লুডুঙ- আদিবাসী কুইয়ার ঝুলি

আর্টিস্ট- রুহ

মুখবন্ধ

ইনজেব চাকমা

বাংলাদেশে ত্রিশ লক্ষেরও অধিক আদিবাসীর বসবাস যাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও লিখিতভাবে উপজাতি, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী এই নামে অভিহিত করা হয়। যুগ যুগ ধরে একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাস করে আসলেও সে ভূখণ্ড আজ কিছু সুবিধাবাদী বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠী কর্তৃক গ্রাস হতে হতে নিশ্চিহ্ন হবার পথে। সংখ্যালঘু বলেন আর প্রান্তিক জাতি বলেন আমাদের অস্তিত্ব আজ হুমকিস্বরূপ। যে জাতিসমূহ ভাষা, সংস্কৃতি, অধিকার, অস্তিত্ব ইত্যাদি টিকিয়ে রাখতে সংকটাপন্ন সে জাতির লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্য মানুষের অবস্থান কোথায়, কেমন হতে পারে? যেদেশে লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্যের মানুষ প্রান্তিক লাইনে সেদেশের আদিবাসী লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্যের মানুষ হিসেবে আমরা প্রান্তিকেরও প্রান্তিক।

আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু শিক্ষিত আদিবাসী লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্য সম্পর্কে একটু আধটু জানতে পারলেও আদিবাসী সমাজ এই বিষয়ে এখনও অন্ধকারে। এতে সামাজিক এবং ধর্মীয় চাপ না থাকলেও না জানার দরুন অনেক আদিবাসী কুইয়ারদের অমতে বিয়ে করতে হয় এবং অন্যান্য সমস্যারও সম্মুখীন হতে হয়। বাঙ্গালি সমাজে এই ব্যাপারগুলো যতটা সহজে জানা যায় আদিবাসী সমাজে এর সিকিও জানা যায় না বললেই চলে। তাই ছোটবেলা থেকেই অন্ধকারে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে এগোতে হয় আমাদের। হ্যাঁ, আমার মতো অনেক আদিবাসী কুইয়ার এখন মোটামুটি উন্মুক্ত-ভাবে চলাফেরা করে। ফলে অনেক আদিবাসী কুইয়ারদের সাথে পরিচয়ও হচ্ছে। অনেকে আবার নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে। তবে সম্পর্কগুলো ওই পরিচয় পর্যন্তই। ফলে আমাদের মাঝে যে সংকীর্ণতা থাকে সেগুলো থেকেই যাচ্ছে।

যাইহোক, আমরা অনেক আদিবাসী কুইয়ার কিন্তু সংখ্যাগুরু বাঙ্গালি লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্য মানুষের সাথে সম্পৃক্ত আছি। মন্দ্রতেও আমার মতো অনেকেই আছে। মন্দ্র যেহেতু বিশেষ দিন, ব্যক্তি নিয়ে অনেককিছু করে যাচ্ছে, ভাবলাম আমাদের নিয়ে কেন নয়? হ্যাঁ আমাদের নিয়েও কথা হোক, লেখা হোক। এতদিন হয়নি বলে আজ হবে না এমন তো নয়। আজ থেকেই এই যাত্রা শুরু হোক তবে। আমাদের অন্দরমহলের খবর সবার কাছে পৌঁছে যাক। আমরা কেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠি। আমাদের সমাজ কি বলে। আমাদের আলাদা কি কি পরিস্থিতিতে পড়তে হয় ইত্যাদি। এতে আমাদের নিজেদের অবস্থা সবার মাঝে জানান দেয়ার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে একাত্মতা, মনোবল ইত্যাদি বাড়বে। সবার মাঝে বেরিয়ে আসার সাহস হবে।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে আমরা কয়েকজনের প্রচেষ্টায় আদিবাসী লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্য নিয়ে লেখা সংকলন “লুডুঙ” বের করতে পেরেছি। সংকলনের নামটা আমার মাতৃভাষায় এবং এটি আমার সংস্কৃতির একটা অংশও। “লুডুঙ” হলো পাকা লাউয়ের বীজ সংরক্ষণ করে যে খোলটা থাকে সেটা দিয়ে তৈরি একটি কৌটা যেখানে চাকমারা বিভিন্ন ধরনের জিনিস বিশেষ করে নানা জাতের বীজ সংরক্ষণ করে রাখে। আমি মনে করি এই সংকলনটাও বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্য মানুষের ভিন্ন ভিন্ন প্লটে লেখা সম্বলিত একটা “লুডুঙ”।

এই মাঠে আমি একদম নতুন হওয়ায় আমাকে অনেক কিছুর সম্মুখীন হতে হয়েছে। যত পরিচিত আদিবাসী কুইয়ার আছে সবাইকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা। বলার পর রাজি করিয়ে লেখা সংগ্রহ করার চেষ্টা করা। যারা একেবারে ক্লজেটে থাকতে চায় তারা রাজি না হলেও অন্তত লেখার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে উদ্বুদ্ধ করেছি। তাদেরও যদি পরিচিত থাকে সেখান থেকেও লেখা আনা যায় কিনা চেষ্টা করেছি। অনেকে লেখালেখিতে অনভ্যাস, ব্যস্ততা, সংকীর্ণতা ইত্যাদি সমস্যা দেখালেও চেষ্টা করেছি কিছু একটা বের করে আনার। যদিও চেষ্টার ফল খুব একটা ভাল আসেনি তবে যে কয়জনের সাড়া পেয়েছি শুরু হিসেবে এটাও অনেক বলে মনে করি।

তারপর সংগৃহীত লেখাগুলো যথাসম্ভব সংযোজন-বিয়োজন করতে হয়েছে। নিজের লেখা তো আছেই তারপর আছে পোস্টারের ক্যাপশন থেকে এই মুখবন্ধ লেখা। এসব কিভাবে লিখতে হয় সেটাই জানতাম না তার উপর লেখায় আদিবাসী দিবস এবং লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্রতা এই দুটো বিষয়কে একত্রে আনা আমার পক্ষে আরও কঠিন ছিল। আর প্রত্যেক পদক্ষেপে বিপদে যে আমার ত্রাণকর্তা সে আর কেউ নয় ফ্লিন রাইডার।

আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আমাদের নিয়ে এই ব্লগ লেখার সুযোগ দেয়ার জন্য মন্দ্র এবং এর পিছনে যারা আছেন সবাইকে কৃতজ্ঞতা এবং আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। যাদের ইচ্ছা আছে বলেই আমি এবং আমার মতো কয়েকজন প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্য আদিবাসী কিছু লেখার তাগিদ পেয়েছি। নিজের ভাব প্রকাশের সুযোগ পেয়েছি। নিজেদের শিল্প, সংস্কৃতি এবং অবস্থান সবার মাঝে তুলে ধরতে পেরেছি। আশাকরি পরবর্তীতেও এই ধারা বজায় রেখে আমরা আমাদের সকল ধরনের অনুভূতি শেয়ার করার মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান পেয়ে যাবো।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস- ২০২১ এর থিম- “কাউকে পিছনে না রেখে: আদিবাসী এবং একটি নতুন সামাজিক চুক্তির আহ্বান।”
তাই কাউকে পিছনে না রেখে আসুন, আদিবাসী এবং লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্যময় মানুষের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি বৈচিত্র্যময়, প্রগতিশীল এবং সুস্থ সমাজ গড়ে তুলি।
সবশেষে, কেউ ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। কোথাও কোনও ভুল পরিলক্ষিত হলে ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। আশাকরি ভুলগুলো শুধরানোর সুযোগ দিয়ে আমাকে সমৃদ্ধ করবেন।

সবার সুস্থতা, সফলতা কামনা করছি।

সকলের দোয়া এবং আশীর্বাদ প্রার্থী
ইনজেব চাকমা

লুডুঙ- আদিবাসী কুইয়ার ঝুলি,আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে আদিবাসী লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্যময় মানুষের লেখা নিয়ে বিশেষ সংকলন।

ইনজেব চাকমা: চাকমা সম্প্রদায়ের মা-বাবার ছয় সন্তানের কনিষ্ঠ সন্তান আমি। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় স্থায়ী নিবাস। চাকুরিসূত্রে চট্টগ্রাম শহরে থাকা হয়। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর থেকেই মূলত এই শহরে আছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জীববিজ্ঞানের একটা শাখা নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছি। শিল্প-বিজ্ঞান-সাহিত্য হলো আমার সবচেয়ে পছন্দের বিষয়। আত্মনির্ভরশীলতা, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে চলা, ঘুরাঘুরি, বই সংগ্রহ ও পড়া, মানব হিতকর কাজে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা, কাছের মানুষদের যথাসম্ভব সময় দেয়া হলো আমার জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা আদর্শ। শখের মধ্যে আছে ঘুরাঘুরি, ফটোগ্রাফি, লেখালেখি, বাগান করা, গান শোনা ইত্যাদি। তবে লেখালেখিটা সময় সুযোগে করার ইচ্ছা প্রবল হলেও আমি নিয়মিত না অর্থাৎ মৌসুমী লেখিয়ে। সমাজনির্ধারিত লিঙ্গানুসারে পুরুষ। যৌন অভিমুখিতায় সমকামী। মানব হিতকর সকল কর্মকাণ্ড এবং বৌদ্ধ ধর্ম যথাসাধ্য অনুসরণ করার চেষ্টা করি। মুক্তমনা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.