
প্রচ্ছন্ন রৌদ্র
সে এক রাজপুত্তুর ! না, কেবল কল্প কাহিনীর পাতায় বন্দি,কোনো চরিত্র নয়। তার নাম-পরিচয়-অস্তিত্ব সবই বাস্তব। সে যখন এসেছিল, তখন কারো দেহ-মনেই যৌবনের কুসুম-কলি ফোটেনি – না তার, না আমার। কাজেই, সম্পর্কটা কেবল বন্ধুত্বেরই ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই বন্ধুত্বের টানে ছিল এক অন্য মাত্রা – তার দিক থেকে ছিল কিনা এখনো জানি না, তবে আমার অবশ্যই ছিল। অন্যদেরও তার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা ; অমন লাল টুকটুকে চেহারা, চশমা আঁটা বুদ্ধিদীপ্ত দুটো চোখ, রুচিশীলতা-নম্রতার জীবন্ত প্রতিমূর্তি, তার ওপর আবার পড়াশোনায়ও ফার্স্ট ক্লাস – ভাবা যায়! কিন্তু না, আমার টান এসবের গণ্ডির বাইরে ছিল, এসব ছাঁপিয়ে বহুদূর অবধি। বয়েজ স্কুলে একসাথে বসে ক্লাস করা, পড়াশোনায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, সুখ-দুঃখের নানান কথা ভাগাভাগি, মাঝেমধ্যে ইঙ্গিতপূর্ণ কথায় লজ্জায় রাঙামুখ করে তোলা – এসব মিলিয়ে ভালোই চলছিল। প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা ঘটনায় তার একচিলতে উপস্থিতিই যেন মনের মধ্যে এনে দিত পূর্ণতা।
কৈশোরের সেই সময়টায় আমি ও সে, দুজনই ছিলাম নিপাট ভদ্রলোক, ভালো ছেলে ; যার পূর্বশর্তই কিনা মেয়েদের থেকে দূরে দূরে থাকা, ওদের নিয়ে বেশি না ভাবা। অবশ্য তার মনে অন্য কিছু চলত কিনা, জানা নেই। চারপাশের অন্য বন্ধুদের টক-মিষ্টি প্রেম, সম্পর্ক ভাঙা-গড়া দেখতাম প্রতিনিয়ত; খুব হাস্যকর মনে হত সেসব। এসব প্রেম, ভালোবাসা আবার কি জিনিস ! পড়াশোনা করব, গুড বয় হব, তারপর অনেক বড় হয়ে গেলে না হয় একটু-আধটু প্রেম-ট্রেম হলে হবে – এইতো ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি,ভেবে এসেছি! তাই ওসব দেখে হাসতাম, ভীষণ কৌতুক পেতাম।
কিন্তু, যা বুঝতে পারিনি তা হল – কখন হুট করে বয়ঃসন্ধি ওরফে যৌবন এসে ধাক্কা দিল আমার দেহ আর মনে। ধাক্কাটা শুরুতে বুঝতেই পারিনি। কারণ সেসব সম্পর্কে জানতামই বা কতটুকু! তারপর মাধ্যমিক পার হয়ে , ভর্তি হলাম কলেজে। সে চলে গেল অন্য শহরে, অন্য কলেজে। এই প্রথম ধাক্কাটার হালকা অনুভূতি পেলাম,বলা যায় একপ্রকার বিচ্ছেদের মাধ্যমে। এরপর আমার বড় হওয়ার যাত্রাটা খুব তাড়াতাড়ি এগোতে লাগল; কোনো এক্সাইটিং ভিডিওকে 2X (দ্বি-গুণ) গতিতে ছেড়ে দিলে যেমন হয় – ঠিক তেমন। ইন্টারনেট ব্যবহারে অভ্যস্ত হলাম, বাইরের জগতের পাশাপাশি নিজের শরীর-মনঃস্তত্ত্বের বিজ্ঞান সম্পর্কেও জানা এগিয়ে চলল। এবার ধাক্কাটা একটু জোরেই অনুভূত হতে থাকল। ওই দূরের শহরে থাকা ছেলেটা, ওই রাজপুত্তুরটার অভাব খুব বোধ হতে থাকল। খেটেখুটে নম্বরটাও জোগাড় করে ফেললাম তার, কিন্তু মাঝে মধ্যে অমন দু’য়েকবার মুঠোফোনে কথা বলে কি আর মন ভরে? একরকম জোর করেই আনলাম তাকে সোশ্যাল মিডিয়ায়, দিলাম সব বুঝিয়ে-টুঝিয়ে।ও আবার এসবে আনাড়ি তো! এরপর হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে মাঝে মাঝেই চলত টুকটাক কথাবার্তা, খুনসুটি, সেই আগের মত…
এর পরের কাহিনী অতি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ওজনে ভারী । ইতোমধ্যেই বুঝে ফেলেছি নিজের অরিয়েন্টেশন, আর দেখে ফেলেছি আমার মনের সিংহাসনে কে রাজত্ব করছে৷ সাত-পাঁচ ভেবে, বারবার নার্ভাস হয়ে, সেই মুহূর্তের সূচনা হিসেবে তার ইনবক্সে লিখে ফেললাম এক গৌরচন্দ্রিকা – যে কথাটা বলব, অনুমতি চাইলাম, অগ্রিম ক্ষমাও চেয়ে নিলাম তার জন্য। হয়তো সে বুঝতে পারেনি কি বলতে যাচ্ছি, কিঞ্চিৎ ঠাট্টা করে অনুমতিটা দিয়েই দিল। বললাম, হ্যাঁ আমি বললাম। সেই কথা, যা বলার জন্য এই ১৯ বছরের জীবনে সঞ্চিত সব সাহস খরচ হয়ে গিয়েছে। উত্তরে সে এসব নিয়ে ভাবতে মানা করল, আপাতত পড়াশোনায় মন দিতে বলল। আর বলল,
“পরে কথা হবে বন্ধু! ”
কথা আর হল না, আর সেই পরের মুহূর্ত আসল না। সে আমাকে গ্রহণ করল না, যার অপেক্ষায় গুণে যাচ্ছি দিনের পর দিন। হয়তো করবেও না কোনোদিন।
কিন্তু গ্রহণ না করলে আমার কাহিনী কি সেখানেই শেষ? কখনোই না! হয়তো তার অরিয়েন্টেশন আমার মত নয়, কিংবা হলেও হয়ত আমাকে পছন্দ নয়। তাতে কি? গৃহীত না হলেই কি ভালোবাসা মরে যায়? কখনোই না! আমার চিরচেনা ওই সত্তা, আর তার প্রতি ভালোবাসা চিরজীবন অটুট থাকবে আমার মনে। হয়ত আমার পরিবর্তে তার জীবনে অন্য কেউ আসবে, তাতেও বা কি? না হয় আমার ভালোবাসা সেই ভাগ্যবান কিংবা ভাগ্যবতীর মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পাবে!
তার সুখ, তার প্রাপ্তিতেই যে আমার সুখ, আমার তৃপ্তি!
ভালো থেকো, হে প্রিয়তম। অন্তত আমার জন্য না হয় ভালো থেকো, কেমন?
প্রচ্ছন্ন রৌদ্র –আমি একজন সমপ্রেমী পুরুষ – যার পুরুষসত্তার ওপর নারীসুলভ এক প্রলেপ লাগানো, যা বাইরে থেকে দেখে বোঝা অসম্ভবই বলা চলে। বয়সে টিনএজার, পেশায় ছাত্র। এ ধরণের লেখালেখির অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। স্বপ্ন দেখি উচ্চশিক্ষার ধাপ পেরোনোর পর ভবিষ্যতে বিজ্ঞান গবেষণার জগতে নতুন কোনো আলোড়ন তৈরি করার, এবং তার পাশাপাশি মুক্তচিন্তার প্রসার ঘটিয়ে সমাজকে আলোকিত করার।

Leave a comment