নীলয় নীল

আজকের মত কমিউনিটিতে এতগুলো পরিচিত মুখ তখনো তৈরী হয় নি। বয়স সবে সতেরো ছুঁই ছুঁই। নিজের যৌন পরিচয়ের সাথেও খুব একটা পরিচিতি হয়নি। তবে শৈশব ছেড়ে যৌবনে পদার্পনের জন্য শরীর, মন তখন প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত। আর এই সময়ে নিজের সমপ্রেমী সত্তা নিজের মতো কাউকে খুঁজে চলেছে। হাতে নতুন স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট  পেয়েছি। ফেসবুক, গুগল তন্নতন্ন করে নিজের মতো কাউকে খুঁজছি। গুগলে পরিচিত দুইটা সংগঠনের নাম এবং রেইনবো প্রাইড সম্পর্কে জানতে পারি, আর ফেসবুকেও দুই তিনজনের সাথে পরিচয় হয়। এর মধ্যে নরসিংদীর একজনের সাথে পরিচয় হয়। তখন তার কাছ থেকে জানতে পারি গুলশান, উত্তরায় নাকি আমাদের মতো মানুষগুলো একত্রিত হয়। প্রত্যন্ত এই গ্রাম থেকে সেই পার্টিতে যোগদান করা আমার জন্য এক আকাশ-কুসুম স্বপ্ন মাত্র। তারচেয়ে বরং নয়া নয়া ফেসবুক আর ইন্টারনেট পেয়েছি এটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতাম। একদিন হঠাৎ বিবিসির খবর শুনতে গিয়ে জুলহাজ-তনয়ের সেই বিভীষিকাময় হত্যাকান্ডের খবর শুনতে পাই। অজানা এক আতঙ্কে আমার সারা শরীরে ভূমিকম্পের মতো কম্পন হচ্ছিল। এই ঘটনার  বেশ কিছুদিন আগে থেকে নিজের ধর্ম বিশ্বাস আর নিজের সত্তার সাথে সংঘর্ষ চলছিল। এর মধ্যেই এই ভয়াবহ ঘটনা আর এই ঘটনায় আমার কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা উচিত সেটা নিয়েও নিজের মধ্যে এক অমীমাংসিত দ্বন্দ্বে ভুগছিলাম। কারণ যাদের সাথে ধর্মীয় প্রচার-প্রচারণা করতাম এই ঘটনায় তারা ঈদের আনন্দ উদযাপন করছিল। এলাকার যারা কিছুটা খবর শুনতো তারও এই ঘটনার সাথে জড়িত সন্ত্রাসীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।  একদল জঘন্য সন্ত্রাসীকে আমার আশেপাশের মানুষের অন্ধ সমর্থন আমার পরবর্তী জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। যারা এই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে সমর্থন করেছিল চিরকালের জন্য তাদের সঙ্গ ত্যাগ করেছিলাম, ত্যাগ করেছিলাম সেই আদর্শ, যে আদর্শ একটি জঘন্য হত্যাকান্ডকে সমর্থন যোগায়। 

যে মানুষটাকে (জুলহাজ মান্নান) না দেখেও তার সাথে সাক্ষাৎ এর বাসানা জেগেছিল, এক অদৃশ্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মিশনে যার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আকাঙ্খা ছিল, সেই মানুষটার এমন চলে যাওয়া এখনও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করে। “রেইনবো প্রাইড” এর আয়োজনটা এতটা আলোচিত না হলে হয়ত আমাদের সেই সমাজ বিপ্লবের মহানায়ক আমাদের মাঝে যুগ যুগান্তর ধরে থেকে যেতো। তবে তারা আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেলেও, তাদের অস্তিত্ব মুছে যায় নি। তারা হয়তো প্রতি রাতের সন্ধ্যা তারা হয়ে আকাশে মিটমিট করে জ্বলতে থাকে। তাদের সেই মিটিমিটি জ্বলতে থাকা আলোকে আমরা কখনই হারিয়ে যেতে দেব না। একদিন অবশ্যই সেই আলোকে সূর্যের প্রখর তাপে পরিণত করব, যে তাপে সমাজের সমস্ত বৈষম্য পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। সেই লক্ষ্যেই আমাদের আগামীর পথচলা।

লেখকের অনুভুতি, অভিজ্ঞতা এবং মতামত একান্তই নিজের। ‘মন্দ্র’ এর অনুমতি ছাড়া এই লেখা পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না।

বিক্ষিপ্ত অনুভূতি একটি তনয়-জুলহাজ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত মন্দ্র আর্কাইভ সংকলন । এই সংকলনে কমিউনিটির বিভিন্ন মানুষ ঘটনা সম্পর্কিত নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন।

mondroadmin Avatar

Posted by

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.