অব্যক্ত, অপ্রকাশিতঃ এক

‘আমি ভার্সিটিতে চান্স পাইছি, একটু আগে রেজাল্ট দিল’

‘গ্রেট! কংগ্র্যাটস আমি জানতাম তুমি চান্স পাবে’

‘তুমি খুশি হয়েছ? তুমিও চান্স পেলে ভাল হত একসাথে পড়া যেত’’

বাদ দাও, তোমার চান্স হয়েছে আমি তাতেই খুশি। মিষ্টি খাওয়াচ্ছো কখন?’

‘বিকেলে চলে এসো আড্ডা দেয়া যাবে।’

‘আচ্ছা।’ বলে আবারো উইশ করে ফোন রেখে দিলো রায়ান। রায়ান কথা বলছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু অলকের সাথে। সে আজ অনেক খুশি কারণ অলক ভাল একটা পাবলিক ভার্সিটিতে ভাল সাবজেক্টে চান্স পেয়েছে। সে নিজেও চান্স পেতে পারত কিন্তু ইন্টারে রেজাল্টটা হঠাত্‍ খারাপ হয়ে গেল। সেটা বাদ গেলেও ভিতরে ভিতরে একটা অচেনা মন খারাপের অস্তিত্ব টের পায় রায়ান। এর উত্‍পত্তি কোথায় সে জানেনা! সেই ক্লাস ফাইভ থেকে শুরু করে কিছুদিন আগ পর্যন্তও ঢাকায় একসাথে ভার্সিটি কোচিং করে আসলো দুজনে। এতটা বছর একসাথে ছিল তারা ভাল বন্ধু হয়ে। আজ দুজনের এই অনিচ্ছাকৃত বিয়োগই কি ক্ষুদ্র মন খারাপের কারণ? হবে হয়তো। মন খারাপ কে পাত্তা না দিয়ে রায়ান অপেক্ষা করতে থাকে বিকেলের, অলককে দেখার। আর খুব বেশিদিন নেই, তখন সে চাইলেই অলককে দেখতে পারবে না। তাকে ছেড়ে সে চলে যাবে নতুন একটা শহরে।

পরিচয়ের শুরুটা অনেকদিন আগের। রংপুর শহরের এক মফস্বলে দুজনের বসবাস। বাড়ি অবশ্য কাছাকাছি ছিল না, প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। ক্লাস ফাইভে ম্যাডাম একটি হ্যাংলা পাতলা ছেলেকে ক্লাসে এনে পরিচয় করিয়ে দিল নতুন বন্ধু হিসেবে। সেদিন যে বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল আজও তা অটুট আছে। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে এলাকার সবচেয়ে ভাল স্কুলে ভর্তি হল তারা। দুজনের নতুন নতুন বন্ধু হলেও নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কটা একই ছিল সবসময়ই। রায়ান ও অলক একসাথে থাকত, ক্লাসে পাশাপাশি বসতো। অন্য বন্ধুরা মাঝে মাঝে ইয়ার্কি করে বলত, “ক্যারে অলক উইয়্যাক কি যাদু করছিস কতো, ওই তো তোর পিছ ছাড়েনা দ্যাহোং। খালি তোর পিছনত ঘুর ঘুর করে।” বলতে বলতে বন্ধুরা হাসত, সাথে ওরা দুজনও। কাকতলীয় হলেও সত্যি তাদের ক্লাসরোল ও সবসময় পাশাপাশিই থাকত। অলকের কখনও দশ হলে রায়ানের এগারো আবার রায়ানের পাঁচ হলে অলকের ছয়। রদবদলটা হত শুধু তাদের অবস্হানের। পরীক্ষার হলেও তাই তারা কাছাকাছিই থাকতো। পরীক্ষায় কখনো তারা নিজেদের হিংসা করেনি বরং সাধ্যমত একজন আরেকজনকে সাহায্য করত। এত কাছের বন্ধু হওয়ার পরেও রায়ান কখনো তার সমপ্রেমী সত্ত্বার কথা অলককে জানাতে পারেনি। কয়েকবার বলতে চেয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলা হয়ে ওঠে নি। বিশ্বাসের জন্য নয়,বিশ্বাস সে অলককে যথেষ্টই করে কিন্তু অলক যদি তাকে ভুল বোঝে, তাকে এড়িয়ে চলে, বন্ধুত্ব না রাখতে চায় এসব আশঙ্কা থেকেই আর বলা হয়ে ওঠেনি কিছুই। এতদিনের গড়ে তোলা বন্ধুত্বটায় সে কোন ঝামেলা চায় নি। অলকের সাথে বন্ধুত্ব থাকবে না এটা সে কল্পনাও করতে পারেনা।

চার বছর পর অলক ফাইনাল ইয়ারে আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ধীরগতির কারনে রায়ান থার্ড ইয়ারে। আগের মত প্রতিদিন কথা হয় না, সপ্তাহে বড়জোড় একদিন কথা হয়। কিন্তু তাদের মাঝে কোন জড়তা থাকেনা কখনও। প্রাণখুলে কথা বলে দুজন। রায়ান জানে অলকের গার্লফ্রেন্ড আছে। অলকের প্রতি রায়ানের শৈশবের ভালবাসাটা এথনো আছে। কখনোই প্রকাশ করেনি সেটা, করাও হবেনা কখনো। ভালোবাসাটা কখনোই খুব বেশি তীব্র ছিল না রায়ানের। হয়ত বয়স অনেক কম ছিল তবুও সে বুঝতো অলকের প্রতি ভালোবাসার কথা। অলক বুঝতে পেরেছিল কিনা কে জানে। কখনো বোঝানোর চেষ্টা করেনি রায়ান, কখনো কিছু জিজ্ঞেসও করেনি অলককে। পাছে এত সুন্দর বন্ধুত্বটাই যদি নষ্ট হয়ে যায়? নষ্ট না হলেও যদি আর আগের মত না থাকে? শূন্যতা সৃষ্টি হয় দুজনের মাঝে? কি দরকার মিছেমিছি ঝামেলা করে।

সব ভালোবাসা প্রকাশ করতে হবে, ভালবাসার মানুষটাকে কাছে পেতে হবে এমন তো কোন কথা নেই। অলকও তো তাকে ভালবাসে,বন্ধু হিসেবে। এটাই বা কম কি? সেই ভালোবাসার তীব্রতাটুকু হয়ত প্রেমিকের ভালবাসার চেয়ে বেশি না কিন্তু কমও তো না কোন অংশেই। রায়ান তাতেই খুশি। থাকুক না তার ভালোবাসাটা যতনে গোপনে,বন্ধুত্বের মোড়কে লুকানো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.