অচিন পাখী

এমডি ইসলাম

১। 

মুষল ধারায় বৃষ্টি ঝড়েই যাচ্ছে। আজ মনে হয় বৃষ্টি থামবেনা। রাস্তা ঘাটে বুক সমান পানি করেই ছাড়বে। 

গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম অফিসের পানে। বুকে এক সংশয় নিয়ে এই বুঝি রাস্তার জমে থাকা পানির কারনে গাড়ির ইঞ্জিনে কোন সমস্যা হয়ে স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাবে।

রাস্তার জমে থাকা জলে ঢেউ তুলে গাড়ি এগিয়ে চলছে সম্মুখে। গাড়ি শান্তিনগর মোড়ে টার্ন নিবে এমন সময় দেখি এক যুবক মনের সুখে বৃষ্টিতে ভিজে হেঁটে যাচ্ছে। পেছন থেকে দেখে মনে হল উমাইন হেঁটে যাচ্ছে। 

গাড়ি বন্ধ করে নেমে পড়লাম। যুবকটির কাঁধে হাত রাখলাম। যুবকটি ঘুরতেই হোঁচট খেলাম। 

– দুঃখিত। ভেবেছিলাম আমার বন্ধু উমাইন। 

– ওকে ব্রো। বলেই যুবকটি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলো। 

কাক ভেজা শরীর নিয়ে রওয়ানা দিলাম অফিসের পথে। 

২।

উমাইন এর সাথে আমার দেখা হয়েছিল এমনি এক বৃষ্টি ভেজা দিনে। সেদিন সে মনের আনন্দে বৃষ্টিতে ভিজে গুন গুন করে গান গেয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। আমি গাড়ি দিয়ে উমাইনের পাশ দিয়ে যেতেই রাস্তার ময়লা পানির ছিটা পড়লো ওর গায়ে। 

চশমা পরিহিত উমাইন স্টুপিড বলে উঠলো। 

আমি গাড়ি থামালাম। কিছুটা ব্যাকে গেলাম। গাড়ির গ্লাস কিছুটা নামালাম। 

– বৃষ্টিতে তো ভিজতেই আছেন, নাহয় রাস্তার জমে থাকা কিছু পানির ছিটা আপনার গায়ে লেগেছে। তাতে কি আপনার শরীর নষ্ট হয়ে গেছে?

আমার কথা শুনে সে চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ বড় করে দেখলো। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই সে তার হাত দিয়ে রাস্তার জমে থাকা পানি আমার গায়ে ছুঁড়ে মারলো। 

– হিউগো বস এর পার্ফিউম দিয়ে দিলাম। বলেই হাসতে লাগলো। 

ইচ্ছে করছিল ঐ বিচ্ছুটার গালে কষে একটা চড় দেই, যাতে ওর দুই পাটির সব দাঁত পড়ে যায়। 

৩।

বজ্জাতটার দুঃসাহসে আমার সমস্ত শরীর রাগে কাঁপছে। এমন সময় আমার মুঠোফোনটা বেজে উঠলো। স্নিগ্ধার ফোন ছিল। রাগে কাঁপতে কাঁপতেই ফোনটা রিসিভ করলাম। 

– কি বলবে বল?

– এমন রোবটের মত কথা বলছো কেন?

– আর বলোনা। এক ফাজিল যা করলো না… 

– কি করলো? 

– এসব বাদ দাও। কি বলবে বল?

– কাল যে আমাদের সবার সাথে তুমিও নীলগিরি যাচ্ছ সেটা মনে করিয়ে দিতে ফোন করেছি। 

– বলেছি তো যাব। এত বারে বারে মনে করানোর দরকার নেই। 

– তোমার শ্বশুর-শ্বাশুরিও যাবে কিন্তু। সেভাবেই এসো। 

– ঠিক আছে বাবা। এখন ফোনটা রাখ। ফ্রেশ হয়ে নেই। বাই।

– ওকে। টেইক কেয়ার। 

স্নিগ্ধার সাথে পরিচয় আমার ভার্সিটি লাইফে। আমার একজন ভাল বন্ধু। খুব খোলা মনের মানুষ। সব সময় মজা করা তার চাই। নিজের বাবা-মা কে আমার শ্বশুর-শ্বশুরি বানাতেও দ্বিধা করে না। 

৪।

নীলগিরি তে এসে মনটা বেশ ভরে গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠেই রিসোর্টের বাইরে আসলাম। সাথে স্নিগ্ধা। সাদা শুভ্র মেঘ ছুঁয়ে যাচ্ছে। সে কি এক অনুভূতি, যা বলে বুঝানোর মতো নয়। 

স্নিগ্ধা কে পাশে নিয়ে গল্প করছি আর এমন সময় এক যুবক স্নিগ্ধাকে কিছু বলতে বলতে আমাদের কাছে আসতে থাকলো। ছেলেটাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কাছে আসতেই আমার আর তাকে চিনতে বাকি রইলো না। সেদিনের সেই রাগটা যেন আবার জাগ্রত হল। ইচ্ছে করছিল বজ্জাতটাকে উঁচু পাহাড়ের নিচে ফেলে দেই। ইচ্ছা পূরণের আগেই স্নিগ্ধা মুখ খললো। 

– শুভ্র। ও হচ্ছে আমার কাজিন উমাইন আহমেদ। 

বিচ্ছুটা মনে হয় আমাকে ভুলে গেছে। তাই আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। 

– হাই। আমি উমাইন আহমেদ। 

আমি অনেক কষ্টে মৃদু হাসি দিলাম।

– হ্যালো। আমি শুভ্র মাহমুদ। 

করমর্দনরত অবস্থাতেই বজ্জাতটা বলে উঠলো,

– সেদিনের হিউগো বস কেমন ছিল। 

হাসবো নাকি কাঁদবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। স্নিগ্ধা ব্যাপারটাতে নাক গলালো। 

– এই শুভ্র। উমাইন কি বলছে?

এবার আমি অট্টহাসি দিলাম। বললাম,

– তোমার বিচ্ছু ভাইটাকেই জিজ্ঞাস কর। 

উমাইন সেই ঘটনাকে বেশ রসাল করে স্নিগ্ধার কাছে বর্ননা করলো। 

– জানো শুভ্র। উমাইন সব সময় অনেক মজা করে। মজা না করলে যেন ওর পেটের খাবার হজম হয় না। 

– হুম। তা উমাইন সাহেবের কি করা হয়?

– তেমন কিছু না। খাই, ঘুমাই আর ঘুরে বেড়াই। উমাইন ভাবলেশহীন ভাবে উত্তর দিল। 

– জীবনে চলতে গেলেতো কিছু একটা করা লাগে। 

– আররে ও কিছু না করলেও ওর সাত জনম বসে বসে খেতে পারবে। আমাদের কথার মাঝে স্নিগ্ধা হাসতে হাসতে বলে। 

– তুই পাকনি বুড়ীদের মত কথা বলা বন্ধ কর। আমার ব্যাপারে তোকে আর ঢোল পিটাতে হবেনা। বলেই উমাইন সামনে চলে গেল। 

বজ্জাতটার দুষ্টামি বুদ্ধি সব সময় লেগেই থাকতো। আমাদের রেখে যাওয়ার সময় সে একটা ব্যাঙ তুলে ধরে আমার দিকে ছুড়ে মারে। আমি ভয়ে চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে পড়ে গেলে তার হাসির জোয়ার উপচে পড়তে থাকে। স্নিগ্ধা কে টিপ্পনি কেটে বলে-

– এমন ভীতুর ডিম নিয়ে কি করে থাকবি? বলেই হাসতে লাগলো। 

রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছিল। আমি বজ্জাতটাকে কিছু করতে যাব আর সে সময় স্নিগ্ধা আমার হাত ধরে থামিয়ে দেয়। 

– ওর এসব কর্মকান্ডে কিছু মনে কর না। মানুষ হিসাবে ও খুব দারুন। জানো? আমি ওর সাথে প্রেম করার অনেক চেষ্টা করেছি। 

– তাই নাকি?

– জ্বি, জনাব। উমাইনের মন সাত রঙে রাঙানো। কোন নারীর স্থান তার মনে নেই।

– তুমি কি করে জানলে?

– উমাইন আমাকে সব খুলে বলেছে। 

– ওর সমপ্রেমি স্বত্বাতে তোমার ঘৃণা হয় নি?

– কেন হবে? তবে ওকে না পাওয়ার আফসোস আমার সারা জীবন ভর থাকবে। 

কিছুক্ষণের মাঝে সকালের নাস্তার টেবিলে আমাদের সাথে যোগ দিলেন স্নিগ্ধার বাবা-মা। নাস্তার টেবিলে তারাও আমাদের সাথে খোশ গল্পে মেতে উঠলেন।

– শুভ্র তোমার জব কেমন চলছে? মৃদু স্বরে স্নিগ্ধার বাবা সোয়েব আলীর জিজ্ঞাসা। 

– বেশ ভালই চলছে আপনাদের দোয়ায়। 

– তাহলে এবার বিয়ে থা করে সংসারী হউ। 

– ওনার মত ভীতুর ডিমকে মেয়ে কে দিবে? আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগে উমাইন বললো। 

– নিজেকে কি বেশ সাহসী মনে করেন নাকি? বেশ ক্ষোভের সাথেই বললাম। 

– উমাইন তুই কি সারাজীবন এমনই থাকবি? স্নিগ্ধার মা হাস্না বেগম কিছুটা বিরক্ত নিয়ে বললেন। 

– চাচী তুমি জাননা, যে ব্যাঙের ভয়ে লাফিয়ে পড়ে সে বৌয়ের মত ভয়ানক চিজ হ্যান্ডল ক্যামনে করবে? বলেই উমাইন হাসতে থাকে। 

ক্ষোভের আগুনে তাকিয়ে থাকলাম উমাইনের দিকে। ভাবতে থাকলাম আজ রাতেই তাকে ভয় কাকে বলে সেটা শিখিয়ে দিব। এমন সময় সে বলে-

– কি ভাবছেন মশাই? আজ রাতে আমাকে ভয় দেখিয়ে বুঝিয়ে দিবেন ভীতুর ডিম কাকে বলে, তাই না? কোন লাভ নাই। বলেই হাসতে লাগলো। 

আমার ভাবনার কথা ওর মুখে শুনে বেশ অবাকই হলাম। যেহেতু সে বুঝেই গেছে তাই এই পথ থেকে সরে আসলাম। তবে আমার প্রচুর এক জেদ কাজ করছিল উমাইনের উপর।

৫। 

বিকালে পাহাড়ের মনোরম লোকেশনে চলতে থাকলো আমাদের ফটো সেশন। কখনো সিঙ্গেল আবার কখনো বা গ্রুপে। স্নিগ্ধা আর আমি বেশী ছবি তুললাম। খেয়াল করলাম উমাইন এর ছবি তোলার প্রতি তেমন আগ্রহ নেই। সে কেমন যেন মন মরা হয়ে আছে। চোখের নিচে কালি দেখে বোঝা যাচ্ছে কোন এক অজানা শঙ্কায় আছে সে। 

কেন জানি স্নিগ্ধা আর উমাইন এর মাঝে সখ্যতা আমাকে মাঝে মাঝে একটু জ্বালাও ধরিয়েছে। 

সেই জ্বালা বেশীক্ষণ থাকেনি। কারন স্নিগ্ধার মুখে যখন জানতে পারলাম এই জগতে উমাইন এর আর কেউ নেই। সিডনীতে এক সড়ক দূর্ঘটনায় তার বাবা, মা আর একমাত্র বোন নিহত হয়। ভাগ্যের জোরে উমাইন বেঁচে যায়। এর পর থেকেই উমাইন তার চাচার কাছে এই দেশে থাকতে শুরু করে। 

সিগারেটের তেষ্টা পেলে এক কোনায় এসে ফুঁকতে শুরু করি। বুক ভরে সিগারেটের ধোয়া নিচ্ছি আর নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া নির্গত করছি। উমাইন সেখানে উপস্থিত। 

– ধোঁয়া গিলে কি লাভ?

– এইটা যে কি লাভ তা পুরুষ মানুষ জানে। ব্যঙ্গ করতে পেরে মনে মনে ভালই লাগলো। 

– নিজেকে কি আপনি পুরুষ দাবী করেন?

মেজাজ আমার সপ্ত আসমানে পৌছাল। 

– এই ছেলে তুমি নিজেকে কি মনে কর? যখন তখন তুমি আমাকে যা খুশী তা বলে যাচ্ছ। 

– কিছুইনা। আমি নিজেকে শুধুমাত্র একজন সাধারন মানুষ মনে করি। 

– প্লিজ তুমি আমার সামনে আর আসবে না। তোমাকে একদম সহ্য হয় না। 

– ঠিক আছে। আসবো না। 

৬।

সন্ধ্যায় সবাই বসলাম খোশ গল্পে। লক্ষ্য করলাম উমাইন সেখানে নেই। তার অনুপস্থিতি আমার মনে কেমন যেন এক টানের সৃষ্টি করলো। আমার মত স্নিগ্ধার মায়ের চারপাশে চাহনি শুধু উমাইনের জন্য। তিনি উমাইনের মাঝে তার ছেলে না থাকার কষ্টকে ভুলে গেছেন। মায়ের উতলা ভাব দেখে স্নিগ্ধা-

– মা তুমি এত ভেব না। আছে হয়ত কোথাও। দাঁড়াও আমি খুঁজে নিয়ে আসছি। 

মিনিট পাঁচেক পরে স্নিগ্ধা উমাইনকে নিয়ে হাজির। 

– মা তোমার উমাইন সেই পাহাড়ের ঢালে গুন গুন করে গান করছে। জোর করে ওরে এখানে আনলাম। 

– বাবা উমাইন তুই সেই গানটা এখানে আমাদের গেয়ে শোনানা। হাস্না বেগম আদরের গলায় বলে। 

উমাইন কিছুক্ষণ নিরব থেকে সুর তুলে তার গীটারে। গলায় সুর তুলে লালনের বিখ্যাত “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়? তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়” গানটি। 

উমাইনের গাওয়া গানটা আমার বুকে তোলপার সৃষ্টি করলো। নির্বাক শ্রোতার ন্যায় শুনতে থাকলাম উমাইনের গাওয়া গান। গীটারেও যে এত সুন্দর করে এই গান গাওয়া যায় তা আমার বোধগম্য ছিল না। লালনের এই গানটি যেন এর আগে আর কেউ ভাল করে গায় নি। মনে হচ্ছিল ওর জন্যই লালন এই গানটা গেয়েছেন। 

৭। 

গানের শেষে উমাইনের অশ্রুসিক্ত চোখ আমার মনে অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি করলো। মনে হতে লাগলো উমাইনের সাথে একটু বেশী দূর্ব্যবহার করে ফেলেছি। মনের মধ্যে কেমন এক অনুশোচনা কাজ করতে লাগলো। উমাইনের সাথে কথা বলার চাহিদা অনুভব করলাম। 

উমাইন গান শেষ করে রিসোর্টের রুমে চলে গেল। আমিও তার সাথে সাথে গেলাম। 

– আসতে পারি?

– এসেই তো পড়েছেন। হঠাৎ আমার এখানে?

– আমার কি এখানে আসতে নিষেধ আছে নাকি? 

– স্নিগ্ধা জানলে খুব কষ্ট পাবে। 

– স্নিগ্ধা কেন কষ্ট পাবে? 

– খুব স্বাভাবিক। কারন আর ক’দিন পরেই আপনারা বিয়ে করতেছেন। 

– কিসব অসংলগ্ন কথা বার্তা বলছো। স্নিগ্ধাকে বিয়ে করছি এটা কে বললো? আর বিয়ে হলেই কি আমি তোমার ঘরে আসতে পারবো না? 

– স্নিগ্ধা কিন্তু আমার বিষয়ে অবগত। আর………।

– আর কি? 

– বাদ দিন। 

– বাদ দিতে তো আসিনি। 

উমাইন কেন জানি বিছানা থেকে উঠে এসে আমাকে বের করে দেওয়ার জন্য উদ্যত হল। আমারও খুব জেদ চাপল বিষয়টা না জেনে সেই রুম থেকে না যাওয়ার। 

উমাইন যখন বেশ জোর করতে লাগল তখন ওকে এক ঝটকায় ধাক্কা মেরে রুমের দরজা বন্ধ করে দিলাম। উমাইন কে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরলাম। এক দৃষ্টিতে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম বেশ খানিক ক্ষণ। বললাম-

– তোমার কিসের এত অহংকার? কেন এমন করছো? 

আমার কথা শুনেও উমাইন চুপ করে থাকে। আমার সহ্যের মাত্রা যেন শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় উমাইন মুখ খুলে। 

– এমন করে কি দেখছো? 

– তোমাকে। বলেই আমি আমার ঠোঁট দুটো উমাইনের ঠোঁটে চেপে ধরলাম। 

কিছু সময়ের জন্য উমাইন সাড়া দিয়েও আমাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল। 

– শুভ্র এ হয় না। কখনো হবার নয়। 

– আমি যে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। 

আমার মুখে ভালোবাসার কথা শুনে উমাইন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। জোর গলায় স্নিগ্ধাকে ডাকতে লাগল। 

উমাইনের ডাকে স্নিগ্ধাও দ্রুত চলে আসে। 

– কিরে তুই এমন উম্মাদের মত করছিস কেন?

– আরে খুশীতে। তুই হেরে গেছিস। আমি জিতে গেছি। 

– কিসের জয় পরাজয়? আমি বিস্ময়ের সহিত স্নিগ্ধাকে জিজ্ঞাস করলাম। 

আমার প্রশ্ন শুনে স্নিগ্ধা মৃদু স্বরে বলতে শুরু করে তার আর উমাইনের মাঝে কিছু আগের কথা। 

– জানিস স্নিগ্ধা তোর বন্ধু মানে তোর হবু হাবি কে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। 

– শুভ্র আমার বন্ধু, হবু বর নয়। দেখিস আবার নজর দিস না যেন। তুই তো আবার… 

– শোন আমি সমপ্রেমি হলেও হি বা শি যে কাউকেই আমার প্রেমে আনতে পারবো। 

– যত যাই করিস না কেন আমার শুভ্রকে তুই কখনও পারবিনা। 

– হয়ে যাক বাজি। 

– ওকে ডান। 

স্নিগ্ধার মুখে এমন শুনে আমি যেন শুণ্যে ভাসতেছিলাম। কিছুতেই আমি উমাইনের চোখে আমার ভালোবাসার কথাকে ভুলতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম আমার প্রথম চুম্বনে তার কিছু সময়ের সাড়া দেওয়া কি করে মিথ্যা হয়। 

আমার এমন চাহনি দেখে স্নিগ্ধা আবার বলতে শুরু করে।

– দেখ শুভ্র। তুমি আমার খুব ভাল বন্ধু। তোমাকে যে কোন মেয়েই চাইবে স্বামী হিসাবে পেতে। আমিও চাই। সত্যি বলতে কি আমি তোমাকে যতই ভাল বন্ধু মনে করি না কেন হয়ত প্রেমিক ভাবিনি। তেমনি হয়ত তুমিও। তুমি ভেবনা উমাইন কে তুমি ভালোবাসলে আমি খুব কষ্ট পাব। যে কষ্ট পাব সেটা হবু বর হারানোর। তা খুব সাময়িকই হবে। আমাকে নিয়ে তুমি ভেবনা। বলেই স্নিগ্ধা হাসতে লাগলো। 

স্নিগ্ধার কথা শুনে উমাইন হাসতে হাসতে অস্থির। বলতে থাকে-

– আরে তুই দেখি হাজি মোঃ মহসীনকেও হারিয়ে দিলি। আরে পাগলি আমি ঐ ভীতুর ডিমকে ভালোবাসিনা। তোর সাথে বেট ধরেছিলাম। জিতে গেছি। এখানেই কিসসা খতম। 

উমাইনের কথা শুনে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। সজোরে এক চড় বসিয়ে দিলাম উমাইনের গালে। সেখান থেকে বের হয়ে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। 

৮।

উমাইনকে আঘাত করে এসে নিজে শান্তি পাচ্ছিলাম না। কখন যে ওকে ভালোবেসে মনের ঘরে ঠাই দিয়েছি তা মনেই ছিলনা। আমাকে নিয়ে উমাইনের মন্তব্যও আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। ঘৃণা হচ্ছিলো। নিজেকে নির্বোধ মনে হচ্ছিল। হঠাৎ আমার রুমের দরজায় নক শুনতে পেলাম। 

– কে?

– শুভ্র তুমি দরজা খোল। 

– স্নিগ্ধা তুমি আমাকে একটু একা থাকতে দাও। 

– দরজা খোল। জরুরী কথা আছে। 

দরজা খুলে দিয়ে চুপচাপ এসে বসে রইলাম। 

– শুভ্র তুমি উমাইনকে এভাবে আঘাত করে ঠিক কর নি। 

– আমাকে নিয়ে ও এভাবে খেলতে পারলো? 

– ও মোটেও তোমাকে নিয়ে খেলা করেনি। শুধু তার এই স্বল্প জীবনের সঙ্গী হিসাবে তোমাকে জড়াতে চায়নি মাত্র। 

– কি বলছ এসব? 

– উমাইন যখন সড়ক দূর্ঘটনায় তার পরিবারের সবাইকে হারায়, তখন ও ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেলেও জানতে পারে তার শরীরে মরন ব্যাধি ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে। একিউট লিউকেমিয়া। এডভান্স স্টেজে আছে। সর্ব হারা উমাইন তাই জীবনের শেষ কয়েকটা দিন কাটাতে চলে আসে আমাদের কাছে। আমরা ছাড়া ওর আর এই পৃথিবীতে আপন কেউ নেই। তোমাকে বলবো ভেবেছিলাম। কিন্তু উমাইন নিষেধ করেছিল। ও চায় নি তোমাকে কষ্ট দিতে। মজার বিষয় কি জানো? যেদিন বৃষ্টির রাস্তায় তোমার সাথে ওর দেখা হয় সেদিন সে তোমাকে পছন্দ করে। আমাকে বলেছিল, “জানিস। আজ এক অচিন পাখি দেখলাম। খুব ইচ্ছে করছিল ওকে ভালোবাসতে। জীবনে জড়াতে। কিন্তু আমার নিজেরই যে একদম সময় নেই রে”। বলেই সে অঝোরে কেঁদেছিল। নীলগিরিতে এসে তোমাকে দেখে সে তার না পাওয়া হাতে পায়। কিছু আগে আমি জানতে পারি সে আমার সাথেও মিথ্যা বলেছে, এই যে সে তোমাকে খুব ভালোবাসে। প্রথম দর্শনের ভালোবাসা যাকে বলে। 

এসব বলতে বলতে স্নিগ্ধার গলা ধরে আসলো। ডুকরে কেঁদে দিল। 

স্নিগ্ধার কাছে উমাইনের এমন কথা শুনে আমি যেন জমে যাচ্ছিলাম। পাথরের মূর্তির মত বেশ কিছু সময় বসে রইলাম। কিছু সময়ের মৌনতা ভেঙ্গে স্নিগ্ধাকে জিজ্ঞাস করলাম- কোথায় আমার উমাইন? 

৯। 

রিসোর্টের কাছেই একটু ঢালুতে বসে উমাইন গুন গুন করে গাইতেছিল আর অঝোর ধারায় তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। 

আমি যেয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রাখলাম। তার কাঁধে হাত রাখতেই সে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো- 

– জীবনটা বেশ সুন্দর। আমি আরো অনেক দিন তোমার হাত ধরে কাটাতে চাই। আমি তোমাকে ছেড়ে এই সুন্দর পৃথিবী থেকে এখনি চলে যেতে চাই না। আমি আমার শুভ্র বাবুটার জন্য বাঁচতে চাই। কেন তোমাকে আমার এই শেষ বেলাতে পেলাম? খোদা কি আমাকে আরো শত বছর আয়ু দিতে পারবেনা? যাতে আমার বাবুকে নিয়ে দূর দূরান্তে ছুটে যাব আর আমাদের ভালোবাসার স্মৃতি স্থাপন করবো। 

উমাইনের কথা শুনে আমি নিজেও স্থির থাকতে পারলাম না। তাকে আমার বুকে জড়িয়ে ধরে আমিও কাঁদতে থাকলাম। বললাম-

– বাবু আমার। আমাদের প্রতিটা সেকেন্ড হবে একেকটা বছরের সমান। আমার সমস্ত স্বত্বা তোমাকে দিলাম। বলেই উমাইনের কপালে চুমু খেলাম। 

১০। 

– এই যে শুভ্র মশাই। রাস্তা ঘাটে বৃষ্টিতে কোন যুবক দেখলেই শুধু উমাইন মনে হয়, তাই না? একদম ঘাড় মটকে দিব বলে দিলাম। কতবার না বলেছি, সবার মাঝে আমাকে খুঁজবে না। আমার যে খুব কষ্ট হয়। 

– ওকে আমার সোনা বাবুটা। আমার এই ভুল আর কখনো হবে না। তুমি কষ্ট পেলে যে আমিও অনেক কষ্ট পাই। 

———- 

আজ পাঁচ বছর হল উমাইন এই পৃথিবীতে আমাকে একা করে চলে গিয়েছে। এই সময়ে একটি বারের জন্যও আমার মনে হয় নি ও আমার থেকে যোজন যোজন দূরে। বরং প্রতিনিয়ত মনে হচ্ছে সে আমার অতি নিকটে। এখনও অপেক্ষায় আছি তাকে একেবারে ধরে ফেলার। মনবেড়ি তার পায়ে দেবার। যাতে সে আমাকে আর একা ফেলে কোথাও যেতে না পারে।

উৎস: অন্যভুবন

প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ১৩, ২০১৬

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.