ভ্রমণ

লিখেছেনঃ অণু ইসলাম

তনয়, তুমি বিশ্বাস করতে আত্মা অবিনশ্বর। এখন আমারও মনে হয় তা। মনে হয়, ২০১৬ সালের ২৫শে এপ্রিল তোমার শরীরটা হারিয়ে গেছে, কিন্তু তুমি আছ আজো আমাদের মাঝে।

আজ ২৫শে মার্চ, ২০১৭। ঠিক এক বছর আগের সন্ধ্যায় তোমার সাথে শেষ দেখা, শেষ আড্ডা, শেষ ভ্রমণ।

ভ্রমণ! এটাকে কি ভ্রমণ বলা যায়? অনেক সময়ই আমরা বিভিন্ন আড্ডা বা অনুষ্ঠান শেষে একসাথে ফিরতাম। একটু বেশি সময় কথা বলার জন্য আমরা রিক্সায় উঠতাম। তুমি কখনো শেওড়াপাড়াতেই নেমে যেতে, কখনো বা আমার গন্তব্য মিরপুর ১২ পর্যন্ত এসে আবার ফিরতে নিজের ঠিকানায়। পান্থপথ থেকে মিরপুর ১২ পর্যন্ত পথটুকু একসাথে যাওয়াকে ভ্রমণ বলা যুক্তিযুক্ত কি না জানি না। তবে যদি পথের বিস্তৃতিকে বিবেচনা না করে আমাদের আলোচ্য বিষয়কে বিবেচনা করা হয় তবে এটা অবশ্যই ভ্রমণ। দুজনার মানসলোকে ভ্রমণ।

এরকম অনেকগুলো ভ্রমণের মধ্য দিয়েই আমাদের চেনাজানাটুকু হয়েছে। শুধু দুজনায় কাটানো সময় বলতে এই পথটুকু অতিক্রমের কালটুকুই।
আজ সেই পথটার কোল ঘেঁষেই শুয়ে আছ তুমি, শেষ শয্যায়। এই ব্যস্ত নগরীর একটি ব্যস্ত প্রধান সড়কের পাশেই ছায়াঘেরা এক কবরস্থানে। অন্যান্য কবরগুলো চারিধার ঘেরা নীল বা হলুদ রঙের বেষ্টনীতে। অথচ তোমার শয্যার চারপাশটা ঘেরা গোলাপি রঙের বেষ্টনীতে। প্রথমে ভেবেছিলাম তোমার স্বজনরাই বোধ হয় তোমার পছন্দের এই রঙটাতে রাঙিয়েছে তোমার শয্যা। কিন্তু পড়ে জেনেছি, সেটা নয়। এখানকার কর্মীরাই এই রঙটা বেছে নিয়েছে।

রঙ তুমি খুব ভালবাসতে। নানা রঙে সাজাতে চাইতে জীবনকে। নানা রঙের নানা মাত্রায় পৃথিবীকে উল্টেপাল্টে দেখতে তুমি। তোমার চব্বিশ বছরের নানা রঙে রাঙানো জীবন শেষ হয়ে গেলো ঘাতকের নির্মম আঘাতে। সেই সব ঘাতক, যারা নিজেদের সৃষ্টিকর্তা মনে করে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি বিচারের ভার ভার নিজেদের হাতেই তুলে নেয়।

অথচ প্রতিটি কাজেই তুমি সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে। নামায পাঁচ ওয়াক্ত পড়া না হলেও নামাযের মূল শিক্ষাটা ছিল তোমার প্রাত্যহিকতায়। ঈদুল আযহায় পশু কুরবানির সমস্ত আয়োজন নিজের হাতে করতে। পশু কেনা থেকে শুরু করে গরীবদের মাঝে কুরবানির পশুর গোশত বিতরণ করা পর্যন্ত সবকিছু নিজের হাতে করতে ভালবাসতে। প্রতিটি কাজের শুরুতে তুমি নির্ধারিত দোয়া পড়তে। আমি অবাক হতাম – এত দোয়া মনে রাখো কিভাবে? তুমি মিষ্টি হেসে বলতে – আগ্রহটাই সব। নইলে আমরা এত গান, এত কবিতা কিভাবে মনে রাখি বলেন?

বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তুমি এমন অনেক কথাও বলতে যেগুলো পরস্পরবিরোধী। আমি আর তোমার প্রেমিক – যে আমার খুব ভালো বন্ধু – দুজনে অনেক হাসাহাসি করতাম এটা নিয়ে।

আমরা খুব হাসতাম ভূতপ্রেতে তোমার বিশ্বাসের গভীরতায়। লালমাটিয়ার সেই বাসাটাতে নাকি ভূত ছিল। বাসাটার একটা ঘর বাড়িওয়ালা আসবাবে ভরা ছিল। তালা দেয়া থাকতো সেটা। সেই ঘরে না কি ভূত ছিল। বিশ্বাস করি বা না করি মুগ্ধ হয়ে আমরা তোমার ভূতের গল্প শুনতাম। কি সুন্দর করেই না বলতে তুমি! তোমার কণ্ঠস্বর, শব্দচয়ন আর অভিব্যক্তি আমাদের প্রভাবিত করতো।

অন্যকে প্রভাবিত করতে পারার বিষয়টি তুমি নিজেও জানতে এবং এটা নিয়ে এক ধরণের অহংবোধও ছিল তোমার।

আচ্ছা, তুমি কি কখনো টের পেয়েছ আমাদের হাসাহাসির বিষয়টা? আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে। যদি টের পেতে তবে কি তোমার ঐ মিষ্টি হাসিটা মলিন হতো? সেই হাসি – যা নিমেষেই মন ভালো করে দিত।

তোমার সাথে পরিচয়ের প্রথম ক্ষণটাতে তোমার এই হাসিটাই তোমার প্রতি আগ্রহী করেছিল। লালমাটিয়া সেই বাসায় প্রথম দেখা। ‘প্রণয়নামা’ নামের একটি অনুষ্ঠানের রিহার্সালে। অবশ্য পরে তুমি বলেছিলে, আমাকে প্রথম দেখেছিলে উত্তরায় একজনের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। পরিচয় হয়নি আমাদের। তাই আমার মনে ছিল না সেটা।

দেখা হলেই ঝলমলে হাসিতে মুখ ভরিয়ে তুমি সম্ভাষণ জানাতে। তবে যখন খুব বিরক্ত হতে বা রেগে যেতে কারো ওপর, তখন ঐ হাসিটা মুছে গিয়ে মুখটা থমথমে হয়ে যেত। তোমার রাগের প্রকাশ দেখিনি আমি। তবে তোমার মুখটা খুব খুব কঠিন হতে দেখেছিলাম দু’বার। একবার তোমার জনকের কথা বলতে গিয়ে। তারপর আর কখনো আমরা ঐ প্রসঙ্গে কথা বলতাম না। আরেকবার তোমার ত্রিভুজ প্রেমের অদ্ভুত একটা টালমাটাল সময়ে। যখন তুমি তোমার সেই সময়ের প্রেমিকের কাছ থেকে তোমাদের প্রেমের সম্পর্কের প্রকাশ চাইছিলে। তার সঙ্গে তোমার সম্পর্কের স্বরূপ জানতে চাইছিলে। খুব কঠিন মুখে তুমি প্রশ্ন তুলেছিলে – তাহলে ওনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটার নাম কি? আমি কে তার? বন্ধু? প্রেমিক? না কি রক্ষিতা?

তোমার রাগী, ব্যথাহত, আপাত অসহায় মুখটার দিকে আমি চাইতে পারছিলাম না। উত্তর দেওয়া তো পরের কথা।

তুমি উতলা হয়েছিলে তোমাদের সম্পর্কের স্বীকৃতির জন্য। পাওনি বলে গভীর হাহাকার ছিল তোমার মনে। কিন্তু আমি অবাক হয়েছি পরবর্তীতে ত্রিভুজের তৃতীয় বিন্দুর সাথে তোমার সম্পর্ক যখন থিতু হল তখন সেই সম্পর্কের ঘোষণা দিতে চাইলে না। মনে পড়ে একটা রিক্সা ভ্রমণের পুরোটা সময় আমরা এটা নিয়েই কথা বলেছিলাম? তখন তুমি বলেছিলে তোমার প্রেমের সম্পর্ক যখন ঘোষিত হয় তখন তোমার প্রেমিকের মনে তোমার জন্য আকুলতা আর আগের মত থাকে না। অতীতে সবগুলো সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে। তাই তুমি ভয় পাচ্ছ। তোমার ভয়টাই সত্যি হল অন্যভাবে। সম্পর্কের স্বীকৃতির পর প্রেমিকের আকুলতা হারাল না কিন্তু তুমি হারিয়ে গেলে পৃথিবী থেকে।

একবারই কাঁদতে দেখেছিলাম তোমাকে। তোমাদের ত্রিভুজ প্রেমের জটিল সময়টায় তোমাদের তিনজনকেই কাঁদতে দেখেছি আমি। তুমি এবং তোমার দুই প্রেমিক – তিনজনেরই বন্ধু এবং বড় ভাই আমি। তাই তিনজনকে অনেক কথা বলতে আমাকে। অনেক প্রশ্নের উত্তর চাইতে। কিন্তু কি বলবো আমি? তোমরা তিনজনই যার যার জায়গায় সঠিক ছিলে, আবার তিনজনেরই ভুলও ছিল বলে আমার মনে হতো। কিন্তু কোন উত্তর আমার জানা ছিল না। খুব অসহায় বোধ করতাম। তিনজনকেই আমি সুখী দেখতে চাইতাম। কিন্তু তা সম্ভব ছিল না। যেহেতু তোমার প্রেমিক-দ্বয় আমার পুরনো বন্ধু এবং তাদের বন্ধুত্বের মাঝখানে এসে পড়েছিলে তুমি সেহেতু আমি তোমাকেই দায়ী করতাম এই পরিস্থিতির জন্য।

তুমি কি খুব রাগ করেছ একথা জেনে? খুব স্বার্থপর ভাবছ আমাকে? ভাবো। আমি আসলেই স্বার্থপর ছিলাম। আমি অনেককে বলেছিও তুমি আসলে ‘Attention Seeker’। শুধুমাত্র এই কারণেই সব জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে।

অবাক করা বিষয়টা হল আমাদের শেষ দিনের ভ্রমণটায় তুমি নিজের সম্পর্কে এই কথাটা বলেছিলে। তুমি বলেছিলে – ‘হ্যাঁ, আমি attention seeker। আমি সবসময় চাই আমার প্রেমিকের পূর্ণ মনোযোগ।

শুধু তোমার প্রেমিকের নয়। সবার মনোযোগ পেয়ে গেলে তুমি ঘাতকের আঘাতে তোমার মৃত্যুতে।

কিন্তু এমন মনোযোগ কি তুমি চেয়েছিলে?

তোমার শেষ শয্যার পাশ ঘেঁষেই আমার যাওয়া আসা। বাস বা রিক্সা থেকে তাকিয়ে থাকি ওদিকটায়। একটিবার তোমার হাসি মুখটা দেখতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয় আরও একবার তোমাকে নিয়ে রিক্সা ভ্রমণ করি। বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলি। মনে হয় এই বুঝি তুমি আমাকে দেখে হাসিমুখে সম্ভাষণ জানাবে – ‘আস সালামু আলাইকুম, ভাই’।
কিন্তু হায়! জীবন খুবই নির্মম।

তাই আমাকেই বলতে হয় – ‘আস্ সালামু আলাইকুম ইয়া আহ্ লাল কুরুব’।
‘হে কবর বাসী, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’।

প্রথম প্রকাশ ধী ব্লগ, একটি বয়েজ অফ বাংলাদেশ-এর উদ্যোগ। কপিরাইটঃ বয়েজ অফ বাংলাদেশ। অনুমতি ছাড়া পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.