মাতাল

জেমাইমা

বেয়াদ্দপ মোরগটা যদি একটা দিনও একটু দেরি কইরা ডাকতো! আলো ফুইটা পারলো না।

এহন তো আর ঘুমও আসবো না। এর’চে এহন কয়টা রুটি বেশি বেইলা রাখলে কাইলকা সকালে একটু গরামু বেশি সময় ধইরা। আনিকার বাপের তো একটা দিনও সকালে রুটি ছাড়া কিসু রুচে না। আরেক জ্বালা।  

“আম্মো— আজকে না যাই স্কুল?”  

“পত্যেকদিন এক প্যাঁচাল পারিস ক্যান? যা বগলের কাছ থিকা সর। কইলাম না  যাইতে? গনগনা আগুন উঠতাছে— মাইয়া কথা শুনেনি? যা এহান থে, রেডি হ— দেরি হইলে তোর বাপে তো আমার উপর চিল্লাইবো” 

“আরে না যাউক আজকা— হুদাকামে চিল্লাও ক্যান? না গেল আইজকা।’’ “আপনের কি হইল? কামে যাওনের তাড়া নাই?” 

“নাহ, আইজকা রিশকা বিকালের শিফটে লমু। কইলাম না, কাইলকা ভালাই কামাই  হইছে।’’ 

“হ থাউক তাইলে। শইলরে এটটুরেস্ট দ্যান। চা বানায়া দেই? রুটি দিয়া খান? অন্য সময় তো হয়না দৌড়ের উপর…” 

“হ দাও, তুমি ও লও, আজকা একলগে নাশতাটা করি।” 

দিনটা যে ভালা শুরু হইল- কার মুখ দেখসিলাম সকালত? মোরগটার?  “ঐ আনিকার মা, কই?” 

“আসি, লন বসেন আপনেরা। আমি গেলাসটা আইনা বসি।”  

মাইয়াটার খাওয়া কেমন খবিশের মতন দেখছনি? রুটি ছিঁড়া ছিঁড়া চায়ের মধ্যে ফেলতাসে আর ঘুটতাছে। ৬ মাস হয়া গেল স্কুলে যাইতাছে এহনও আদব-লেহাজ  শিখায়ছেনি কিছু কেমন স্কুলে দিলাম। ওরে একটা…”  

“আহা খাইতে দাও ওরে— ধমক ধুমক দিও না। মন পইড়া যাইব সকাল সকাল।” এহহে বুইঝা ফেলল এমনে? 

“কই ধমকাইলাম— কিসু কইনাই তো।”  

“তোমার তো নাক ফুলা শুরু হইসিল— না থামাইলে তো তহনি চিল্লান দিতা একটা।” 

“যান হুদা প্যাঁচাল আপনের” 

মানুষটারে হাসলে এত আপন লাগে! সবদিন লোকটা বিকালে বাইর হইতে পারে না? “তোমারতো আইজকাও ছুটি , নাকি? স্কুলে র আপারা আইবো কবে ঢাকা?” “কাইলকা সকালে আইসা পৌঁছব— আমারে দুপুর কইরা যাইতে বলসে, বলসে আইসা ফোন দিব।”  

“নাহ, আর পারলাম না মাইয়াটারে লইয়া…ঐ আনিকা থো গেলাস, হইছে না খাওয়া?  থো— যা আব্বার লগে যাইয়া হাত ধুইয়া আয়- আপনে একটু ওরে লগে লন দেহি- আমি ধোওয়া পাকলার কাজটা সাইরা ফেলি।”  

শুধু চা রুটি খাইলেও তো সেই ঘেটির সমান বাসন জমে। তাও বাঁচন আইজকা,  কামে গেলে তো দুই- ডাবল মাজা লাগতো। করল্লাগুলা কই থুইলাম ধ্যাত।  “তুমি আবার সবজি নিয়া বসছ? এডি রাইখা ঘরে আইসা বস— দুইডা গপসপ করি,  কদ্দিন পর দনোজন একলগে ছুটি পাইলাম।”  

“আসি, একটু গুছায়ে থুইয়া আসি দুপুরেরটা— আনিকায় কই? লগে আনেন নাই  ওরে?” 

“আরে আনছি, আনছি। অয় জামা ভিজায় ফেলছে, বদলাইতাছে। তুমি এগলি জলদি সারো।”  

জলদি সারো কইলেই তো জলদি তাইনা? কাম করতে তো টাইম লাগে না— ব্যাডামানুষ গুলান যদি বুঝত এডি করতে মেহনত…  

“অ আর শুনো?” 

“হু?” 

“দুপুরে আনিকারে খাওয়ায় রানুর ঘরে পাঠায়া দিয়ো, বুঝছ?” 

না বুঝি নাই। বুঝি নাই। বুঝি নাই। বুঝি নাই। আমি এগলি বুঝি না।  

“কথা কও না যে?” 

“হ, বুঝসি- তয় রানু ঘরে আছেনি তো কইতে পারিনা…” 

“না না আছে ওরা— দেহা হইছে আমার রানু আর অর ছোড মাইয়াটার লগে কলপারে। অয়ই তো ভিজায় দিল আনিকারে। তুমি ওরে খাওয়ায়য়া লগে লগে পাঠাইও  কেমন?” 

“জি আচ্ছা।”  

আনিকায় তো শুনলেই লাফায়া উঠবো। রানুর মাইয়া ছোডটা তো একটু ক্যামন  জানি বদপানা, অর নাম শুনলে এমন লাফায় ক্যান মাইয়াটা? ওরে ঘুম পারায়া দিমুনি —  খাওনের পর? এম্নেই তো ঘুমায়— অর বাপে তো ওরে ঘুমে র থে তুইলা পাঠাইবো না,  নাকি? ইয়া খোদা এই করল্লাডির বীচি কি আমার বাপে ফালাইব- দুইডা মিনিটের লাইগা  মনটা উঠলো আর হাতের কাম আদ্ধেক নষ্ট। বালের কপাল আমার না ফাটা হইলে হইব  ক্যান এডি। 

“আম্মো আম্মো আব্বায় বলসে দুপুরে আমারে পেয়ারার সাথে খেলতে দিব। ভাত  ঠিকঠাক খাইলেই নাকি যাইতে দিব” 

ক্যামনে একটা মানুষে র বাচ্চার নাম একটা মায়ে পেয়ারা থোয় ? ক্যামন মানুষ রানুর  জামাই? আক্কেল মাক্কেল নাই নি— 

“কি আম্মো শুনো নাই? পেয়ারার…” 

“আরে বুঝসি হ— কিন্তু পাতের খাওন শেষ না কইরা তুমি কইলাম ডানে বামে পেয়ারার কাছে কাঁঠালের কাছে যাইতে পারবা না, বুঝা গ্যাছে? আরে ধ্যাত আস্তে হাস,  কোন মাইনসে এমনে চিক্কুর পাইড়া হাসে শুনসোস তুই?” 

হাসলে বিলকুল অর বাপের মতন লাগে অরে। উপ্রে নিচে সব দাঁত বাইর কইরা— আইজকা তো হের তাড়া আছে, কইছে দুপুরে র পরপরই বাইর হওন লাগব, থাকব না  বেশীক্ষণ— থাক সমস্যা নাই। আর খাওয়ার পর থালা বাটি ধুইতেই তো আধঘণ্টা লাগে,  থাক সমস্যা নাই। সমস্যা নাই। সমস্যা নাই। 

“তোরে না আমি কইছি পেলেট খালি না কইরা কোথাও যাওয়া হইব না তোমার?  কইছি? কত্তডি ভাত বাকী এহনই উশখুশ করো কিসের লাইগা? শেষ কর সব।” “আম্মো আজকা তুমি বেশি ভাত দিছ- খাইতে পারতাছি না। ডাল এত্তগুলা…” “তোমার কানের তলে দুইডা না দিলে তুমি …” 

“আহা! এই আনিকা, শেষ কর তো মা, জলদি জলদি— এই দ্যাখ আমি ফাস্ট হইয়া  গেছি, আম্মাও ফাস্ট হইয়া যাইব, তুই একলা একলা বইসা খাবি?” এট্টুকে ই মাইয়ার চখে পানি টলটল? বাপরে দেইখা আজকা চেতছে বেশি—শালার  মাইয়া প্যাটে ধরলাম, পাললাম পুষলাম আমি, এহন ন্যাটা হইছে বাপের। দুনিয়াডা এমন  না-ইনসাফ ক্যান। 

“দ্যান আপনের পেলেট দ্যান— গেলাসটা একটু আগায়া দ্যান। ডাইলের চামুচটা তুইলা  এইখানে খালি বাটিটাত দ্যান। হ। ঐ তোর এহনও বাকী নাকি? আনিকা তোরে আমি কইলাম কিন্তু মাইনশের বাড়িত আধাপেটা যাবি এরপর আমার মান ইজ্জত ডুবাবি…” 

“না না থামো না- নে তো মা, সুরুত কইরা একটা টান দে দেখি… হ্যাঁ এইতো সাবাশ!” 

“ভেরি গুড দাও আমারে আব্বা?” 

“হ হ, ভেরি গুড— যাও আম্মার সাথে গিয়া হাত মুখ মুইছা আসো। আমি নিয়া  35

যাইতেছি তোমারে রানুদে র ঘরে…” 

“অখনি? একটু জিরায়ে যান— মাত্রই না খাইলেন?” 

“আইসা জিরামুনে— ওরে আর দেরি করাইলে আবার কান্দন ধরবো” বিষের জ্বালা এই মাইয়াটা আমার। দুনিচয়ার সবাইর মাইয়া দেখলাম কি সুন্দর ঘরে বইসা খেলে, মায়ের লগে লগে থাহে, আর আমার এইডা ঘরের বাইরে যাওনের নাম  শুনলে পারে না য্যান ঘরের চালে উইঠা নাচন লাগায়। কপালডা আমার আগাগোড়া ফাটা  না হইলে এডি হইত? হইত না আসলে। 

“যা— সাবধানে থাকিস। আর জামা কাপরে মাটি লাগলে কইলাম তোরে আর তোর  পেয়ারারে দিয়া ধোওয়ামু। মারামারি চুলাচুলি করবি না— রানু খালার কথা শুনবি তো?  মাথা নাড়িস ক্যান, তোর মুখ নাই? হ মনে থাকব? যা ভালা হইয়া থাকিস— আর আব্বা আনতে গেলে ধানাই পানাই না কইরা চইলা আসবি, দুইবারের বার য্যান বলা না লাগে—  বুঝা গ্যাছে?” 

“আরে তুমি দেখি ওরে শ্বশুরবাড়ি পাঠাইতাছ। আয় মা, হাত ধর। তুমি থালা বাসন  গোছ কইরা রাখো— অহনি ধুইতে বইসো না আবার। সারা বিকাল আর কি করবা?  তহন ধুইয়ো। চল মা।’’ 

হের তো যাইয়া আইতে পাঁচ মিনিটও লাগব না। কপাল। মানুষটা এত ভালা, এত  ভালা— আমারই খালি…  

“আচ্ছা ইয়াসমিন একটা জিনিস কও— একটা মানুষ কেম্নে নিজের প্যাটের মাইয়ার নাম পেয়ারা দ্যায়?” 

“আরে আমিও এইডাই ভাবি— অর জামাইটা একটা ব্যাক্কেল নি বউরে এমন একটা  নাম থুইতে মানা করব না? ক্যামন…” 

“আরেহ তুমি আইজকা এমন চেইতা আছ ক্যান— রাখল অর মাইয়া অয় পেয়ারা  তরমুজ গাবগাছ যা ইচ্ছা নাম থুক। তুমি আইসা শান্ত হইয়া বস।”  শাড়িটা তো বদলানোই… 

“আপনি বসেন আমি চট কইরা শাড়িটা বদলাইয়া আসি। এইটা…” হাসে ক্যান মানুষটা?  

“আরেহ বদলাইয়া লাভ কি— থাকবই তো না” 

“ইস চুপ করেন কি কন” 

“আচ্ছা করলাম। বস তুমি । তোমারে এইরকম চাঁপা চাঁপা হইলদা শাড়িতে অনেক  মানায় মাশাল্লাহ। ঈদে টাকা জমলে তোমারে কি এই রঙই আইনা দিব নাকি অন্য পসন্দ আছে?” 

“আমার পসন্দ কি? দেখবেন ত আপনে— যেইটা মনে লাগে ওইটাই আইনেন।“ “খারাপ কও নাই— হাহাহা, দেখুম তো আমিই। তুমি এত দূরে যাইয়া বসছ কেন,  এইযে এইখানে বস” 

না। না। না। না না না। না না না না। 

লোকটার হাত দুইটা কেম্নে এমন রিশকা চালায়াও এমন নরম— আমার তো বাসন  মাইজাই হাত ক্ষইয়া গেছে। পরের মাসের টাকা পাইলে হের লাইগা একটা দাড়ি নরম  করনেরও সাবান কিনুম— কি যে খোঁচা লাগতাছে চামড়ায় মাবুদ।  ইয়া খোদা। ইয়া খোদা। ধৈয্য খোদা, ধৈয্য। ধৈয্য। আরেট্টু ধৈয্য। 

“আল্লাহুম্মা ইন্না…” 

“কিছু…কিছু বললা…” 

“নাহ ন…না” 

খোদারে! 

“ব্যথা লাগলে…বইল।’’ 

খোদা— মাবুদ। ক্যামনে বলব?  

৭ বছরে লোকটা প্রত্তেকবার জিগাইল, আমি একবারও সাহসটা করতে পারলাম না।  কি কমু? 

রানুরে একবার বলছিলাম। পত্থম যে কত্ত হাসলো মাগি, পরে আবার কইলাম—শুইনা  মন হইল আকাশ থন পড়ল। 

“কি কস? সবসময়? এতডি বছর হইল একবারও তোর…..?” 

“নাহ। একবারও না।”  

“তুই কি শরম করতাসস আমার লগে নাকি?” 

“আরে বাল তোর লগে শরম করলে এতডি কিছু কইতাম এহন পৈয্যন্ত?” পরে রানু অনেক ভাইবা বাইর করছে “তোর মনে হয় কোন অসুখ আছে—অইখানে কোন ব্যথা ব্যাদনা, ল ডাক্তারের থন যাই, যাবি নি?” 

তহন আমি অনেক হাসছিলাম। “ডাক্তাররে কি কমু? যে ডাক্তার আমার … ভাল্লাগে না?” 

রানুও হাসছিল পরে, “আর কি কবি? আছে আর কোন সমইস্যা?” 

অহনও আমার মাঝেমধ্যে মনে পড়ে ঐদিনের কথা। তহন গেলেই মনে হয় ভালা  করতাম। এদ্দিন পর রানুরে আবার কেম্নে মনে করায়া দিমু— আর মাইনসে শুনলে তো রানুর থন বিশ্রী কইরা হাসব। বুড়ি মাগির ভাল্লাগে না?? মাইয়া স্কুলে পড়ে মাগির? 

লোকটা এমন জোরে দম ছাড়ে ক্যান কানের ভিত্রে? আস্তে দম ছাড়লে কি কষ্ট বেশি? ইয়া মাবুদ। ধৈয্য মাবুদ, ধৈয্য। আরেটটু ধৈয্য। 

“এটটু সরেন তো— নামমু।’’ 

“কই যাও আরে” 

“পাক— সাফ হইয়া আসি।’’ 

“লও দুইডা মিনিট পর একলগে যামুনে।’’ 

“পাগলাইছেন আপনে— দুই মিনিট পর ঘর আলগা দিয়া দুইজন মিলা চইলা যামু?  আপনে থোন, আমি আইলে আপনে যান একবারে আনিকারে লইয়া ঘরে আহেন?” “অহনি ক্যান? আরেট্টু পর আনি অরে?” 

“পরেই তো— আমি আইসা লই। শোন আপনে। পানি দিমু? খাইবেন? আচ্ছা তয়  গেলাম, আপনে ঘর আল্গি দিয়া যাইয়েন না কিন্তু কোন দিগ।”  

“না, যামু না কোন দিগ। যাও তুমি ।”  

চাপকলটার ইস্ক্রু কি কেউ টাইট কইরা দিসে বেশি? আজকা এমন পেসার দেওন  লাগতাসে ক্যান? অবশ্য ভাইগ্য ভালা আজকা মনে লয়— রহিইম্মা বলদটা অর ঘরে জোরে ক্যাসেট ছাড়সে, নাইলে এই নতুন গোসলখানার যেই পাতলা ওয়াল— একটু বুকখালি কইরা কান্দন ও যাইত না। মমতাজ মাগিডা আইসা জিগাইত “কান্দ ক্যান?  জামাই মারছে?”  

মাতারি তোর ভাতারের মতন মাতাল নি আমার জামাই?

প্রথম প্রকাশ: সমারূঢ়
(মন্দ্র প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম কুইয়ার ছোটগল্প সংকলন)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.