অকামিতা

সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন (Sexual Orientation) কথাটা আমরা আজকাল হরহামেশাই শুনি। বাংলায় অনুবাদ করলে এটাকে সহজ ভাবে বলা যায় “যৌন কামনার প্রকার” হিসেবে। সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন নিয়ে কিছু হাল্কা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি।

ঐতিহাসিক ভাবে মুলতঃ দু’টি সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের সাথে আমরা পরিচিত, হোমোসেক্সুয়াল (Homosexual) বা সমকামী, এবং হেটারোসেক্সুয়াল (Heterosexual) বা বিসমকামী। এর বাইরে সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন স্পেক্ট্রামে আরো আছে বাইসেক্সুয়াল (Bi-sexual), প্যান্সেক্সুয়াল (Pansexual), ও এসেক্সুয়াল (Asexual) সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন।

হেটারোসেক্সুয়ালিটি (Heterosexuality) : এটা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণ। বিসমকামীরা নিজের সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি সাধারণতঃ কোন যৌন আকর্ষণই বোধ করেনা।

হোমোসেক্সুয়ালিটি (Homosexuality) বা সমকামিতা : সমকামী বললে আজকাল আমরাও চিনে যাই সহজেই। এই সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশনের মানুষেরা আকৃষ্ট হয় কেবল মাত্র সমলিঙ্গদের প্রতি অর্থাৎ একজন পুরুষ যৌনকামনা অনুভব করে আরেকজন পুরুষের জন্য এবং একজন নারী যৌনকামনা অনুভব করে কেবল একজন নারীর জন্য। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তাদের সাধারণতঃ কখনোই কোন যৌন আকর্ষণ থাকেনা। কিন্তু কিছু সমাজে, (বিশেষতঃ ধর্ম ভিত্তিক সমাজে) যেহেতু সমকামীতা নিষিদ্ধ হিসেবে দেখা হয়, দেখা যায় অনেক সমকামীই পুরোটা জীবন কাটিয়ে দেন নিজের প্রকৃত যৌন কামনাকে অবদমিত করে। একটা ছোট তথ্য, এই অবদমিত সমকামিতা অর্থাৎ Repressed Homosexuality কে ধরা হয় Homophobia অর্থাৎ সমকামীভীতির অন্যতম কারণ হিসেবে। ঐতিহাসিকভাবে প্রায় সব অগ্রসরমান সভ্যতা যেমন মেসোপটেমিয়ান সভ্যতা, রোমান সভ্যতা এবং ওটোমান সাম্রাজ্য, সমকামিতাকে মেনে নিয়েছিলো বিসমকামিতার মতোই স্বাভাবিক হিসেবে।

বাইসেক্সুয়ালিটি (Bi-sexuality) বা দ্বিকামিতা: একজন বাইসেক্সুয়াল ব্যক্তি নারী অথবা পুরুষ, যে কারো প্রতিই যৌন কামনা অনুভব করতে পারেন।বস্তূতঃ একজন মানুষ একইসাথে সমকামী এবং বিসমকামী হলেই কেবল তাদেরকে দ্বিকামী (bi-sexual) বলা হয়। 

প্যান্সেক্সুয়ালিটি (Pansexuality): এর কোন ভালো বাংলা নেই। আমাকে নিজে থেকে করতে দেয়া হলে আমি বলবো লিঙ্গ নিরপেক্ষ যৌনকামনা। প্যানসেক্সুয়ালদের সাথে বাইসেক্সুয়ালদের পার্থক্য হচ্ছে, প্যানসেক্সুয়ালদের জন্য পার্টনারের পুরুষ বা নারী হওয়াটা জরুরী না, তারা তৃতীয় লিঙ্গের হোক, কিংবা তাদের কোন নির্দিষ্ট লিঙ্গ না থাকুক (Gender Fluid) , তাদের প্রতি একজন প্যান্সেক্সুয়াল মানুষ যৌন কামনা বোধ করতে পারেন। প্যানসেক্সুয়ালিটিকে তাই বাইসেক্সুয়ালিটির একটি বিশেষরূপ হিসেবে ধরা হয় অনেক সময়।

বাইসেক্সুয়ালিটি এবং প্যানসেক্সুয়ালিটি এই দু’টোকেই অনেকাংশে সমকামিতার চেয়েও বেশী ট্যাবু হিসেবে দেখা হয়। যেই কারণে বাইসেক্সুয়াল এবং প্যানসেক্সুয়াল মানুষের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম দেখা যায়। 

যেটা নিয়ে বলা দরকার সবচেয়ে বেশী, এসেক্সুয়ালিটি (Asexuality) : 

ধরুন একজনের নাম সাবিহা, সাবিহা খুব ভালো মেয়ে, একদম ট্রাডিশনাল ভালো মেয়ে যাকে বলে। বাবা-মা’র বাধ্য, কখনোই প্রেম করেনি, যখন থেকে তার নিজের যৌনতার ব্যাপারে তার ধারণা এসেছে, সে নিজেকে রক্ষা করে চলেছে। সে একজন বিসমকামী নারী। পড়াশোনা শেষ করে সাবিহা একটা ভালো চাকরি করছে এখন, বাবা-মা বিয়ে দিচ্ছেন। সাবিহাও বিয়ে করতে অনেকটাই উদগ্রীব। তার বয়স এখন ২৪, তার বিবাহিত বান্ধবীদের খোলামেলা বর্ণনা শুনে সে নিজের বিবাহিত জীবন নিয়ে অনেকটাই আশাবাদী। তার বিয়ে ঠিক হলো জাভেদের সাথে, জাভেদ একটা ব্যাংকে চাকরি করে, বাবা-মা তাকে বিয়ে দিতে অতি আগ্রহী। কিন্তু জাভেদের আসলে সেদিকে ইচ্ছে নেই। শেষ-মেষ তার মা এর লাস্ট স্টেজ ক্যান্সার ধরা পড়লে মৃত্যুশয্যায় তাকে ইমোশনাল ব্ল্যাক্মেইল করেই সাবিহার সাথে বিয়েতে রাজী করানো। 

বিয়ের পর বাসররাতটা ঢাকাতে থেকেই সাবিহা আর জাভেদ রওনা দিলো ভারতে, শাশুড়ীকে ভেলোরের হাসপাতালে দেখে তারপর ভারতেই তারা হানিমুন করবে, এটাই হচ্ছে ইচ্ছে। সাতদিন পর তারা দেশে ফিরতেই, সাবিহা নিজের বাড়ীতে ফেরত এলো। যদিও কোন কথা হয়নি, কিন্তু তার মা-বাবা বুঝতে পারলেন কিছু একটা ভুল হচ্ছে। কিন্তু সাবিহার মুখ থেকে কিছু বের করা গেলোনা। সাবিহা আর জাভেদ আলাদাই থাকে, জাভেদ মাঝে মাঝে এসে শ্বশুর-শাশুড়ীর সাথে দেখা করে যায়, কিন্তু সাবিহার সাথে রাত কাটাবার কোন আগ্রহ দেখা যায়না তার মধ্যে। দু’মাস পরে, জাভেদের মা মারা গেলেন, খবর এলো। তার পরেরদিনই সাবিহা বাবা-মা’কে তালাকপত্র দেখালো, দেড়মাস আগের তারিখেই সই করা। অনেক চাপাচাপির পর সাবিহা যেটা বললো, সেটা হচ্ছে, “জাভেদ আমার প্রতি কোন আকর্ষণই বোধ করেনা, ও কারো প্রতি কখনোই কোন যৌন আকর্ষণ বোধ করেনি। এমনকি ওর কোন ছেলের প্রতিও এই ধরণের কামনা নেই। যৌন কামনা যে কি, এটাই ও জানেনা। ও আমার কাছে ওর মা বেঁচে থাকাতক সময় চেয়েছিলো। তাই আমি ওকে দিয়েছি।”

Asexuality হচ্ছে অকামিতা, অর্থাৎ কিনা কোন ধরণের যৌন কামনাই বোধ না করা। এসেক্সুয়াল ব্যক্তিরা কিন্তু যৌন ভাবে অক্ষম নন, তাদের শুক্রাণু অথবা ডিম্বাণুর উৎপাদন থাকে স্বাভাবিক। তারা কেবল যৌন কামনা কখনোই অনুভব করেননা, সুতরাং স্বাভাবিক উপায়ে কারো সাথেই যৌন সঙ্গম করতে পারেন না। 

জাভেদের মতো এসেক্সুয়াল মানুষের সংখ্যা কিন্তু আমাদের মাঝে কম নয়। জাভেদ পুরুষ দেখে এবং অপেক্ষাকৃত ভালো মানুষ হয়তো সাবিহা খুব সহজেই এইরকম একটা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। একটা এসেক্সুয়াল মেয়ের জন্য কিন্তু এই ধরণের বিয়ে থেকে কখনোই বেরিয়ে আসা সাধারণতঃ সম্ভব হয়না। বস্তুতঃ তাদেরকে আজীবন যৌন সঙ্গম নামের একটা নির্যাতন সহ্য করে যেতে হয়। আর যদি স্বামী এসেক্সুয়াল হয় তবে, প্রায় একই ধরণের কষ্ট মেনে জীবন চালাতে হয় তাদেরকে। আমাদের মতো পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাই একটা বিয়েতে যেই এসেক্সুয়াল হোকনা কেন (যদি কেউ হয়), কষ্টটা মেয়েটাকেই করতে হয়।

*অসংখ্য বানান ভুল এবং বড় পোস্টের জন্য দুঃখিত।

Source: BAH ( Bangladesh Against Homophobia)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.