এম ডি রহমান

আলস্য দুপুর, টেবিলে বসে পা নাচাতে নাচাতে বই পড়ছি। ইদানীং প্রতিদিনকার রুটিন একই রকম ঘুম, খাওয়া, বই পড়া, মুভি দেখা আর ঘরের মেঝে পরিষ্কার করা৷ লকডাউনের এই সময়টাতে প্রতিদিনই আমি ঘরের মেঝে পরিষ্কার করি যা আগে একদমই করা হতো না।

সারাদিন খুঁজেও আর কোন কাজ পাইনা৷ নানান বাহানায় দুইদিনে একবার বাসার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করি৷ রাস্তাতে একটু হেঁটেই  আবার ফিরে আসি। এই একাকীত্ব সময়টাতে স্বস্তির জায়গা বলতে ডেটিং বা হুকআপে যাওয়া একটা অপশন হতে পারতো। কিন্তু এই ছোয়াচে রোগ কোন অপশনই খোলা রাখেনি, তবুও ডেটিং এপস গুলোতে নিয়মিত ঢুঁ মারি। অনেকের সাথে কথাবার্তা হয়, আর লক-ডাউন শেষ হলে দেখা করার একটা প্লান ঠিকই করা হয়। তবে শেষমেশ আর যোগাযোগ থাকে না। আবার অনেকে ভাইরাসের ভয়াবহতা মনে করিয়ে দিয়ে বলে আমরা যদি স্বাস্থ্যবিধি মনে চলি তাহলে কোন ভয় নেই। বিষয়টা হাস্যকর মনে হলেও আমাদের মানসিক বিপর্যস্থতা থেকে মুক্তি পেতে এটার দরকার খুব ছিল। 

বই পড়ছিলাম “জজ অরওয়েলের” একটি ছোট গল্প “শুটিং অ্যান এলিফ্যান্ট”। গল্পের হাতি যখন বাজারে ঢুকে ভেঙে তছনছ করছে তখনই আমার পায়ের কাছে এসে পাঁচ দাঁত বের খিল খিল হেসে, কোলে উঠতে চাইছে আমার ছোট্ট মামাতো ভাইটি। ওর বয়স কিছু দিন আগেই একবছর হল। ওর আসল নাম অবশ্য অনেক গুলো তবে আমি কোনটাই মনে রাখতে পারিনা৷ তবে আমি ওকে নকলু বলেই ডাকি। ছোট বেলায় নকলু নামে আমাকেও ডাকা হতো। এই নামে কেও আদর করে ডাকলে ভীষণ ক্ষেপে যেতাম কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম নকলু নামটা শুধু আমার নাম না, তখন খুব মন খারাপ হতো। হতো। আমি বড় হলাম পরবর্তীতে আমার ছোট বোনকে নকলু বলে ডেকেছে সবাই৷ তারপর থেকে আমাদের পরিবারে যে জেনারেশন আসছে সবারই প্রায় ছোট বেলার নাম ঐ নকলুই। তো আমাদের নকলুকে নিয়ে দিনের বেশ খানিকটা সময় কাটে৷ ঢাকাতে আমি মামা, মামি আর নকলু একসাথে থাকি।

গল্পের মাঝে ঢুকে পরেছি কিভাবে ব্রিটিশ সাদা শাসকেরা বার্মিজদের শোষণ করছে, বার্মিজরা নিচু জাতের হলদে অসভ্য মানুষ মনে করে এসব ব্যাখ্যা দিচ্ছে লেখক। কিন্তু নকলু আমাকে আর গল্পের ভিতর থাকতে দিতে চাইছেনা৷ সে চাইছে আমি যেন তার সাথে খেলা করি, সে তার দিকে আমার মনোযোগ চাইছে। নানা ভঙ্গিতে ভাষাহীন একটি ভাষায় শব্দ তৈরি করে আমার সামনে একটা কাল্পনিক চিত্র তৈরি করেছে, আমিও যেন সেটা বোঝার চেষ্টা করে টেবিল থেকে একটা কলম নিয়ে নকলুর হাতে দিই। নকলু কলমটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো তারপর চার হাত পা দিয়ে হামুর হেঁটে কিছুদূর সরে গেলো। এবার সে কলম দিয়ে হাতে গায়ে আঁকিবুঁকি করে আর মুখ দিয়ে অদ্ভুত এক শব্দ করতে থাকে। যেহেতু নকলু আমাকে আর বিরক্ত করছে না তাই আমি আবার জজ অরওয়েলে মনোনিবেশ করলাম।

গল্পের প্রোটাগোনিস্ট একজন ব্রিটিশ পুলিশ বা শ্বেতাঙ্গ সাহেব তিনি সাম্রাজ্যবাদকে নিম্নমানের ব্যাপার বলে মনে করতেন। ব্রিটিশ দখল দারিত্ব আর আগ্রাসনকে পছন্দ করতেন না। আবার তিনি একই সাথে নিচু মনা, অসভ্য বার্মিজদেরকেও পছন্দ করতেন না। গল্পে তার এই দ্বিধান্বিত বেশ ভাবায়৷ এইতো পাঁচ দিন আগে আমেরিকার মিনেসোটাতে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ একজন কৃষ্ণাঙ্গ লোককে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেললো, সেই ভিডিও সারা বিশ্ব জুড়েই ভাইরাল হল। এখন সেখানে তীব্র প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। আচ্ছা এই আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ পুলিশটা কি কখনো মনে করেছে তিনি আমেরিকান আগ্রাসী মনোভাবকে পছন্দ করেন না বা রাষ্ট্র তাকে বর্ণবিদ্বেষী হতে বাধ্য করে। কিংবা পরিবার সমাজ তার সামনে দিনের পর দিন এক কাল্পনিক বাস্তবতার জাল তৈরি করে গেছে যে কৃষ্ণাঙ্গরা অসভ্য নিচুজাতি। এসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতেই নকলু আবার ফিরে এসেছে সে আর কলম দিয়ে একা একা খেলতে চাইছেনা। তখন বাধ্য হয়ে তাকে কোলে নিয়ে টেবিলে বসিয়ে দিলাম। তখন সে খাতায় আঁকি বুকি করতে শুরু করেছে। আমি তাকে পাখি, ফুল আর মাছ একে দেখাচ্ছি আর বলছি এটা মাছ, এটা পাখি, এটা ফুল। নকলু তখন শুধু চুপচাপ চোখ গোল গোল করে দেখছে। আমার সব সময় মনে হতে থাকে, আমরা প্রতিনিয়তই আমাদের তৈরি বাস্তবতা দিয়ে ওর জগতকে তৈরি করছি, আমাদের কাছে যা সুন্দর যাঅদ্ভুত সেটা ওর ক্ষেত্রেও একই রকম হবে। সেটা বর্ণবাদ হোক কিংবা যৌনতা !

প্রথম প্রকাশ
ঠাহর (দ্বিতীয় সংখ্যা)
মন্দ্র থেকে প্রকাশিত জেন্ডার, সেক্সুয়ালিটি এবং কুইয়্যার বিষয়ক ম্যাগাজিন

mondropublication Avatar

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.