কোতি সমাচার

লিখেছেনঃ কান্তিপরীন্দ্র

মানুষের সবচেয়ে পুরনো ঠিক কত বছর বয়সের স্মৃতি মনে থাকে? ২?৩?৪? ভাসাভাসা ভাবে আমার ৪, ৫ বছর বয়সের কিছু স্মৃতি মনে পড়ে। পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার সেই বাসা, বাসার ছাদের বিকেল বেলা, পাশের বাসার বন্ধু তন্ময়ের সাথে আমার খেলাধুলা। দুই তলার শান্তা, তিন তলার বীথি বা পাঁচ তলার বিন্নী আপু। আরও একটা বিষয় আমার স্মৃতিতে প্রকট। পুরুষ মানুষদের প্রতি আমার তীব্র আকর্ষণ। কোন বড় ভাইয়া বা কোন পুরুষ আত্নীয় যদি বাসায় বেড়াতে আসত, তবে তার প্রতি পরবর্তী কয়েকটা দিন ধরে অনুভব করা আমার এক চরম নিষিদ্ধ শারীরিক মোহ। ঐটুকু ছোট বয়সে কি যে রোমাঞ্চকর সেই অনুভূতি তা বলে বোঝানো যাবে না। আরও একটি প্রবল সুখকর স্মৃতি আমাকে খুব আনন্দ দেয়, প্রতিদিন দুপুরে আম্মুর  ঘুমের ফাঁকে ড্রেসিং টেবিল এর সামনে গিয়ে আমার সেই সাজগোজ। রং বেরং এর চুড়ি, সাজ প্রসাধনী…একটু খানি লাল লিপস্টিক। আম্মুর ওড়না কোমরে পেঁচিয়ে শাড়ি পরার অনুকরণ করার চেষ্টা। সেই বয়সে এগুলো কোন কিছুই অস্বাভাবিক বলে ঠেকেনি আমার কাছে।

৫০ এর দশকের আমেরিকান সাইকোলজিস্ট কিন্সের প্রস্তাবিত সেই সেক্সুয়াল স্পেকট্রাম এর কথাই বলি বা হালের নানা সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশনের স্টাডির কথাই বলি, অনেক স্টাডিই দাবী করে থাকেন যে মানুষের যৌনতা বিচিত্র, ফ্লুয়িড, পরিবর্তনশীলও বটে। নারী পুরুষের সম্পর্কের বিষয়টি যদি সামাজিক ভাবে আমাদের উপর চাপানো না হতো,তবে একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষেরই লিঙ্গ বিচার নির্বিশেষে অবাধ যৌনতা উপভোগ করার কথা। সেই হিসাবে পপুলেশনের একটা বিশাল অংশটাকে বাইসেক্সুয়াল টেন্ডেন্সি, বা বাইসেক্সুয়াল রোমান্টিক সম্পর্কের আধারের কাতারে ফেলা যায়। আমেরিকার বিখ্যাত Cornell University’র এক রিসার্চ তো আরেক ধাপ এগিয়ে এটাও দাবী করে যে “we all are bisexuals”. মাঝে মাঝে আমার অবশ্য মুচকি হাসি পায়। যৌনতা ফ্লুয়িড তা বুঝে নিতে পারলেও এই ২৬ বছরের জীবনে একটা বিষয় খুব ভালভাবে আমার বোধগম্য হয়েছে, তা হল  সেক্সুয়াল ফ্লুইডিটি নিয়ে আমার নিজ অভিজ্ঞতা। দুনিয়াতে অন্তত একজনকেও শতভাগ সমকামী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, তবে আমি চোখ বুঝে সেই কাতারে আগ বাড়িয়ে দাঁড়াব(পাছে অন্য কোন সমকামী বন্ধু এসে আমার জায়গাটি আবার মেরে দেয়)। নারীঘটিত অভিজ্ঞতা যে আমার হয়নি তা বলা যাবে না, বেশ কিছুবারই হয়েছে। তবে সেই স্মৃতি মনে হলে আজও শিউরে উঠি। বাবাগো, নারী দেহকে যৌনতার কোন মাধ্যম হিসেবে আমি ভাবতেই পারি না। নারীর তুলনায় যেন কোন কোন জড়বস্তুর প্রতিও আমি যৌনগতভাবে বেশি আকর্ষিত হই, এই ধরুন যেমন কলা, বা বেগুন, সেটাও নারী দেহের থেকে থেকে আমার কাছে বেশি যৌনাবেদনময়। কাকতালীয় ব্যাপার? আমার তো মনে হয় না। তো মাঝে মাঝে সেইসব সাইকোলজিস্টদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে মন চায় যারা খুব গম্ভীর ভাবটা নিয়ে বলেন,”হ্যাঁ, আমরা সবাই বাইসেক্সুয়াল”। তাদের কে বলতে ইচ্ছা করে,”তো বাপু আমাকে তোমাদের মানুষ মনে হয় না নাকি? একজন নারীকে সামনে এনে দেখাও না আমার যৌনাঙ্গখানা উত্তেজিত করে।”

আমার ব্যক্তিত্বের আরেকটি খুব উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আমার মধ্যকার সুপ্ত নারীসুলভ আচরণ। ছোটবেলায় মায়ের সাজ পোশাক দিয়ে নিজেকে মাধুরী বা জুহি চাওলায় রূপান্তরের সেই প্রাণান্তকর চেষ্টার কথাতো আগেই উল্লেখ করেছি। না, পরিপূর্ণভাবে নারী হবার বাসনা আমার কোনদিন হয়নি। তবে এই পুরুষ দেহখানাকেই কিছুক্ষণের জন্য নারী দের সাজপোশাকে মুড়ে নিয়ে কি যে এক অদ্ভুত আনন্দ পেতাম আমি(তা এখনও জারি আছে বটে)। শৈশবের গণ্ডি পেরোনোর পর অবশ্য আমার সেই সুযোগে ভাটা পড়ে। মীনার মত আমার কৈশোরে কোন হ্যান্ডসাম দৈত্য এসে জিজ্ঞেস করেনি আমি সিনেমার নায়িকা হতে চাই কিনা, তবে আমাকে যদি সেই অফার দেয়া হত মীনার মত বোকামি আমি করতাম না। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার তুলনায় সিনেমার নায়িকা হিসেবে নিজেকে দেখতে পারাটাই আমার কাছে বেশি সার্থক বলে মনে হয়েছে সবসময়। তবে আমার এই নারীসুলভ নমনীয়তা আমার কৈশোরে যে কি পরিমাণ ভুগিয়েছে তার গীত গেয়ে শেষ করা যাবেনা। স্কুলের সবচেয়ে বেশি বুলি হওয়া হোঁৎকা ছেলেটাও বেঞ্চে গিয়ে বসার সময় ‘হাফ লেডিস’ বলে আমার মাথায় একটা টোকা দিয়ে যেতে ভুলত না। লাল বা গোলাপি রঙের জামা যদি আমি ভুলেও কখনো পরে ফেলতাম, তবে সেদিন তো আর রক্ষে নেই। শিক্ষকরা পর্যন্ত আমার দিকে তাকিয়ে একচোট হেসে নিতেন। তাতে অবশ্য আমার বয়েই যেত। সারা বছর সেই জেরে খুব করে পড়াশুনা করে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর আমাকে টিজ করা সেই ছেলেদের দিকে তাকিয়ে উপহাসের হাসিটা আমিই হাসতাম,”হেহ…এই নাম্বার পেয়ে আবার আমাকে হাফ লেডিস বলে খোঁটা দিতে আসিস?আমার মত হাইয়েস্ট পেলে আসিস কথা বলতে”। তবে এসবের আড়ালে নিজের এই ফেমিনিনিটিকে আমার কাছে সবসময় এক চরম দুর্বলতা হিসেবেই মনে হত। সবার সামনে বুক উঁচিয়ে “হ্যাঁ আমি এমনি সই” বলা আমি বাথরুমের আড়ালে গিয়ে কাঁদতে বাদ সাধতে পারতাম না। সবসময়ই নিজেকে মনে হত কোন না কোন ভাবে ডিফেক্টেড।

অবশেষে ১৬ বছর বয়সে কনসাস ভাবে আমার মেনে নেয়া হল যে আমি একজন সমকামী। প্রথমদিকের বছর গুলোতে তার প্রভাব ছিল ভয়ংকর। হায় হায়, আমার মত পাপী কি এই দুনিয়ায় আর একটিও আছে? পরে অবশ্য আরও ৫/১০ জন সমকামী বন্ধু জোগাড় হওয়াতে নিজের প্রতি সেই হীনমন্যতা আস্তে আস্তে কেটে যাওয়া শুরু হয়েছিল। ক’বছরের মাঝে তো একজন আস্ত খাসা টক্সিক মাসকুলিন টপ বয় ফ্রেন্ড বাগিয়ে ফেললাম। সে কি শিহরণ আমার অন্তরে। সমকামী সত্তার স্বীকৃতি আমার মিলল, তবে সেক্ষেত্রেও আমায় নাক মুখ ফুলিয়ে জোর করে একদম ঠাঁটানো পুরুষ হতে হত। সমকামী কমিউনিটির মাঝে নারীসুলভ আচরণের প্রতি কেমন এক ছ্যা ছ্যা মনোভাব আমি দেখতে পেয়েছিলাম শুরু থেকেই। কত মানুষ তো যুক্তিই দেখান ”তা বলি পুরুষের নারীসুলভ নমনীয়তাকেই যদি মেনে নেব তবে আর সমকামী হয়েছি কেন? তাহলে তো বিষমকামী হয়ে নারীর কাছেই যেতে পারতাম”। সবাইকে আরও কয়েক ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেত আমার সেই টক্সিক ডম টপ(শিহরণ) বয় ফ্রেন্ড। যদি ভুলেও কোনদিন তার সামনে কোমরটা একবার বাঁকা হয়েছে বৈকি, পারলে আমাকে ঠ্যাঙাতো। তো বয়ঃসন্ধিকালের অমন ভঙ্গুর মানসিকতায় আমার চারপাশের এই মানসিকতাকেই আমার যেন স্বাভাবিক মনে হত। নিজের উপর জোর করে চাপাতাম ‘হ্যাডানো পুরুষ’ হবার চেষ্টা। 

এই কাহিনীতে মোড় নিলো আমার মাঝে সমকামী যৌন পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবার বহু বছর পর। ততদিনে কিছু কিছু সমকামী বন্ধু আমার একেবারে দৈনন্দিন জীবনের পারিবারিক অংশে পরিণত হয়েছে। পাঁচ বছর ধরে দু’দুটা প্রেমের সম্পর্কের নিকুচি করে ততদিনে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এমন ঠুনকো প্রেম আর না, ক্যারিয়ারে ঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে একবারে বিয়ের জন্য ছেলে দেখা আরম্ভ করব। জীবনের এমন সময়ে আমার পরিচয় হল কিছু অতীব নারীসুলভ বন্ধুর সাথে। তারা এ জীবনে যে নতুন ধর্মের খোঁজ আমায় দিলো, তার সন্ধিক্ষণের কথা ভাবলে এখনো আমার নাজুক পরাণ কেঁপে কেঁপে ওঠে। হ্যাঁ, এই নতুন বন্ধুদের হাত ধরে সেই জীবনধর্মের দীক্ষা আমি নিলাম, সেই স্বর্গীয় ‘লাহা লাহা’। নিজের এক নতুন পরিচয় আমি খুঁজে পেলাম, ‘কতি’। সমকামী কমিউনিটিতে, আসলে বৃহত্তর এলজিবিটিকিউআই+ কমিউনিটিতে নমনীয় বা নারীসুলভ সমকামীরা, রূপান্তরকামী, এমনকি হিজরা জনগোষ্ঠীর একত্রিত হয়ে যে অনানুষ্ঠানিক হাস্যরসাত্নক  উদযাপন,আড্ডা ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ তাকেই আপাতভাবে লাহা লাহা বলে সম্বোধন করা যায়। এবং খুবই নারীসুলভ, নমনীয় সমকামী গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে সম্বোধন করা যায় ‘কতি’ হিসেবে।

আমার লাহা লাহার হাতেখড়ি মূলত কিছু এলাকাগুলোতে। এই লাহা লাহার উদযাপনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হল হিজরা জনগোষ্ঠীর ব্যবহার করা উল্টি ভাষা। লাহা লাহা বা কতি, দুটো শব্দই এসেছে হিজড়া আপাদের মাঝে বহুল প্রচলিত উল্টি নামক এক কোড ল্যাঙ্গুয়েজের হাত ধরে। তো এই লাহা লাহার সাথে পরিচয় হবার পর এবং নিজের কতি পরিচয় খুঁজে পাবার পর দেখা যেত প্রায়ই কতি বন্ধুদের সাথে এ পাড়া, সে পাড়ায় আমার চষে বেড়ানো হত।  ৬/৭ জন কতি বন্ধুরা এক হয়ে টিএসসির চায়ের দোকানে, কোমর বাকিয়ে, হাতে তালি দিয়ে, কানের কোনায় ফুল গুঁজে, গলা ছেড়ে ‘চোলি কি পিছে’ গান গেয়ে নাচের ভঙ্গিমায় থাকাকালীন আমি মাঝে মাঝে নিজের ভেতরের সেই ছোট বেলায় খুঁজে বেড়ানো মাধুরীর দেখা পেতাম। এই লাহা লাহার মাধ্যমে নিজের প্রতি, নিজের নমনীয়তার প্রতি, নিজের ফেমিনিন আচরণের প্রতি যে ভালবাসা, যে গ্রহণযোগ্যতা  আমি খুঁজে পেলাম তার ভাষিক প্রকাশ আমার পক্ষে সম্ভব না। কমিউনিটির মাঝে আজও অনেককেই আমি নাক সিটকাতে দেখি এহেন নারীসুলভ (উল্টি ভাষানুযায়ী ‘ছল্লা ভাঙা’) আচরণের প্রতি। সমপ্রেমী ডেটিং প্ল্যাটফর্ম গুলোতেও আমি বহু মানুষকে উল্লেখ করতে দেখি “মেয়েলি ছেলেরা দূরে থাক”। অনেকের ভাব এমন যেন কতি ছুলে তার জাত যাবে, পরে গঙ্গায় দুটো ডুব দিয়ে নিজের পুণ্যি উদ্ধার করে নিতে হবে পুনরায়। তবে চারপাশে যা কিছুই ঘটুক, নিজের এই পরিচয়ে আমার আর কোন সমীহা হয় না। নিজেকে আমি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খুব ভালভাবে চিনেছি, ভালবেসেছি। নিজেকে এখন আর ডিফেক্টেড মনে হয় না। নিজের নারীত্বের প্রকাশ যেমন মেনেছি তেমনি নিজের ভেতরের খুব প্রবল এক পুরুষ সত্তাকেও আমি খুঁজে পেয়েছি। নিজেকে এসব সামাজিক আচরণের স্টেরেওটাইপের দোলাচলে আর বাঁধি না আমি। যখন আমার কোন পুরুষালী আচরণ প্রকাশ পায় তখনও আমি নিজেকে ভালবাসি, আবার যখন কোন কতি বান্ধবী এসে “আ লো মাসী” বলে আলিঙ্গন করে তখন দু’হাত তুলে কোমর নাচানো আমাকেও আমি ভালবাসি। আজ আর কাউকে সামনে এসে আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টার সুযোগ আমি দেই না। কবছরের জন্য পৃথিবীতে এসেছি, বাঁচার মত বাঁচব, গর্ব নিয়ে বাঁচব। খুব তোরজোড় বেধে ‘সুশীল’ চরিত্রে অভিনয় করার চেষ্টা করা কমিউনিটির একটা অংশ যেন আবার আমাদের কতি হতে দেবে না। চোখ বাকিয়ে ‘পুরুষ মানুষের’ এহেন ছল্লা লহরি তাদের বদহজম ঘটায়। আবার বলি, তাতে আমার বয়েই গেছে। ঠিকই কতি বন্ধুদের সাথে নিয়ে কোন ভোজপুরি গানের তালে আকাশে মাথাখানা উঁচিয়ে চিৎকার করে আমি বলবই “আমি কতিইইইইইইই……”

তথ্যসূত্র : 

১) https://journals.plos.org/plosone/article?id=10.1371/journal.pone.0040256

২) https://news.cornell.edu/stories/2012/08/study-finds-pupil-dilation-reveals-sex-orientation

প্রথম প্রকাশঃ ঠাহর (প্রথম সংখ্যা)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.