দশ বছরে রূপবান: উত্থান ও পতন

বিশাল বড় এক মাঠ। শোরগোলে মশগুল। নানা পসরা সাজিয়ে মেলা জমজমাট। নানা রঙে ছেয়ে আছে – শামিয়ানায়, কাপড়চোপড়ে, সব জায়গায়। শত শত মরিচবাতিতে ঝিলমিল করছে। 

রূপবান-এর দশ বছর-পূর্তি অনুষ্ঠানটি এভাবেই কল্পনায় ছিল অনেক বছর। তবে এর কোনোটাই আজ হচ্ছে না। যেন হুট করে জ্বলে উঠা এক শিখা, গৌরবে নিজের জানান দিয়ে জ্বলতে জ্বলতে, হুট করে কয়েকজনের উদ্যোগে নিভিয়ে ফেলা হলো। জোর করেই। গায়ের জোরে।

একটু আবেগাপ্লুত হয়ে, নস্টালজিয়াকে আস্কারা দিয়ে লেখাটা যে লিখছি তা সম্পূর্ণ অসত্য নয়। দশ বছর আগে আমার স্পষ্ট মনে আছে – পুরো ভেন্যু সাজানো হচ্ছিল নানা আঙ্গিকে, সবার চোখমুখে আনন্দের ছাপ প্রকটভাবে লক্ষিত করা যাচ্ছিল, সাথে ভীত মনোভাব যে উঁকি দিচ্ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমি তখন খানিকটা গবেটই ছিলাম, কী হচ্ছে না হচ্ছে অত সব বুঝার চেষ্টাও করতাম না। একটা ম্যাগাজিন লঞ্চ হবে, নাম ‘রূপবান’ – তা আমি জানি, অল্প কাজও করা হয়েছে, তবে এই ম্যাগাজিন কী বার্তা নিয়ে আসবে, মুভমেন্টের ল্যান্ডস্কেপ কিভাবে চেঞ্জ করবে – আমি কোনো অনুমান করতে পারিনি। আমার বারবার ইচ্ছা করছিল বাসায় যেতে, কারণ অনেক মানুষ কাজ করছে, আবার অনেকেই আসবে যাদের আমি চিনি না, আমি তো সাংঘাতিক ইন্ট্রোভার্ট, তাই আমার জন্য ভারী লাগছিল। বেগুনী রঙের জামা পরেছে যারা নিজেদের রূপবান টিমের অংশ মনে করতো তারা, আমিও পেয়েছিলাম এক পিস কাপড় – সেটা দিয়ে পাঞ্জাবী বানিয়েছিলাম। বেগুনীতে সবাইকে বরণ করা হলো। হুট করে শুরু হয়ে গেল মানুষের আগমন, বেশীরভাগ মানুষজনকে আমি চিনতাম না, কিছু কিছু মানুষকে টিভিতে দেখছি – তাদের এখানে দেখবো তা ভাবতেও পারিনি। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে হুট করে শেষ হয়ে গেল – যেন মুহূর্তেই আমার চোখের সামনে একটা ইতিহাস গড়লো। ম্যাগাজিন উন্মোচিত হলো, মানুষজন বয়ান দিল – প্রকাশক, সম্পাদক সামনে এলো – সবাই সামিল হলো এই ইতিহাসে।

তারপর কী? রূপবান হয়ে গেল ‘কুইয়ার ভিজিবিলিটি’-এর এক অন্যতম অগ্রদূত। সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলোতে রাতারাতি খ্যাতি পেল, ম্যাগাজিনের চুলচেরা বিশ্লেষণ হতে লাগলো। সবার টনক নড়ল, এক্সট্রিমিস্ট থেকে সরকারের আমলা পর্যন্ত – কী এই রূপবান? এতো ক্যাচাল করছে কেন? 

রূপবান সৃষ্টির গোঁড়া থেকে না থাকলেও, প্রথম সংখ্যা বের হওয়ার আগে অল্প কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। লঞ্চ হবার পর এডিটরিয়াল টিমে জায়গা পেলাম, বিশেষ সহকারী হয়ে গেলাম, আর তৃতীয় সংখ্যায় সাব-এডিটর, এক পর্যায়ে এডিটর পদ প্রায় স্পর্শ করে ফেলেছিলাম – তবে পলিটিক্সের সুনিপুণ জ্বালে সব একাকার হয়ে সব পরিবর্তন হয়ে যায়। তারপরও ‘রূপংক্তি’ নামে প্রথম কুইয়ার কবিতার বই সম্পাদনার সুযোগ পাই, যা শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে – অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর পরের দিন। ওদিকে ‘ইতি রূপবান’ নামে এক চিঠির বইয়ে লিড হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয় ২০১৮ সালে গিয়ে। তবে এই বিশাল গ্যাপের মধ্যে যে উত্থান-পতন হয়ে গেছে – তা আঁচ করতে পেরেছে ভালোভাবেই। 

‘রূপবান’ বাংলাদেশের প্রথম এলজিবিটি+ ম্যাগাজিন, যা কুইয়ার ভিজিবিলিটেতে এক আমূল পরিবর্তন এনেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই, তবে পাশাপাশি ‘রূপবান’ ম্যাগাজিন পরিচয়ে থাকবে না সংগঠনে যাবে এই নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই বিরোধ ছিল। নানা হুমকি, নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে, ২০১৪ সালের মাঝামাঝি দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশ হলেও, একটু গোপনেই রাখা হয় ব্যাপারটা। দুটো সংখ্যার মধ্যে বিরাট ফারাক – কনটেন্টে বিশেষ করে, কারণ প্রথম সংখ্যা খোদ কমিউনিটির মানুষজন ‘এলিট’ বলে আখ্যা দিয়েছিল, তাই ক্লাসিজমের তকমা নিয়ে দ্বিতীয় সংখ্যা ‘গ্রাসরুটস’-দের টানতে এক প্রয়াস করা হয়। পুরোপুরি যে জয় পেয়েছে – তা বলা সম্ভব নয়। নানা প্রতিকূলতায়, ইন্টারনাল টিমে নানা মত বিরোধের মধ্যেই রূপবান একে একে অনেকগুলো মাইলফলক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। পহেলা বৈশাখে চারুকলার সামনে সেই মঙ্গল শোভাযাত্রার পিছনে ‘বৈচিত্র্য র‍্যালি’ করার দুঃসাহস ম্যাগাজিন লঞ্চিং-এর তিন মাস পরেই করে তারা, যা ২০১৫ সালেও হয় তবে টিএসসিতে নারী লাঞ্ছনার ঘটনার কারণে অত লাইম লাইটে আসেনি, কিন্তু ২০১৬ সালে সম্মুখীন হয় সাংঘাতিক বিরোধিতার। 

রূপবান ‘ট্রান্স-শো’, ‘পিংক স্লিপ – হেলথ ক্যাম্প’, ‘ইয়ুথ লিডারশীপ প্রোগ্রাম’ এর মতো অনেক নতুন, চমৎকার কাজ করবার সত্ত্বেও, দ্বিতীয় সংখ্যা বের করার পর সম্পাদক ও প্রকাশকের মধ্যে রূপবানের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধের জেরে সম্পাদক বের হয়ে যাওয়ার পর তৃতীয় সংখ্যা আজ অবধি বের করতে পারেনি রূপবান টিম। যদিও সম্পাদক বের হবার পর নতুন করে তৃতীয় সংখ্যার কাজ তুলে নেয় নতুন টিম, সেখানে আমি জায়গা না পেলেও, খানিকটা কাজ করবার সুযোগ পেয়েছিলাম – তবে সেই প্রিন্টেড ম্যাগাজিন করার অভিপ্রায় কারোর মধ্যেই উপস্থিত ছিল না। শুধুমাত্র প্রকাশকের গায়ের জোরেই তারা কাজ করছে। করতে হবে এমন এক মনোভাব কোনোভাবেই একটি ক্রিয়েটিভ কাজকে ত্বরান্বিত করে না। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে যাই বলুক না কেন সম্পাদক-এর ভিশন রূপবান ম্যাগাজিনের মূল চালিকাশক্তি ছিল। ম্যাগাজিন দিয়ে শুরু হলেও সংগঠনটি এনজিও মডেল ফলো করাতে বাধ্য হয়েছিল কারণ তখনকার টিম, লিডার তাই কায়েম করতে চাচ্ছিল – তাই ম্যাগাজিনের গুরুত্ব লাঘব হয়েছিল। তবে এরই মধ্যে ‘রুপংক্তি’র কাজ হয়, ‘ইতি রূপবান’-এর কাজও বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিল। রূপবানের পরিবর্তন কেন জানি আমার নিজের কাজের সাথে যাচ্ছিল না, তাই হুট করে ২০১৫ সালে মার্চের শেষের দিকে সরে আসি। যদিও পরে খুচরা কিছু কাজ করে দেই, তবে দূরত্ব ভালোভাবেই পাকাপোক্ত হয়ে উঠছিল। হয়তো এমন কড়া কথাগুলো শুনতে কটু লাগবে, বা আমাকে তুচ্ছ করার এক প্রচেষ্টা হবে – তবে যা বলেছি তা আমার অভজার্বেশন, এক্সপেরিয়েন্স থেকেই বলা। রূপবান সম্পাদক ছাড়া কিছুই না তা সত্য নয়, যারা টিমে কাজ করেছে, সামনে চালিয়ে নিয়ে গিয়েছে তাদের কাজের প্রতি আমার অবশ্যই শ্রদ্ধা আছে। ম্যাগাজিন অবশ্যই এক ইমপ্যাক্ট তৈরি করেছে, তবে সেই ম্যাগাজিনের দুটো সংখ্যার কন্টেন্টগুলো কেমন ছিল, কতটা এক্সেসেবল ছিল, আদৌ তা কমিউনিটির ভয়েসগুলো রিফ্লেক্ট করেছে কিনা তা অবশ্যই ক্রিটিসিজমের আওতায় পড়ে।

২০১৬ সালের ‘বৈচিত্র্য র‍্যালি’ করতে গিয়ে যখন রূপবান সাংঘাতিক ভাবে আক্রমণের শিকার হলো – যেমন এক্সট্রিমিস্টরা কাউন্টার ইভেন্ট তৈরি করে ‘সবগুলোকে হত্যা করা হবে’ বলে সবাইকে আহ্বান জানালো, অনেক ধানাইপানাই করে র‍্যালি বন্ধ করা হলো, তবুও সেখানে কিছু মানুষ গেল – গ্রেফতার হলো, তারপর নানা হুমকিধামকি আসতে লাগলো, তারপর ২৫শে এপ্রিল রূপবানের হেড জুলহাজ মান্নান, আর জেনেরেল সেক্রেটারি মাহবুব রাব্বি তনয়, জুলহাজের কলাবাগান বাসায় নিহত হয় জঙ্গিদের দ্বারা। পুরো মুভমেন্টের অবস্থা পাল্টে গেল, নিরাপত্তার জন্য সবাই আশ্রয় খুঁজার জন্য মরিয়া উঠলো। রূপবানকে চিরকালের জন্য বন্ধী করে ফেলা হলো। সব বাজেয়াপ্ত হলো, পরে কিছু জিনিস ফেরত দেওয়া হলেও – এই সুযোগে রাষ্ট্র থেকে কমিউনিটির সবাই ‘রূপবান’-কে আনসেইফ তকমা দিয়ে দিল। পতন জোর করেই আনা হলো। 

রূপবানের সাবেক কর্মীরা, নতুন কিছু মানুষজনের সাথে শুরু করতে চাইলেও তা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। অ্যাট লিস্ট শেষ প্রজেক্ট’ ইতি রূপবান’ উদ্ধার করে শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হলো, আর ওভাবেই ২০১৮ সালে আমার আবার প্রত্যাবর্তন রূপবান-এ। এক নতুন টিম শেষ করলো কাজ, আমি নিজেও ২০১৯ সালের শেষ অবধি থাকলাম। রূপবান ঘোষণা দিল যে তারা শুধু ‘রূপবান’-এর লেগ্যাসিকে রক্ষা করবে, নতুনভাবে কাজ করবার খায়েশ তাদের নেই। 

রূপবানের উত্থানের পিছনে যারা রূপবান টিমে ছিল তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক যে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে তা অনস্বীকার্য। তবে উত্থান হলেই তো হয় না, টিকে থাকতে হয়। কুইয়ার মুভমেন্টে রূপবান যে ধরণের কাজ নিয়ে এসেছে, তার অনুকরণ করে এখনও অনেক সংগঠন কাজ করে। যে ধরণের এস্থেটিক তারা প্রচার করেছে, তা এখনও প্রভাব বিস্তার করছে। ২০১৬-এর পর এক অন্য যাত্রা শুরু হয়েছে বাংলাদেশের কুইয়ার মুভমেন্টে তা সত্যি হলেও, এক জিনিস খুব আমাকে পীড়া দেয় যে ‘রূপবান’ যেন অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। একসময় এরকম কিছু একটা ছিল যেন রূপবানের বর্তমান পরিচয়। আজ দশ বছরে ‘রূপবান’ এর দশা থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত। ‘রূপবান’ সারাজীবন আমার প্রিয় হয়েই থাকবে – আমার কাজকর্মের পাকাপোক্ত-ভাব সেরকম আসতো না, যদি রূপবান না থাকতো আমার জীবনে। 

দশ বছরে ‘রূপবান’-এর এই বর্তমান হাল মোটেও কাম্য নয়। তাই এই লেখাটা লিখে একটু ঋণ শোধ করবার চেষ্টা করলাম। ২০২১ সালে আগস্ট মাসে হত্যার এক প্রহসনের রায় হলেও, তা কার্যকর তো দূরের কথা হেইট ক্রাইমে যে আমাদের কমিউনিটিকে স্বীকার করতেই নারাজ। আর যে হারে হেট্রেড দেখা যাচ্ছে কমিউনিটি নিয়ে – আরেকটা ২০১৬ তো বেশিদূর নয়, যদিও আমি তা চাই না, কিন্তু ইতিহাস তো পুনরাবৃত্তি করতে পছন্দ করে। 

মন ভার করে বলতেই হচ্ছে, রূপবান এক মরীচিকা হয়ে ইতিহাসের পাতায় মাঝেমধ্যে উঁকিঝুঁকি দিবে। 

mondroadmin Avatar

Posted by

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.