উড়ে উড়ে দেখেছে সে মরণের পার

লিখেছেন আলবাট্রস

জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব রাব্বি তনয়কে যেদিন হত্যা করা হয়, সেদিন আমি ঘটনাস্থলের খুব কাছাকাছিই ছিলাম। আমি তখন একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। বিশ্ববিদ্যালয়টি যেখানে অবস্থিত তার পাশের গলিতেই থাকতেন জুলহাজ। জুলহাজের বাসার সামনে দিয়েই আমি প্রতিদিন দু’বার আসা যাওয়া করতাম। কিন্তু ঢাকা শহর এমন আজব একটা জায়গা যেখানে মিডিয়াতে খবর না আসা পর্যন্ত পাশের বাসার লোকজনও জানে না আপনার জীবনে কি ঘটে যাচ্ছে। বাসায় ফিরে যখন গণমাধ্যমে খবর দেখলাম, তখন ভীষণ অসহায় লাগছিল। মনে হচ্ছিল, পায়ের নীচে মাটি সরে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে যেহেতু সেক্স এডুকেশন নাই বললেই চলে (নামমাত্র যা আছে তা কেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ শেখানোর জন্য), ফলে বিষমকামীতার বাইরে অন্যান্য যৌনতা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ খুবই সীমিত। তাত্ত্বিক ও ধারনাগত জায়গা থেকে যৌনতা সম্পর্কিত বাংলা ভাষায় লেখা মাইলস্টোন বইটি রচনা করেছিলেন ড. অভিজিৎ রায় (১২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ – ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। বাংলাদেশে আমার মত অনেক উঠতি কিশোর ও যুবকরা এই বই পড়ে নিজেদের যৌনতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা পায়, যা পরবর্তীতে তাদেরকে যৌন অভিমুখীতা বা যৌন দিকস্থিতি নির্মাণে সাহায্য করে। উল্লেখ্য, ব্যক্তিগত জীবনে বিষমকামী, মুক্তমনা, বিজ্ঞানী, ও লেখক ড. অভিজিৎ রায়কে-ও খুন করে ধর্মান্ধ তরুণরা। কিন্তু, যদি  বাংলাদেশে সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি পলিটিক্স এর কথা বলা হয়, তবে নি:সন্দেহে  জুলহাজ মান্নানের নাম অগ্রগণ্য। ইন্টারনেটের বিশাল জগত যখন সাধারণ মানুষের হাতে হাতে পৌঁছায়নি, তখনো জুলহাজ একজন সংগঠক হিসাবে বাংলাদেশের তরুণ একটা জনগোষ্ঠীকে হাতে কলমে শিখিয়েছিলেন কীভাবে আইডেন্টিটি পলিটিক্স করতে হয়। এরই ধারাবাহিতায় ম্যাগাজিন রূপবান, কাব্যগ্রন্থ রুপংক্তি, পাবলিক এডভোকেসী টুলস হিসাবে ধী ও আরো অন্যান্য প্রকাশনা আমরা দেখতে পাই, যেখানে বাংলাদেশের বিষমকামীতার বাইরে অন্যান্য যৌনতার মানুষের (যেমন সমকামী  ও রুপান্তরকামী) ভাবনা, জীবন ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে।  

জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় হত্যাকাণ্ডেরও আগে আমি ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে আনসারুল্লাহ বাংলা নামক একটি সংগঠন থেকে আমি প্রাণনাশের হুমকি পাই। কাকতালীয়ভাবে, সেসময় আমি জিডি করেছিলাম কলাবাগান থানায়। তখন থেকে আমার মানসিক অবস্থা খুবই বিপর্যস্ত ছিল। নিজের চলাফেরা সংকোচিত করা, বারবার রাস্তা-বদল করে বাসা-অফিস মেইনটেইন করা, নিরাপত্তা নিয়ে ২৪/৭ উদ্বিগ্ন থাকা; এরকম একটা অস্থির সময়ে জুলহাজ ও তনয়ের মৃত্যু সংবাদ আমার ভয় আরো বাড়িয়ে দেয়। মানসিকভাবে একেবারেই বিপর্যস্ত করে দেয়। যদিও শিক্ষক হিসাবে আমি দীর্ঘদিন জেন্ডার এন্ড কমিউনিকেশন কোর্স পড়াতাম, এই ঘটনার পর আমি কোর্সটি বাদ দিই। নিজের কথাবার্তা ও লেখালেখির উপর সেলফ-সেন্সরশিপ আরোপ করতে বাধ্য হই। এবং এক পর্যায়ে দেশ ছাড়ি। ২০১৭ সালে।

জুলহাজ মান্নান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। বাংলাদেশের মত একটা রাষ্ট্র যেখানে বিষমকামীতার বাইরে অন্যান্য যৌন অভিমুখিতাকে সাংবিধানিকভাবে (আর্টিক্যাল ৩৭৭) শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে দেখা হয়, সেখানে জুলহাজ ও তার সহকর্মী বন্ধুরা একটা নতুন আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন। স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি সমতাভিত্তিক বৈষম্যবিহীন রাষ্ট্রের, যেখানে যৌন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকারও সমুন্নত থাকবে। জুলহাজ ও তনয়ের অকাল প্রয়াণ আমার কাছে “ঘুমন্ত বাঘের বুকে বিষের বাণের মতো বিষম সে ক্ষত!”

বিক্ষিপ্ত অনুভূতি, একটি সংগৃহীত সংকলন, যা জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডের পঞ্চম বছরে প্রকাশ করা হয়।

লেখকদের অনুভুতি, অভিজ্ঞতা এবং মতামত একান্তই তাদের নিজেদের। ‘মন্দ্র’ এর অনুমতি ছাড়া এই লেখা পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.