“পাখির নীড়ের মত চোখ” যার তার কেন এত বেদনা?

লেখকঃ আলবাট্রস

আজকের এই লিখাতে আমি বাংলাদেশে কুইয়্যার কমিউনিটির প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতার মূলে যাওয়ার চেষ্টা করবো। বাংলাদেশে আমরা যে যৌন সহিংসতা দেখি, তার মূল অন্তত দুই জায়গায়: প্রথমত, একটা কারণ একেবারেই স্ট্রাকচারাল বা কাটামোগত। বলতে চাচ্ছি, সাংবিধানিক ও আইনী কাঠামোতে কুইয়্যার কমিউনিটির উপর সহিংসতার শাস্তি কী হবে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নাই। তারচেয়ে বড় কথা, দেশের সংবিধান এই জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায় না। ফলে, এ কমিউনিটির উপর সহিংসতা চলমান, এবং এর বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াতে পারছি না। 

দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো, রিপ্রেজেনটেশনাল। অর্থাৎ, যে পরিমাণে সহিংসতার ঘটনা ঘটে, সেগুলোর ১% ও আমরা দেখতে পাই না। টিভিতে বা সংবাদপত্রে আসে না।  যে কারণে সহিংসতার ধারনাটিই আমাদের কাছে অস্পষ্ট। ধরুন, ছোটবেলা থেকে আজ অবধি নারী-পুরুষ/নন বাইনারী নির্বিশেষে অনেকেই যৌননিপীড়কের চেহারা প্রত্যেক্ষ করেছি। কয় জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে? কত জন সাহস করে মুখ খুলেছে? একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন। আমার বিবেচনায় ১% ও না। এটাকে আমরা বলছি রিপ্রেজেনটেশনাল সমস্যা।  নারীরা বর্তমানে কিছুটা নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খোলা শুরু করেছে, কিন্তু কুইয়্যার কমিউনিটির পক্ষে সেটা অচিন্তনীয় ব্যাপার।

আমেরিকাতে ৯০ দশকে প্রফেসর ক্রেনশ “ইন্টারসেকশনালিটি” ধারনাটি হাজির করেন। তিনি বলতে চাচ্ছেন, একজন নারী প্রথমত নারীর অধঃস্তন সামাজিক অবস্থানের কারণে নির্যাতিত হয়। তারপরে তার রেসিয়াল ও এথনিক কারণে নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। এবং প্রতিটি আলাদা আলাদা পরিচয় তাকে আরো আরো বেশি সহিংসতার প্রতি ধাবিত করে। সোজা কথায়, একজন শ্বেতাঙ্গ নারীর প্রতি সহিংসতার ধরন ও মাত্রা এবং একজন আফ্রিকান-আমেরিকান নারীর প্রতি সহিংসতার ধরন ও মাত্রা একেবারেই আলাদা। শত শত বছর ধরে আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতনের যে ইতিহাস, সে ইতিহাসের সামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে কালো নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা অধিক। তাদের পক্ষে প্রতিবাদ করা অনেক বেশি কঠিন। বিচার লাভের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। বাংলাদেশে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বিভাজনের মত সামাজিক সমস্যা নেই। তবে বাংলাদেশে যে সমস্যা আছে সেগুলো হলো উপরোল্লিখিত কাঠামোগত ও রিপ্রেজেন্টেশনাল। এখানে নারী এবং কুইয়্যার কমিউনিটি উভয়ই নির্যাতিত হয় পুরুষতন্ত্রের কাছে। নির্যাতিত নারীর জন্য সংবিধান আছে, কিন্তু কুইয়্যার কমিউনিটির প্রতি নির্যাতনের বিচার করার জন্য আইন, আদালত, আইনজীবী, আইনী সেবা কোনটিই প্রতুল নয়। বাংলাদেশে একজন কুইয়্যার পার্সন যখন সহিংসতার শিকার হয়, স্বাভাবিকভাবেই কুইয়্যার হবার কারণে তারা খুব একটা বিচার পায়না। গরীব হলে বিচার পাবার আশাও অনেকে করে না। এমন বাস্তবতায় যদি সে গরীব, সংখ্যালঘু এবং “সিসি” (“নারীসুলভ আচরণ”) জনগোষ্ঠীর কেউ হয়, তাহলে তো আর কথাই নেই। বিচারের আশা করাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এখানে জটিল সমস্যা হলো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা  যা “কুইয়্যার”, “গরীব”, “সিসি” এসব আইডেনটিন্টিকে সহ্যই করতে পারে না।

সমাজের বিদ্যমান কাঠামোও আসলে কোন ব্যক্তিবিশেষ বা জনগোষ্ঠীর প্রতি সহিংস হওয়ার শক্তি যোগায়। আমরা যদি এ কাঠামোতে একজন কুইয়্যার পার্সনকে বিবেচনা করি, তাহলে যে যে কারণে তাদের প্রতি সহিংসতা এখনো টিকে আছে সেরকম কারণগুলোর একটি হলো-  অধঃস্তন সামাজিক অবস্থান। যতদিন পর্যন্ত কুইয়্যার কমিউনিটির অর্থনৈতিক মুক্তি হচ্ছে না, ততদিন তারা মার খাবে। নির্যাতিত হলেও ঘরে, বাইরে সবখানে চুপ থাকতে বাধ্য হবে। আপনার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের ভিতরেই লক্ষ্য করুন। কেউ না কেউ প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে। কিন্তু মুখ খুলছে না। বিচার চাওয়ার মত শক্তি, সাহস, সাপোর্ট কোনটাই তাদের নেই।

দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনাগুলো সমাজে ঘটতে ঘটতে এক ধরনের “স্বাভাবিকতা” তৈরি করে। যেটাকে আমরা ইংরেজিতে ”নরমালাইজেশন” বলে থাকি। মানুষ ধরইে নিচ্ছে- “এগুলো তো একটু-আধটু হয়-ই! অথবা “মেরে মেরে তোর মেয়েলী স্বভাব আমি শেষ করে দিব”-টাইপ মানসিকতা। এই ধরনের মানসিকতা অপরাধের বৈধতা দেয়। আপনার ঘরে ডাকাতি হলে বা আপনাকে কেউ ছুরিকাঘাত করলে আপনি থানায় মামলা করতে যান; কিন্তু পরিবারে-বাসে-কর্মস্থলে একটা কিশোর ছেলে অন্য কোন পুরুষ দ্বারা মলেস্টেশনের শিকার হলে কয়জন অভিবাবক মামলা করতে যায়? যারা যায়, তারাও হতাশ হন। এমন সহিংসতার খুব বেশি বিচার হয়না। অপরাধী নানাভাবে সহজে পার পায়। তারচেয়ে বড় কথা নানামুখী বাঁধা। পরিবারিক বাঁধা, সামাজিক লোক-লজ্জার বাঁধা, ভয়-ভীতি, আরো অনেক অনেক বাঁধা।

সবশেষে, আজকের আলোচনায় তিনটি বিষয় বোঝার চেষ্টা করেছি: স্ট্রাকচারাল সমস্যা, রিপ্রেজেন্টেশনাল সমস্যা এবং ইন্টারসেকশনালিটি।  বাংলাদেশে তিনটি সমস্যাই প্রকট। তাই আমাদেরকে সমাজের স্ট্রাকচারটার ভিতরে গিয়ে মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবারে, সমাজে, স্কুলে, পাবলিক বাসে, সবখানে কুইয়্যার কমিউনিটির জন্য সম-মর্যাদার একটা অবস্থান তৈরি করতে পারলে, কেবল তখনই নারী/পুরুষ/নন বাইনারী/কুইয়্যার কমিউনিটির প্রতি নির্যাতনের মাত্রা কমবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.