বিয়ে

এইতো প্রায় মাস দুয়েক হতে চললো জাহিদের সাথে হিমেল এর ব্রেকআপ হলো!! একসঙ্গে অনেকগুলো বছর কাটিয়েছে জাহিদ আর হিমেল।
তাদের ভালোবাসা যেন এ কম্যুনিটিতে হিংসার উদ্রেক করতো। ভালোবাসাকে সহজবোধ্য জীবনের সাথে মিশিয়ে ফেলে, এত সহজে পরিচালনা করবে তা সবার ভাবনার বাইরে ছিলো। জাহিদ হিমেল কে কথা দিয়েছিলো কখনো ছেড়ে যাবেনা। সমাজ, ধর্ম, পরিবার সব কিছুই মোকাবেলা করবে দুজন।
খোলা আকাশের নিচে বসে একজন আরেকজনের হাতে হাত রেখে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো ।

সব ভালোবাসাতেই মনে হয় একজন হয়তো অনেক বেশিই ভালোবাসে আরেকজনের থেকে।
হিমেল ও তাই ছিলো। পাগলের মতো উজাড় করে ভালোবাসত সে জাহিদ কে।

কি সোনালী দিন কাটিয়েছে জাহিদের সাথে। কতো আড্ডা-মাস্তিতে মেতে থাকতো দুজন। আজ যেন এসব বেশিই মনে পড়ছে। আসলে ছোট ছোট সুখগুলো স্মৃতির পাতায় সৌরভ হিসেবে ভেসে বেড়ায় অনেকদিন!

হিমেল এটাও মনে মনে ভাবছে, জাহিদ ত রাগ করে কতোবারই তাকে বলেছে ব্রেকআপ! আবার তার কাছেই ফিরে এসেছে। এবারও কি জাহিদ হিমেলের কাছে ফিরে আসবে? হয়তো কখনোই আর আসবেনা!!
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলো হিমেল টেরই পেলো না।
বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলো হিমেল! পথি মধ্যে ছোট্ট একটা পুল পড়ে। যেখানে জাহিদ আর হিমেল সবসমই আড্ডা দিতো।
হিমেল দেখতে পেলো পুলটার অর্ধেক অংশ ভাঙা। অনেকটা তার মনের মতো। নির্জন, নিবিড়, ভগ্ন।
সে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো। আর মনে মনে ভাবতে লাগলো প্রিয় মানুষ গুলো হারানোর সাথে সাথে প্রিয় মানুষের সাথে কাটানোর স্মৃতি গুলোও আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যায়।

বাড়িতে এসে হাতমুখ ধোয়ে শুয়ে পড়লো হিমেল। সেদিন রাতে আর খাওয়া হয়নি। কারন যেদিনই জাহিদের কথা তার মনে হয় সে গলা দিয়ে ভাত গিলতে পারেনা। শুয়ে শুয়ে জাহিদের ছবিগুলো দেখছিলো আর দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলো বড় করে। হয়তোবা ভালোবাসার এরকম নিগূঢ় প্রাপ্তিই তার নিয়তিতে আছে।

আজকাল হিমেলের মা প্রায়ই তাকে জিগ্যেস করে,

-“কিরে হিমেল তর চোখের নিচে কালি জমেছে কেন?”

এ কথার উওর হিমেল দিতে পারেনা। কিছু কিছু কষ্ট থাকে, যা একান্তই নিজস্ব। সেসব কষ্টের ভাগ কাউকে দেয়া যায় নাহ।

রাত পেরিয়ে সকাল হলো। আজকাল হিমেলের মনে কি যেন সব বাজে চিন্তা ভর করে।
অতীত কে যেন ও কিছুতেই ভুলতে পারেনা। সকালে হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা করার পর হিমেল বাজারে যায় কোনো একটা কাজে।
সেদিন হিমেল জাহিদ কে দেখলো তার এলাকার এক বড় ভাইয়ের সাথে বাইকে করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হিমেলের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
হিমেল জাহিদের সাথে কাউকে সহ্য করতে পারত না। কিন্তু এখন কেন এমন হয়? এখন ত জাহিদের মনে হিমেল এক দূর পরবাসী। সে কেন ভাবে? সে কেনইবা তার ক্ষুদ্র স্বাভাবিক সময়কে বিষন্ন করে?

সেদিন যে কাজে বাজারে গিয়েছিলো হিমেল সে কাজ আর করা হয়নি। সব কিছু কেমন যেন তার কাছে উল্টাপাল্টা মনে হচ্ছে।

হিমেল মাঝে মাঝে ভাবে জাহিদ কি তাকে একটুও মনে করেনা? তার কথা কি কখনো মনে পরেনা জাহিদের? কতো স্মৃতি ছিলো তাকে নিয়ে এগুলো কি সে ভুলে গেছে?

এসব প্রশ্ন জাহিদের মাথায় ঘুরপাক খায়। সত্যিকারের ভালোবাসায় কোনো ব্রেকআপ থাকেনা। হয়তো জাহিদ তাকে ভালোই বাসত না। নয়তো কেন তাকে ছেড়ে চলে গেলো?
আজকাল হিমেলের পড়াশোনা, খাওয়া দাওয়া কিছুই ঠিক মতো হচ্ছে না।
এদিকে তার মা তাকে সবসময় প্রশ্ন করেই যেতো কি হয়েছে বাবা? আমার সাথে শেয়ার কর? হিমেল এসব প্রসঙ্গ সবসময় এড়িয়ে যেতো। মাঝে মাঝে বলতো বলব মা একদিন সময় হলে তোমাকে সবই বলব। দিন পার হতে থাকে। জাহিদের দিন গুলো হয়তো ভালোই কাটে। কিন্তু হিমেল ভালো নেই। পিছুটান প্রতিনিয়ত হিমেল কে কষ্ট দেয়।

মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় নিজের এলাকা ছেড়ে দুরে কোথাও চলে যাবে। সে শুনেছে স্থান পরিবর্তন করলে নাকি অতীত ভুলে থাকা যায়।
যেই ভাবা সেই কাজ।
এদিকে তার পরিক্ষার রেজাল্ট দিতে আরও কয়েক মাস লেগে যাবে। তাই মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সিলেট জাফলং চলে যায়!! হিমেলের প্লেন হলো এটা যে যদি সে জাফলং গিয়ে জাহিদ কে ভুলে থাকতে পারে তাহলে পারমানেট ভাবে চলে যাবে। যাওয়ার আগে হিমেল সেই খোলা আকাশের নিচে একবার গেলো।
ইচ্ছে ছিলো যাওয়ার আগে জাহিদের মুখটা একবার দেখে যাবে।
কিন্তু তা আর ভাগ্যে জুটলো না। আজ রাতেই জাফলং যাওয়ার ট্রেনে উঠলো হিমেল। যাওয়ার সময় মনটা খুব বিষন্ন ছিলো।
মনে মনে তার মনকেই গালি দিচ্ছিলো সে- কতো মানুষ পৃথিবীতে থাকতে বেহায়া মনটা শুধু তার জন্যই ব্যাকুল হয় যে তাকে কখনো ভালোই বাসতো না।
সকালে ট্রেন পৌঁছে গেলো। ভালো একটা হোটেলের সন্ধানে পা চালাতে লাগলো হিমেল।
পেয়েও গেলো মন মতো হোটেল।
তিন দিন ভালোই কাটলো তার।
চতুর্থ দিনের মাথায় যা হলো হিমেলের সাথে তার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা।
সেদিন সকালে মোবাইল রিংটনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো হিমেলের। হকচকিয়ে উঠলো সে!
ভাবলো এতো সকালে কে ফোন দিলো! তাকে এতো সকালে ফোন দেওয়ার মতো ত কেউ নেই!
কাপা কাপা হাতে মোবাইল টা হাতে নিয়ে দেখতে পেলো সেই চিরচেনা নাম্বার টা!

ভাবলো এতোদিন পর কি মনে করে জাহিদ ফোন দিলো!
ফোনটা ধরেই ফেললো হিমেল।
পরিচিতো সেই কন্ঠটা ভেসে আসছে মোবাইলের ওপাশ থেকে।
জাহিদঃ কেমন আছো?
হিমেলঃ যেমনটা রেখেছো ঠিক তেমনটাই ভালো আছি! তুমি কেমন আছো?
জাহিদঃ আমি ভালো আছি।
হিমেলঃ তা কি মনে করে ফোন দিয়েছো?
জাহিদঃ কথাটা তোমাকে কিভাবে বলব বুঝতে পারছি না। জানি তুমি অনেক কষ্ট পাবে।
হিমেলঃ কষ্ট পেয়ে অভ্যস্ত আমি বলে ফেলো!
জাহিদঃ আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে!!! তুমি বলছিলে একদিন তোমাকে ছেড়ে কখনো অন্য কাউকে বিয়ে করলে সেই খবরটা প্রথম তোমাকে দিতে। এটা বলার জন্য ফোন করেছি।
হিমেলঃ কথাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো হিমেল! কিছু বলতে পারছেনা। তারপর বললো ভালো তো বিয়ে করে ফেলো!
জাহিদঃ তুমি আসবে কিন্তু বিয়েতে!
হিমেলঃ অশ্রুশিক্ত চোখ নিয়ে বললো তোমার বিয়ে অথচ আমি আসব না। আমি আসব অনেক আনন্দ করব। এটা বলেই ফোন কেটে দেয় হিমেল।

সবকিছুই যেন কেমন গুলিয়ে আসছিলো! রুমে দরজা আটকে অনেক কেঁদেছিলো হিমেল। তার কান্নার শব্দ চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো।
চিৎকার করে বলছিলো তুমি আমাকে ভালো না বাসো ছেড়ে চলে যাও তবুও কাউকে বিয়ে করোনা।
তোমার পাশে কাউকে আমি কিভাবে সহ্য করব।

যেখানে তুমি কোনো ছেলের সাথে কথা বললেই আমার বুক ফেটে যেতো সেখানে আমি কিভাবে তোমার পাশে একটা মেয়েকে সহ্য করব। কিভাবে?
এসব কথা গুলো বলছিলো আর চিৎকার করে কাঁদছিলো।
এক মূহুর্ত দেরি করলোনা হিমেল সিলেট থেকে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
যেতে যেতে নিজেকে বুঝাচ্ছিলো আমার আবেগ হয়তো অনেক বেশি। হয়তো জাহিদ কে আমি খুব বেশিই ভালোবাসি।
সে ত আমাকে ভালোবাসেনা! হয়তো তাকে এই জনমে পাওয়া হবেনা। পরের জনমে তার জন্য অপেক্ষায় থাকবো।
তখন আমি হবো রাজকন্যা সে হবে রাজকুমার। তখন সে অমাকে কোনো কিছুর অজুহাত দেখিয়ে ছেড়ে যেতে পারবেনা।
এসব ভাবছিলো আর চোখ থেকে ক্রমাগত জল পরছিলো।

হিমেল শুনেছিলো বিয়ের দিন নাকি ছেলেদের একটু বেশিই সুন্দর লাগে!
এসব ভাবতে ভাবতে হিমেল চলে আসলো তার বাড়ির কাছেই। ট্রেন থেকে নেমে হাটতে লাগলো।
কাল দিন বাদে জাহিদের বিয়ে।
বাড়িতে আসতেই মা জিগ্গেস করলো কিরে গেলি মনটা ফ্রেশ করার জন্য ফিরে এলি যে?
মায়ের কথার উওর দিলোনা পাশ কাটিয়ে চলে গেলো তার রুমে।

আজ জাহিদের বিয়ে। কালকে সারারাত ঘুম হয়নি হিমেলের। সকালে উঠেই সে চলে গেলো! কিন্তু হ্যাঁ জাহিদের বাড়িতে যায়নি! দূর থেকে তাকে দেখতে গিয়েছে।
বিয়ে বাড়ি সাজ সাজ রব। কি সুন্দর ডোকোরেশন, লাইটিং এসব যেন আজ বিষের মতো লাগছে হিমেলের কাছে। আড়ালে দাড়িয়ে দেখতে পেলো বাড়ির বড় মুরব্বি চাচা-চাচিরা জাহিদের গায়ে হলুদ মেখে দিচ্ছে।
বিয়ের কাপড়ে কি যে সুন্দর লাগছে তাকে।
হলুদ পর্ব শেষ হওয়ার পর জাহিদ কে গোসল করিয়ে লাল রঙের শেরওয়ানী পড়তে দেখলো হিমেল।
এক দৃষ্টিতে পলকহীন ভাবে তাকিয়ে আছে হিমেল।
চোখের জ্বল মুচছে আর ভাবছে কেউ তাকে কতোটা ভালোবাসতো হয়তো জাহিদ জানতেই পারবেনা।
বর যাত্রী চলে গেলো কনের বাড়িতে। এদিকে হিমেল তখন জাহিদের বাড়িতে গেলো।
জাহিদের মা হিমেল কে দেখে বললো এতো দেরি করে এসেছো কেন বাবা? হিমেল বললো আন্টি একটু কাজ ছিলো তাই আসতে পারিনি। এখন ত এসেছি।
তারপর বাসর ঘর সাজানোর সব কিছু নিয়ে রুমে ডুকলো হিমেল!!
জাহিদ তাকে বলেছিলো তুই নিজের হাতে আমার বাসর সাজিয়ে দিবি!

হিমেল জাহিদের কথা রেখেছিলো। খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিলো জাহিদের জন্য তার বাসর।
মনে মনে ভাবতে লাগলো যাকে নিজের অস্তিত্তে মিশিয়েছিলাম তাকে আজ অন্য কেউ স্পর্শ করবে।
সব কাজ শেষ করে একটা চিঠি লিখলো হিমেল-

শুধু এটুকুই লিখলো ভালোবাসতাম তোমায়!! আর দেখা হবেনা। চলে যাচ্ছি এই শহর ছেড়ে। তুমি ভালো থেকো তোমার মতো করে। যাকে বিয়ে তাকে কখনো ঠকিয়ো না। তাকে কখনো ঠকিয়ো না।
ইতি তোমার হতোভাগা
হিমেল।

চিঠিটা লিখে হিমেল বিছানার নিচে রেখে চলে আসে।
সেদিন রাতেই বাড়ি থেকে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরোদ্দেশ হয়ে যায় হিমেল।
হয়তো জাহিদের দেওয়া কষ্টের কারনে হিমেলের সাজানো জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে।
হয়তো আজও তার স্মৃতি গুলো মনে করে আজও হেসে উঠে নয়তো কেঁদে উঠে হিমেল।
হয়তো জাহিদ তার কথা মনে করে নয়তো না ! হয়তো জাহিদের ফুটফুটে একটা বাবু হয়েছে।
হিমেল বলেছিলো কোনোদিন আমাকে ছেড়ে বিয়ে করে ফেললে তোমার বাবু হলে নাম রেখো *কুসুম*
হয়তো হিমেলের কথা ভুলে গেছে জাহিদ।

হিমেল আজও কাঁদে। আগেও কাদতো। কারন সত্যিকারের ভালোবাসায় নাকি কান্নাটাই বেশি। সব সময় এক তরফাই ভালোবেসে গেলো হিমেল।
আজও বাসে।
কারন জাহিদ ছিলো তার কষ্টে পাওয়া ভালোবাসা।

লেখকঃ রাকিব হাসান জ্যাক

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.