
যা হবার কথা ছিলোঃ
১. টিনএইজ শুরুর কিছু বছরের মধ্যেই নিজের জেন্ডার আইডেন্টিটি ও সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন বুঝতে পারা।
২. এই সম্পর্কে জানার জন্য খোঁজখবর করা, পড়াশোনা করা, গবেষণা করা। ইন্টারনেটের কল্যাণে সেক্সুয়ালিটি, জেন্ডার আইডেন্টিটি বিষয়ক অসংখ্য প্রবন্ধ, গবেষণাকর্ম, বইয়ের অধিগম্যতা একেবারেই অনায়াসসাধ্য। ধর্মীয়, সামাজিক, বৈজ্ঞানিক, মনস্তাত্ত্বিক; বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে হোমোসেক্সুয়ালিটির পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক, তত্ত্ব-তথ্য উপস্থাপন করে হাজারো গবেষণাকর্ম হয়েছে। ইন্টারনেটের ইজি একসেস ব্যবহার করে এসব নিয়ে পড়াশোনা করে, যেটা গ্রহণযোগ্য মনে হয় সেই উৎস থেকে তথ্য ও জ্ঞান গ্রহণ করে, নিজের জেন্ডার আইডেন্টিটি ও সেক্সুয়ালিটি সম্পর্কে জেনে নিজেই নিজেকে ভ্যালিডেটেড করা।
৩. আত্মোপলব্ধি ও পড়াশোনার পর সবচেয়ে অন্ধকার যে পর্যায় আসে তা হচ্ছে নিজের প্রতি ঘৃণা, হতাশা, আতঙ্ক ও বিষাদ। এসময় উচিত নিজেকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানো নয়; বরং নিজেই নিজেকে গ্রহণ করা, আত্মস্বীকৃতি দেওয়া, নিজেকে উদ্দীপ্ত করা। ভুলক্রমেও কাম আউট না করা।
৪. আর দশজন স্ট্রেইটের মত ভবিষ্যত জীবনটা যে তুলনামূলক সহজ হতে যাচ্ছে না এটা বুঝতে পারা। যেহেতু, নিজেই নিজেকে আত্মস্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সেহেতু, জীবনটাকে স্ট্রেইটের ছদ্মবেশে না কাটিয়ে কীভাবে স্বীয় সেক্সুয়ালিটি অনুযায়ী কাটানো যায় সেই অনুযায়ী প্ল্যান করা।
৫. প্ল্যানের অংশ হিসেবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রচুর পরিশ্রম করে পড়াশোনা করা, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য অর্জন করা।
৬. পরিবার থেকে চাপ দিলে বা বিয়ের জন্য জোরপ্রদান করলে নিজের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনকে ফলো করার উদ্দেশ্যে পরিবারের বিরোধিতা করার সামর্থ্য অর্জন করা। পরিবার বা সমাজের কেউই শুরুতেই মেনে নেবে না একথা পরিষ্কারভাবে মাথায় ঢুকিয়ে নেওয়া। পরিবার ও সমাজ ত্যাগ করার মতো মনের জোর ও আর্থিক সামর্থ্য তৈরি করা। সেজন্য প্রয়োজন পড়াশোনা, রেজাল্ট ও চাকরি।
৭. রিলেশনশিপে প্রবেশ করার আগে বা পরে অপরপক্ষের জীবনের সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক ভার বহন করার মতো সামর্থ্য অর্জন করার জন্য যা কিছু করণীয় করা।
৮. শুধু উন্নততর জীবনযাপনের জন্যই নয়; সেক্সুয়ালিটি অনুযায়ী মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনবোধে দেশত্যাগ করতে করণীয় সবকিছু করা।
অথচ যা হচ্ছেঃ
১. নিজেকে বুঝতে পারা। প্রথমে টার্মিনোলজিক্যাল আইডিয়া না থাকা। পরবর্তীতে জানতে পারা।
২. অল্পবয়সেই বড়সড় একটা ক্রাশ বা সিরিয়াস প্রেমে পড়া। সেটার ধাক্কা সইতে না পেরে বিরহী হয়ে যাওয়া।
৩. যথাযথ পরিস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও ও স্বনির্ভরশীল না হওয়ার পূর্বেই কাম আউট করে বসা। ফলস্বরূপ পারিবারিক নির্যাতন ও সামাজিক বুলিংয়ের শিকার হওয়া।
৪. একাডেমিক পড়াশোনা ও জ্ঞানভিত্তিক পড়াশোনায় ন্যূনতম মনোযোগী না হওয়া।
৫. অনলাইনের মাধ্যমে কিংবা বাস্তবজীবনে কারো সঙ্গে রিলেশনশিপে জড়িয়ে যাওয়া।
৬. বিভিন্ন কারণে রিলেশনশিপ ভেঙে যাওয়া।
৭. ব্রেকআপের পর বয়স বিশ অথবা পঁচিশের কোটা পেরোনোর আগেই জীবনের ইতি দেখে ফেলা।
৮. ফেসবুকে ফেইক অ্যাকাউন্ট খুলে কমিউনিটির সমমনা মানুষদের সঙ্গে অনলাইনে একত্র হওয়া। অনবরত নিজের হতাশা ব্যক্ত করতে থাকা।
৯. কংক্রিট ফিউচার প্ল্যানের কোনো বালাই না রাখা। পরিবার ছাড়ার মানসিকতা ও আর্থিক সামর্থ্য অর্জনের জন্য কোনোধরনের কোনো প্রচেষ্টা না চালানো।
আমি এই পেইজটির সঙ্গে ২০১৩ সাল থেকে অনিয়মিতভাবে যুক্ত আছি। এছাড়া গত কয়েক বছরে এই পেইজের বেশ নিয়মিত পাঠকই হয়ে উঠেছি। ২০১৫-১৬ পরবর্তী সময়ে প্ল্যাটফর্মটিতে মানুষের আনাগোনা যে হারে বেড়েছে তার সাক্ষী আমি। এতগুলো বছরে আমার জীবন স্পর্শ করে গেছে অসংখ্য মানুষের জীবনের গল্প। বিশেষ একজন মানুষের অনুরোধ ও অনুপ্রেরণায়, তাঁর র্যান্ট ও আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেই লেখাটা লিখছি। এবং এই আঙ্গিকেই ওপরে তুলে ধরা অভিযোগগুলো নিয়ে বাকি বক্তব্যটুকু রাখব।
প্রথমেই আমার পরবর্তী বক্তব্যের সঙ্গে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক একটা কথা বলে নিই। আমার এই প্রশ্নের উত্তরটা জানার খুব আগ্রহ, আপনার যার সঙ্গে কোনোদিন নক দিয়ে একটা কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও নেই তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান কেনো? অপরিচিত মানুষগুলোর ফ্রেন্ডলিস্টে থেকে আপনার কী লাভ? যদি ইনবক্সে কোনো কথাই না বলেন তাহলে নিজে একটা ফেইক আইডি চালিয়ে আরেকটা ফেইক আইডির সঙ্গে যুক্ত থাকার পেছনের যুক্তিটা কী? আপনারা আসলে কী চান?
যাই হোক।
একজন মানুষ যিনি হেটারোসেক্সুয়াল নন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ হওয়া উচিত নিজের সেক্সুয়ালিটিকে ফলো করে জীবনযাপন করার সামর্থ্য অর্জন করা। সেই লক্ষ পূরণ করার পথে অন্যতম বাধা হচ্ছে, হতাশ হয়ে উল্টে পড়ে থাকা, ফেসবুকে হৃদয়বিদারক গান, কবিতা, উক্তি, স্ট্যাটাস শেয়ার করতে ব্যস্ত থাকা। গান, কবিতা ও শিল্প চর্চায় আমার আপত্তি নেই। সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে উন্নত রুচির শিল্প, সাহিত্য অনুসরণ করা জরুরি। কিন্তু নিজের অস্তিত্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ সম্পর্কে পড়াশোনা না করে, জানার চেষ্টা না করে আবেগ উদ্রেককারী কবিতা, ‘জীবনের ইতি দেখে ফেলেছি’ টাইপ স্ট্যাটাস শেয়ার করা নিয়ে আমার আপত্তি।
যদি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্সটাগ্রামে ব্যয় করার মতো সময় ও মেগাবাইটের যথেষ্ট প্রতুলতা থাকে, সেই সময় ও মেগাবাইট ইন্টারনেটে অ্যাভেইলেবল বই, আর্টিকেলস, ম্যাটেরিয়ালস পড়ার পেছনেও ব্যয় করা সম্ভব। ইংরেজি গান শুনতে পারলে, ইংরেজি কোটস শেয়ার করা গেলে, ইংরেজি মিমস দেখে হেসে গড়াগড়ি খাওয়া গেলে নিজের অস্তিত্ববিষয়ক প্রশ্নের উত্তর জানতে কঠিন কঠিন ইংরেজির এই ম্যাটেরিয়ালসও পড়া সম্ভব। ফেসবুকে সরব থাকা, চ্যাট করা, কবিতা লেখা, গান, কোটস শেয়ার করা এসবের বিরুদ্ধে আমার কোনো স্ট্যান্ড নেই। কিন্তু আপনি যখন পড়াশোনা করবেন, জানবেন, তখন আপনার চিন্তায় গভীরতা আসবে। আপনি নিজেই বুঝবেন জ্ঞানচর্চা করার আগের আপনি আর পরের আপনির মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর তফাত। তখন ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টটাকে শুধুই বড় করার তাগিদে যাকে নয় তাকে অ্যাড করে ভরিয়ে ফেলবেন না। ইনবক্সে কথা বলতে যেয়ে অপরিণত কথাবার্তা বলবেন না। জীবন গঠনের তাড়না আপনার জন্য সবচেয়ে বড় তাড়না হিসেবে কাজ করবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনর্থক এতো সময় ব্যয় করতে পারলে পড়াশোনাটা কেনো করা যাচ্ছে না সেখানেই আমার আপত্তি।
আসন্ন রূঢ় বাস্তব জীবনের উন্মত্ত ঢেউকে সামাল দিতে প্রস্তুত না হয়ে ফেসবুকে অগভীর চিন্তাধারার কিছু অনর্থক বালখিল্যতায় ব্যস্ত থাকা নিয়ে আমার আপত্তি। সেই আসন্ন রূঢ় বাস্তবতার তুলনায় নিতান্তই ছোট কিছু হতাশাকে পুঁজি করে ফেসবুকে দুঃখী দুঃখী একটা ইমেজ প্রদর্শন করা নিয়ে আমার আপত্তি। ব্যাপারটা এমন, আপনার কাছে হয়তো দুঃখের একটা কুয়া আছে। আপনি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সেটাকে দুঃখের মহাসাগর হিসেবে তুলে ধরছেন। আপনার জীবনে এতো দুঃখিত হওয়ার মতো বিশাল কিছু এখনো ঘটেনি। ভবিষ্যতে কী হবে তা ভেবেই তো এতো দুঃখ আপনার? তাহলে ভেবে দেখুন তো জীবনে করছেনটা কী? নিজ হাতে ভবিষ্যতের খুঁটি গড়ার সময়টাকে কাজে না লাগিয়ে হেলায় হারাচ্ছেন না তো? বিরহমাখা গান, কবিতা, স্ট্যাটাসে যে টাইমলাইন পূর্ণ করছেন, ভবিষ্যতে বাস্তবতার ডামাডোলে এসব কাজে আসবে তো? এমন নয় তো যে, মুখে মুখে খুব স্বীকার করলেও ডিপ ডাউন আপনি নিজেই বিশ্বাস করছেন না যে, পরিবার ও সমাজের বাইরে যেয়ে আপনিও আপনার সেক্সুয়ালিটি অনুযায়ী জীবন কাটাতে পারেন? যদি আপনি বিশ্বাস করছেন বলে দাবি করেন, সেই অনুযায়ী কাজ করছেন তো? না করে থাকলে আমি বলব আপনার আসলে সেই আত্মবিশ্বাসই নেই যে, আপনার সেক্সুয়ালিটিকে ফলো করে একটা বাস্তব জীবন কাটানো সম্ভব ও আপনি সেই সামর্থ্য অর্জন করতে পারবেন। আপনি আসলে হেটারোনর্মেটিভিটি থেকে বেরিয়েই আসতে পারেননি। ওই হোক্সটা থেকে বেরিয়ে আসুন। মেকি হতাশায় নিমজ্জিত না থেকে আত্মবিশ্বাস তৈরি করুন ও সেই অনুযায়ী কাজ করুন।
সবচেয়ে অত্যাশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, ভাঙা রিলেশনশিপ নিয়ে আহাজারি করা। এটা যেনো আমাদের কমিউনিটির মানুষগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিলেশনশিপ ভাঙার হাজারো কারণ থাকতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবার ও সমাজ মেনে নেবে না এটাই মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আচ্ছা, কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো! আপনার রিলেশনশিপ ভাঙবে না কেনো? আপনি যে সমাজে আছেন সে সমাজটা কি আপনার রিলেশনশিপের জন্য বাস্তবসম্মত? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে বাস্তবসম্মত করার জন্য আপনি কতটুকু ফাইট করেছেন? আপনি পড়াশোনা করেছেন? ভাল রেজাল্ট করেছেন? চাকরি করেছেন? যার সঙ্গে রিলেশনশিপটা ছিলো তাকে একসঙ্গে থাকার মতো জীবনের নিশ্চয়তা দিয়েছেন? তাকে কি দেখিয়েছেন যে তাকে একটা সচ্ছল জীবন দেওয়ার মত আর্থিক সামর্থ্য আপনার আছে? পরিবার থেকে বেরিয়ে আপনার কাছে এসে থাকার মতো পরিস্থিতি কি আপনি তৈরি করতে পেরেছেন? পরিবার থেকে বেরিয়ে আসার পর তার স্ট্রাগল করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে যতটুকু আর্থিক ও মানসিক সমর্থন দেওয়া প্রয়োজন সেটুকু সমর্থন দেওয়ার সামর্থ্য কি আপনার ছিলো? আপনার মধ্যে কি এমন কোনো যোগ্যতা ছিল যার কারণে সমাজ-সংস্কার-সামাজিকতার চাপ, লোকের ফিসফিসানি, সামজিকভাবে বয়কটেড হওয়া সত্ত্বেও এসব মেনে নিয়ে আপনার সঙ্গে জীবন কাটাতে সম্মত হবে?
সব কয়টা প্রশ্নের উত্তর যদি নেতিবাচক হয় তাহলে ভাবুন বাস্তবতা এইমাত্র আপনার গালে ঠাস করে একটি চড় বসালো। চড়টাকে হজম করে ফেলবেন না। ব্যথাটুকু বয়ে বেড়ান। পড়াশোনা করুন। এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স, মাস্টার্সে ভালো রেজাল্ট করুন। দেশের বাইরে যেতে চাইলে টোফেল, আইএলস, জিম্যাট, জিআরই; যা প্রয়োজন সেই অনুযায়ী প্রস্তুত হোন। পরিবার বাধা হয়ে দাঁড়ালে নিজের শক্ত অবস্থান তুলে ধরুন। আপনার পরিবারকে আপনারই সামলাতে হবে, আপনার প্রতিবেশী এসে সামলে দেবে না। নিজের ভবিষ্যতের জন্যই অবস্থানটা শক্ত করুন। দেশে থাকলে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করুন। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি আরো একজন মানুষকে ভালো রাখার সামর্থ্য অর্জন করুন। প্রেমিক-প্রেমিকাকে জীবনসঙ্গী বানাতে চাইলে নিজে সমর্থ হয়ে তারপর তাকে একটা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের প্রস্তাব দিন। ফাঁপা ও বাকসর্বস্ব কিছু প্রতিশ্রুতি দিনশেষে আপনাদের মাথার ওপরে ছাদ, প্লেটে খাবার ও সমাজে মর্যাদা এনে দেবে না। ফেসবুকে শিটপোস্টিং করে, মেসেঞ্জারে হরেক রকম মানুষের সঙ্গে ভবিষ্যতহীন হাজারো প্রতিশ্রুতি প্রদানের মাধ্যমে প্রেম প্রেম ভাব করে, পড়াশোনা না করে, একান্তই নিজের প্রচেষ্টার অভাবে পরবর্তী জীবনটা পরিবার ও সমাজের কাছে আত্মসমর্পণ করে স্ট্রেইটদের বেশে কাটিয়ে দিয়েন না। প্লিজ।
Source: BAH ( Bangladesh Against Homophobia)

Leave a comment