কুইয়্যার কমিউনিটির সক্ষমতা বৃদ্ধি সম্পর্কে আমার ভাবনা

লেখকঃ এমডি রহমান

এটা ঠিক যে আন্দোলন ছাড়া কখনো কোন অধিকার আদায় হয়নি। কিন্তু অধিকারের আন্দোলনের জন্য পায়ের তলার শক্ত মাটি থাকা চাই। পাশাপাশি এটা ঠিক যে বড় কোন মুভমেন্টের ক্ষেত্রে যাদের অংশগ্রহণ বেশি থাকে তাদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত। উচ্চবিত্তরা কখনো সর্বস্তরের মুভমেন্টে অংশগ্রহণ করে না। তাই পৃথিবীতে যত আন্দোলন সংগ্রাম ঘটেছে তার নেতৃত্বে ছিলো মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষ, যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে ভালবাসে।কুইয়্যার মুভমেন্টের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম না।

একটু খেয়াল করলে দেখতে পাবেন বাংলাদেশের এলজিবিটিকিউ+ কমিউনিটির মুভমেন্টের বেশির ভাগ নেতৃত্ব দেয় এই শ্রেণীর লিডারেরা। ফেসবুকে বিচ্ছিন্ন ভাবে গড়ে উঠা  গ্রুপগুলোর কর্মকাণ্ড দেখলে বোঝা যায় এই তরুণ বয়সে তাদের দেহের শ্বেত রক্ত কণিকাগুলো একটু বেশিই প্রতিরোধী। কেও চায় কমিউনিটির জন্য প্রাণ দিতে, কেও চায় শাহবাগের মোড়ে গিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে দাড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে, কেও চায় রংধনু প্রাইড করতে, কেও চায় নিজের প্রকাশ ভঙ্গিকে সাহসিকতার সাথে তুলে ধরতে। মানে নদীর মতো একে বেকে যাওয়া বিদ্রোহের গলি পথগুলো দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু কমিউনিটির ঐ পায়ের তলার মাটি শক্ত করবার উদ্যোগ চোখে পরে না বললেই চলে অর্থাৎ নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নেটওয়ার্কিং গড়ে তোলার প্রতি ভীষণ অনাগ্রহ।

অনেকের মতে আমাদের এখানে কমিউনিটি ধারণাটাই গড়ে ওঠে নাই।আমারও তাই মনে হয়।বিভিন্ন অনলাইনের কর্মকাণ্ড হয় প্রেম-পিরিতি আর কুইয়্যার পলিটিক্সেই সীমাবদ্ধ। এর পরে আছে কমিউনিটির বিচ্ছিন্নতা। যেমন গে কমিউনিটি, লেসবিয়ান কমিউনিটি, হিজড়া কমিউনিটি,কতি কমিউনিটি,  ট্রান্স-জেন্ডার  কমিউনিটি  ইত্যাদি কমিউনিটিগুলো একসাথে কাজ করবার পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারা। এজন্যই হয়ত সামগ্রিক কমিউনিটির দক্ষতা বৃদ্ধি, নেটওয়ার্কিং, মুভমেন্টের আইডিয়া তৈরি হচ্ছে না।

বাইরের দেশগুলো তাকালে আমরা দেখতে পাবো সেখানকার এলজিবিটিকিউ+ সদস্যরা নিজেদের নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কমিউনিটিও তৈরি করেছে টেক, বিজনেস,হেলথ, গবেষণা, লাইব্রেরী, আর্ট, সায়েন্স ইত্যাদি কমিউনিটি।আর আমরা পলিটিক্সই করে যাচ্ছি এগুলোর ছিটে ফোটাও আমাদের এখানে নেই। কিন্তু সমানে বিদ্রোহ মনোভাব, কোন কৌশলগত অবস্থান না তৈরি করেই যত্রতত্র অধিকার আন্দোলনের নামে নিজেদেরকে ঝুঁকির মুখে ফলছে। অথচ আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে  ঐ কাজগুলোই আমাদের বেশি দরকার। কমিউনিটির সদস্যরা স্বাবলম্বী হোক , অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ুক, বিভিন্ন কাজে তাদের দক্ষতা কীভাবে বৃদ্ধি পাবে এটা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। আমরা খুব বেশি দেরি করে ফেলছিনা তো ভাববার দায়িত্ব আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম।

যাকগে এবার আসল কথাতেই আসি, আমার ধারণা এবং অভিজ্ঞতা থেকে কমিউনিটি সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কি কি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করছি।

i) আমি অবয়বের পক্ষ থেকে RHRN বাংলাদেশ প্লার্টফর্মে কিছুদিন কাজ করেছি। গত জানুয়ারিতে RHRN প্লার্টফর্মের উদ্যোগে একটি ইয়ুথ সামিট অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশ থেকে প্রায় ৩৫০ জন তরুণ যারা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে। অবাক করা বিষয়টি হচ্ছে এই সকল তরুণদের মধ্যে প্রায় সকলেই এলজিবিটিকিউ+ এবং যৌন বিচিত্রতা সম্পর্কে ধারণা রাখে, সাপোর্ট করে।স্পষ্ট ধারণা না রাখলেও অন্তত ওরা সমকামী, হিজড়া, উভকামী, ট্রান্স-জেন্ডারদের প্রতি ওদের কোন ঘৃণা নেই বরং সমর্থন আছে। এদের বেশির ভাগই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসেছে। তাহলে এদের ভিতর এই পরিবর্তনটা আসলো কীভাবে?

 RHRN প্লার্টফর্মের সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের এডভোকেসি করার সুফল এটি।

আমাদের কমিউনিটিতে যদি প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অন্তত ১০ জনকে এডভোকেসি করার কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় যেমন জেন্ডার সেক্সুয়ালিটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা , কামিং আউট , সিকিউরিটি, কাউন্সিলিং ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষিত করতে পারলে এরাই কমিউনিটিতে মিশে গিয়ে কুইয়্যার কমিউনিটির দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করবে।এর জন্য দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে । ১০ বছর এটি চালাতে পারলে পজিটিভ পরিবর্তন দেখা যাবে।

ii) কমিউনিটি যতটা বড় সে তুলনায় কমিউনিটি লিডার তৈরি হচ্ছে না। যত্রতত্র ডালপালার মতো ছড়ানো ছিটানো গ্রুপগুলোতে বাংলাদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মতো , কুইয়্যার পলিটিশিয়ান তৈরি হচ্ছে, কুইয়্যার লিডার তৈরি হচ্ছেনা।তাই যতই গ্রুপ তৈরি হোক না কেন নেতৃত্ব দেওয়ার মতো লিডার নেই। তাদের ভুল কৌশল, ভুল প্রকাশ ভঙ্গির জন্য পুরো কমিউনিটিকে ভোগাচ্ছে। নিরাপত্তার কথা মাথায় না রেখেই ফেসবুকে পাবলিকলি পোস্ট করছে এবং হুমকি পাচ্ছে, বিপদের মুখোমুখিও হচ্ছে । এদের জন্য সিকিউরিটি ওয়ার্কশপ বা প্রশিক্ষণ খুবই দরকার এবং সেটা প্রতি বছরই দরকার। একবার প্রশিক্ষণ দিয়ে ছেড়ে দিলে হবে না। প্রতিবছরই নতুনদেরকে এই প্রশিক্ষণটা দিলে বড় সুফল আসবে। কারণ এরাই কমিউনিটিকে আগামী দিনে লিড দিবে। সিকিউরিটি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে কীভাবে কমিউনিটিতে নিরাপত্তার সাথে কাজ  করতে হয় সেটার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।

iii)  প্রতিবছর যদি কিছু সংখ্যক কমিউনিটি সদস্যদেরকে আউটসোর্সিং, ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন, এনিমেশন, আইওটি, প্রোগ্রামিং ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তারা নিজেরা যেমন দক্ষতা অর্জন করতে পারবে, আর্থিক ভাবে উপার্জন করতে পারবে তেমনই কমিউনিটিও উপকৃত হবে। এরাই পরবর্তীতে এলজিবিটি টেক কমিউনিটি এবং ডিজিটাল আর্ট কমিউনিটি গড়ে তুলবে।

iv) কমিউনিটির কোন সদস্য যদি উদ্যোক্তা হতে চায় যেমন: ফুড কার্ট, কাপড়ের ব্যবসা বা অন্যান্য কাজের উদ্যোক্তা হলে তাদের উদ্যোগকে কমিউনিটিতে প্রচারের একটি মাধ্যম তৈরি করা যেতে পারে। প্রয়োজনে তাদেরকে আর্থিক সহায়তা করতে হবে এবং উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করতে দিতে হবে।

v) হিজড়া বা কতি হওয়ার জন্য বা যারা সামাজিক নর্মের বাইরে গিয়ে নিজের প্রকাশভঙ্গীকে প্রাকটিস করে তারা যদি পড়ালেখা থেকে ঝরে পরে তাহলে তাদেরকে শিক্ষার সুজগ করে দিতে হবে বা আলাদা ইন্সিটিটিউশন গড়ে তোলার কথা ভাবতে হবে। অন্তত মানসিক সামাজিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে না  হয় লেখাপড়া করার জন্য। আর নিজের পছন্দসই পেশায় যেতে পারে, সেই সুজগ তৈরি করতে হলে শিক্ষা অর্জন করাটা খুবই দরকার, এটা তো মৌলিক অধিকার এই অধিকার নিশ্চিত কতটা জরুরি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এরা কি ধরনের বাধা বা সমস্যার মুখোমুখি হয় সেই বিষয়ে গবেষণা জরুরি।

এখন আসি কোন প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ছাড়াই আমরা নিজেদের ভিতর কিভাবে কমিউনিটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে দক্ষতা অর্জন করতে পারি।

i) কমিউনিটিতে অনেকেই অনেক ধরনের ক্রিয়েটিভ জিনিস তৈরি করে যেমন : সেলাইয়ের কাজ, ছবি আঁকা, মাটি কাঠের তৈরি কুটির শিল্প ইত্যাদি জিনিস গুলোকে বিক্রি করার জন্য কমিউনিটিতে অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরি করা যায় খুব সহজেই।  এখনকার অনলাইন মার্কেটের মতো। প্রাথমিক ভাবে একটা ফেসবুক পেইজ খুলে এটা করা যায় কমিউনিটিতে প্রচার এবং কৌশলে কমিউনিটির বাইরেও প্রচার ঘটিয়ে বিক্রি করা যায়। তবে এই কাজটা কমিউনিটির মানুষদেরই করতে হবে। চেষ্টা করলে এটা সম্ভব।

 ii) আমার কিছু বন্ধুরা একটা কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করে প্রতি মাসেই, অনেকেই দেখে থাকবেন। সেটা হলও রি-ইভোলিউশনরই কো-কাউন্সিলিং। এটার মাধ্যমে সবাই নিজেদের দুঃখ কষ্ট বাধার কথা শেয়ার করে এবং নিজেই নিজের বাধা থেকে অতিক্রম করার সুজগ পায়। এই পদ্ধতিটা খুবই সহজ। অন্তত এর মাধ্যমে কমিউনিটি বিল্ডিং করে একে অন্যের প্রতি সমানুভূতি বৃদ্ধি এবং কাউন্সিলিং এর দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে।

iii)  ছোট লাইব্রেরি গঠন করা নিজেদের পড়ার দক্ষতা এবং লেখালেখির দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে। খুব সহজেই এটা করা যায়, শুধু ইচ্ছা থাকাটা দরকার। আমরাও একটি কমিউনিটি লাইব্রেরি তৈরি করেছি, গল্প নগর নামে। কেও নিজেদের এলাকায় ভ্রাম্যমাণ বা ছোট লাইব্রেরি তৈরি করতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন। পরামর্শ এবং বই দিয়ে সাহায্য করবার চেষ্টা করবো।

iv) ইংরেজিতে কথা বলা প্রাকটিস, সিভি লেখা প্রাকটিস ইত্যাদি বিষয়গুলো কমিউনিটি গ্রুপ তৈরি করে প্রাকটিস করে তাহলে ভালো একটা প্রভাব পরে। অন্তত কমিউনিটিতে পজিটিভ চিন্তার জায়গা তৈরি হবে।

v) আমাদের ভিতরে অনেকে বিদেশের ইউনিভার্সিটিগুলোতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। তারা যদি কমিউনিটির জুনিয়র ভাই-বোনদেরকে কিভাবে এপ্লাই করতে হবে, কোন সাবজেক্টে পড়বে, কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, কিভাবে জিআরই এর পড়াশোনা করবে ইত্যাদি বিষয়ে একটু আনুষ্ঠানিক ভাবে পরামর্শ দিলে সেটাও কমিউনিটি একটা ভালো প্রভাব পরবে।

আরও অনেক অনেক পদ্ধতিতে নিজেদের ভিতরেই দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায়। অনেকের অনেক আইডিয়া আছে সেগুলোকে শেয়ার করুন আলোচনা করুন। আলোচনার পথকে প্রসারিত করুন। যাতে অন্যদের মনে না হয়, কমিউনিটি গ্রুপগুলো শুধু ডেটিং আর পলিটিক্স নিয়ে ব্যস্ত না। যাতে সর্বস্তরের কমিউনিটির মানুষেরা উপকৃত হয়।

অনেকেই নিড এসেসমেন্ট সার্ভের কথা বলবেন। আমিও এটাকে সমর্থন কিন্তু সার্ভে করে তারপরে কাজ করতে হবে এটা বিশ্বাস করিনা। কমিউনিটির সকলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না। কিন্তু এই কাজ গুলো শুরু তো করতে হবে, তাহলে ধীরে ধীরে কমিউনিটি সকল স্তরে পৌঁছানো যাবে।তাই কমিউনিটির গ্রুপগুলোকে অবশ্যই প্রতিযোগিতা মনোভাব বদলে একে অপরকে সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।

 আমাদের দরকার কমিউনিটির ভিতর থেকেই এই উদ্যেগ গুলো যাতে গড়ে ওঠে সেই দিকে খেয়াল রাখা। তবেই না মুভমেন্ট সার্থক হবে। 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.