিন্তু কি হলো মালার সুতোয় উঠার আগেই ঝরে পড়ে গেলাম। কুশল তোমার মনে আছে যখন প্রথম তোমার থেকে জীবনের স্বর্গীয় স্বাদ পেলাম তখন আমার অন্তরকে স্পর্শ করেছিল। কুশলের হয়তো অনিকে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। অনি আমি সারাজীবন তোমাকে মনে আগলে বেঁচে থাকবো।

এই সেই কথা বলতে বলতে তার কোলকাতা চলে আসলো। বিয়ের সমস্ত কিছু কুশলের পছন্দ মতো কেনা হলো। কারণ কুশল যা পছন্দ করবে অনি বিনা বাক্যে সেটা গ্রহণ করবে।
দেখতে দেখতে বিবাহের দিন উপস্থিত হলো। বিয়ে বাড়িতে নানান লোকের আনাগোনা। এমন জ্ঞাতি আত্মীয়দের নেমন্তন্ন করা হয়েছে যাদের কুশল জীবনে একবার দেখেছে কি সন্দেহ। এদিকে সকালেই অনিকে দিয়ে বিবাহের সব নিয়ম কানুন যথারীতিতে পালন করানো শেষ। কুশল গেল অনিকে ধুতি পাঞ্জাবী পড়াতে। কুশল একবার অনির দিকে তাকলো। কিন্তু কারো মুখে কোন কথা নেই। কুশল অনিকে ধুতি পড়াচ্ছে এমন সময় অনি কুশলের হাত ধরে বললো,” কাল সারারাত ঘুমাও নি তাই তো। কুশল কোন কথা বললো না। পাঞ্জাবিটা পরিয়ে কুশল অনির কাছে একটা অনুরোধ জানালো। অনি শেষ বারের মতো তোমাকে একটু আলিঙ্গন করতে চাই। অনির কামরায় যারা ছিল তাদের সবাইকে বাইরে যেতে বলা হলো। সবাই চলে যাওয়ার পর কুশল অনির ঠোঁটে ছোট্ট একটা চুমু একে দিল। সন্ধ্যায় বরযাত্রী বের হলো। দুইটায় লগ্ন। সবার মুখে হাসি, শুধু দুটি নিথর পুরুষের মুখে হাসির লেশ মাত্র নেই।সমস্ত অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে অনির বিবাহ সম্পন্ন হলো। পরদিন অনির ফুলশয্যা। অনির কামরা কুশলের কামরার পাশেই। তাই ফুলশয্যার দিন কুশল নিচের বসার রুমে এসে ঘুমালো। আজ মধু চন্দ্রিমা, কুশলের রাতে ঘুম হলোনা। তাই সে জানালা দিয়ে মধু চন্দ্রিমা দেখছে। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল অনির কামরার দিকে। কিছু সময় তাকিয়ে কয়েক ফোটা চোখের জল ফেললো। হায় ইশ্বর যে কামারায় দুটি পুরুষের নগ্ন দেহ খেলা করতো, আজ সেখানে স্ত্রীলোকের আগমন। হায় ইশ্বর তুমি সব পারো।

১০
অনির বিবাহের আট মাস সময় অতিক্রম করলো। এদিকে বহু চেষ্টায় পর, আমার কোলকাতা শহরে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সেকেন্ড মাস্টারি পদ প্রাপ্ত হইলাম। মনে করিলাম আমার উপযুক্ত কাজ পেয়েছি। উপদেশ ও উৎসাহ স্কুলের ছেলে – মেয়েদের সময় দেই। ছাত্র ছাত্রীদের গ্রামার ও অ্যালজেব্রা বহির্ভুত কোন কথা বরি না। বেশ ভালো লাগে স্কুলে সময় কাটাতে।এর মাঝে একদিন জানতে পারলাম অনির একটা পুত্র জন্মিয়েছে। শুনে আমার খুব ভালো লাগলো। ভাবলাম একটু ফোন করে অভিনন্দন জানাবো। কিন্তু তা আর হলো না।শহরের কর্ম ব্যস্ততার মাঝে সে চিন্তা চাপা পড়ে রইলো। সারাদিন কাজ করার পর সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরি।লিখি – পড়ি যাই করি কিছুতেই মনের ভার দূর হয় না। কুশল সন্ধ্যা বেলায় ভাবতে লাগলো,এমন টা কেন হলো।

মনের মধ্যে থেকে উত্তর আসিল তোমার সে অনি কোথায় গেল? কুশল প্রতিউত্তরে বললো, আমি তো তাকে ইচ্ছে করে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। আমার জন্য কি সে তার সুন্দর জীবন নষ্ট করবে। মনের মধ্য থেকে উত্তর আসলো শৈশবের অনি যতই তোমার কাছে থাকুক, তার মাঝে আর তোমার মাঝে একটা দেয়াল তৈরি হয়েছে। একথা সত্য যে আমি ইচ্ছে করলে অনিকে নিজের কাছে রাখিতে পারিতাম। কিন্তু মানব সমাজে নতুন নিয়ম চালু করার আমি কে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কুশলের দিন গুলো কেটে যায়। হঠাৎ একদিন ভোরে কুশলের ফোনে অনি ফোন দেয়। ফোন দিয়ে অনি জানায় যে সারদা ভবজীবন সাঙ্গ করিয়া পরপারে চলিয়া গেছে। পিসির জন্য কুশলের খুব কষ্ট হলো আবার ক্ষোভও হলো। পিসিকে দেখতে যাওয়া তার কাছে কেমন ইতস্তত লাগছে। তবুও সে পিসিমার কাছে ঋণী, সেই ঋণের কথা ভেবেই শেষ বারের মতো পিসিমাকে দেখতে যাওয়া। কোলকাতা থেকে গোবিন্দপুর যেতে বেশি সময় লাগে না। তাই স্কুলের কার্য সম্পন্ন করিয়া বিকেলে রওনা দিলাম। কুশল বাড়িতে ঢুকতেই অনি তাকে জড়িয়ে ধরে গলা ফাটিয়ে আর্তনাত শুরু করলো। কুশল অনিকে শান্তনা দিয়ে বললো, অনি বাবা – মা সবার সারাজীবন বেঁচে থাকেনা। যার যাবার সে চলে যাবে। শেষ বারের মতো কুশল পিসেকে দেখে কেঁদে উঠলো। সন্ধ্যার পর সারদাকে দাহ করা হলো।

পরদিন সকালে কুশল চরে যাওয়ার জন্য ব্যাগ পত্র গোছাতে লাগলো। এমন সময় অন্নপূর্ণা এসে কুশলকে বললো, বাবা তুই একেবারে আমাদের কে দূরে সরিয়ে দিলি।এক বারের জন্য কি আমার কথা তোর বাবার কথা ভাবলি না। আমরা না হয় আর বলতাম না বিয়ের কথা। কিন্তু তুই এভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবি কখনো ভাবতে পারিনি।তোর বাবা প্রায় আমাকে বলে পরের কর্মচারি না হয়ে বাড়িতে বসে থাকা অনেক ভালো। তুই চলে যাবার পর তোর বাবা মন থেকে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে।মায়ের কথা শুনে কুশল অন্নপূর্ণাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাদতে শুরু করলো। এমন সময় বছর তিন হবে একটা ছেলে এসে কুশলকে বললো, বাবাই তুমি কাঁদছো কেন? কুশল মাকে ছেড়ে ছেলেটির দিকে তাকালো। ছেলেটি অমনি কুশলকে জড়িয়ে ধরলো। বাবাই এত দিন কোথায় ছিলে, বলো আর আমাদের ছেড়ে যাবে না। কুশল অন্নপূর্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। অন্নপূর্ণা একটু ম্লান হেসে বললো, এ অনির ছেলে কর্ণ।কুশল কর্ণকে কোলে নিয়ে বললো, তুমি আমাকে কেমনে চিনলে। কেন বাবার ঘরে তোমার ইয়া বড় একটা ছবি আছে। বাবা বলেছে তুমি আমার বাবাই হও। কুশল বেশ কয়েকবার কর্ণের মুখে চুমু খেল। মা তুমি একবার বুঝতে চেষ্টা করো আমার অনেক কাজ। আজ না গেলে সমস্যা হতে পারে। অন্নপূর্ণা ওকে যেতে দাও, আমরা ওর কে যে ও আমাদের কথা শুনবে। গৌড়শংকর জোর গলায় বলতে বলতে সেখানে হাজির হলো। কুশল বাবাকে দেখে এগিয়ে গিয়ে পায়ে হাত রেখে প্রণাম করলো।গৌড়শংকর ছেলেকে উঠিয়ে জড়িয়ে ধরে চোখের জল আটকাতে পারলো না। কুশল আমি কখনো ভাবিনি যে তোকে বিয়ে কথা বলে আমি মহা অপরাধী হয়ে যাব।আমি যদি জানতাম যে তুই এমন করবি তবে কখনো তোকে বিয়ের কথা বলতাম না। কুশল কিছু বললো না। বাবা এসব কথা এখন থাক।তোমাদের ব্যাবসা কেমন চলছে সেটা বলো। বলবো সব বলবো, তুই অন্তত আজকের দিনটা থেকে যা। কুশল আর না করতে পারলো নাহ।

কুশল তুই একটু সুনিতার সাথে কথা বলবি, মেয়েটা তোর কথা অনেক করে বলে। আচ্ছা মা দেখা যাবে। সেদিন আর কুশলের যাওয়া হলোনা। রাতে কুশল অনির ঘরে গেল। বাইরে থেকে কুশর কর্ণকে ডাকলো। কুশলের সুর শুনে কর্ণ এক দৌড়ে বাবাই বাবাই বলে বাইরে চলে এলো। কুশলকে হাত ধরে কর্ণ ঘরে নিয়ে গেল। বাবা দেখো কে এসেছে? কুশলকে দেখে অনি ও সুনিতা উঠে দাঁড়ালো। সুনিতা মৃদু স্বরে বললো দাদা বসেন। কুশল অনির কামরার চারদিক ঘুরে দেখতে লাগলো। বেশ পরিবর্তন হয়েছে কামরার, শুধু বড় ফ্রেমে বাধানো কুশলের ছবিটা ছাড়া সব কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। অনির সাথে কুশল বেশি কিছু বলরো না। দু চারটি শান্তনার বাণী শুনিয়ে চলে যাবে, এমন সময় কর্ণ তার হাত টেনে ধরে বললো, বাবাই আমি আজ তোমার কাছে থাকবো। কর্ণের আবদারে কাছে কুশল হেরে গেল। নিষ্পাপ শিশুর জন্য তার বুকটা হাহাকার করে উঠলো।
পরদিন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কুশল চলে গেলো। অবশ্য কর্ণ তার সাথে যাওয়ার জন্য অনেক কান্নাকাটি করেছিল, কিন্তু তাকে কোন মতো বুঝিয়েই কুশলকে চলে যেতে হলো।

১১
পিসি মারা যাবার তিন বছর পর। স্কুলে আমার পদ হেডমাস্টার হওয়ার ধাপগুলি অতিক্রম করিতে আর মাস পাঁচেক বাকি। এমন সময় পিতার মৃত্যু হলো।সংসারেতে মা, অনি,আর সুনিতা।তাও সে অনির দ্বিতীয় সন্তানের মা হতে চলেছে। বাবার মৃত্যুর পর আর আমার চাকরি করা হলো না। মায়ের পানে চেয়ে চাকরির বরখাস্ত পত্র জমা দিলাম। যদিও স্কুল কতৃপক্ষ রীতিমতো তোষামোদ করেছিল চাকরিটা করার জন্য। কিন্তু আমি করিলাম না। বাবার শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে যথারিতিতে সব নিয়ম কানুন পালন করিলাম। এদিকে একটা আনন্দের সংবাদে আমি বিমোহিত হলাম। ভারতীয় সংবিধান থেকে ৩৭৭ ধারা বাদ দেওয়া হলো। হাজার আলোচনা, সমালোচনা, তর্ক, বির্তক,দাঙ্গা, হাঙ্গামা মধ্যে দিয়ে বৈধতা দেওয়া হলো সমকামীতাকে।আমার রাগ হলো, আবার ভালোও লাগলো। কারণ আমার মতো সমপ্রেমীদের আর অসহনীয় যন্ত্রণায় ছটফট করতে হবে না। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের খাতিরে ভারতেও স্বীকৃতি পেল কুশলের মতো হাজারো মানুষের প্রেম।কুশল বসে বসে ভাবছে হায় ইশ্বর তুমি কি না পারো।

এদিকে সুনিতা দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের সময় ইহকাল ত্যাগ করে।সুনিতার মৃত্যুতে অনির মাঝে বেশি হতাশা দেখতে পেলাম না। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দ কেমন যেন নেশাতুর লাগছে।কুশলের খুব ইচ্ছে হলো অনির চোখে তাকিয়ে সেই নেশায় ভরা চোখ দুটি দেখতে।তাহার মনে খুব ইচ্ছে হলো এই দূর্যোগের রাত্রে অনিকে কাছে পেতে। রাত্র তখন একটা কি দুইটা কুশলের কামাতুর মন আর স্থির করতে না পারিয়া অনির কামরায় চলে গেলো। দুজনেই ঘর ছাড়িয়া বাহিরে আসিল।কুশলদের পুকুর পারের একটা অংশ হাত দশ – এগারো উচ্চ হইবে।অনি ও কুশল স্নান শেষ করিয়া সে উচু স্থানে একে অপরকে ছুয়ে দাড়িয়ে আছে। কুশল যেমন অনির সবটা নিমিষেই জানিত পারিল তেমনি অনিও কুশলের সবটা বুঝিতে পারিল।পুষ্করিণীর সর্বাগ্রে জলমগ্ন হয়েছে।কুশল ও অনি হাতে হাত রেখে হাঁটু জলে নেমে দাঁড়ালো। দুজন দুজনের অন্তরাত্মা এতে কোন সন্দেহ নাই। তখন প্রলয়কাল, আকাশে তারার আলো ছিল না। পৃথিবীর সমস্ত প্রদীপ নিবিয়া গেছে, তখন একটা কথা কেউ বলিল না। শুধু নিরবতার মাঝে দুটি পুরুষের প্রেমলীলা চলছিল। আজ সমস্ত বিশ্ব সংসার ছাড়িয়া অনি কুশলের কাছে আসিয়া দাঁড়াইছে।আজ কুশল ছাড়া অনির কেউ নেই। কবেকার সেই শৈশবের অনি, কোন এক জন্মান্তর, কোন এক রমনীর সদ্য জাত স্বামী, রহস্যান্ধকার হইতে কুশলের পাশে এসে সংলগ্ন হয়েছে।

পরদিন সকালটা অনি ও কুশলের জীবনের নতুন দিন। কুশল ওঠো, অনেক দেরি হয়ে গেছে। কর্ণকে স্কুলে দিয়ে আবার কাজে যেতে হবে। কুশল সকালের আলসেমিটা কাটাতে একটু নড়েচড়ে শুয়ে পড়লো। অনি কুশলের গায়ে হাত দিতেই কুশল অনিকে টেনে নিয়ে বাহুদ্বয় দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। বাবু আসো না একটু প্রেম করি। অনি বৃথা ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। এমন সময় কর্ণ এসে সেখানে হাজির। বাবাই উঠো না, আজ তুমি না আমাকে নিয়ে স্কুলে যাবে।অনিকে ছেড়ে কুশল কর্ণকে কোলে নিয়ে বললো, বাবাই যখন বলেছি তখন আমিই তোমাকে নিয়ে যাব।
বাবাই চলো আমরা যায়। হ্যাঁ বাবা চলো, তোমার সব কিছু টিক করে গুছিয়ে নিয়েছো তো। কর্ণ মাথা নেড়ে কুশলের প্রশ্নের উত্তর দিল। বাবাই একটু দাড়াও আমি দ্বিদার কাছ থেকে একটা লাড্ডু খেয়ে আসি। এই বলে কুশল এ দৌড়ে অন্নপূর্ণার ঘরে চলে গেলো। অনি এসে কুশলের পাশে দাড়িয়ে বললো, জীবনের হাজারো ঢেউ আসিয়া তোমাকে আমার থেকে আলাদা করছে। আবার আরেকটা ঢেউ আসিয়া বিচ্ছেদের এই বৃন্তটুকু হইতে খসিয়া আমরা দুজন এক হইয়া গেলাম। কুশল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, সব তোমার ইশ্বরের ইচ্ছা। অনি তোমাকে একটা কথা বলার ছিল। কি কথা বলো? চলোনা একদিন কর্ণকে সাথে নিয়ে কোথাও ঘুরে আসি। অনেক ধকল সইতে হয়েছে তোমার। বাইরে একটু ঘুরে আসলে তোমারো ভালো লাগবে বাবাইটারও ভালো লাগবে। কুশল ও অনির কথা শুনে কর্ণ মহা খুশি। বাবা চলোনা আজ বিকেলেই যায়। কর্ণের কথা রাখতে তাই করা হলো। বিকেলে সুমুদ্দুর দেখতে যাওয়া হবে। কর্ণের মাঝে এক নতুন উদ্যম। বাবাই চলো দেরি হয়ে যাবে তো। দ্বিদা তুমি চলো না আমাদের সাথে। না দাদুভাই আমি তোমাদের মতো হাটতে পারবো না,তোমরা যাও। সেদিন বিকেলটা অনি, কুশল ও কর্ণের জীবনের একটা নব অধ্যায় যুক্ত হলো। বাবাই তুমি যখন ছোট ছিলে তখন কি বাবার সাথে ঝগড়া করতে। কুশল কর্ণের নাকের ডগায় হাত দিয়ে বললো, হুম। তারপর দাদু তোমাদের বকতো তাই তো। হুম বাবাই, দেখতো ঐটা কি? দূর আকাশে রংধনুর আভাস ফুটে উঠেছে। বাবাই বলোনা ওটা কি? পাশ থেকে অনি বললো ওটা রংধনু। বাবা চলোনা আমরা ওটা হাত দিয়ে ছুয়ে দেখি।বাবাই তুমি ওটা ধরবে, চলো আমরা আজ ওটাকে ধরবো। দিগন্তের কিনারায় রংধনুকে ধরার জন্য অনি, কুশল ও কর্ণ পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো নব দিগন্তের তীরে।

লেখক: শুভ্র মেঘ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.