উইমেন অ্যান্ড ফিকশন আর ভার্জিনিয়া উলফের প্রেমিকা

লেখক : ছোটন

ভার্জিনিয়া উলফ ও ভিটা স্যাকভিল ছবি সোর্স : brainpicking.org

১৯২২ সালে ডিসেম্বরের এক জাঁকজমকপূর্ণ সন্ধ্যায় ভার্জিনিয়া উলফের সাথে ভিটা স্যাকভিল ওয়েস্টের প্রথম দেখা। সেদিনের ডিনার পার্টির হোস্ট ছিলেন ভার্জিনিয়া উলফের দেবর ক্লাইভ বেল।  ভার্জিনিয়ার বর লিওনার্দ  উলফ ছিলেন তৎকালীন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, চিন্তক এবং লেখক। ভার্জিনিয়া নিজেও বেড়ে উঠেছেন লন্ডনের শিক্ষিত সংস্কৃতিমনা পরিবারে। তার বাবা স্যার লেসলি স্টিফেন একাধারে শিক্ষাবিদ, লেখক, সমালোচক ও ঐতিহাসিক। এই লেখক জুটি ভার্জিনিয়া এবং লিওনার্দ মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘হোগার্থ প্রেস’ নামের প্রকাশনা। অপর দিকে ভিটা স্যাকভিল ওয়েস্ট ছিলেন ঔপন্যাসিক, কবি,সাংবাদিক এবং তার বর হ্যারলন্ড নিকলসন ছিলো কূটনৈতিক, লেখক এবং রাজনীতিবিদ।

সেদিনের সেই পার্টির দুই লেখক পরিবারের সাক্ষাৎকার ভার্জিনিয়ার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। সেই সাথে ইংরেজী সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস সৃষ্টিতেও সাহায্য করে। ভিটা স্যাকভিল নিয়মিত ভার্জিনিয়ার পত্রিকা ‘ হোগার্থ প্রেসে’ লিখতেন। এই লেখালেখির মধ্য দিয়েই তাদের বন্ধুত্ব পরবর্তীতে প্রণয়ে রুপ নেয়। ভিটা ছিলেন ভার্জিনার দশ বছরের ছোট। তাদের প্রেমের বর্ণনা ভার্জিনিয়ার ডায়েরি এবং তাদের চিঠিপত্রেই পাওয়া যায়।

ভার্জিনিয়া ও ভিটা দু’জনেই ব্রিটেনের ব্লুমসবেরি গ্রুপের সদস্য ছিলেন। ব্লুমসবেরি গ্রুপ হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের ব্রিটেনের সাহিত্যিক, কবি, দার্শনিক,বুদ্ধিজীবী,আর্টিস্টদের একটি সংগঠন। 

 ব্লুমসবেরি গ্রুপের সদস্যরা যৌনতা সম্পর্কে উন্মুক্ত এবং প্রগতিশীল ধারণা পোষণ করতো৷ হয়ত এই দুই লেখিকার প্রেম, যৌন সম্পর্ক সম্ভব হয়েছিলো এমন উদার পরিবেশের জন্যই।ভার্জিনিয়া স্বিকার করেছিলেন তার অন্যতম উপন্যাস Orlando : A Biography উপন্যাস তিনি ভিটা স্যাকভেলির জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেছেন৷ ভার্জিনিয়া উলফ জীবনে অনেক প্রেমিক প্রেমিকা এসেছে, তবে কী এই উভকামী অস্তিত্বই তাকে সাহিত্যে নারী সম্পর্কে ভাবতে উৎসাহিত করেছে?

১৯২৮ সালের ১১ই অক্টোবার Orlando : A Biography উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় এবং তার পরের বছরে ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে ‘দি ফোরাম’ নামক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘উইম্যান অ্যান্ড ফিকশন’।  পরবর্তী কালে ১৯৭৯ সালে এটি ‘ভার্জিনিয়া উলফ : উইম্যান অ্যান্ড রাইটিং’ সংকলনে সংকলিত হয়। এই প্রবন্ধে উলফ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের সাহিত্যচর্চা এবং নারী সাহিত্যকে যেভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে সে-সম্পর্কে আলোচনা করেন।তিনি বিশ্বাস করতেন : 

একজন রচয়িতা তার নিজের বিষয়ে লেখালেখি ছাড়াও অন্য সকল বিষয় নিয়ে কিছু রচনার করার জন্য তাকে স্বাধীনতা দেওয়া কিংবা নিজস্ব স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন এইসব লেখালেখির ক্ষেত্রে যদি অতিরিক্ত শর্ত আরোপিত হয়, তা হলে সে সব লেখায় শিল্প বলতে কিছুই থাকে না। 

তিনি তৎকালীন সমাজের নারী বিষয়ক সাহিত্য সম্পর্কে একটি প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। কেন অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে নারীদের নিয়মিত লেখক হিসেবে খুঁজে পাওয়া যায়নি? কেন তারা পুরুষের মতো করেই রচনা করে থাকে? এর উত্তরে তিনি বলেন সেই সময়েও নারীদের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম ছিলো,পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাসে নারীদের এই অবদানকে সবসময় উপেক্ষা করে এসেছে। ইংল্যান্ডের ইতিহাস মানেই হলো পুরুষ জাতির ইতিহাস, নারী জাতির নয়।সময়ের এই আশ্চর্য নীরব দিকটিই এ যুগের কর্ম প্রবাহ হতে অন্য যুগের কর্মপ্রবাহকে আলাদা করে।

সাফো’ সহ নারীদের একটি ছোটো দল যিশুখ্রিষ্টের ছয়শ বছর পূর্বে গ্রামে কাব্যসাধনার সাথে নিজেদের যুক্ত করেছিলো।তারা সময়ের অভিঘাতে এখন নীরব। লেডি মুরাসাকি নামক একজন মহিলা ছিলেন, যিনি আজ থেকে একহাজার বছর আগে চমৎকার একটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। কিন্তু ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ডে যখন নাট্যকার এবং কবিগণ তাদের সৃষ্টিকর্মরত তখন সেখানকার নারী সমাজ একেবারেই নীরব ভূমিকা পালন করেছে শিল্প। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে পরবর্তীকালে অর্থাৎ, অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে এবং উনবিংশ শতকের শুরুতে সেখানকার নারীরা ব্যাপকহারে লেখালেখির কর্মে এগিয়ে আসে। 

মাঝখানে অষ্টাদশ শতাব্দীতে নারীদের এই নিরবতার জন্য দায়ী করেন আইন-কানুন, রাজনীতি এবং ধর্মীয় বাঁধাকেই।একজন লেখকের লেখার মূল উপাদানই হচ্ছে তার চারপাশের পরিবেশ। যেমন কনরাড যদি নিজে নাবিক না হতেন তাহলে উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলি তার লেখাতে ধরা দিত না।টলস্টয় সৈনিক ছিলেন এ জন্য যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন আর ধনীর সন্তান হিসেবে তিনি সমাজের সর্বস্তরের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। আর এই দুইয়ের সফল প্রকাশ ঘটে তার লেখা ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এ। যুদ্ধ ও জীবন সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকলে এ উপন্যাস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হত৷ কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে এটি সম্ভব নয়, উনবিংশ শতকের উপন্যাসে স্বাভাবিক ভাবেই লিঙ্গগত বৈষম্য, জীবন অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত থেকেছে তাই এর স্পষ্ট ছাপ দেখা যায় নারী ঔপন্যাসিকদের ক্ষেত্রে। আর প্রতিনিয়তই নারী সাহিত্যিকদের সমাজিক অনেক বাঁধা অতিক্রম করতে হয়েছে। জর্জ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই যখন প্রেমিক লুইসের সাথে থাকতে শুরু করলো তখন এটা নিয়ে পুরো সমাজ অশ্লিল অশোভন কথা রটাতে থাকে। শেষে বাধ্য হয়ে তিনি একটি মফস্বল শহরের নির্জন এলাকায় বাস করা শুরু করে। সমসাময়িক পুরুষ লেখক টলস্তয় নানা পেশার নারী-পুরুষের  সাথে মেলামেশা করেছেন, কেও তার বিরুদ্ধে কোন খারাপ কিছু বর্ণনা করেনি, নিন্দাবাদও জ্ঞাপন করেনি, আর সেই অভিজ্ঞতায় তাকে উপন্যাসের গভীর ভাবব্যঞ্জনায় দীপ্ত হতে সাহায্য করেছে। 

আমরা যদি এখন ভার্জিনিয়ার Orlando : A Biography উপন্যাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো এখানকার কেন্দ্রীয় চরিত্র অরল্যান্ডো ব্রিটেনের একজন সরকারী কর্মকর্তা, একসময় সে নিজেকে নারী ভাবতে শুরু করে এবং জেন্ডার চেইঞ্জ করে নারীতে পরিণত হয়। এক সময় সে অন্য একজন নারীর প্রেমে পরে। একটি সমকামী উপন্যাসে রূপ নেয়। ঐ সময়টাতে ইংল্যান্ডে সমকামিতা অবৈধ ছিলো এবং সমকামিতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।  ঐ প্রতিকূল সময়টাতেও দারুণ সাহসিকতার সাথে তিনি সমকামিতা এবং ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে লিখেছেন। সমানে লিখেছেনে নারীদেরকে নিয়েও। ভেবেছেন কেন নারীরা সাহিত্যে পুরুষের সমান অবদান রাখেনি৷ এসবই কী সম্ভব হয়েছিলো তার উভকামী স্বত্তার কারণে! ২০ বছর বয়সে তিনি একটি কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। Orlando : A Biography উপন্যাসটা লিখেছিলেন ভিটা স্যাকভিল এর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। এই সম্পর্কে ভিটা স্যাকভিল ওয়েস্টের পুত্র নাইজেল নিকেলসন বলেন 

 “the longest and most charming love letter in literature, in which [Virginia] explores Vita, weaves her in and out of the centuries, tosses her from one sex to the other, plays with her, dresses her in furs, lace and emeralds, teases her, flirts with her, drops a veil of mist around her.”

ভার্জিনিয়া তার লেখার মধ্য দিয়ে মানব হৃদয়ের দুর্গম রহস্যের জটিল দিকটার স্বরূপ তুলে এনেছিলেন।

তথ্যসূত্র: 

১) https://www.brainpickings.org/2013/10/11/virginia-woolf-orlando-lesbian-readings/

২) https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://www.brainpickings.org/2016/07/28/virginia-woolf-vita-sackville-west/&ved=2ahUKEwjwlpeZicDpAhUe63MBHUExBlwQFjAdegQIDxAB&usg=AOvVaw3heX8_yMRE5lzpeqSa4As7

৩) https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://www.britannica.com/biography/V-Sackville-West&ved=2ahUKEwjwlpeZicDpAhUe63MBHUExBlwQFjAeegQIDBAB&usg=AOvVaw3caOT13oDgwwdlkYJZ4SPM

৪) https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://www.bookdepository.com/Women-Fiction-Virginia-Woolf/9780631180371&ved=2ahUKEwi-9P7rp8XpAhWBcn0KHS7rDr0QFjACegQIBhAB&usg=AOvVaw2DxaTYTvSNbXSRWeM9_lGk

প্রথম প্রকাশঃ ঠাহর (প্রথম সংখ্যা)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.