আমাদের গল্প

ও সবসময় বলে, “এইযে এত এত গল্প লিখো, আমাদের গল্পটা কবে লিখবে?”

আমি হাসি। বলি, “লিখব কোন একদিন।”

গল্পের শুরুটা অতি সাধারণ। কোনো এক নিঃসঙ্গতার রাতে আমি যখন সেই একজনকে খুঁজে যাচ্ছি, পাতার পর পাতা ওল্টাচ্ছি, মানুষের পর মানুষ খুঁজে যাচ্ছি অজস্র ফেইক আইডির ভিড়ে, হঠাৎ আমার কাছে আরেকটা ফেইক আইডি হয়েই ও এল। এরপর ছোট একটা পদক্ষেপ, ‘হাই’ এর উত্তর পাবো আশা করিনি। উত্তর এল, গল্প হল, কথায় কথায় বের হয়ে এল দুজনে আছি একই পেশায়। ভালো লেগে গেল ওকে এক মুহূর্তেই। একটা মুহূর্তের জন্য মনে হল, মন যাকে খুঁজে ক্লান্ত, এই সেই মানবী।

বয়সে ও আমার চেয়ে কিছুটা সিনিয়র। সম্ভবত এই কারণেই যতবার ওকে বলতে গেছি ভালোলাগার কথা, ও পিছিয়ে গেছে। সরাসরি জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি আমার, যদি মুখের ওপর না করে দেয়! হৃদয় ভাঙার বেদনা বইবার শক্তি ও জীবনে আসার পর থেকেই হারিয়েছি। অথচ না বলেও পারছিলাম না। নিজের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ করতে করতে অবশেষে গত বছর দশমীর রাতে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানিয়ে বললাম আমার ওকে ভালো লাগে। এটা জানার পর বন্ধুত্ব নষ্ট হতে পারে জানতাম, তবু না বলে আর থাকা সম্ভব ছিল না আমার। আমার দুঃস্বপ্ন সত্যি হল। সে আমাকে সরাসরি না বলে দিল।

এরপরের দুই দিন আমার জন্য মৃত্যুসম ছিল। ভাবলাম, এই জীবনে নিজে থেকে ওর সাথে আর কোন যোগাযোগ করব না।

দুই দিন পর হঠাৎ একটা নক। ও জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছো?” সেই মেসেজ পড়ে ‘সব পেয়ে গেছি’ টাইপ একটা হাসি চলে এসেছিল ঠোঁটের কোণায়। আমি জেনেছিলাম, ও আমাকে ভালবাসবে। এরপর আমাদের গল্প চলল, চলতেই থাকল। একরাতে মুঠোফোনে শোনালাম কবিতা। কবিতা শেষে ছোট একটা মেসেজ পেলাম, “তোমার কণ্ঠে কবিতাটা আবার শুনতে চাই।” পরদিন বললাম, “আমি আপনাকে ভালবাসি।” একদিন পর ও বললো, “ভালোবাসি তোমাকে।”

পথটা খুব সহজ হয়নি যতটা গল্পে শোনাচ্ছে। আমি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের, আমার পরিবার কখনো মেনে নেবে না মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক। ও সব জেনেশুনেই এল আমার জীবনে। ওর পরিবারও মানবে বলে আমরা ভাবিনি। আংকেল আন্টিও ধার্মিক, নিয়মিত পূজা-অর্চনা করেন। কিন্তু আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে আংকেল আন্টি খুব স্বাভাবিকভাবে নিলেন আমাদের সম্পর্কটা, ঠিক আর দশটা সম্পর্কের মতই। একদিন অফিস থেকে ও ফোন করে আমাকে বলল, “আজকে বাবাকে সব বলে দিয়েছি।”

ওর পরিবারে আমি আরেকজন সদস্য। আমার পরিবারেও ও তাইই। যদিও এখন পর্যন্ত শুধু বন্ধুর পরিচয়েই থাকতে হচ্ছে তাকে। আশা রাখি, একদিন আমার পরিবারেও ওকে পরিচয় করিয়ে দেব ওর সত্যিকার পরিচয়ে।

বয়সের ব্যবধান, ধর্মের পার্থক্য, দুজনের মধ্যকার অবস্থানগত দূরত্ব, সামাজিক বাধা, সব পেরিয়ে আমরা একসাথে আছি, ভাল আছি। ভবিষ্যতে এই দেশের মানুষের জন্য, অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য, নারীদের জন্য এবং প্রাণিদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা আছে, একসাথেই।

জীবন তো একটাই, ভালবাসার মানুষকে নিয়ে না বাঁচলে জীবনের কোন অর্থ হয়?

Source: BAH ( Bangladesh Against Homophobia )

mondroadmin Avatar

Posted by

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.