নূর বনাম ৩৭৭ : ১৯৮৯-এর একটি কেইস

নূর মোহাম্মদ ওরফে বগ মাস্টার
বনাম
রাষ্ট্রপক্ষ
৪১ ডিএলআর (১৯৮৯)

ঘটনা সংক্ষেপ:

১৯৮২ সাল। মে মাসের পঞ্চম দিনের বিকেল। মায়ের জন্য ওষুধ দরকার। ছেলে ইউনুস হোমিওপ্যাথি ওষুধ আনার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন একই গ্রামের নূর মোহাম্মদের বাড়ির দিকে। রাজশাহীর এই গ্রামে নূর মোহাম্মদকে লোকে বগ মাস্টার নামে চেনে। ইউনুস সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় নূর মোহাম্মদের বাড়ির দিকে রওনা দিলেও বাড়ি ফিরলেন কাঁদতে কাঁদতে। মা ও ভাইয়ের কাছে তার অভিযোগ, নূর মোহাম্মদ তাকে পশ্চিমের ঘরে নিয়ে যান। এরপর দরজা-জানালা বন্ধ করে তার ওপর জোর খাটিয়ে লুঙ্গি খুলে তার সঙ্গে “খারাপ কাজ” করেন। ইউনুসের বাবা বাড়িতে ছিলেন না। দুদিন পর যখন বাড়ি ফিরলেন, ঘটনাক্রমে তখন থানার দারোগা এ গ্রাম পার হচ্ছিলেন। থানায় এজাহার দায়ের করা হল। এই নিয়ে সালিশ বসল গ্রামে। ফলাফল শূন্য।

তদন্ত শেষে মে মাসের শেষ দিবসে নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দায়ের করল পুলিশ। দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার অধীনে করা এই চার্জশিটে বগ মাস্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মোহাম্মদ ইউনুস আলীর সঙ্গে প্রকৃতিবিরুদ্ধ উপায়ে শারীরিক মিলন ঘটিয়েছেন। রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলা উঠল। রাষ্ট্রপক্ষ চার্জশিটে উল্লিখিত আটজন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। প্রথমজন ভুক্তভোগী ইউনুস নিজে, দ্বিতীয়জন ইউনুসের বড় ভাই ইয়াসিন আলী। মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা তৃতীয় ব্যক্তি একমাত্র স্বতন্ত্র সাক্ষী যিনি ভুক্তভোগীর আত্মীয় নন। বিবাদী পক্ষ সাক্ষীদের জেরা করে প্রমাণ করবার চেষ্টা করলেন, বিবাদী নূর সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং পূর্বশত্রুতা ও আক্রোশের জেরে তাকে এই মামলায় ফাঁসান হয়েছে। বিচারিক আদালত নূর মোহাম্মদকে ৩৭৭ ধারার অধীনে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দিলেন। রায়ের বিরুদ্ধে রাজশাহীর দায়রা জজ আদালতে আপিল করা হলে বিজ্ঞ আদালত বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। বিচারিক ও আপিল; উভয় আদালতের রায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে নূর মোহাম্মদ হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন আবেদন করেন। এই রিভিশন আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগের রংপুর বেঞ্চের দেওয়া রায় নিয়েই মন্দ্র আর্কাইভের বর্তমান এ লেখা।

রায় সংক্ষেপ:

আলোচ্য রিভিশনের রায় লেখেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান খান। বিচারপতি হাবিবুর রহমান রায়ে উল্লেখ করেন, দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার অধীনে পায়ুকামের অপরাধ ঘটেছে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রসিকিউশনকে চারটি বিষয় প্রমাণ করতে হয়:

১. বিবাদী পুরুষ, নারী অথবা পশুর সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হয়েছেন;

২. এরূপ সংসর্গ প্রকৃতিবিরুদ্ধ;

৩. কৃতকর্মটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাধীন;

৪. যৌন অনুপ্রবেশের (Penetration) ঘটনা ঘটেছে।

উক্ত ধারা অনুযায়ী পায়ুকামের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে প্রমাণ করার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে যৌন অনুপ্রবেশের ঘটনা। যদিও এই অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশের মাত্রা ও ব্যাপ্তি কোন গুরুত্ব রাখে না তবুও অনুপ্রবেশ যে ঘটেছে তা প্রমাণ করতেই হবে। তা যত সামান্যই হোক না কেন। একথা সত্য যে পায়ুকামের ঘটনা লোকসম্মুখে ঘটে না। তবে সে অজুহাতে রাষ্ট্রপক্ষ অপরাধ যে সংঘটিত হয়েছে তা প্রমাণের দায় থেকে অব্যহতি পান না। রাষ্ট্রপক্ষকে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে যৌন অনুপ্রবেশের ঘটনা প্রমাণ করতে হবে। বিচারপতি হাবিবুর রহমান আরও লেখেন, এধরণের মামলায় মেডিকেল প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেডিকেল প্রতিবেদনের অনুপস্থিতি রাষ্ট্রপক্ষের মামলার সদগুণের ওপর গুরুতর সংশয় তৈরি করে।

পিটিশনারের যুক্তিতর্কে বিজ্ঞ আইনজীবী বলেন, বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়টি উত্থাপিত কোন প্রমাণের (এভিডেন্স অন রেকর্ড) ভিত্তিতে ঘোষিত ছিল না। বরং, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নূর মোহাম্মদকে কেবল আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে শাস্তি দেন। আপিল আদালতও স্বাধীন বিচারিক মনন প্রয়োগ না করেই বিচারিক আদালতের রায় বহাল রেখে আইনের অপপ্রয়োগ ঘটান। মামলার এজাহার দায়ের করতে দুই দিন দেরি করবার বিষয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই আইনজীবী আরও বলেন, যদিও বিলম্বের কারণ হিসেবে ভুক্তভোগীর বাবার অনুপস্থিতিকে নির্দেশ করা হয়েছে, বাদীর বাবা রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সাক্ষী দিতে একবারও আদালতে উপস্থিত হননি। 

রায়ে বিচারপতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। মামলার কোন পর্যায়েই ভুক্তভোগী ইউনুস আলীর বয়স প্রকাশিত হয়নি। যদিও ভুক্তভোগীর বয়স পায়ুকামের অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়, বয়স নিঃসন্দেহে অপরাধটি কতটুকু গুরুতর তা নির্ণয় করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, ইউনুস আলীর এজাহারের বক্তব্য ও আদালতের জবানবন্দিতে অসামঞ্জস্য খুঁজে পান  উচ্চ আদালত। মামলার এজাহারে ইউনুস বলেন নূর মোহাম্মদ ইউনুসের লুঙ্গি খুলে তার সঙ্গে “খারাপ কাজ” করেন। অথচ আদালতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার ভাষ্য বদলে যায় এভাবে, নূর মোহাম্মদ তাকে একটি কক্ষে নিয়ে তার গুহ্যদ্বারে পুরুষাঙ্গের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে যৌন লালসা মেটান। এটুকু বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে, এজাহারে দেওয়া বক্তব্য দণ্ডবিধি অনুযায়ী প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপরাধ প্রমাণে যথেষ্ট নয় সে সম্পর্কে অবগত হয়েই “অনুপ্রবেশ” শব্দের অবতারণা ঘটান ইউনুস। এছাড়াও, ইউনুস যে প্রকৃতপক্ষেই নূরের বাড়িতে ওষুধ আনতে গিয়েছিলেন, তিনি যে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিলেন অথবা তার গুহ্যদ্বারে কোন আঘাতের চিহ্নের স্বপক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ কোন ধরণের প্রমাণই হাজির করতে পারেননি। এমনকী মামলার তৃতীয় ও একমাত্র স্বতন্ত্র সাক্ষী অপরাধের ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে সাক্ষ্য দেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, পায়ুকামের অপরাধ যে ঘটেছে তা নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগীর গুহ্যদ্বারের অবস্থা বর্ণনা করে কোন মেডিকেল প্রতিবেদন বা চিকিৎসকের বক্তব্য উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয় রাষ্ট্রপক্ষ।

কোন স্বাধীন সাক্ষী দ্বারা ভুক্তভোগীর বক্তব্য প্রতিপাদন করা সম্ভব না হওয়ায়, পায়ুকামের প্রমাণ হিসেবে কোন মেডিকেল প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে না পারায় এবং উত্থাপিত মামলার অন্তর্নিহিত অসম্ভাব্যতা ও দুর্বলতার ভিত্তিতে নূর মোহাম্মদকে ৩৭৭ ধারার অধীন প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপরাধের অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দেন উচ্চ আদালত।

মন্দ্র আর্কাইভের বিশ্লেষণ:

মামলায় অভিযুক্ত আসামী নূর মোহাম্মদকে অভিযোগ থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে বলে আনন্দে উদ্বেলিত হবার কোন প্রয়োজন নেই। একথা ভুলে গেলে চলবে না মামলাটি ৩৭৭ ধারার অধীনে দায়ের করা হয়েছিল। যে ধারায় সমকামিতা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য। দণ্ডবিধির অধীনে সমকামিতা একটি প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ হিসেবে ফৌজদারি অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।

প্রথমত, সমকামিতা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ নয়। দ্বিতীয়ত, আলোচ্য মামলার অভিযোগটি স্পষ্টতই ধর্ষণের, সমকামিতার নয়। সম্মতির বিরুদ্ধে, জোর করে, হুমকি অথবা ভয়ভীতির মাধ্যমে যৌন সঙ্গমের অপরাধের নাম ধর্ষণ এবং কেবলই ধর্ষণ। এ অপরাধ নারীর সঙ্গে ঘটুক কিংবা পুরুষ; তা ধর্ষণই। অথচ, দণ্ডবিধি অথবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় কোথাও নরধর্ষণের অস্তিত্বই স্বীকৃত হয়নি। নরধর্ষণ ও শিশুবালক ধর্ষণের ঘটনাকে সরাসরি সমকামিতা আখ্যা দেওয়া এই ভূঅঞ্চলের পুরনো অনুশীলন। মন্দ্র আর্কাইভ এই অনুশীলনের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। বিচারপতি হাবিবুর রহমান অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদের পক্ষে রায় দিয়েছেন বলে তাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দেওয়াও অনুচিতই হবে। কেননা রায়ের এক পর্যায়ে তিনি পায়ুকামকে একটি “জঘন্য কাজ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার এই বক্তব্য সমকামিতার বিরুদ্ধে তৎকালীন ও বর্তমান বাংলাদেশের বিচার বিভাগের সামষ্টিক কণ্ঠস্বরেরই প্রতিনিধিত্ব করে।

রায়ে পায়ুকামের অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে মেডিকেল প্রতিবেদন বা চিকিৎসকের বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে। ঠিক এই বিষয়টিই বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্তকে দোষী প্রমাণের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সামাজিক ও আইনী বাস্তবতায় অধিকাংশ ধর্ষণ মামলা দায়ের করতে বহু সময় লেগে যায়। ততদিনে মেডিকেল নিরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ করা অসম্ভব। এই সিস্টেমিক ফাঁকফোকরের বদৌলতে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায় অসংখ্য ধর্ষক। সম্প্রতি বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই নারী ধর্ষণ মামলায় বিচারক কামরুন্নাহারের রায়েও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখেছি আমরা।

অথচ, ২০২০ সালের অক্টোবরে হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী মেডিকেল প্রমাণাদির অনুপস্থিতির সরাসরি অর্থ এটা হতে পারে না যে অভিযুক্ত আসামী খালাস পেয়ে যাবেন। ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া যাবে। মামলার পূর্বনজিরের ক্ষেত্রে যে ভারতের অন্ধ অনুসরণ করি আমরা, সে দেশের উড়িষ্যা প্রদেশের উচ্চ আদালতের একটি রুল অনুযায়ী ধর্ষণ ও আত্মহত্যা মামলায় সরাসরি প্রমাণের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপক্ষ সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্সের মাধ্যমে মামলা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

৩৭৭ ধারা বাহ্যত বিষমকামী ও সমকামী উভয় যৌন অভিমুখিতার জনমানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও এটি মূলত সমকামী যৌন অভিব্যক্তিকেই অন্যায্যত কোণঠাসা করে রাখে। অধিকন্তু, ধর্ষককে সমকামী হিসেবে পরিচয় দিয়ে একটি স্বতস্ফূর্ত যৌন অভিমুখিতাকে প্রতিনিধিত্বকারী জনসমাজকে নিতান্তই অপমান করা হয় বৈকি।  

লিখেছেনঃ ইনসেনলি অ্যাভারেজ

মন্দ্র-এর অনুমতি ছাড়া এই লেখা পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.