অন্যপাশে তুমি

রিয়াজুল ইসলামের বয়স ২৬। একটা প্রাইমারি স্কুলে ইসলাম শিক্ষা পড়ান। প্রতিদিন সকাল ৭ টার আগে স্কুলের জন্য বের হওয়া এবং বেলা দেড়টায় বাড়িতে আসা তার রোজকার রুটিন। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন। সকালের কিছুটা সময় তিনি বরাদ্দ রেখেছেন কোরআন শরিফ পড়ার জন্যে। এ থেকে ধারণা হতেই পারে রিয়াজুল ইসলাম একজন গম্ভীর ধরণের মানুষ।
তবে, তিনি এই মুহূর্তে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। গম্ভীর টাইপ মানুষেরা বেশিক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়ায় না। কিন্তু, তিনি যে শুধু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়েই আছেন তা না। অসম্ভব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজের মুখ দেখছেন। তিনি দেখতে সুন্দর। বেশ সুন্দর। তার বড় বড় বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, খাড়া নাক, গালে এলোমেলো দাঁড়ি দেখে যে কেউ তাকে পছন্দ করবে। কিন্তু, এখন রিয়াজুল ইসলাম ভ্রু কুঁচকে আছেন। মনে হচ্ছে তিনি কোনো কারণে বিরক্ত।
তিনি ভ্রু কুঁচকানো অবস্থাতেই স্কুলের জন্য বের হলেন। তার অসম্ভব বিরক্ত লাগছে। স্কুলে যেতে ইচ্ছা করছে না। ছোট বাচ্চাদের যারা পড়ান, তাদের অন্যরা তাচ্ছিল্য করে। কিন্তু আসল ব্যাপার হচ্ছে টিচারদের হাড় ভাজা ভাজা করার জন্য বাচ্চাদের জুড়ি নেই। ক্লাসে চুপচাপ তো বসবেই না, তার উপরে হাজার হাজার প্রশ্ন করে মাথায় আগুন ধরিয়ে দেবে। তিনি তারপরেও হাঁটতে থাকলেন।
তার ক্লাসগুলো সব টিফিনের পরে। কোনো এক অদ্ভুত কারণে প্রাইমারি স্কুলগুলো ইসলাম শিক্ষা ক্লাস টিফিনের পরে দেয়। টিফিনের পরপরই তার ক্লাস ফোরে একটা ক্লাস আছে। তিনি ক্লাসে ঢুকলেন। বাচ্চারা একসঙ্গে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ালো এবং বললো, “গুড মর্নিং,স্যার”। রুম গমগম করে উঠলো। তিনি বললেন, “সবাই বই বের করো।”
একজন ছাড়া সবাই বই বের করলো। তিনি ওই ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলেন, “সামি, তোমার বই কোথায়?”
ছেলেটা সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বললো, “স্যার, আমার ছোটো বোন আমার বইয়ের প্রতিটা পৃষ্ঠায় হাতি ঘোড়া এঁকেছে। এইজন্যে লজ্জায় নিয়ে আসি নি।”
তিনি বললেন, “বই ঠিকমতো রাখবে এরপর থেকে। বুঝেছো?”
ছেলেটা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। তিনি বাকিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ তোমাদের সূরা নাস পড়া ছিলো। কে কে মুখস্ত করে এসেছো?”
প্রথম বেঞ্চের কয়েকজন এবং পেছনের বেঞ্চের দুইজন হাত তুললো। ক্লাসে ২৬ জন স্টুডেন্ট। অথচ পড়ে এসেছে মাত্র এই কয়েকজন। এরপরেও তিনি বিস্মিত হতে পারছেন না। কারণ, তার নিজেরই ছোটবেলায় সূরা নাস মুখস্ত করতে এক সপ্তাহ লেগেছিলো। সেখানে এরা একদিনে কীভাবে মুখস্ত করবে? যারা হাত তোলে নি তাদের তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের মুখস্ত হয় নি কেনো?”
তাদের মধ্যে ছটফটে স্বভাবের একজন উত্তর দিলো, “স্যার, সবই মুখস্ত হয়েছে খালি কয়েকটা শব্দ মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না।”
তিনি বললেন, “তাহলে যেটুকু মুখস্ত আছে ওইটুকুই বলো শুনি।”
ছেলেটা পড়তে শুরু করলো। সূরাটির এক জায়গায় আছে “ওয়াস ওয়াসিল খন্নাস”। ছেলেটি বললো, “ভুস ভুসিল খন্নাস।” আরেক জায়গায় আছে, “ইউ ওয়াসয়িসু ফি”। ছেলেটা এই অংশ আরো ভয়ানক ভাবে উচ্চারণ করে বললো, “ভাসভিসু।”

তিনি ছেলেটাকে বেশ সময় নিয়ে বুঝিয়ে দিলেন এবং বললেন উল্টা পাল্টা উচ্চারণ করলে পাপ হবে। কিন্তু, ছেলেটা পরেরবারও একই ভুলগুরো করলো। তিনি সূরা নাস-ই আবার পড়া দিলেন। তার ভেতরে ভেতরে মজা লাগছে। কারণ, তিনিও ছোটবেলায় এই ভুলগুলোই করতেন।
সেদিন তিনি স্কুল শেষ করে জোহরের নামায পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। রাস্তায় হাঁটছে এমন একটা ছেলেকে দেখে তিনি ধাক্কার মতো খেলেন। লম্বামতো রাজপুত্রের মতো একটা ছেলে নীল গেঞ্জি পরে হেঁটে আসছে। তিনি তৎক্ষণাৎ চোখ সরিয়ে ফেললেন। এক দৃষ্টে কারো দিকে তাকানোটা বেয়াদবি। কিন্তু, ছেলেটা এতো সুন্দর কেনো? কেমন যেন স্নিগ্ধ স্নিগ্ধ ভাব আছে। এরকম চিন্তা আসায় তিনি কয়েকবার “আসতাগফিরুল্লাহ” পড়লেন। আর চিন্তা ভাবনাগুলাও দ্রুত ডালপালা ছড়াচ্ছে। যা থামানোটা খুব জরুরি। এরকম বিব্রতকর অবস্থায় তিনি এর আগেও পড়েছেন। প্রতিবারই চেষ্টা করেছেন নিজেকে সংযত রাখতে। আজকেও করলেন। আচ্ছা, ছেলেটা কি তাকে সালামও দিবে না? পাঞ্জাবি আর মুখে হালকা দাড়ি আছে এমন কাউকে তো প্রায় সবাই-ই সালাম দেয়। আর তাছাড়া, সালাম দিলে তিনি ছেলেটার গলার স্বর শুনতে পারতেন। গলার স্বর শোনার এরকম ইচ্ছা হওয়ায় তার খুবই খারাপ লাগতে লাগল। আল্লাহ তো মনের খবরও রাখেন। তিনি ক্রমাগত বিড়বিড় করছেন “আসতাগফিরুল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ”। তাকে চমকে দিয়ে ছেলেটা তাকে সত্যি সত্যি তাকে সালাম দিলো। তিনি ছেলেটার দিকে না তাকিয়েই সালামের উত্তর দিলেন। কী আশ্চর্য! তিনি তাকাতে পারছেন না কেন ছেলেটার দিকে। তার নিজেরই বিরক্ত লাগছে নিজের উপর।
তিনি হাঁটতে হাঁটতে বাড়িতে গেলেন।
*
অদ্ভুতভাবে, পরেরদিনও ছেলেটার সঙ্গে রিয়াজুল ইসলামের দেখা হলো। তিনি স্কুল শেষ করে যথারীতি জোহরের নামায পড়ে বাড়ি ফিরছেন। তখনই খেয়াল করলেন ছেলেটা আসছে। তিনি ছেলেটার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। আবার, দেখা হওয়ায় তার সবকিছু মনে পড়ে গেলো। তিনি মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকলেন। আজকে ছেলেটাকে আরো সুন্দর লাগছে কেন? ছেলেটা তাকে আজকেও সালাম দিলো। তিনি অন্যদিকে তাকিয়ে সালামের উত্তর দিলেন। তার বারবার মনে হলো ছেলেটার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলে- ছেলেটা তার চোখ দেখে নিমিষেই বুঝে যাবে তার ভেতরে কী ঘটছে।
পরদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় তিনি অতি সাবধানে চারদিকে দেখছিলেন। না, ছেলেটা নেই। তার একই সঙ্গে ভালো লাগলো আবার মন খারাপও হলো।
তিনি বাড়ি চলে গেলেন।

*
তন্ময় প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফিরছে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই সে দেখলো হুজুর টাইপ ছেলেটা আসছে। সে বেশ কয়েকদিন ধরেই উনাকে লক্ষ্য করছে। তন্ময়কে দেখলেই তিনি কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে যান। প্রথম দিন মানুষটার ওই হাল দেখে তন্ময়ের ভেতর ভেতর মজা লাগছিলো। মানুষটাকে ভড়কে দেয়ার প্রচন্ড ইচ্ছা দমন করতে না পেরে সেদিন সে সালাম দিয়েছিলো। সত্যি সত্যি মানুষটা ভড়কে গিয়েছিলো। সালাম দেয়ার পর অবাক হয়ে তিনি একবার তন্ময়ের দিকে তাকালেন। সালামের উত্তর দিলেন অন্যদিকে তাকিয়ে। তন্ময় অনেক কষ্টে হাসি চেপে রেখেছিলো সেদিন। সাধারণত, কে কোন নজরে তাকাচ্ছে এটা বুঝতে তন্ময়ের বেশি সময় লাগে না। এক পলক দেখলেই বোঝা যায়।
আজকে আরো একটা অদ্ভুত কিছু করতে ইচ্ছা হচ্ছে। লাভ লেটার-ফেটার জাতীয় কিছু লিখে দিলে না জানি কী করেন! সমস্যা হচ্ছে এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে লাভ লেটার লেখা সম্ভব না।
ওইতো মানুষটা তার দিকে তাকালো। এরপর প্রাণপন চেষ্টা করছে মাথা নিচু করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে। কিন্তু পারছে না। মুখে অপ্রস্তুত ভাবটা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে আছে। তন্ময় লক্ষ্য করলো মানুষটা হালকা পাতলা হলেও দেখতে বেশ সুন্দর। নীল রঙের পাঞ্জাবীটা বেশ মানিয়েছে তার ওপর।
তারা দুজন কাছাকাছি চলে এসেছে। রিয়াজুল ইসলাম চূড়ান্ত লেভেলের অস্বস্তি নিয়ে হাঁটছেন। ছেলেটাকে দেখলে এমন লাগে কেন কে বলবে। তন্ময় কথা বলার জন্য এগিয়ে গেলো। সে হাসিমুখে পরিচিত ভঙ্গিতে সালাম দিলো। রিয়াজুল ইসলাম উত্তর দিলেন। উত্তর দিয়েই তিনি গটগট করে হেঁটে চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু পারলেন না। কারণ তন্ময় জিজ্ঞেস করে ফেলেছে, “কেমন আছেন?” প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে যাওয়াটা বেয়াদবি।
তিনি বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ্। আপনি?”
‘আপনি’ বলে ফেলায় তার নিজের উপরেই রাগ লাগতে শুরু হলো। ছেলেটা তার থেকে কমপক্ষে পাঁচ বছরের ছোট। সমস্যা হচ্ছে ‘আপনি’ শব্দটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। তিনি ইচ্ছা করে বলেন নি। অস্বস্তিতে পড়লে কি মানুষ উল্টা পাল্টা কথা বলে? রিয়াজুল ইসলামের বারবার মনে হলো ছেলেটা তার অস্বস্তি লাগার ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে। কারণ, ছেলেটা মুচকি হাসছে। ছেলেটা বললো, “আমি ভালো আছি।”
রিয়াজুল ইসলামের ভয় লাগতে শুরু করলো এই পর্যায়ে। ছেলেটা যদি জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা আপনি ওরকম ক্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকেন কেন বলেন তো?”। তাহলে তিনি উত্তরে কী বলবেন? তিনি মনে করার চেষ্টা করলেন কখনও কি তিনি ক্যাবলার মতো তাকিয়ে থেকেছেন নাকি।
ছেলেটা জিজ্ঞেস করলো, “ভাইয়া আপনার নামটা?”
তিনি বললেন, “রিয়াজুল ইসলাম।”
তন্ময় বললো, “ও আচ্ছা। আমার নাম জিজ্ঞেস করবেন না?”
রিয়াজুল ইসলাম ফাঁদে পড়েছেন এমন গলায় বললেন, “আপনার নাম?”
“আমার নাম তন্ময়। এইতো এবার এইচএসসি দেবো। আচ্ছা আপনি কী করেন?”, তন্ময় জিজ্ঞেস করলো।
রিয়াজুল ইসলামের অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, “আমি স্কুলের টিচার। আচ্ছা, বাসায় কাজ আছে। এখন যাই। কেমন?”
তন্ময় হেসে বললো, “হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। যান তাহলে। ভালো থাকবেন।”
রিয়াজুল ইসলাম কোনো কথা না বলে একেবারে বাসায় চলে এলেন। কী সাংঘাতিক ছেলেরে বাবা! তিনি তো প্রায় ঘেমেই গিয়েছিলেন। তিনি ঠিক করলেন ছেলেটাকে এড়িয়ে চলবেন। দরকার করে অন্য রাস্তা দিয়ে আসা যাবে। কিন্তু, ওই রাস্তায় আর না।
*
অন্ময় বেশ কিছুদিন ধরে রিয়াজুল ইসলামকে খুঁজছে। আশ্চর্য! মানুষটা কি হারিয়ে গেলো? নাকি, অন্য কোথাও চাকরি পেয়েছে? কলেজ থেকে আসার সময় তন্ময় প্রায়ই রাস্তাজুড়ে হেঁটে বেড়ায়। একদিন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে গিয়েও উঁকি দিয়েছে। না, মানুষটা নেই। বিষয়টা যথেষ্টই অদ্ভুত।
এদিকে, আটদিন গা ঢাকা দিয়ে রিয়াজুল ইসলাম হাঁপিয়ে উঠেছেন। শুধুমাত্র একটা ছেলের সাথে যাতে দেখা না হয়- এজন্য বাড়তি তিন কিলোমিটার পথ হাঁটার কোনো মানে হয় না। তিনি ঠিক করলেন তন্ময়ের সাথে দেখা হোক বা না হোক, ওই রাস্তা দিয়েই যাবেন। তার ভেতরে তন্ময়কে দেখার সুপ্ত বাসনা যে নেই, তাও বলা যায় না।

তাই তিনি পরদিন স্কুল এবং নামায শেষে ওই রাস্তা দিয়েই ফিরতে লাগলেন। ওইতো ছেলেটা। আচ্ছা, ছেলেটাকে প্রতিদিন এই একই সময়েই রাস্তায় থাকতে হবে কেনো? আজ আবার কথা বলার জন্য এগিয়ে আসবে না তো?
তন্ময়ের খুব ইচ্ছা করছিলো কথা বলতে। কিন্তু, সে খেয়াল করলো রিয়াজুল ইসলাম তাকে দেখে অন্যদিনের চেয়েও বেশি বিব্রত মুখ করে আছেন। মনে হচ্ছে মানুষটা বিরক্তও। তাই সে কোনো কথা বললো না। শুধু একবার মানুষটার দিকে তাকিয়ে হাসলো। রিয়াজুল ইসলামও হাসলেন।
সেই হাসিতে অনেক কিছু ছিলো যা তন্ময় মুহূর্তের মধ্যেই ধরে ফেললো। তার বারবার মনে হতে লাগলো, শত বিপদের মধ্যে পড়লেও একটা মানুষ তার হাত কখনো ছাড়বে না, কখনও না। মানুষটা তার সব আবদার মেনে নেবে। যদি সে কখনও এক মুঠো লাল শাপলা চায়- অনেক খুঁজে হলেও মানুষটা তা এনে দেবে।
*
সেদিন রাতে এশার নামাযের পর রিয়াজুল ইসলাম ওয়াজ মাহফিলে গেলেন ওয়াজ শুনতে। শীত পড়তে শুরু করেছে। এরমধ্যে চারদিকে একের পর এক মাহফিল শুরু হয়ে গেছে।
বক্তা যথেষ্ট ভালো বক্তৃতা দিচ্ছেন। ভালো লাগছে শুনতে। হঠাৎ করেই ওয়াজের মধ্যে বক্তা আলোচনা করতে লাগলেন লূত (আ.) এর জাতির ওপরে বর্ষিত আযাব নিয়ে। এই ঘটনা রিয়াজুল ইসলামের জানা। আশ্চর্যের কথা হচ্ছে বক্তার কথাগুলো শুনে আজ তার বিরক্ত লাগছে। ওয়াজ শুনতে ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছে গলার কাছে কিছু একটা দলা পেকে আছে। তারপরেও তিনি বসে রইলেন। বক্তা বলেই যাচ্ছেন, “আমাদের পাশের দেশ ভারত ছেলে ছেলে সম্পর্ক করার অনুমতি দিয়েছে। এটা কোনো কাজের কথা? আপনারাই বলেন? ভারত যা করে, বাংলাদেশ তো তাই-ই করে। কবে দেখবেন বাংলাদেশেও ছেলে ছেলের বিয়ে হচ্ছে। বলেন নাঊযুবিল্লাহ।” উপস্হিত জনতা হুংকার দিয়ে বললো, “নাঊযুবিল্লাহ।”
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে তিনি বুঝতে পারলেন তার অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে। তিনি অনেক বই-পত্র খুঁজে পবিত্র কোরআন শরীফে থাকা লূত (আ.) এর জাতি নিয়ে থাকা প্রত্যেকটি আয়াত বাংলা অর্থসহ পড়লেন। এগুলো আগেও তিনি পড়েছেন। কিন্তু, কে বলবে আজ তার এতো খারাপ কেনো লাগছে? তিনি কি কোনো পাপ করছেন? তার মধ্যে তো ভালোবাসার মতো পবিত্র একটা বিষয়ের আরম্ভ হচ্ছিল মাত্র। সমস্যাটা কোথায়?
পবিত্র কুরআনের একটা আয়াত এরকম:
“যারা জাহানের মানুষদের মধ্যে তোমরাই কি পুরুষদের সাথে কুকর্ম করো? তোমাদের জন্য তোমাদের রব যে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে তোমরা বর্জন করো? বরং তোমরা তো সীমালঙ্ঘকারী সম্প্রদায়” -সূরা শুয়ারা; আয়াত ১৬৫-১৬৬।
সেই রাত রিয়াজুল ইসলাম না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিলেন।
কাকতালীয় ভাবে সেই একই রাতে জেগে আছে তন্ময়। তার কাছে মনে হচ্ছে রাতটা বুঝি কোনোদিনই শেষ হবে না। প্রচন্ড মন খারাপ লাগছে অথচ মন খারাপ করার মতো কিছুই হয় নি। এই মন খারাপের উৎস কী? তার কেনইবা বারবার ওই অপরিচিত মানুষটাকে দেখতে ইচ্ছা করছে? রাত আড়াইটা বাজে অথচ চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। “আচ্ছা, যখন জেগেই আছি, তখন একটা চিঠি লিখে ফেললে কেমন হয়? কিংবা ডায়েরীতে কোনো লেখা?” সে ভাবল। সে চিঠি লিখতে বসলো। চিঠি লিখতে গিয়ে সে আবিষ্কার করলো চোখদুটো বারবার ভিজে যাচ্ছে। এতো মায়া কেনো লাগছে মানুষটার জন্য?

*
রিয়াজুল ইসলাম আজকেও একই সময়ে বাড়ি ফিরছেন। তবে, তিনি ঠিক করে ফেললেন- আজ যদি তন্ময়ের সাথে দেখা হয়, তাহলে অবশ্যই তাকে কিছু কথা বলবেন। কড়া কোনো কথাও হতে পারে। গতকাল রাত থেকেই তার সবকিছুর ওপর রাগ লাগছে। যদি সৃষ্টিকর্তা এভাবেই মানুষকে সৃষ্টি করবেন তাহলে কেনো খাঁচায় বন্দী করে রাখলেন? কেনো পূর্ণ অধিকার দিলেন না?
রাস্তায় তন্ময়কে দেখা যাচ্ছে। রিয়াজুল ইসলামের ইচ্ছা করছে ছুটে গিয়ে তন্ময়কে জড়িয়ে ধরতে। তন্ময়ের মাথাভর্তি চুলের ভেতরে হাত গলাতে। সম্ভব না। কিছুতেই সম্ভব না। তিনি চিরকাল ধর্ম অনেক কঠোরভাবে মেনে চলেছেন। বাল্যকালের পর থেকে তার নিয়মিত নামায পড়ার অভ্যাস। অতি শীতে যখন সবাই ফজরের নামায পড়া বন্ধ করে দেয়, তখনও তিনি নামায ছাড়েন নি। তার পক্ষে আল্লাহর বিধানের বাইরে যাওয়া অসম্ভব।
এতো দিন তিনি তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে কি গুনাহ্ করেছেন? তিনি তো সবসময়ই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন। আচ্ছা, তন্ময়কে এই বিষয়ে যদি আল্লাহর বিধান বোঝানো যায় তাহলে সে কি বুঝবে না? বুখারী শরীফে তো লেখা আছে, “কোনো বান্দা যদি আল্লাহর জন্যে কোনো খারাপ কাজ বর্জন করে, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ সেই বান্দাকে পুরস্কৃত করবেন।”
কাউকে ভালোবাসাটা কি আসলেই কোনো খারাপ কাজ? ধরা যাক খারাপ কাজ। এখন, তন্ময় যদি আল্লাহর ভয়ে পৃথিবীতে নিজেকে সংযত রাখে তাহলে পরকালে সে তো বেহেশত পেলেও পেতে পারে। হয়তো বেহেশতে তাদের মিল হতেই পারে! আচ্ছা, তিনি নিজে যে বেহেশত পাবেন তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়। তার সবকিছু গোলমেলে লাগছে। মাথার কোনো এক কোণে তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে।
তন্ময় ছেলেটা হাসছে। ইদানিং ছেলেটা তাকে দেখলেই হাসে। ছেলেটা যখন হাসে তখন তার মনে হয় এই ছেলের জন্য তিনি সবকিছু করতে পারবেন। পানিতে ঝাপ দিতে বললে তিনি তাই দেবেন। গায়ের শিরা উপশিরা ছিঁড়ে ফেলতে বললে ছিঁড়ে ফেলবেন।
তন্ময় এগিয়ে আসছে। ছেলেটার হাতে চিঠি জাতীয় কিছু নাকি? মুখে মুচকি হাসি। তন্ময় হাসিমুখে বললো, “কেমন আছেন?”
রিয়াজুল ইসলাম বললেন, “এইতো ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
তন্ময় হেসে বললো, “আমি তো ভালোই আছি। আচ্ছা আপনার কি রাতে ঘুম হয় নি? চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে দেখছি।
তিনি কিছু বললেন না। মনে মনে তিনি গুছিয়ে নিচ্ছেন এই ছেলেকে কী বলা যায়।
তন্ময় চিঠিটা এগিয়ে দিয়ে বললো, “এটা আপনার জন্য।”
তিনি চিঠিটা নিলেন। তার খুব ইচ্ছা করছে চিঠিটা পড়তে। তারপরেও তিনি বিরক্ত গলায় বললেন, “কী এটা?”
তন্ময় বললো, “চিঠি। এতো বিরক্ত হয়ে যাচ্ছেন কেনো বলুন তো? আমি কি কিছু করেছি?”
রিয়াজুল ইসলাম একটা দীর্ঘ শ্বাস নিলেন। তার মোটেই ছেলেটার মন খারাপ করিয়ে দিতে ইচ্ছা করছে না। কড়া কোনো কথাও বলতে ইচ্ছা করছে না। তারপরেও তিনি বললেন, “শোনো তন্ময়! আমি জানি এর মধ্যে কী লেখা আছে। তুমি ভেবেছোটা কি বলো তো? কয়টা দিন তোমার সাথে হেসে কথা বলেছি বলেই আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি? শোনো, আমার দিকে তাকাও। আমার গায়ের পাঞ্জাবীটা দেখো। আমাকে দেখে তোমার তো আগেই বোঝার দরকার ছিলো আমি ধর্ম খুব ভালো করে পালন করি। আর তোমার এটাও নিশ্চয়ই জানা আছে এই ধরণের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের ধর্ম কী বলে? জানো কি না বলো?”
তন্ময় কিছু বলতে পারলো না। কারণ, তারও মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে। আশ্চর্যের বিষয় সে সবকিছু ঝাপসা দেখছে। চোখে কিছু পড়লো নাকি?
রিয়াজুল ইসলামের আরো কিছু বলতে ইচ্ছা করছিল। তন্ময়কে দেখে তিনি থামলেন। ছেলেটার চোখভর্তি পানি। চোখে পানি থাকলে কাউকে কি এতোটা সুন্দর লাগে?
পরের আধা ঘন্টা যে কীভাবে কেটে গেলো তন্ময় বুঝতে পারলো না। সে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে মূর্তির মতো বসে থাকলো।
*
এশার নামায পড়ে রিয়াজুল ইসলাম বাড়ি ফিরেছেন। তার হঠাৎ করেই মনে হলো তন্ময়ের লেখা চিঠিটা তার পাঞ্জাবীর পকেটে আছে। তিনি পকেট থেকে চিঠিটা বের করলেন। পুরো কাগজে একটাই শব্দ বারবার লেখা- ভালোবাসি।
রিয়াজুল ইসলামের মা শাহানা হঠাৎ করেই শুনলেন কে যেন হাউমাউ করে কাঁদছে। তিনি তার ঘর থেকে বের হয়ে দেখেন কাঁদছেন রিয়াজুল ইসলাম। শাহানা ব্যাকুল গলায় ডাকতে লাগলেন, “ও রিয়াজুল কাঁদিস ক্যান বাপ? ও রিয়াজুল। রিয়াজুল রে।” কিন্তু, রিয়াজুল কান্না থামাতে পারছেন না। এতো কান্না কেন আসছে তিনি বুঝতে পারছেন না।

লেখকঃ Fahim Hasan

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.