ডিজিটাল কুইয়্যার অনিরাপত্তাকরণ আইন ২০১৮

লিখেছেনঃ অন্যকথা

বাংলাদেশে কুইয়্যার এক্টিভিজম ও অর্গানাইজিং-এর বেশ বড় একটি অংশই পরিচালিত হয় অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। তাই যারা কুইয়্যার কমিউনিটিতে আছেন এবং যারা এক্টিভিজম ও অর্গানাইজিং-এর কাজের সাথে জড়িত আছেন তাদের সকলের জন্য এই “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮” সম্পর্কে জানা প্রাসঙ্গিক। যেমন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর ধারা-২৪ অনুযায়ী ফেক আইডি ব্যবহার করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কিংবা কুইয়্যার কমিউনিটির পক্ষে কোনো কিছু লিখলে, ২৮ ধারার আওতায় সেই লেখাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হতে পারে। আবার, কেবল মাত্র অনলাইন এক্টিভিটিস নয়, এই আইনের ৪৩ ধারামতে পুলিশ চাইলে, সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কোনো প্রকার গ্রেফতারী পরওয়ানা বা অভিযোগ ছাড়াই, একজন কুইয়্যার ব্যক্তির কর্মস্থল/আবাসস্থলে তল্লাশী করে, তার কাছে থাকা যে কোনো ধরনের জিনিস তল্লাশী ও জব্দ করতে পারে, সেই জিনিস ডিজিটাল নাও হতে পারে, হতে পারে কোন বই, পত্রিকা, ম্যাগাজিন ইত্যাদি। এছাড়াও এমন অনেকগুলো ধারা এই আইনে রয়েছে যা কুইয়্যার কমিউনিটির জন্য বিপদজ্জনক। সেই ধারাগুলো নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতার একবারে শেষ দিকে এসে, জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রচণ্ডভাবে সমালোচিত তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ সহ মোট ৫টি ধারা বিলুপ্ত করে, জাতীয় সংসদে কন্ঠ ভোটে পাশ করে “ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন’২০১৮”। উল্লেখ্য, তথ্য প্রযুক্তি আইনটি ২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটসরকার প্রণয়ন করে এবং ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার আইনটি সংশোধন করে শাস্তির পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি করে। তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা একটি বহুল সমালোচিত অপ-আইন হিসেবে প্রসিদ্ধ

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, “এ আইন বাকস্বাধীনতা বিরোধী”। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা বিলে সই না করার জন্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে আহ্বান জানিয়েছিলো সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সেই চিঠিতে এই বিলটিকে পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদে ফেরত পাঠানোরও আহ্বান জানিয়েছিলো সংগঠনটি। এই আইনকে সংবিধানের মূলনীতির পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আইনটি পাশ না করতে অনুরোধ জানিয়েছিলো। তখন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছিলেন, “বিতর্কিত ৩২ ধারার ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ অনুসরণের সুপারিশ করার দৃষ্টান্ত অত্যন্ত হতাশা ও দুঃখজনক। “এ আইনের কারণে বাক-স্বাধীনতার ওপর বিরূপ প্রভাব ও তথ্য জানার অধিকার বিঘ্নিত হবে” বলে সুলতানা কামাল তার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন

এই আইনটি বাংলাদেশের সাধারণ অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে এই লেখার উদ্দেশ্য এটা দেখানো যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮, বাংলাদেশের কুইয়্যার কমিউনিটির এবং বাংলাদেশের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশী কুইয়্যার নাগরিকের জন্য কতটা হুমকি তৈরি করতে পারে। এই পর্যায়ে বলে নেয়া উচিত যে এই লেখাটির মধ্যে কুইয়্যার শব্দটি দিয়ে বোঝানো হচ্ছে লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সম্যান, ট্রান্সওমেন, ইন্টারসেক্স, হিজড়া, কতি, নন-বাইনারি, জেন্ডার ফ্লুইড, কোশ্চেনিং, কিউরিয়াস, এসেক্সুয়াল, প্যানসেক্সুয়াল, জেন্ডার নন-কনফার্মিং, এন্ড্রোজেনাস, জেন্ডারকুইয়্যার, এজেন্ডার, ইন্টারজেন্ডার সহ আরো যে সকল লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী রয়েছেন তাদের সকলকে।

তার মানে সব কুইয়্যার মানুষ এক নয়, এবং এই আইনের প্রভাব বিভিন্ন কুইয়্যার মানুষের উপড়ে বিভিন্ন ভাবে পরবে। এছাড়াও সামাজিক অবস্থান ও পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে, যেমন, ধর্ম, বিশ্বাস, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, প্রথা, জাতি, ভাষা, রাজনৈতিক দর্শন, শ্রেনী, পেশা, বয়স, রোগব্যাধি, বৈবাহিক অবস্থা, জন্মস্থান, দলিত ভিত্তিতেও আইনের প্রয়োগের মাত্রা ও শাস্তির মেয়াদের তীব্রতা তৈরি হতে পারে। যেমন বাংলাদেশের নাগরিক কিন্তু বাংলাভাষী নয়, কুয়্যার কমিউনিটির এমন সদস্যদের জন্য (যেমন, আদিবাসী, বিহারী ইত্যাদি) এই আইনের আওতায় নির্যাতন, নিপীড়ন ও শাস্তির মাত্রা আরো তীব্রতর হতে পারে। এক্টিভিস্ট পাইচিংমং মারমা বলেছেন যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো মানবাধিকারকর্মী নিরাপত্তাবাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কোনো কথা বলে, তবে এই আইনের আওতায় তার কার্যক্রমকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে গণ্য করা হবে, এবং এই আইনটি জুম্ম জনগনের কন্ঠরোধের একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।

আবার যেহেতু এই উপমহাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর লোকজন সংঘবদ্ধ ভাবে কোনো একটি নির্দিষ্ট জাগায় বসবাস করে, তাদেরকে দৃশ্যমান ভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব।[1] তাই যখন কোনো হিজড়া ব্যক্তির কর্মকাণ্ড এই আইনের অধীনে অপরাধ গণ্য হবে, তখন সহজেই তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে, এবং একজন হিজড়ার জন্য অন্য অনেকজন হিজড়াকেই হেনস্ত করার একটি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

ধারা২৮: ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার ইত্যাদি।

ধারাটিতে বলা আছে যদি কোনো ব্যক্তি/গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে “ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে” আঘাত করে বা আঘাত করতে অন্য কোনো ব্যক্তিকে উস্কানী দেয়ার উদ্দেশ্যে, অনলাইনে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করে, তাহলে এটি একটি অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। তবে এই আইনে “ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধের” কোনো সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি।

এই অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন, আর কেউ যদি এই একই অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাইলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

উদাহরণ:

প্রথমে যে কথাটি বলে রাখা ভালো, এ্যামেনিস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভাষ্য মতে এটি একটি ডি-ফ্যাক্টো ব্লাসফেমি আইন[2] এই ধারাটি বহুল আলোচিত বাক-স্বাধীনতা হরণকারী তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার নতুন সংস্করণ।

ধরুন, কোনো একটি ওয়েবসাইটে লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্যময়তাকে নিয়ে যে কোনো ধরনের লেখা প্রকাশ করা হলো। অথবা আপনি লেখাটি শেয়ার করলেন। কিংবা অন্য কেউ এমন একটি লেখা শেয়ার করার পর লেখাটির পক্ষে একটি কমেন্ট দিলেন। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে যে ওয়েবসাইটে লেখাটি প্রকাশ করা হলো, যিনি লিখলেন, যারা লেখাটি শেয়ার করলেন এবং যারা লেখার পক্ষে কমেন্ট করলেন, তাদের সকলের বিরুদ্ধে  ২৮ ধারায় মামলা করা যাবে।[3] এছাড়াও যেহেতু সমকামীতা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম অনুযায়ী পাপ কর্ম, তাই আপনি যদি সমকামীতাকে স্বাভাবিক হিসেবে দাবি করেন, সমকামীদের অধিকার চান কিংবা সমকামীতাকে নিয়ে কিছু লেখেন, তবে একজন মুসলিম ধর্মাবলম্বীর ধর্মানুভূতিতে আঘাত আসতে পারে এবং এজন্য তিনি আপনার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন।

ধারা২১: মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা বা প্রচারণার দণ্ড

ধারাটিতে বলা হচ্ছে, যদি কোনো ব্যক্তি অনলাইনে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা চালান বা এমন কোনো প্রচারণাতে যদি সহযোগীতা প্রদান করেন, তাহলে এটি একটি অপরাধ বলে গণ্য করা হবে।

যদি কোনো ব্যক্তি এই অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আর কেউ যদি এই একই অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন করেন, তবে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ৩ কোটি টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেয়া যাবে।

আইনটির ধারা-২(প)-তে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বলতে বোঝানো হয়েছে “জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা”।[4]

উদাহরণ:

এই ধারাটি বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই বিপদজ্জনক এবং অস্পষ্ট একটি ধারা। এখানে অনেকগুলো টার্ম ব্যবহার করা হয়েছে (টার্মগুলো); এবং এগুলোর মাধ্যমে চাইলে অনেক সাধারণ চিন্তাভাবনাকে এই ধারার আওতায় এনে মামলা রুজু করা সম্ভব। যেমন, আপনি বলতে পারেন জাতির পিতা যদি বেঁচে থাকতো তবে বাংলাদেশে কুইয়্যার আন্দোলনকে তিনি বিবেচনা করতেন, কিংবা এই ক্যুইয়ার আন্দোলন জাতির পিতার আদর্শের সাথে সংগতিপূর্ণ; তবে জাতির পিতার আদর্শ ঠিক কী? এটা যেহেতু কোথাও স্পষ্টভাবে বলা নেই, সেহেতু এখানে আপনার যে অনুভূতি/বিশ্বাস জাতির পিতার আদর্শকে ঘিরে সেটাকে যে কেউ জাতির পিতার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা বলে যদি দাবী করতে পারে। এছাড়াও অনেক কুইয়্যার এক্টিভিস্টকে দেখা যায় কুইয়্যার যে পতাকাটি আছে, তার সাথে কোনোভাবে মিলিয়ে বাংলাদেশের পতাকাকে এক করে ছবি প্রকাশ করতে। এটাও কিন্তু যে কেউ জাতীয় পতাকার অবমাননা হিসেবে দাবী করতে পারেন এবং তাতে করে এই আইন তো বটে, জাতীয় পতাকা আইনের আওতায়ও মামলা হতে পারে।

ধারা২৪: পরিচয় প্রতারণা বা ছদ্মবেশ ধারণ

এই ধারাতে বলা হচ্ছে যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বা প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে তার নিজের পরিচয় গোপন করে অন্য কোনো ব্যক্তির পরিচয় ধারণ করে বা অন্য কোনো ব্যক্তির কোনো তথ্য নিজের বলে দাবি করে নিজে কোনো সুবিধা লাভ করে কিংবা অন্য কাউকে লাভ করিয়ে দেয় এবং যার পরিচয় ধারণ করলো, তার কোনো ক্ষতি করে বা অন্য ব্যক্তির/ব্যক্তিসত্ত্বার ক্ষতি করে, তবে এটি একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। যে ব্যক্তি এই অপরাধে অভিযুক্ত হবে তাকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ড প্রদান করা হবে। কেউ যদি এই একই অপরাধ একাধিকবার করেন, তবে তাকে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড কিংবা ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড প্রদান করা হবে।

উদাহরণ:

কুইয়্যার কমিউনিটির বিশাল একটি অংশ তাদের শুরুটা করেন ফেক আইডি থেকে, যেখানে ব্যবহৃত ছবি বা তথ্য এমনি কি নামও নিজের থাকে না। এই ধারাকে ব্যবহার করে অনায়সেই যে কোনো ফেক আইডিধারী মানুষকে পুলিশ চাইলে হ্যারেস করতে পারবে। এই আইনের অধীনে যেহেতু মামলা করার অধিকার পুলিশের আছে, তাই কোনো ফেক আইডি ব্যবহারকারী কুইয়্যার ব্যক্তি যদি কোনো মডেলের ছবি ব্যবহার করে ফেক আইডি চালায়, তবে চাইলে সেই ফেক আইডি ব্যবহারকারী ব্যক্তিটির বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার করা সম্ভব। যেহেতু এই ধারায় লাভ-ক্ষতি-প্রতারণা কিংবা ইচ্ছা-অনিচ্ছাকৃত ধরণের শব্দগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি, তাই আইন প্রয়োগ/ব্যবহারকারী যে কেউ চাইলে এই ধারার অধীনে কুইয়্যার কমিউনিটিকে বিপদে ফেলতে পারবেন।

এছাড়াও উক্ত কমিউনিটির মানুষদের বৈচিত্র্যময় আচরণের কারণে অনেকেই তার কাঙ্খিতসত্ত্বায় নিজেকে প্রকাশ করার জন্য নারী/পুরুষ সেজে (ড্র্যাগ, ক্রসড্রেসিং ইত্যাদি) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি আপলোড করেন, সেই ছবিগুলোকেই আইনগত ভাবে নিজের পরিচয় লুকানোর উপায় হিসেবে চিহ্নিত করে, এই ধারার অধীনে একজন মানুষকে অভিযুক্ত করা যেতে পারে। আবার অনেক ট্রান্সম্যান/ট্রান্সওমেন তাদের সরকারী নিবন্ধনকৃত নাম পরিবর্তন না করে, যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তার কাঙ্খিত নামটি ব্যবহার করেন, এই কাজটিও এই ধারার আওতায় একটি আমলযোগ্য অপরাধ বলে পুলিশ চাইলে গণ্য করতে পারে।

ধারা২৫: আক্রমণাত্মক মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্যউপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি

ধারাটির প্রথম উপধারাতে বলা হচ্ছে:- যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অনলাইনে কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, যেগুলো আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা; যদি কোনো ব্যক্তি অনলাইনে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ণ করা, বিভ্রান্তি ছড়ানো বা উল্লেখিত উদ্দেশ্যে এমন তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করতে সহায়তা করেন যে তথ্যগুলো অপপ্রচার বা মিথ্যা; তবে এই কর্মকাণ্ডগুলো অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

যদি কোনো ব্যক্তি উল্লেখিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়, তবে তাকে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৩ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আর যদি এই একই অপরাধ কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বার এবং পুনঃপুন বার করে থাকেন, তাহলে তিনি সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা  উভয়দণ্ডে শাস্তির যোগ্য হবেন।

উদাহরণ:

অনলাইনে প্রায়ই অনেক হোমোফোবিক মানুষজনের হেটস্পিচ দেখতে পাওয়া যায় যাতে স্বভাবতই ক্যুইয়াররা বিরক্ত হন। এই বিরক্তি থেকে কুইয়্যার কমিউনিটির অনেক সদস্যই হেটস্পিচ প্রদানকারীদের বিভিন্ন শব্দ বা বাক্যবাণ দ্বারা আক্রমণ করে বসেন যেখানে ব্যবহৃত অনেক শব্দের ভয়াবহতা সম্পর্কে শব্দের ব্যবহারকারী নিজেও ওকিবহাল নন। যেমন ধরুন, কেউ কোনো একটি সমকামীভিত্তিক নিউজের নিচে সমকামীদের ধ্বংস কামনা করে মন্তব্য করলেন; আপনি সেখানে রিপ্লাই দিয়ে তার সাথে তর্ক জড়িয়ে পড়লেন, এবং তর্কের একপর্যায়ে তাকে উগ্রবাদী, জঙ্গী, সন্ত্রাসী ইত্যাদি হিসেবে আখ্যায়িত করলেন। তখন আপনার এই মন্তব্যগুলো সেই ব্যক্তি নিজের জন্য অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্নমূলক বক্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করলে এটি একটি অপরাধ বলে গণ্য করা যেতে পারে।

প্রায়শঃ অনেক কুইয়্যার সদস্যকে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক আচরণ, কুইয়্যার সদস্যদের প্রতি রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আইন নিয়ে প্রতিবাদী আচরণ করতে দেখা যায়। এই প্রতিবাদের ভাষাতে স্বভাবতই রাষ্ট্রের সহনশীলতা এবং অন্য অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা/প্রশ্ন/উত্তর উঠে আসে, যাতে আক্ষরিক অর্থেই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবার সম্ভবনা দেখা দেয়। এমন আলোচনাও তখন এই ধারার আওতায় একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা অসম্ভব কিছু নয়।

ধারা২৭: সাইবার সন্ত্রাসী কার্য সংঘটনের অপরাধ দন্ড

যত্নসহকারে পড়ুন এই ধারাটি। প্রথম উপধারায় বলা হচ্ছে—

  • যদি কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করা এবং জনগণের বা জনগণের কোনো অংশের মধ্যে ভয়ভীতি সঞ্চার করার উদ্দেশ্যে কোনো কম্পিউটার বা কম্পিউটার নেটওয়ার্কে, ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে বৈধ প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন বা বে-আইনি প্রবেশ নিজে করেন, বা অন্যকে করান;
  • যদি কোনো ব্যক্তি কোনো ডিজিটাল ডিভাইসে এমন কোনো দূষণ সৃষ্টি করেন বা ম্যালওয়্যার প্রবেশ করান, যার ফলে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে বা গুরুতর জখম প্রাপ্ত হন বা হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়;
  • যদি কোনো ব্যক্তি জনসাধারণের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ ও সেবা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস সাধন করে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করেন;
  • যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অনলাইনের যে কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত অনলাইনে প্রবেশ করান (প্রকাশ করেন), যা কোনো রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্টে বা জনশৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে অথবা কোনো বৈদেশিক রাষ্ট্রের/ব্যক্তির/গোষ্ঠীর সুবিধার্থে ব্যবহৃত হতে পারে;

তবে উপরের সবগুলো সাইবার সন্ত্রাসের অপরাধ বলে গণ্য করা হবে।

যদি কোনো ব্যক্তি উক্ত অপরাধে অভিযুক্ত হন, তবে তিনি সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড/সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড/উভয়দণ্ড প্রাপ্ত হবেন। যদি তিনি এই কাজ আবার করেন, তবে তিনি যাবজ্জীবন (এখানে সর্বোচ্চ শাস্তি বলে কিছু নেই, যাবজ্জীবনই হবে শুধু)/ সর্বোচ্চ  ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড/ উভয়দণ্ড শাস্তি পাবেন।

উদাহরণ:

এই ধারাটি বিশেষত যারা কুইয়্যার এক্টিভিস্ট ও সংগঠক আছেন তাদের জন্য উদ্বেগের। এক্টিভিস্টরা যখন কোনো একটি বিষয়ে জনমত তৈরি করতে অনলাইনে কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, মনে করুন ২০১৬ সালের (জুলহাজ-তনয়) হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবীতে একটি অনলাইন প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করলেন, তখন রাষ্ট্র মনে করতে পারে এতে করে রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে, জনগণের মধ্যে বা জনগণের কোনো একটি অংশের মধ্যে এই কার্যক্রম ভীতিসঞ্চার করতে পারে বা এতে রাষ্ট্রের শান্তি নষ্ট হবার সম্ভবনা আছে, তখন অবশ্যই যিনি সেই কর্মসূচির ঘোষণা করলেন এবং যারা তাতে অংশ নিলেন তাদের সবার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ভঙ্গের চেষ্টা করবার দায়ে একটা মামলা রুজু হতে পারে।

এছাড়াও, যদি কুইয়্যার এক্টিভিস্টরা এমন কোনো নথিপত্র বা ডকুমেন্টস তৈরি করেন, যেখানে বাংলাদেশের কুইয়্যার কমিউনিটির সাথে ঘটা অন্যায়গুলো প্রকাশ করা হচ্ছে, এবং সেটা ব্যবহার করে যদি কোনো আন্তর্জাতিক/বিদেশী দাতব্য সংস্থা কিংবা কোনো বিদেশী নিউজ পোর্টাল/ম্যাগাজিন/ওয়েবসাইটে খবর প্রকাশ করে বা সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলে কিংবা সরকারের উপভোগ করা কোনো বৈদেশিক সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়, তবে সেই কুইয়্যার এক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে এই ধারার অধীনে মামলা হতে পারে।

ধারা২৯: মানহানিকর তথ্য প্রকাশ প্রচার

এই ধারাতে বলা হচ্ছে, যদি কোনো ব্যক্তি অনলাইনে পেনাল কোডের ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত মানহানিকর কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন তাহলে এটি একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।[5]

তো, কোনো ব্যক্তি যদি এই মানহানির অপরাধ অনলাইনে করে থাকেন, তবে তাকে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড/ সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড/উভয়দণ্ড দেয়া হবে। এবং যদি সেই ব্যক্তি পরে আবারও একই অপরাধের জন্য দায়ী হন তবে প্রতিবার তাকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড/ সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড/উভয়দণ্ডের সাজা দেয়া হবে।

উদাহরণ:

যদি কোনো কুইয়্যার কমিউনিটির সদস্য/এক্টিভিস্ট/অর্গানাইজার কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান/সংগঠনের বিরুদ্ধে সরাসরি বা ‘মেটাফোর’ ব্যবহার করে কিছু প্রচার বা প্রকাশ করেন, তবে তা এই ধারার অন্তর্ভুক্ত হবে। হতে পারে, আপনি প্রমাণ ব্যতীত কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনলাইনে কিছু লিখছেন, অথবা কোনো হুজুরের হেটস্পিচকে হালকা পরিবর্তন করে, একটু হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করলেন, তাতে করে আপনার বিরুদ্ধে এই অভিযোগে মামলা হবে। কিংবা কোনো একজন মানুষ যিনি কুইয়্যার কমিউনিটির জন্য ‘ফোবিয়া’ ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তাকে জব্দ করার জন্য তার কোনো গোপন তথ্য আপনি অনলাইনে প্রকাশ করে দিলেন, তাতেও কিন্তু আপনি বিপদে পড়তে পারেন। এই কর্মকাণ্ডগুলো যদি কোনো মৃতব্যক্তিকে নিয়েও করেন তাহলেও আপনি এই আইন থেকে নিস্তার পাবেন না। কারো ইনবক্সে ‘মিডেল ফিঙ্গার’ দেখিয়ে দৃশ্যমান কোনো ছবি পাঠালেও আপনি এই ধারা অনুসারে অপরাধী হবেন।

ধারা৩১: আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ইত্যাদির অপরাধ দন্ড

ধারাটিতে অপরাধের সংজ্ঞায় বলা হচ্ছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অনলাইনে এমন কিছু প্রকাশ, প্রসার বা প্রচার করেন যা বিভিন্ন শ্রেণী/সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা/ঘৃণা/বিদ্বেষ সৃষ্টি করে কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে অথবা অস্থিরতা/বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি/আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়/ঘটানোর অবস্থা তৈরি করে, তবে এটি একটি অপরাধ বলে গণ্য করা হবে।

যদি কেউ এই অপরাধে অভিযুক্ত হন তবে তিনি সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড/সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড/উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এবং একই অপরাধে একাধিকবার অভিযুক্ত হলে, সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড/সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড/উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

উদাহরণ:

এটা খুব সহজ কথা। লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর যে কোনো কার্যক্রমই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলার জন্য হুমকি ভাবতে পারে। ধরুন আপনি রেইনবো কালারের একটি পতাকা হাতে তুলে একটা ছবি প্রোফাইলে প্রকাশ করলেন, এবং তা দেখে কোনো একটি সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে ঘৃণার তৈরি হলো, তাতে করে আপনার বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা অবনতির জন্য অভিযোগ আনা যেতে পারে।

কিংবা কোনো কুইয়্যার অর্গানাইজেশন কোনো একটি ইভেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করলো, যেখানে তারা কেবল মাত্র কুইয়্যার কমিউনিটির মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিবে বলে জানালো। এটা দেখে কোনো শ্রেণীর মানুষের মাঝে বিদ্বেষের উদ্রেগ হলো এই ভেবে যে কুইয়্যার মানুষজন কেন এই সেবা পাবে, তখন তিনি একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করলো, আয়োজকদের বিরুদ্ধে তখন এই আইনে অভিযোগ আনা যেতে পারে।

কিংবা কোনো একটি পোষ্ট যেখানে কুইয়্যারনেস কে নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশদ আলোচনা করা হলো; এটা দেখে যদি কোনো ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায়ের মানুষজন রাস্তায় একটা মিছিল বের করে, কিংবা পোস্টদাতাকে কোপাতে উদ্যত হয়, তাহলেও পোস্টদাতার বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে মামলা করা যাবে।

ধারা৩৫: অপরাধ সংঘটনে সহায়তা তার দণ্ড

মজার একটি ধারা। এখানে বলা হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর অধীনে যদি কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকেন, এবং তাকে যে ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ এই অপরাধ সংগঠনে সহযোগিতা করেছে তারাও অপরাধী বলে গণ্য হবেন। এবং এই সহায়তার অপরাধে সহযোগিতা প্রদানকারী ব্যক্তি, মূল অপরাধীর মতোই একই ধরনের সাজা পাবেন।

উদাহরণ:

কোনো ব্যক্তি যদি উপরের ধারাগুলোতে উল্লেখিত কোনো অপরাধ করেন, এবং অপরাধকারীকে যদি কোনো কুইয়্যার কমিউনিটির সদস্য কোনো সহযোগিতা করেন, তবে সেই কুইয়্যার সহযোগীও একই অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে একই শাস্তি পাবেন।

যেমন অপরাধকারী যদি কোনো কুইয়্যার ব্যক্তির, মোবাইল, কম্পিউটার ব্যবহার করে অপরাধটি করলে; অথবা অপরাধকারীর কোনো উস্কানীমূলক পোষ্ট একজন কুইয়্যার ব্যক্তি শেয়ার/ কমেন্ট করলে; কিংবা অপরাধকারীকে কোনো ব্যাঙ্গাত্মক ছবি বানাতে যদি কোনো কুইয়্যার ব্যক্তি সহায়তা করে, তবে সেই কুইয়্যার ব্যক্তিটি এই ধারার অধীনে একজন সহায়তাকারী বলে বিবেচিত হবেন। সহয়তাকারী হিসেবে যাকে চিহ্নিত করা হবে তার কর্ম/আবাসস্থল পুলিশ চাইলে তল্লাশী ও জব্দ করতে পারবে।

ধারা২৬: অনুমতি ব্যতীত পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার, ইত্যাদির দন্ড

ধারাটিতে প্রথমেই বলা হচ্ছে যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, বিক্রয়, দখল, সরবরাহ বা ব্যবহার করেন এটি একটি অপরাধ বলে গণ্য করা হবে।[6] ধারাটির “ব্যাখ্যা” অংশে বলা হয়েছে “পরিচিতি তথ্য” মানে কোনো বাহ্যিক, জৈবিক বা শারীরিক তথ্য বা অন্য কোনো তথ্য যা একক/যৌথ ভাবে একজন ব্যক্তি/সিস্টেমকে শনাক্ত করে।[7]

শাস্তি হিসেবে বলা হচ্ছে যদি কোনো ব্যক্তি এই ধারার অধীনে অভিযুক্ত হন, তবে তাকে  প্রথমবারের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড/সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড/উভয়দণ্ডের সাজা পাবেন। এবং দ্বিতীয় ও পরবর্তী প্রতিবারের জন্য অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড/সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড/ উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

উদাহরণ:

ধরুন আপনি একটি অনলাইন কুইয়্যার কমিউনিটি নিয়ে একটি জরীপের কাজ করছেন, এবং জরীপের প্রয়োজনে আপনি কিছু তথ্য আপনি চাইছেন (নাম, বয়স, ইমেইল আইডি, ফোন নম্বর ইত্যাদি)। এমন তথ্য সংগ্রহ করা আপনার জন্য বিপদজ্জনক হতে পারে, কারণ তখন এই ধারার অধীনে আপনার বিরুদ্ধে মামলা হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। আবারও মনে করিয়ে দেয়া প্রয়োজন, এই মামলা করার অধিকার কিন্তু আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর হাতেও আছে; এবং যার তথ্য দেয়াকে কেন্দ্র করে মামলা হবে, সে যতক্ষণ না ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে বলবে যে সে স্বেচ্ছায় এই তথ্য দিয়েছেন, ততক্ষণ আপনাকে আইনী হয়রানীর শিকার হতে হবে। অনলাইনে কোনো পিটিশন, প্রশ্ন, স্ট্যাটাস, জরিপ এমন যে কোনো কিছু, যার দ্বারা আপনার/আপনাদের কাছে অন্য আরেকজন মানুষের তথ্য আসছে, সেই প্রক্রিয়াটি আপনার জন্য বিপদজ্জনক হতে পারে। তার মানে কিন্তু এটা বলছিনা যে আপনি অনলাইনে এমন কিছু করতে পারবেন না। অবশ্যই পারবেন, তবে তার জন্য আপনাকে তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তির নিকট হতে পূর্বলিখিত অনুমতি নিতে হবে।

প্রাসঙ্গিক ধারা সমূহ

উপরে উল্লেখিত সবগুলো ধারাই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ষষ্ঠ অধ্যায় হতে নেয়া, যেখানে কেবল অপরাধের সংজ্ঞা ও অপরাধের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও আরো কিছু ধারা রয়েছে এই আইনে, যা কুইয়্যার কমিউনিটির জন্য জানাটা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ধারা: আইনের অতিরাষ্ট্রিক প্রয়োগ

ধারাটি মূলত যুক্ত করা হয়েছে আইনটি কিভাবে সমগ্র বিশ্বে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে সেটি বোঝাতে। চলুন বুঝতে চেষ্টা করি কি বলা হয়েছে ধারাটিতে।

এই ধারার তিনটি উপধারাতে বলা হচ্ছেঃ যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের বাইরে থেকে এমন কোনো কর্মকাণ্ড করেন, যা বাংলাদেশে করলে এই আইনের অধীনে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে উক্ত ব্যক্তি এই আইনের অধীনে দণ্ডযোগ্য যে কোনো অপরাধ করলে মনে করা হবে অপরাধটি তিনি বাংলাদেশে থেকেই করেছেন। যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশে অবস্থিত কোনো কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম বা নেটওয়ার্কের সাহায্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ সংঘটন করে থাকেন তবে মনে করা হবে অপরাধের পুরোটাই বাংলাদেশে হয়েছে; যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশে থেকে বাংলাদেশের বাইরে এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ সংঘটন করেন তবে মনে করা হবে অপরাধটি বাংলাদেশে করা হয়েছে

উদাহরণ:

হতে পারে কোনো একজন কুইয়্যার ব্যক্তি দেশের বাইরে থাকেন, এবং তিনি দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত কোনো একটি নিউজপোর্টালে বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন কিছু লিখলেন যাতে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। তবে উক্ত ব্যক্তি এমন কর্মকান্ডের জন্য অপরাধী বলে গণ্য হবেন, এবং অপরাধটি বাংলাদেশে হয়েছে বলেই মনে করা হবে।

ধরুন যদি কোনো কুইয়্যার এক্টিভিস্ট দেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশে ব্যবহৃত কোনো ওয়েব সাইটে, বাংলাদেশি কুইয়্যার কমিউনিটির জন্য, কোনো একটি গে-প্রাইডের ঘোষণা দেন, যাতে করে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট হবার সম্ভবনা দেখা দেয়, তাহলে উক্ত ঘোষণা প্রদানকারী ব্যক্তি এই আইনের অধীনে অপরাধী হবেন।

যদি কোনো কুইয়্যার ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে বিদেশী কোনো গণমাধ্যমে বাংলাদেশের কুইয়্যার অবস্থা নিয়ে এমন কোনো বক্তব্য, তথ্য-উপাত্ত দেয়, যাতে করে বাংলাদেশের সাথে ওই দেশের সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার সম্ভবনা তৈরি হয় তবে ওই কার্যক্রম এই আইনের অধীনে একটি অপরাধ বলে গণ্য করা হবে।

ধারা: কতিপয় তথ্যউপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করবার ক্ষমতা

বলা হচ্ছে যদি ডিজিটাল মাধ্যমে এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রকাশিত বা প্রচারিত হয় যা ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করে, তাহলে এই আইনের অধীনে যাকে মহাপরিচালক বলে উল্লেখ করা হচ্ছে,  তিনি চাইলে  ওই তথ্য-উপাত্ত অপসারণ, বা ওয়েব সাইট ব্লক করার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) অনুরোধ করতে পারবেন। এছাড়াও যদি আইনশৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনীর ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত যা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জন শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ণ করতে পারে, কিংবা জাতিগত বিদ্বেষ বা ঘৃণার সঞ্চার করতে পারে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনী সেই তথ্য-উপাত্ত ব্লক বা অপসারণ করার জন্য মহাপরিচালকের মাধ্যমে বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবেন।

বিটিআরসি এমন অনুরোধ পেলে, বিষয়টি সরকারকে অবহিত করে, তাৎক্ষণিকভাবে উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করবে।

উদাহরণ:

সারা বিশ্বে যে কুইয়্যার ওয়েবসাইটগুলো আছে, সেই ওয়েবসাইটে যদি এমন কোনো লেখা, ভিডিও  বা খবর প্রকাশিত বা প্রচারিত হয়, যা আইনশৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনী দেশের নিরাপত্তা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ইত্যাদির জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন, তবে সেই ওয়েবসাইটটি বিটিআরসি চাইলে যেকোনো সময়, বিনা নোটিশে বাংলাদেশের জন্য ব্লক করে দিতে পারবেন।

ধারা৪৩: পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্লাশী, জব্দ গ্রেফতার

এই ধারা মতে, যদি কোনো পুলিশ অফিসার মনে করেন কোথাও এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, হয়েছে কিংবা হবার সম্ভবনা আছে, এবং সেখানে স্বাক্ষ্য প্রমাণ হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছে ফেলা, পরিবর্তন করা বা অন্য কোনোভাবে তা দুষ্প্রাপ্য হবার সম্ভাবনা আছে তবে পুলিশ অফিসার ইচ্ছা করলে উক্তস্থানে প্রবেশ করে তল্লাশী করতে পারবেন এবং প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হলে ফৌজদারী কার্যবিধি অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন; উক্তস্থানে তল্লাশী করার সময় যেসব ডিভাইস বা সরঞ্জাম অপরাধপ্রমাণে সহায়ক বলে পুলিশ মনে করবে, সেগুলো তারা জব্দ করতে পারবেন (কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি); উক্ত স্থানে উপস্থিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশী করতে পারবেন; যে কোনো ব্যক্তিকে অপরাধের সাথে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার করতে পারবেন। 

উদাহরণ:

পুলিশ চাইলে কুইয়্যার কমিউনিটির যে কোনো সদস্যের সাথেই উল্লেখিত কাজগুলো করতে পারবেন। সেটা হতে পারে বাসা, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্রাবাস, রাস্তাঘাট। এবং এমন কাজের জন্য পুলিশের কাছে কোনো পরোয়ানা বা পূর্বানুমতি কিংবা কোনো প্রমাণের দরকার হবে না। পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবেই এই সকল কর্মকাণ্ড করতে পারবেন।

ধারা:৫৩ অপরাধের আমলযোগ্যতা জামিনযোগ্যতা

এখানে কেবল সেই ধারাগুলো উল্লেখ করা হচ্ছে, যেগুলো কেবল কুইয়্যার কমিউনিটির জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ধারাতে বলা হয়েছে ধারা – ২১, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮ ও ৩১-এ উল্লেখিত অপরাধসমূহ আমলযোগ্য অপরাধ ও জামিন-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।[8]

উদাহরণ

যে ধারাগুলোর সংজ্ঞা ও অপরাধ বর্ণনা করা হলো তার মধ্যে ২১, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮ ও ৩১-এ উল্লেখিত অপরাধসমূহের ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠলে অবশ্যই মামলা হবে এবং যদি অভিযুক্ত কুইয়্যার ব্যক্তি গ্রেফতার হন তবে তিনি আদালত থেকে জামিন পাবেন না, যতদিন না বিচার কার্যক্রম শেষ হয়। তবে এই আইনের অধীনে জামিন-অযোগ্য ধারার মামলায় জামিন হতে পারে ফৌজাদারী কার্যবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী।

তাহলে কি কুইয়্যাররা অর্গানাইজিং করবে না?

এখন পর্যন্ত, এই আইনটি বিশ্লেষণ করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে আইনটি কুইয়্যার এক্টিভিস্ট/অর্গানাইজার এবং সদস্যদের বিরুদ্ধে কিভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে এখানে বলে রাখা উচিত যে এটা একেবারেই বলা হচ্ছে না যে এই আইনটি শুধু ক্যুইয়ারদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য তৈরী করা হয়েছে, বা শুধু ক্যুইয়ারদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হবে। এমনকি, বাস্তবিক অর্থে বলতে গেলে এই আইনটি এই সরকার একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে সরকার এই আইনকে ব্যবহার করে কিছু কমিউনিটিদেরকে ভয় দেখিয়ে থাকে (সাংবাদিক, মুক্তমনা কমিউনিটি ইত্যাদি), আবার কিছু ক্ষেত্রে সরকার এই আইন ব্যবহার করে থাকে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা ঠেকানোর জন্য এবং সরকারের সমালোচকদের শাস্তি দেয়ার জন্য (যেমন ফটোগ্রাফার শহীদুল আলমকে গ্রেফতার)। তবে এই আইনটির প্রভাব সব চাইতে বেশি পড়েছে বিভিন্ন সাংবাদিক, সংগঠক, শিক্ষক, ও এক্টিভিস্টদের উপরে।

তাহলে কুইয়্যার কমিউনিটির ক্ষেত্রে এই আইন নিয়ে আলাপের সারমর্ম কি? আমরা কি অর্গানাইজিং ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে পড়বো? আমরা কি আর অনলাইনে নিজেদের মত, নিজেদের সত্ত্বা প্রকাশ করবো না? আমরা কি নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো না? আমরা কি অবিচার, জুলুমের প্রতিবাদ করবো না? নাকি আমরা বলবো, এমন আইন দিয়ে রাষ্ট্র আমাকে চুপ করাতে পারবে না, আমার যা কথা আমি বলবোই। আমাদের মতে বাংলাদেশের প্রেক্ষপটে আমরা পুরোপুরি রক্ষণশীল আচরণ করতে পারি না,  কারণ তাতে আইনের পরিবর্তন আসবে না। আবার আইনটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে চাই না কারণ তাতে আবার কুইয়্যার কমিউনিটি তাদের অর্গানাইজেশন এবং অর্গানাইজারদের হারাবে। যে কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন বাধা থাকেই। কিন্তু সেই বাধাগুলোকে উপেক্ষা করে কাজ না করে, আমাদের ভাবতে হবে যে আমাদের অর্গানাইজিং এর মধ্যে কিভাবে এই বাধাগুলো অতিক্রমের জন্য আমরা সুক্ষ্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারি।

যেমন আমাদের মাঝে এমন অনেক কুইয়্যার কমিউনিটি মেম্বার, অর্গানাইজেশন ও অর্গানাইজার আছে যারা নিজেদের অনলাইন সিকিউরিটি চর্চা নিয়ে তৎপর। হয়তো তারা ইমেইল ও ফেসবুকের ক্ষেত্রে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, ট্রাস্টেড কন্টাক্ট ব্যবহার করছে, পার্সওয়াড কয়েক মাস পরপর পরিবর্তন করছে। এছাড়াও কোনো অনলাইন মাধ্যমে, লেখালিখির ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ব্যবহার করছে। লেখক কোথা থেকে লিখছে, সেই আইপি এড্রেস দিয়ে যেন তাকে খুঁজে বের করা না যায় তার জন্য ভিপিএন ব্যবহার করছে। ফেইসবুক প্রোফাইল লক করে রাখছে এবং পাবলিক পোস্ট থেকে বিরত থাকছে। লেখা বা যে কোনো কিছু যা অনলাইনে প্রকাশযোগ্য, তা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে যেখানে প্রকাশিত হচ্ছে, সেই জায়গা কতটুকু নিরাপদ সেই বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করছে। পাবলিক যে কোনো অনলাইন ফোরামকে এড়িয়ে চলছে, এবং অবশ্যই কোনো অজানা ব্যক্তির সাথে ইনবক্সে কিংবা কোনো পোষ্টের কমেন্টস সেকশনে তর্কে জড়িয়ে পড়ছে না। বিশেষত, যখন সরকার এবং ধর্মকে নিয়ে তারা আলোচনা করছে, সেখানে এই নিরাপত্তামূলক সতর্কতা অব্যশই পালন করছে। উল্লেখিত অনলাইন নিরাপত্তমূলক পদক্ষেপগুলো নিয়ে আরো আলাপ-আলোচনা, ঝুঁকিগুলোর বিশ্লেষণ এবং ট্রেনিং কুইয়্যার কমিউনিটিতে প্রয়োজন।

সবশেষে বলতে চাই, এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি বাংলাদেশের কুইয়্যার কমিউনিটিকে আরো বেশি অনিরাপদ করা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার একটি রাষ্ট্রীয় অপকৌশল। এই আইনকে বিলুপ্ত না করা হলে, আমাদের প্রগতিশীল আন্দোলনগুলোর বিকাশ বাংলাদেশে ঘটবে না। তাই এই আইনটিসহ বাংলাদেশে বিদ্যমান যতগুলো আইন এই দেশের কুইয়্যার কমিউনিটির জীবনকে অরক্ষিত ও অনিরাপদ করে তুলেছে, সেই আইনগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের সংবেদনশীল ও সুচিন্তিত অর্গানাইজিং অবিরাম চলতে থাকুক।

আমরা কৃতজ্ঞ বাটারটোস, ধৈর্য্যশীল ফেমিনিস্ট, রাজীব ও হৈমৈদের কাছে তাদের ফিডব্যাকের জন্য।


[1] কুইয়্যার কমিউনিটির অন্যদের ক্ষেত্রে সচরাচর সংঘবদ্ধ ভাবে বসবাস করা বা দৃশ্যমান ভাবে তাদের চিহ্নিত করা ততটা সহজ নয়।

[2] ডি-ফ্যাক্টো অর্থ সরাসরি/আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, কিন্তু পরোক্ষভাবে এবং প্রায়োগিক অর্থে।

[3] কা্রণটা পাবেন এই আইনের ৩৫ ধারায়।

[4] এই চারটি উপাদান আমাদের সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে “মূলনীতিসমূহ” বলে উল্লেখ করা আছে।

[5] এদিকে পেনাল কোডের ধারা-৪৯৯ মানহানি-তে বলা হচ্ছে “যদি কোনো ব্যক্তি জেনে-বুঝে ইচ্ছাকৃভাবে কথা, পড়া, শব্দাবলী, চিহ্ন বা দৃশ্যমান কোনোভাবে অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে কোনো নিন্দা করে, যাতে ব্যক্তির সুনাম বা খ্যাতি নষ্ট হয়, তবে তাকে মানহানি বলে বিবেচনা করা হবে। এই ধারাতে পরবর্তীতে ৪টি ব্যাখ্যা বলা হয়েছেঃ যদি কোনো মৃত ব্যক্তির নামেও এমন মানহানিকর কর্মকাণ্ড করা হয় তবে তাও অপরাধের শামিল হবে। এতে যদি মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনের অনুভূতিতে আঘাত লাগে, তারাও চাইলে মামলা করতে পারে। এই মানহানি কেবল ব্যক্তি নয়, একজন আইনী ব্যক্তির (কোম্পানী, সংঘ, ব্যক্তিসমূহ) ক্ষেত্রেও হতে পারে; অর্থাৎ কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানেরও মানহানি হতে পারে। বিকল্পরূপে (মেটাফোর) প্রকাশিত বিদ্রুপাত্মক কোনো তথ্যও মানহানির অপরাধ হবে (যেমন ব্যঙ্গচিত্র, মিম ইত্যাদি)। তবে কোনো মানহানি ততক্ষণ পর্যন্ত মানহানি বলে বিবেচিত হবে না, যতক্ষণ না এটি প্রমাণ হয় যে অপরাধটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ব্যক্তির খ্যাতি, সুনাম, বুদ্ধিমত্তা, বর্ণ বা পেশা নষ্ট করে।

[6] যদি কোনো ব্যক্তি কোনো আইন দ্বারা এমন তথ্য সংগ্রহের অধিকার পেয়ে থাকেন তবে সেটি অপরাধ বলে গণ্য করা হবে না।

[7] যেমন নাম, ছবি, ঠিকানা, জন্মতারিখ, পিতা-মাতার নাম, স্বাক্ষর, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, মৃত্যুনিবন্ধন নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাংক একাউন্ট নম্বর, ই-টিন নম্বর, ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর, ক্রেডিট/ডেবিট কার্ড নম্বর/ভয়েস প্রিন্ট, রেটিনা, আইরিস ইমেজ, ডিএনএ প্রোফাইল, নিরাপত্তামূলক প্রশ্ন বা অন্য কোনো পরিচিতি।

[8] এই আইনের অধীনে যদি কোনো কুইয়্যার ব্যক্তি যে কোনো ধারায়, দ্বিতীয় বা তার পরবর্তীতে যতবার অভিযুক্ত হবেন দ্বিতীয়বার থেকে প্রতিটি ধারা তার জন্য আমলযোগ্য অপরাধ ও জামিন-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।

মন্দ্র এবং প্রণেতার অনুমতি ছাড়া এই লেখা পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.