ট্রান্সম্যান হিসেবে জীবনকে যেভাবে দেখছি

ন্যারেটিভ : লিওন খান

আমি ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের মতো পোশাক পরতাম চুল ছোট রাখতাম কারণ আমার পরিবার আমার এই প্রকাশভঙ্গি নিয়ে কখনো বাধা দেয়নি।

আমার ভালো লাগতো ছেলেদের মতো চলা ফেরা করতে কিন্তু এটার কারণ কী সেটা জানতে পারি অনেক পরে, যখন আমি এসএসসি পাস করি তখন বুঝতে পারি যে আমার জন্য আসলে ছেলেদের রুপটাই পার্ফেক্ট আর সেভাবেই রোল প্লে করতে থাকি।সেই হিসেবে আমার এই প্রকাশভঙ্গীর জন্য আমার পরিবার কোন ঝামেলা করেনি।  ততটুক সময় সব ঠিক  ছিলো পরিবারে কিন্তু আমি যখন বড় হই আমার মা আমাকে চুল বড়ো রাখার জন্য অনেক বকাঝকা করতেন। 

আমার বন্ধু মহলে আমার আইডিন্টিটর জন্য অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। 

আমার প্রকাশভঙ্গি এবং পরিবর্তনের বিষয়টা বেশির ভাগ বন্ধুই মেনে নিতে পারেনি। এমনকি এখনো পারেনা। তারা আমার গেট-আপ চুল এসব নিয়ে অমেক ঠাট্টা মস্করা করতো। এমনও বলে যে আমার কোথাও সমস্যা আছে ডাক্তার দেখাতে হবে,  আবার এটাও বলে বিয়ে করে ফেলতে। বিয়ে করলে নাকি সব ঠিক হয়ে যাবে। একটা স্বাভাবিক মেয়ে হয়ে চলার কথা বলে খোঁচা দেয়। আমার এসবে অনেক কষ্ট লাগে, তখন সবাইকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। আমার যে সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে যখন বলি আমি ফিজিক্যাল ট্রান্সফরমেশন করতে চাই তখন সে আমাকে নাস্তিক বলে তাচ্ছিল্য করেছে।  আরো নানান ভাবে অপমান করত। আমি আমার কমিউনিটিতে মিশতে গেলে আমাকে হিজড়া বলতো। 

আর এগুলাই ছিলো আমার বন্ধুদের আমার সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া। 

এখন আমি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা থাকি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার প্রকাশভঙ্গী নিয়ে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি এবং এখনো হচ্ছি।

আমি একটা মহিলা কলেজে পড়ি, সেই সুবাদে আমাকে প্রতিদিন ক্লাস এ যেতে হতো। প্রতিদিন আমাকে কলেজে ঢোকার সময় অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে  হয়েছে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই। তারা আমার চাল চলন প্রকাশভঙ্গী দেখে বলতো এভাবে আসলে পরে আর কলেজে ঢুকতে দিবে না,  মেয়ে হয়ে জন্মেছি তাই একটা মেয়ের মতো হয়েই যেন কলেজে আসি। শিক্ষকরা বলতো যেন চুল বড় করি, লিপিস্টিক দিই, ওড়না পরি। এগুলো করলে আমাকে আর কোন ঝামেলায় পড়তে হবে না৷ একদিন আমার পরীক্ষা চলছিলো, আমাকে ৩০ মিনিট পরীক্ষার হলে ঢুকতে দিচ্ছিলো না কারণ আমি প্যান্টশার্ট পরে কলেজে যাই বলে। 

রাস্তা ঘাটে চলা ফেরার সময়ও অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। মাঝে মাঝে মানুষ এমন ভাবে তাকায়ে থাকে যেন এলিয়ান দেখছে। আর আমি যখন কথা বলি বা আমার ভয়েসটা এখনো মেয়েদের মতোই এখনো ট্রান্সফর্মে যাইনি, তখন অজেকে ভয়েস শুনে নানা বাজে মন্তব্য করে৷ অনেক সময় হিজড়াও বলে বসে৷ পাবলিক টয়লেটে যাবার ক্ষেত্রে এখনো তেমন কোন সমস্যার সম্মুখীন হইনি। 

আমি এখন আমার কমিউনিটি নিয়ে তেমন কোন কাজ করার সুযোগ পাইনি,  পেলে অবশ্যই করবো কারণ আমি আমার কমিউনিটিকে অনেক ভালোবাসি৷  তবে কিছু সংগঠনের কাছ থেকে বেশ কিছু ট্রেনিং, ওয়ার্কশপ আর প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছি। অনেকে আমাকে টম বয় ভাবে। কিন্তু টমবয় আর ট্রান্সম্যান এক জিনিস না। যদিও আমি এই বিষয়ে খুব বেশি জানিনা। আমি যতটুকু জানি একজন ট্রান্সম্যান হলো যে নারীর শরীর নিয়ে জন্মায় কিন্তু তার চলা ফেরা পুরুষের মতো এবং সে নিজেকে একজন পূর্ণাঙ্গ পুরুষ রুপে দেখতে চায়। আর টমবয় হলো একটি মেয়ে তার ছেলেদের মতো অঙ্গ সজ্জায় চলতে পছন্দ করে তবে সে নিজেকে একজন মেয়ে বলেই দাবি করে।  

আমার জীবনেও প্রেম এসেছে। আমার একটা বিষমকামী মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিলো চার বছর ধরে। আমি যখন তাকে বলি আমি ট্রান্সফরমেশন করাতে চাই তখন থেকে সে আমাকে এড়িয়ে চলে। সে বিয়ে করবে, তার পরিবার আছে, এসব করা পাপ বলে আমার সঙ্গে রিলেশন শেষ করে দেয়। 

আমি একটা সময় খুব ডিপ্রেশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন খুব আত্মহত্যা প্রবণ হয়ে গেছিলাম। চেষ্টা করতাম আত্মহত্যা করার জন্য কিন্তু আবার নিজেকে নিজেই বুঝাতাম আত্মহত্যা করে কি হবে, সবই তো শেষ হয়ে যাবে। আমি তো আর নতুন করে জন্ম নিবো না।দেখতে থাকি সামনে কি আছে আমার জন্য। আমি এখনো কোন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাইনি কিন্তু আমি শুনেছি আমাদের দেশে তাদের কাছ থেকে ভালো কোন ফলাফল পাওয়া যায়নি আইডিন্টিটি ক্রাইসিসের জন্য। উল্টা তারা ঘুমের ঔষুধ দেয় আর বিভিন্ন ফোবিয়া বলে কাটায়ে দেয়।     

আর হ্যা আমি ট্রান্সফরমেশন করাতে চাই কিন্তু সেটা খুব এক্সপেনসিভ ইস্যু, আমার এখন সেই সামর্থ্য নাই। আমার ক্যারিয়ারটা ভালো ভাবে তৈরি করতে পারলে তারপর আমি ট্রান্সফরমেশনে যাবো, যদি বেঁচে থাকি।  

প্রথম প্রকাশঃ ঠাহর (প্রথম সংখ্যা)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.