সাইকো

1.
শামীম আর ইব্রাহিম চট্টগ্রামের একটি রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে আছে। আজই তাদের প্রথম দেখা। দুজনেরই ফেসবুকে পরিচয় সেখান থেকেই একে অপরকে পছন্দ করা। তাদের মধ্যে স্বাভাবিক কথা বার্তাই চলছিল হঠাৎ শামীম তার ব্যাগ থেকে একটি ডায়েরি বের করলো। এবং শামীম সেই ডায়েরি টি খুলে ইব্রাহিম কে দেখালো। ইব্রাহিম দেখতে পেল সেই ডায়েরির প্রথম পাতায় কতগুলো নাম লেখা আর সেই নাম গুলো বিভিন্ন রঙের কালি দিয়ে কাটাও আবার।ইব্রাহিম একটু কোতুহলী হয়ে শামীম কে নাম গুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলো তখন শামীম যা বললো তা শুনে ইব্রাহিম প্রায় ভুত দেখার মতো অবাক হয়ে শামীম এর দিকে তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে।

2.
শামীম আর ইব্রাহিম এর পরিচয় তো দেওয়া হয় নি এখনো। শামীম চট্টগ্রামের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের BBA তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। দেখতে খুবই সুদর্শন। শুধু মাথার বেশ খানিক চুল পাকা। ছোট বেলাতেই বাবা-মা কে হারায় সে। সেই থেকে তার বোনের কাছেই মানুষ সে কিন্তু সেই বোন ও আজ শামীম কে নিজের ভাইয়ের পরিচয় দিতে নারাজ তার সমকাম সত্তার জন্য।শামীম তার বাবার রেখে যাওয়া অঢেল সম্পত্তির একমাত্র অধিকারী।
আর ইব্রাহীম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ করেছে মাত্র। সে ও তার পরিবার থেকে এই সমকাম সত্তার জন্যই বিচ্ছিন্ন। কাকতালীয় ভাবে দুজনেই তাদের এই সমকাম সত্তার জন্য নিজেদের পরিবার আর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। নিজেদের ব্যাক্তিগত জীবনে একা।

3.
এবার শামীম সেই নাম গুলো সম্পর্কে বলতে লাগলো। ইব্রাহিম এর প্রশ্নের উত্তরে শামীম বললো এইগুলো সব আমার প্রাক্তন। তখন ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলো প্রাক্তন বুঝলাম কিন্তু নাম গুলো কাটা কেনো। তখন শামীম খুব স্বাভাবিক ভাবেই বললো এরা আর কেউ এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই। তখন ইব্রাহিম অবাক হয়ে বললো বেঁচে নেই মানে??? শামীম বললো হ্যা বেঁচে নেই কারন আমি তাদের মেরে ফেলেছি। শামীম এমন ভাবে কথা গুলো বললো যেনো সে এই কাজ টা খুবই সহজে করে ফেলেছে সে আর প্রতিদিন ই সে এই কাজ টি করতে অভ্যস্ত আর তার বিন্দুপরিমাণেও অনুশোচনা নেই। তখন ইব্রাহিম ভয় ভয় কন্ঠে বললো মানে কি? কেনো মেরেছো?

4.
তখন শামীম প্রথম নামটি দেখিয়ে বললো এই হলো ইশমাম। আমরা দুইজন ই দুজনকে অনেক পছন্দ করতাম। আমাদের এই ভালোলাগা ভালোবাসায় রুপ নিচ্ছিল ধীরে ধীরে। কিন্ত ইশামাম আমাকে একদম ই সময় দিতো না। সারাদিন শুধু নিজের পারিবারিক সমস্যা ঝামেলা নিয়ে চিন্তিত থাকতো আর আমাকেও চিন্তায় রাখতো। আর সবসময় আমার সামনে এসে ঘ্যানঘ্যান করতো। যখনই দেখা হতো আমাদের কথা না বলে ওর পরিবারের ঝামেলা নিয়ে কথা বলতো তো একদিন ওকে নিয়ে আমি আমার পছন্দের একটা পাহাড়ে ঘুরতে গেলাম। আবহাওয়া অনেক সুন্দর ছিল। যেনো আমাদের সেখানে স্বাগতম জানাচ্ছিল। সূর্য অস্ত যাবে যাবে এমন সময় সাথে আকাশে মেঘের আনাগোনা ছিল হালকা বাতাস ছিল। কিন্তু ইশমাম সেই তার পরিবারের ঝামেলা নিয়ে কথা বলা শুরু করলো। তো আমি ভাবলাম ইশমাম কে এই ঝামেলা থেকে মুক্তি দেওয়া দরকার। তাই ওকে পাহাড় থেকে ধাক্কা দিলাম। ও আর উঠে আসলো। ওকে ওর পরিবারের ঝামেলা থেকে মুক্তি দিলাম। কিন্তু সবাই ভাবলো ও ওর পারিবারিক ঝামেলার জন্য আত্মহত্যা করেছে। আর অই পাহাড় টা অনেক সবুজ ছিল তাই ওর নাম টা সবুজ রং দিয়ে কাটা।

তারপর পরের নাম টা দেখিয়ে বললো এইটা হলো রাজ। দেখতে অনেক সুদর্শন ছিল।একদম রাজপুত্রের মতো।কিন্তু ওর মধ্যে সবসময় নিজেকে নিয়ে অনেক অহংকার করতো আর সবসময় আমাকে হেয় করে কথা বলতো।আমাকে আমার চুল নিয়ে কথা শোনাতো। মানে যখনই আমি ওর সাথে কথা বলতাম ও শুধু আমাকে কথাই শোনাতো। মানে যখনই মুখ খুলতো আমাকে হেয় করার জন্য। তো একদিন আমি ও আমার বাসায় এসেছিল। ভেবেছিলাম রোমান্স করবো। অনেক আয়োজন করেছিলাম। ওর পছন্দের চাইনিজ রান্না করেছিলাম আর খাচ্ছিলাম দুজনে কিন্তু সেই সে আমার লুকস চুল নিয়ে কথা বলা শুরু করলো। তো আমি আমার হাতের কাটা চামচ ওর গলায় ঢুকিয়ে দিলাম।কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্ত ক্ষরনে মারা গেলো সে।

এই-বার ইব্রাহিম শামীম কে জিজ্ঞেস করলো লাশ টা কি করলে। তখন শামীম মুচকি হাসি দিয়ে বললো আরে অইটা সিলেট ট্যুরে যাওয়ার আগে ফ্রিজে টুকরো টুকরো করে কেটে রেখে দিয়েছিলাম তারপর ট্যুরে যাওয়ার সময় ল্যাগেজ এ করে নিয়ে সুরমা নদীতে ফেলে দিয়েছি।তখন ইব্রাহিম কোতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো চট্টগ্রামে এত নদী থাকতে সিলেটের সুরমায় কেনো।তখন শামীম বললো আরে রাজের অনেক ইচ্ছে ছিল আমাকে নিয়ে সুরমার পাড়ে হাটবে তাই ওর শেষ ইচ্ছে টা পুরন করলাম। শামীম আরো বললো ওর গলায় যখন চামচ টা ঢুকিয়ে দেই তখন অনেক রক্ত বের হয়েছিল তাই ওর নাম টা লাল কালিকাটা।

ইব্রাহীম এবার আরেকটি নাম দেখিয়ে বললো এই নাম টা হলুদ কালি দিয়ে কাটা কেনো? তখন শামীম বললো আরে এই টা হলো ফাওয়াদ, ও অনেক ভালোছিল। ওর সাথে আমি অনেক সুখেই ছিলাম।শামীম এইবার একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললো বিশ্বাস করো ওকে আমি মারতে চাই নি। কিন্তু একদিন ঝগড়ার সময় ও আমাকে আমার পরিবার নিয়ে গালি দিলো অনেক বাজে কথা বললো। তাই আমি ওর মা বাবা কে মারতে চেয়েছিলাম। তাই আমার লুকিয়ে করা Sex এর ভিডিও ভাইরাল করে দেই অই ভিডিও তে ফাওয়াদ কে দেখা গেলেও আমাকে দেখা যাচ্ছিল না আর ওর বাবা মা কেও দেখাই এই ভিডিও আর আমি জানতাম একমাত্র ছেলের এই ভিডিও দেখে তারা ঠিক থাকতে পারবে না। তারপর তারা আত্মহত্যা করলো আর বাবা-মার এই মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে ফাওয়াদ ও আত্মহত্যা করলো । আর ও যে দড়ি দিয়ে ফাসি তে ঝুলেছিল সেই দড়ি হলুদ রঙের ছিল। তাই ওর নাম টা হলুদ রং দিয়ে কাটা।

এইবার ইব্রাহিম ভয় ভয় কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো এই ডায়রির সবার সাথেই কি এমন টা করেছো.???
তখন শামীম বললো হ্যা ওরা সবাই আমার সাথে এমন টা করেছে।
সাইকোলজির ছাত্র হওয়ায় ইব্রাহীম এর বুঝতে খুব বেশি সময় লাগলো না যে ছোট বেলায় বাবা-মা কে হারানোর পর সে একটা মানসিক রোগী/সাইকো হয়ে গেছে এবং সে মানসিক ভাবে চড়ম ভাবে অসুস্থ।শামীম ইব্রাহীম এর দিকে তাকিয়ে বললো আরে তুমি এত ঘামছো কেনো??? ইব্রাহীম এইবার একটু হেসে বললো যাইহোক অইগুলা তোমার অতীত আর আমি এখন তোমার সাথে আছি তো তুমিএত চিন্তা করো না। সেখান থেকে শুরু হলো শামীম আর ইব্রাহীম এর জীবনের নতুন পথচলা।

আজ ওদের সম্পর্কের একবছর পূরন হবে এই একবছরে শামীম অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেছে। ইব্রাহীম তার ভালোবাসা দিয়ে অনেকটাই সুস্থ করে ফেলেছে শামীম কে। আজ তাদের অনেক প্ল্যানিং। আজ তারা একসাথে বাজার করলো তারপর রান্না শেষ করে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করলো। তারপর তারা মেতে উঠলো সেই আদি ভালোবাসার খেলায়।দুজনের অস্তিত্ব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। রাত শেষ হয়ে এসেছে প্রায় শামীম ইব্রাহিম এর বুকে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। তখন ইব্রাহিম বললো জান কফি খাবা? শামীম বললো হ্যা খেলে মন্দ হয় না তবে আমি বানাতে পারবো না তুমি বানিয়ে আনবা৷ ইব্রাহিম বললো যো হুকুম আপ কি। তারপর সে কফি বানাতে চলে গেলো কফি বানিয়ে কিছুক্ষন এর মধ্যেই ফিরে এলো দুজনেই কফি খেলো। কিন্তু কিছু ক্ষন পর শামীম ছটফট করতে লাগলো মনে হচ্ছিলো যেনো তার শরীরের রক্তে কেউ এসিড ঢেলে দিয়েছে । কিছুক্ষনের মধ্যেই তার শরীর বিষে নীল হয়ে গেলো। খুব মারাত্মক বিষ ছিল তার কফিতে আর ইব্রাহিম চুপ করে তার মৃত্যু দেখলো শামীমের চোখ খোলা নিথর দেহ পরে আছে। ইব্রাহিম আসতে করে মুচকি হাসি দিয়ে চোখ টা বন্ধ করে দিলো আর এইবার সে একটা ডায়েরি নিলো আর অনেকগুলো নীল কালি দিয়ে কাটা নামের পাশে শামীম এর নামটিও নীল কালি দিয়ে কেটে দিলো।আর হাসতে হাসতে বললো আমি সবার জন্য নীল কালিই ব্যবহার করি কারন সবার নীল মৃতদেহ দেখতে আমার বেশ লাগে।
(সমাপ্ত)

লেখকঃ Nur Hossain Tanvir

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.