অব্যক্ত, অপ্রকাশিতঃ তিন

ধোঁয়াশা মাঘের সন্ধ্যা বেলা আড্ডা মারছি রেলওয়ে ফুটবল মাঠের এককোণে বসে, আমরা চার বন্ধু। ক্রমেই দূরের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো কেমন যেন কুয়াশার ঘোমটায় ঢাকা বিধবা দাদীমার মতো হয়ে আসছে। মাঠে লোক খুব একটা নেই, আমরা মূল রাস্তা থেকে একটু দূরে ঈদগাহ মাঠের মধ্যে নিজেদের বানানো কাঠের মাচানে বসে আছি অন্ধকারে। একটা সময় কথাবার্তার মোড় ঘুরে এল আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে। বিষয় – নেলসন ম্যান্ডেলা। প্রাথমিক পর্বে তার গুণকীর্তনই চলছিল। তাঁর ২৩ বছর জেলের অন্ধকারের মধ্যে থাকা, বর্ণবিদ্বেষী সরকারের বিরুদ্ধে অধিকারের লড়াই ইত্যাদি। এমন সময় এক জন নিঃশব্দে প্রবেশ করল আড্ডায়। আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি তার উপস্থিতি।

আমাদের মধ্যে অনিন্দ্যই প্রথম সমালোচনার সুর ধরল, ‘‘কিন্তু যাই বল, নেলসন জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর নিজের স্ত্রীকে ডিভোর্স করে ভাল করেননি। অথচ ভাবো, এই স্ত্রীই নেলসনের অবর্তমানে এত দূর নিয়ে এসেছিলেন, এটা খুব অমানবিক কাজ হল না?’’

মোসলেম বলে উঠল, ‘‘এটা ওঁর ব্যক্তিগত বিষয়, উনি কার সঙ্গে থাকবেন বা থাকবেন না, এটা তো উনি নিজেই ঠিক করবেন। এসব বলে ওঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপকে কলঙ্কিত করার কোনও মানেই হয় না। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্কই নেই।’

হঠাৎ ছায়ামূর্তিটা বলে উঠল, ‘‘আচ্ছা! তাই নাকি?”

আমরা চমকে তাকিয়ে দেখি মানুষটা নিঃশব্দে এসে ঘাসের ওপর বসে পড়েছে, একদম। ছায়ামূর্তিকে সনাক্ত করা গেল – আমাদের মানিক দাদা। মানিক দাদা আমাদের পাড়ারই একজন, বছর দশেকের বড়। মানিক দাদা সম্পর্কে অল্প কথায় কিছুই বলা সম্ভব নয়। কারণ, মানিক দাদা সম্পর্কে প্রত্যেক মানুষের ধারণাই পরস্পর বিরোধী। কারো মতে মানিক দাদা নির্বোধ মানুষ, কারো মতে বেশ বোধ সম্পন্ন জ্ঞানী মানুষ। এরকম মানুষ সম্পর্কে কোনও মতামত প্রকাশ করতে চাওয়াটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না ভেবে তার বিষয়ে কোনও মন্তব্য করা ছেড়ে দিয়েছিলাম। সেই মানিক দাদাই ছায়ার মধ্যে থেকে আত্মপ্রকাশ করে বলল, ‘‘আচ্ছা! তাই নাকি?’’

আমরা চুপ। বুঝতে পারছি না মানিক দাদার কথা কোন দিকে মোড় নেবে। তারপর বললেন, ‘নেলসন ম্যান্ডেলার স্ত্রীকে ডিভোর্স করা রাজনৈতিক বিষয় নয়? তোরা ভেবে দেখেছিস, ২৩ বছর বাদে নেলসন মুক্ত হল জেল থেকে, সারা পৃথিবীর মিডিয়া হামলে পড়ল, নেলসন রাতারাতি হিরো। কিন্তু কৃষ্ণ বর্ণের মানুষগুলোর কী উপকার হল, কী লাভ হল? ভেবেছিলাম নেলসনের মুক্তি বর্ণবিদ্বেষী সরকারের মুখে ঝামা। তো কী হল? পর্বতের মূষিক প্রসব। আমি যদি আবার বলি, গোটা ব্যাপারটা একটা প্ল্যান। পূর্ব পরিকল্পিত। ২৩টা বছর খুব একটা কম সময় নয়। যদি বলি, এই ২৩ বছরে কারাগারে থাকার সময়ই আসল নেলসনের মৃত্যু হয় বা তাঁকে হত্যা করা হয়? কোনও এক look alike-কে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল নেলসনের ভূমিকায় থাকার জন্যে? যেটা ওই বর্ণবিদ্বেষী সরকারেরই প্ল্যান্ট করা! এবার সময় বুঝে মুক্তি দিতে সরকারের অসুবিধে কোথায়? সেই লোকটা মুক্ত হবার পর কী করতে পারেন? মূল আন্দোলনের স্রোতকে গতিহীন করতে পারেন। যেটা উনি করেছেন। সে মানুষটা সরকারের মদতে এতটাই Trained বা শিক্ষিত যে, তার ধরা পড়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই বললেই চলে। তারপরও সম্ভাবনা একটা থেকেই যায়। — কার কাছে?’

মোসলেম সম্মোহিত ভাবে বলে উঠল, ‘‘তাঁর স্ত্রীর কাছে।’’

ঘটাদা হঠাৎ দুহাতে তালি মেরে বললেন, ‘ইয়েস! অতএব নেলসন ম্যান্ডেলা তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ব্যাপারটা ব্যক্তিগত না রাজনৈতিক?’

কুয়াশা বেড়েই চলেছে। দূরের ল্যাম্পপোস্টগুলো ভেজা চোখে আলো দেখার মতো। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ।

কলিম হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে বলে উঠল, ‘‘তুমি কী বলতে চাও, মানিক দাদা? আমরা যে নেলসন ম্যাণ্ডেলাকে দেখি খবরের কাগজে, সে look alike?’’

মানিকদা নাটকীয় ভাবে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের কলেজের কেমিষ্ট্রির টিচারের মতো বলে উঠলেন, ‘‘Boys! Try to understand! What is what.’’ তার পর আমার থেকে একটা সিগারেট চেয়ে সেটা কানে গুঁজে ঘাসের ওপর গ্যাঁট হয়ে বসে পড়লেন। নিরন্তর যুক্তি দিয়ে আমাদের চারজনের মগজ ধোলাই করে দিলেন। রাত বেড়েই চলেছে। মানিকদা আমাদের মধ্যে এক ভিন্ন মায়াজাল আবিষ্কার করলেন। হঠাৎ করেই তিনি উঠে দাড়িয়ে পড়লেন, আমার হাত থেকে একটা সিগারেট নিয়ে হেলে দুলে মিশে গেলেন ঘন কুয়াশার মধ্যে, আমাদের মাঝে ঘন ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে।

আমরা চার বন্ধু থ মেরে বসে রইলাম একে অপরের মুখের দিয়ে চেয়ে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.